কার্টুনিস্ট রনবী এর ‘টোকাই’ কাহিনী

কার্টুনিস্ট রনবীর এর 'টোকাই

রফিকুন নবী। বাংলাদেশের অগ্রগণ্য শিল্পী। রনবী নামে পরিচিতি লাভ করেছেন কার্টুনিস্ট হিসেবেও। ‘টোকাই’ তাঁর অমর সৃষ্টি, যার শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। যার ঘটনাপ্রবাহে উঠে আসে পরিবেশ, রাজনীতি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, সামাজিক মাৎস্যন্যায়, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং টোকাইয়ের নিজস্ব বৃত্তান্ত। কার্টুনিস্ট রনবী এর ‘টোকাই’ এর ভালো লাগার মতো কিছু তথ্য এখানে উপস্থাপন করা হলো।

‘টোকাই’র শুরুর গল্প

১৯৭৬ সালের শেষ দিকের কথা। রনবী তখন সদ্যই গ্রিস থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে এসেছেন। আসার পরপরই ঠিক করেছিলেন যে আর কার্টুন আঁকবেন না। ষাটের দশকে তিনি কিছু ম্যাগাজিনে কার্টুন আঁকতেন। তবে আবার কার্টুন শুরু করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তিনি তখন শুধু চিত্রকলা— যেটা তাঁর আসল জায়গা— সেটা নিয়েই কাজ করার চেষ্টা করছিলেন। ১৯৭৭ সালের একদম শেষ দিকে, সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকাটি তখন বেশ উঠতির দিকে। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিল রনবীর ছোটবেলার বন্ধু শাহাদত চৌধুরী। সে বিচিত্রার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে তাঁকে একটা কার্টুন এঁকে দেওয়ার জন্য জোরাজুরি করা হলো। এমন অনুরোধের চাপে রনবীর টোকাইয়ের প্রথম স্ট্রিপটি আঁকলেন। চরিত্রটির বয়স ৮-৯ বছর। নির্মল চেহারার একটি ছেলে, পেটফোলা—দেখলে মনে হয় অপুষ্টিতে ভুগছে। আস্তাকুঁড়ের কাছাকাছি বা ফুটপাতে থাকে। ওই প্রথম কার্টুনটি করার পর এটা এত জনপ্রিয় হয় যে নিয়মিতভাবে এই কার্টুন করার জন্য চাপ এল। এবং সেই থেকে শুরু ‘টোকাইযাত্রা’।

কার্টুন‘টোকাই’এর
জনপ্রিয় কার্টুন‘টোকাই’এর ছবি

নামের উৎপত্তি

সম্পাদক শাহাদত রনবী কে বললেন, ধারাবাহিক যেহেতু করতে হবে সেহেতু এটার একটা নাম দাও। টোকন, টোকামিয়া, টগর, টুকু—এ রকম অনেক নাম মাথায় এসেছিল কার্টুনিস্টের। প্রায় ২০টি নাম খাতায় লেখেন তিনি। কিন্তু সব নাম ছাপিয়ে ‘ট’-বর্গের নামগুলোর বাইরে তাঁর চোখ সরাতে পারেননি। শেষ অব্দি একটি নাম ঠিক হলো—‘টোকাইনা’। কিন্তু সে নামও তাঁর চাওয়ার সঙ্গে মিলল না। তখন আচমকা ‘টোকাইনা’ থেকে ‘না’ বাদ দিলেন। পরে দেখেন, বেশ ভালো লাগছে। শুনতেও ভালো লাগে। সস্ত্রীকে নামটা বললেন। তিনিও পছন্দ করলেন। তারপর থেকেই টোকাই।

 জনপ্রিয় কার্টুন‘টোকাই’এর ছবি
জনপ্রিয় কার্টুন‘টোকাই’এর ছবি

‘টোকাই’র বয়স

টোকাই’ প্রকাশের ৪০ বছর হলো। শুরুতে টোকাইয়ের বয়স ছিল ৮-৯ বছর। এখনো টোকাইয়ের বয়স সে রকমই আছে। কার্টুনিস্ট যদি ভাবেন যে তাঁর বয়স বাড়ার সঙ্গে চরিত্রের বয়সও বাড়াবেন, সেটা হতে পারে। তবে স্ট্রিপ কার্টুনের বেলায় মজা হলো, একই চরিত্র বছরের পর বছর একই বয়সে থাকতে পারে ফলে টোকাইয়ের বয়স কখনও বাড়বে না।

‘টোকাই’র ভাষা

টোকাই রাজনীতি থেকে শুরু করে সামাজিক নানা রকম বিষয় বা সমস্যা নিয়ে বারবার কথা বলে।

টোকাই
জনপ্রিয় কার্টুন‘টোকাই’এর ছবি

অভিধানে স্থান

সে সময় দেশের রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি একবার এক সভায় বলেছিলেন, ‘রনবীকে অনুরোধ করছি, তিনি যেন আর টোকাই নাম দিয়ে এ ধরনের কার্টুন না আঁকেন। এরা আসলে ‘পথকলি’। টোকাই ডাকা এদের জন্য অবমাননা।’ শিল্পি অবশ্য সেটা মানতে পারেননি। বেশ মজার ব্যাপার হলো, টোকাই কী বলছে না-বলছে সেটা একটা দেশের উচ্চপদস্থ ব্যক্তির চিন্তার বিষয় ছিল। তবে ‘টোকাই’ শব্দটিকে রনবীর নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করেননি। টোকাই মানে কাগজ কুড়ানো। কিন্তু সাধারণ মানুষ পথশিশুদের টোকাই বলে ডাকতে শুরু করেন। মানুষের ভালো লাগা থেকেই শব্দটা জনপ্রিয় হয়েছে। প্রথমে টোকাই ছাপা হওয়ার পরপরই খুব ভালো সাড়া পেয়েছিল। পরে শব্দটিকে অভিধানেও যুক্ত করা হয়।

সে সময় দেশের রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি একবার এক সভায় বলেছিলেন, ‘রনবীকে অনুরোধ করছি, তিনি যেন আর টোকাই নাম দিয়ে এ ধরনের কার্টুন না আঁকেন। এরা আসলে ‘পথকলি’। টোকাই ডাকা এদের জন্য অবমাননা।’

পাঠকের পছন্দ ও অনুরোধ

শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা—বছরের ১২ মাসই টোকাইয়ের পোশাক বলতে ওই একটা লুঙ্গি। রনবী একবার প্যান্ট পরিয়েছিলেন, পাঠক লুঙ্গিটাই পছন্দ করেছে। এ ছাড়া নির্বাচনের মৌসুমে একবার শার্টও পরেছিল টোকাই। শার্টটা এতই বড় ছিল যে সে বলেছিল, ‘ভোটে পাইছি। তয় সাইজ দেইখা মনে হয় ম্যালা ভোট পার করতে পারমু।’ পাঠকের অনুরোধে রনবী একবার টোকাইকে গ্রামেও নিয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় গ্রামের জীবন, রাজনীতি, পরিবেশ, প্রকৃতি— এসবই উঠে এসেছিল টোকাইয়ের জবানে।

জনপ্রিয় কার্টুন
জনপ্রিয় কার্টুন‘টোকাই’এর ছবি

‘টোকাই’ সংখ্যা

টোকাই নিয়ে ‘টোকাই এক’ ও ‘টোকাই দুই’ নামে দুটি বই প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে, প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা থেকে। বই দুটিতে ২৪০টি কার্টুন স্থান পায়। তবে পত্রিকায় প্রকাশিত মোট টোকাইয়ের সংখ্যা যে ঠিক কত, তা রনবী নিজেও জানেন না।

রফিকুন নবী (রনবী) এর বই সমূহ

 

আরও পড়ুনঃ 

কলমের ইতিবৃত্ত

হাসান আজিজুল হকের গল্প ভাবনা ও নির্মাণ শৈলী

“চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা” – সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক।

জাপানের বৈধ জুয়া !!

নায়ক থেকে মহানায়ক, অরুণ কুমার থেকে উত্তম কুমার !

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png