হুমায়ূন আহমেদ ও তাঁর অটোগ্রাফ কাহিনি

হুমায়ূন আহমেদ এর autograph

প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ এর  অটোগ্রাফ পেতে কার না ভালো লাগে? পাঠকদের কাছে বিষয়টা সোনার হরিণ পাওয়ার মতো। এটি সংগ্রহ করার জন্য প্রচন্ড ভিড় সহ্য করতেও আপত্তি থাকে না কারো। রোদের মধ্যে লম্বা লাইনের পর লাইন অপেক্ষা করাটাও যেন স্বস্তির ব্যাপার হয়ে ওঠে। অটোগ্রাফমিশ্রিত বই সারাজীবন স্মৃতি বহন করে বলেই হয়তো এর জন্য এত ত্যাগ-তিতিক্ষা।

হুমায়ূন আহমেদ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। কেমন ছিল তাঁর অটোগ্রাফ? সেটি সংগ্রহ করার জন্য কতটা কাঠখোট্টা পোহাতে হয়েছে পাঠকদের? আজকের আয়োজনে থাকছে সেসব গল্পগুলোই।

০১। সম্রাট হুমায়ূন

হুমায়ূনকে আমি প্রথম দেখি একুশের বইমেলায়। সাতাশি সালের এক সন্ধ্যায়। যিনি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘‘ইনি হুমায়ূন আহমেদ। ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামে একটি জনপ্রিয় টিভি-নাটক লিখেছেন, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামের উপন্যাস লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ান।’’ দেখলাম, একটি শীর্ণ যুবককে, যার পরনে পাঞ্জাবি, চোঙা পাজামা গোড়ালির ওপরে। কিন্তু চশমার আড়ালে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ। হেসে বলেছিল, ‘‘আমি আপনাদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি।’’

সেদিন মেলার দর্শক-শ্রোতারা হুমায়ূনকে ঘিরে ভিড় জমায়নি। রথের মেলায় উদাসীন বালকের মতো বইমেলায় ঘুরছিল সে।

বছর পাঁচেক পরে ঢাকার একুশের বইমেলায় ঢুকেই দেখি বিশাল লাইন। বই হাতে মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। প্রশ্ন করে জানলাম ওঁরা হুমায়ূন আহমেদের বই কিনে দাঁড়িয়ে আছেন অটোগ্রাফ করিয়ে নেবেন বলে। অন্তত পাঁচ-ছ’শো মানুষ একই আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন দেখে অবাক হলাম।

আমাদের কলকাতা বইমেলায় এমন ঘটনা ঘটেছে কি-না মনে পড়ল না। সমরেশ বসুশংকরসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা যখন মেলায় আসতেন, তখন তাঁদের ঘিরে ছোটখাট ভিড় জমলেও এমন লাইন পড়ত না।

সময়টা উনিশশো বিরানব্বই। তখনও কলকাতার পাঠকদের নব্বই ভাগ হুমায়ূন আহমেদের নাম শোনেননি, বই পড়া তো দূরের কথা। লাইনের শুরুতে পৌঁছে দেখলাম একটি স্টলের সামনে চেয়ারে বসে হুমায়ূন মাথা নিচু করে একের পর এক সই দিয়ে যাচ্ছে। যে বই এগিয়ে দিচ্ছে তার মুখের দিকে তাকাচ্ছে না।

১৯৮৭-সালের-বইমেলায়-হুমায়ূন-আহমেদ

আমি একটা ‘গীতবিতান’ এগিয়ে ধরতে সে আমাকে না দেখে বইটি নিল। সই করার ঠিক আগে থেমে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘‘সর্বনাশ, আপনি কি আমাকে দোজখে পাঠাতে চান? এই বই-এ সই করার যোগ্যতা তো আমার—!’’ বলতে বলতে মুখ তুলেই সে আমাকে দেখতে পেল। তার চোখ বিস্ফারিত হলো। লাফিয়ে উঠে আমাকে প্রণাম করতে এলো সে। বলল, ‘‘ছি ছি, আপনি আমায় এ কী লজ্জায় ফেললেন!’’

সমরেশ মজুমদার, লেখক

(আনন্দবাজার পত্রিকার আর্টিকেল, সংক্ষেপিত)

০২। অটোগ্রাফ বিড়ম্বনা

বাংলাদেশের বইমেলার বাণিজ্য দীর্ঘদিন হুমায়ূননির্ভর ছিল। এক হুমায়ূন আহমেদের কারণেই বইমেলাতে একটা নির্দিষ্ট ক্রেতাসমাগম সৃষ্টি হইতো। হুমায়ূন নিজে বইমেলায় বইসা সকলকে অটোগ্রাফ দিতেন। শাওনের কাছ থেকে সেই সময়কার কিছু স্মৃতি উদ্ধার করা গেল।

হুমায়ূন আহমেদ যখন ২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে শাওনকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন বেশ কিছু প্রকাশক তার বাসায় হাজির হন। প্রকাশকরা হুমায়ূনকে শুভকামনা জানানোর ভঙ্গিমায় নানাভাবে বিয়েটা মাসদুয়েক পিছানোর প্রস্তাব করেন। তাদের ধারণা, হুমায়ূন আহমেদকে নিয়া তাদের ব্যবসা শেষ। এই বিয়ের পর আর পাঠকরা হুমায়ূনকে পড়তে রাজি হবে না। ফলে, বিয়েটা মাসদুয়েক পিছানো গেলে শেষবারের মতো ব্যবসাটা কইরা নেয়া যাবে।

শাওনের বয়ানে হুমায়ূন বইটাতে শাওন বলেছেন, হুমায়ূন আহমেদকে নিয়া এখন পর্যন্ত যে বড় বড় কথা বলতে পারি, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে হুমায়ূনের ব্যক্তিত্বের নৈতিকতা। হুমায়ূন আহমেদ ডিসেম্বরেই বিয়ে করেন, এবং ফেব্রুয়ারিতে শাওনকে সাথে নিয়াই বইমেলায় যান। সেই বছরও তার উপন্যাস বরাবরের মতো বেস্টসেলার। উপরন্তু, হুমায়ূনের পাশাপাশি শাওনকেও অনেকের বইয়ে অটোগ্রাফ দিতে হয়েছে। সেই মেলায় হুমায়ূনের অটোগ্রাফের জন্য ছিল একটা লাইন, আর শাওনের জন্য আরেকটা।

 

এই পর্যায়ে অটোগ্রাফ নিয়া একটা মজার ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন শাওন। হুমায়ূনের প্রতিবার এক বসায় দেড় দুই হাজার অটোগ্রাফ দিতে হইতো, ঘাড় উঁচা কইরা কারও চেহারা দেখার সময় পাইতেন না। অটোগ্রাফ লিখতে লিখতেই পাঠকের নাম জানতে চাইতেন, সেই নামে অটোগ্রাফ লেইখা দিতেন।

তো, এইরকম একজনকে অটোগ্রাফ দিতে গিয়া হুমায়ূন জিগাইলেন, তোমার নাম কী? সে নাম বলে না। দ্বিতীয়বার আবার জানতে চাওয়া হইলো, কোন উত্তর নাই। পিছনে লাইন বড় হইতেছে, পাঠকেরা অধৈর্য হইয়া যাইতেছেন। হুমায়ূন বিরক্ত হইয়া ঘাড় ফিরায়া তাকাইলেন, তোমার নাম বলো?

উত্তর আসলো, স্যার, আমার নাম শাওন!

মেহের আফরোজ শাওনের ভাষ্যমতে, ইয়া গোঁফওয়ালা, ষণ্ডামার্কা এক লোক, তার নাম বলতেছে শাওন! স্টলে সকলে হাসতে হাসতে শেষ। 

বইমেলা রাত নয়টার মধ্যে শেষ করার নিয়ম। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ ঠিক নয়টায় মেলার লাইট অফ কইরা দেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের অটোগ্রাফ সংগ্রহকারীদের লাইন তখনো বড় হইতেছে। মেলা শেষ, কিন্তু অটোগ্রাফ দেয়া তো শেষ হয় নাই। নয়টা বাজতেই মেলার বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ কইরা দেয়া হইলো।

সেই রাতে প্রকাশক তৎক্ষণাৎ কিছু মোম আনার ব্যবস্থা করলেন। চাঁদের আলোয় বাংলা একাডেমির মাঠে লাইন দীর্ঘতর হইতেছে, জোছনায় তাদের ছায়া পড়ে। ক্যান্ডেল লাইট জ্বালায়ে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত অটোগ্রাফ দেন হুমায়ূন। শাওনের মুখে বইমেলা নিয়া এইরকম আরও কিছু সুখস্মৃতি শুনতে পাওয়া গেল।

পরের দিন বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বিষোদগার করলেন, একজন মাত্র লেখকের জন্য এই অব্যবস্থাপনা মেনে নেয়া যায় না। হুমায়ূনের যদি এতো অটোগ্রাফ দিতেই হয়, তাইলে তিনি রমনা পার্কে গিয়া চেয়ার-টেবিল নিয়া বইসা থাকেন না কেন? বাংলা একাডেমি এই অত্যাচার আর সহ্য করবে না। 

হুমায়ূন তাদেরকে মৃদু ভঙ্গিমায় জানাইলেন, আমি নাইলে রমনা পার্কে চইলা যাইতে পারি, কিন্তু তখন বইমেলা বাংলা একাডেমিতে রাখতে পারবেন তো?

পরে অবশ্য বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ তাদের ভুল স্বীকার করেন এবং তাদের এই বক্তব্যের বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বইমেলা-পাঠক-ক্রেতাদের নিয়া হুমায়ূনের জীবনে এইরকম আরও অনেক অনেক গল্প আছে, শাওনের কাছ থেকে সেইগুলা সংগ্রহ করা হইছে। পরে সুযোগ হইলে অন্য কোথাও বলব। 

শোয়েব সর্বনাম, ‘শাওনের বয়ানে হুমায়ূন’ গ্রন্থের লেখক

(ফেসবুক পোস্ট)

০৩। অবাক অটোগ্রাফ

পুরানো বই কেনার মধ্যে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার আছে। একটা পুরানো গল্প থাকে। যে গল্প হয়তো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে, তার স্মৃতিচিহ্ন থাকে- বইয়ের মলাটে, পৃষ্ঠায়। এ নিয়ে শাহাদুজ্জামানের ‘আন্না কারেনিনার জনৈক পাঠিকা’ নামে একটি সুন্দর গল্প আছে। 

অনেক আগে নীলক্ষেত থেকে হুমায়ূন আহমেদের একটা পুরানো বই কিনেছিলাম। বইটির নাম ‘আমার আপন আঁধার’। পরে দেখি, সেখানে হুমায়ূন আহমেদের অটোগ্রাফ! আমি অবাক। লেখা- 

প্রিয়, 

শুভেচ্ছা

হুমায়ূন আহমেদ

১৯/০২/৯৩

– মিলু হাসান, পাঠক

(ফেসবুক পোস্ট)

০৪। লেটার প্যাডে অটোগ্রাফ 

আমার শৈশবে পড়া প্রথম উপন্যাস ‘বোতল ভূত‘। সেই থেকে আজ অবধি হুমায়ূন আহমেদের আশ্চর্য মায়াবী ভূবনে নিরন্তর পথচলা। 

অনন্ত নক্ষত্র বীথি‘র দেশে ভালো থাকবেন, স্যার।

পুনশ্চ: আব্বু তার ছাত্রজীবনে একবার ঝোঁকের বশে অটোগ্রাফ চেয়ে হুমায়ূন আহমেদকে চিঠি লিখেন। অবাক ব্যাপার! সেই চিঠির উত্তরে লেখক তাঁর নিজ লেটার প্যাডে শুভাশিস সহযোগে অটোগ্রাফ পাঠিয়ে দেন। সেখানে লেখা ছিল-

মিজনুর রহমান

আমার শুভেচ্ছা নাও

হুমায়ূন আহমেদ

২২/১১/৮৮

– খালিদ সাইফুল্লাহ, পাঠক

(ফেসবুক পোস্ট)

০৫। তোমার ও জল কোথায় রাখি

১৯৯১ সাল, ক্লাস টেনে পড়ি। ভয়ংকর বই পড়ার নেশা। হুমায়ুন আহমেদ, সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেব- রাতদিন গোগ্রাসে পড়ছি, না গিলছি বলাই ভালো। এক এক দিন রাত ভোর হয়ে যেত, শেষটুকু না পড়ে  ঘুমই আসে না! ক্লাসের বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে কতো পড়েছি তার হিসাব নেই। মাঝেমাঝে মায়ের হাতে ধরা খাওয়া, এরপর ডেজার্ট হিসাবে কিছু গালাগালি এবং দুই চারটা চড়- থাপ্পর। কুছ পরোয়া নেহি- Necessity is the mother of invention; বেশী বিপদ দেখলে মাঝে মাঝে ওয়াশরুমে ঢুকে বালতি উল্টে নিয়ে তার উপর বসেও ২০/২৫ মিনিটের এক একটা সিটিং দিয়ে আসতাম।

সেবার জামালপুরের সাহিত্য অনুরাগীদের উদ্দোগে পাবলিক লাইব্রেরিতে একটা বইমেলা উদ্বোধনে হুমায়ুন আহমেদ আসবেন। সময়টা ছিল সম্ভবত শীতের শেষ, চৈত্রের শুরু। স্যারের ভক্তকূলের মধ্যে বিরাট উৎসাহ উদ্দীপনা। আমি তো আবার তার মহাভক্ত, এক নন্দিত নরকে পড়েই তো কত বার বালিশ ভিজিয়েছি!

আব্বাকে বললাম, স্যারকে আমাদের বাসায় দাওয়াত দিতে চাই। আমার আবদার শুনে দস্তয়ভস্কি, তলস্তয়, জওহর লাল, খুশবন্ত সিং পড়া আমার আব্বা তার উচ্চমার্গীয় সাহিত্যরুচির সাথে তার পুত্র-কন্যাদের সাহিত্যরুচির দৈন্যের তুলনা করে জামালপুরের লোকাল একসেন্টে(!) নাতিদীর্ঘ এক ভাষণ দিয়ে ফেললেন। আমার প্রিয় লেখকদের প্রতি আব্বার মনোভাবে বড়ই কষ্ট পেলাম। অভিমানে দ্বিতীয়বার তাকে আর অনুরোধ করলাম না। কিন্ত এখন কী করা যায়? 

হুমায়ুন স্যারের সাথে একান্তে দেখা করার দারুণ এক সুযোগ এসে গেল। এ্যাডভোকেট অরবিন্দ কাকার বাসায় স্যার দুপুরে খাবেন। সুতরাং আমি এবং আলো, আমার স্কুলের বান্ধবী, শাড়ী পরে, কপালে লাল টিপ আর কানের কাছে ফুল গুঁজে চলে গেলাম স্যারের সাথে দেখা করতে।

স্যারকে সামনে পেয়ে আমরা দুই কিশোরী বাক্যহারা, মুখ থেকে কোন কথাই বের হয় না। আমার মতো হাজার কিশোরীর নির্ঘুম রাতের কারিগর এতো সাদামাটা একজন নিরীহ মানুষ, আমাদের তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না সত্যি সত্যি তিনি আমাদের সামনে বসা! ছোটখাট লাজুক মানুষটা নেত্রকোনা ময়মনসিংহের স্থানীয় ভাষায় আমাদের সাথে এটাসেটা গল্প করলেন। আমি সাথে করে স্যারের লিখা একটা বই নিয়েছিলাম, অটোগ্রাফ নেব বলে।

অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে স্যার বললেন, ‘তোমার চোখগুলি তো খুবই সুন্দর, আমি তোমার নাম দিলাম আঁখি।’ তারপর উনি ছোট ছোট অক্ষরে দুটি লাইন লিখলেন-

আমার জলেই টলমল করে আঁখি

তোমার ও জল কোথায় রাখি?

– বাররীন ইভা, পাঠক

(ফেসবুক পোস্ট)

০৬। ফোন নম্বর দেইনি

হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আমার মাত্র দুটো ইচ্ছা ছিল। প্রথম ইচ্ছাটা খুব কঠিন কিছু না, ওনার অটোগ্রাফসহ একটি বই জোগাড় করা। দ্বিতীয় ইচ্ছাটাই বরং বেশ জটিল। নিজের লেখা একটি বই অটোগ্রাফসহ স্যারকে দেওয়া। এ জন্য প্রথম কাজ হচ্ছে, একটি বই লিখে ফেলা, দ্বিতীয় কাজ একজন বোকাসোকা, সাহিত্যানুরাগী, তরুণ লেখকবান্ধব, ত্যাগী, সাহসী এবং আত্মঘাতী প্রকাশক খুঁজে বের করা। যিনি অম্লানবদনে বই ছেপে ধরা খাবেন।

প্রথম ইচ্ছাপূরণের গল্পটাই আগে বলি। দুপুর এবং বিকেলের মাঝামাঝি একটা সময়। গোটা বইমেলা ঝিম মেরে আছে। শুধু একটা স্টলের সামনে দারুণ ভিড়। ভিড়ের রহস্য হুমায়ূন আহমেদ। কেউ তাঁকে দেখছে, কেউ অটোগ্রাফ নিচ্ছে, কেউ ছবি তোলার চেষ্টা করছে। আমি সর্বশক্তি দিয়ে স্যারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। নিউটন বলেছিলেন, প্রত্যেক ক্রিয়ারই বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে এবং সেই প্রতিক্রিয়াটি সমান। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ এমনই এক চিজ, যেখানে স্বয়ং নিউটনের গতিসূত্র ফেল মেরে গেল। আমি যে শক্তিতে স্যারের কাছাকাছি হওয়ার চেষ্টা করলাম, উপস্থিত জনতা তার দ্বিগুণ শক্তিতে আমাকে ঠেলে ভিড়ের বাইরে ফেলে দিল। আমি আবার চার গুণ শক্তি নিয়ে ভিড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। শার্টের তিনটা বোতাম শহীদ হলো। চতুর্থ বোতাম ছেঁড়ার আগেই ওনার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। 

দেখলাম, একটা মোচওয়ালা লোক স্যারের দিকে বই বাড়িয়ে দিয়েছেন, স্যার, একটা অটোগ্রাফ।  স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, নাম কী আপনার? লোকটা গাঢ় স্বরে বললেন, পারুল।  হুমায়ূন আহমেদ একটু থমকালেন। লোকটা ব্যাখ্যা দিলেন, স্যার, বইটা আসলে আমার ইয়ের জন্য। স্যার কথা বাড়ালেন না, অটোগ্রাফ দিয়ে দিলেন। 

এরপর আমি বই বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, স্যার আমার নাম রবি। উনি আমাকেও নিরাশ করলেন না। সেই বইটি বুকে জড়িয়ে বইমেলা থেকে বেরিয়ে এলাম। পেয়েছি, আমি পেয়েছি, স্যারের অটোগ্রাফ পেয়েছি। পরে বইটার মলাট ওল্টানোর পর মাথায় পুরো সৌরজগৎসহ আকাশ ভেঙে পড়ল। র এর ফোটা পড়েনি, রবি হয়ে গেছে ববি। ববিকে শুভেচ্ছাসহ হুমায়ূন আহমেদ।

এর কয়েক বছর পর আমার একটি বই বের হয়। প্রকাশক আমাকে ১০টি সৌজন্য কপি দেন। তার একটিতে আমি লিখি, হুমায়ূন আহমেদকে শুভেচ্ছাসহ আশীফ এন্তাজ রবি। এখন হুমায়ূন আহমেদকে কোথায় পাওয়া যায়? বই হাতে নিয়ে সারা মেলা চষে বেড়াই, স্যার নেই। শুনি কালকে আসবেন, পরদিন গিয়েও পাই না। 

একদিন মেলা শেষে টিএসসিতে বসে আড্ডা মারছি, এমন সময় শোনা গেল, হুমায়ূন আহমেদ বইমেলায় এসেছেন। আমি ছুটে গেলাম। বইমেলার গেটে পুলিশ আটকে দিল। মেলার সময় শেষ, এখন আর ঢোকা যাবে না। আমি সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পুলিশদের দ্রবীভূত করার চেষ্টা করলাম। পুলিশ দ্রবীভূত হলো না, শোলার মতো ভেসে রইল। এরপর আমি সাংবাদিক থেকে ডাইরেক্ট হিমু হয়ে গেলাম। পকেট থেকে মুঠোফোন বের করে কাল্পনিক হুমায়ূন আহমেদকে ফোন করলাম, স্যার কাণ্ডটা দেখছেন? পুলিশ আমাকে ঢুকতে দিচ্ছে না। না, না, না, স্যার, আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। এরপর লাইনটা কেটে গলায় কেজি খানেক মধু ঢেলে পুলিশকে বললাম, দেখুন, খুবই দরকারি অ্যাপয়েন্টমেন্ট। স্যার, আমার জন্য ওয়েট করছেন। না গেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। কাম অন, ইটস অ্যান ইমারজেন্সি।

শেষের ইংরেজি বাক্যটি ম্যাজিকের মতো কাজ করল। পুলিশ আমাকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিল, তবে আমার সঙ্গে একজন পুলিশ যাবে। সে গিয়ে দেখবে আসলেই আমার সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের কোনো ঘনিষ্ঠতা আছে কি-না, অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে কি-না, আদৌ কোনো কাজ আছে কি-না। না থাকলে আমার খবর আছে। 

আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে, ফাঁকা বইমেলায় অন্যমনস্কভাবে হুমায়ূন আহমেদ স্টলে বসে সিগারেট ফুঁকছেন। আমি তাঁর সামনে গিয়ে প্রায় হাহাকার করে, স্যার, আপনি যদি আমার সঙ্গে কথা না বলেন, তাইলে এই পুলিশ ব্যাটা আমাকে অ্যারেস্ট করবে। আমি বহু নাটক করে ঢুকছি। আমি বলছি, আপনার সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। 

হুমায়ূন আহমেদ খুব সম্ভবত এই জাতীয় পাগলা ভক্ত সামাল দিতে অভ্যস্ত। তিনি বললেন, আরে না, পুলিশ তোমারে কিছু করবে না। তারপর উনি পুলিশকে হাত দিয়ে ইশারা দিয়ে জানালেন, সব ঠিক আছে। পুলিশ চলে গেল। এবার আমি আমার বইটা ওনার হাতে তুলে দিলাম। উনি মলাট উল্টে একটু মুচকি হাসলেন। আমি বললাম, স্যার, বইটা ভালো, একটু পইড়েন। শেষের গল্পটা দারুণ! 

উনিও খুবই সিরিয়াসলি বললেন, আমি খুবই আগ্রহ করে পড়ব। আমি বললাম, স্যার, ভালো লাগলে একটু জানায়েন। আপনার ফিডব্যাকের দরকার আছে। উনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, অবশ্যই জানাব।

এ ঘটনার পর আমি কয়েক দিন খুব অ্যালার্ট থাকলাম। কোনো ফোন এলো না। তার মানে কি আমার লেখা ওনার পছন্দ হয়নি? আমি ঠান্ডা মাথায় ভাবতে বসলাম। ভাবতে ভাবতে হিমু থেকে মিসির আলি হয়ে গেলাম। আমার মুখে হাসি ফুটে উঠল। ফোন আসবে কীভাবে? আমি তো শুধু অটোগ্রাফ দিয়েছি, ফোন নম্বর তো দিইনি।

আসিফ এন্তাজ রবি, লেখক

(ফেসবুক পোস্ট)

০৭। অটোগ্রাফ

অন্যপ্রকাশ স্টলের সামনে বিশাল লাইন। হাসান হতাশ হয়। কয়েকশ মানুষতো হবেই। ওর ইচ্ছা ছিল আরো আগে আসার, রিন্টু ফাজিলটার জন্য সব প্ল্যান চৌপাট। রিন্টুর কোন আত্মীয় অসুস্থ্য হওয়ায় ওর মাকে নিয়ে সেইখানে গেল আর হাসানের আসতে হল একা। রিন্টুর কাছে ও কিছু টাকা ধার চেয়েছিল, সেই আশায়ও গুড়েবালি। তাই ওকে আসতে হয়েছে হেটে। সেই মতিঝিল থেকে বাংলা একাডেমী। কুচপরোয়া নেহী, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে? মায়ার জন্মদিন বলে কথা! আর সেই প্রিয়জনের জন্মদিনের সারপ্রাইজ অবশ্যই হতে হবে অন্যরকম।

হাসানের সামনে জনাপঞ্চাশেকের মতো লোক হবে। পেছনে অলরেডি সমুদ্রের গর্জন। বালক বালিকা, কিশোর কিশোরী, যুবক যুবতী, মাঝবয়সী, বয়োবৃদ্ধ সব ধরনের মানুষ দাঁড়িয়ে। লাইন খুবই মন্থরগতিতে এগুচ্ছে। কিন্তু কোন ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি নেই, কেউই বিরক্ত হচ্ছে না। হাসানের সামনে দুইটা স্কুল বালিকা ননস্টপ কথা বলে যাচ্ছে। দুজনেরই পড়নে হলুদ, বালিকা হিমু। হাসানের পড়নে অফহোয়াইট কালারের পুরনো পাঞ্জাবী। পুরোপুরি হলুদ না হলেও ও আজ হিমু, ‘সেমি হিমু। পাঞ্জাবী পুরো হলুদ হলে হতো ১০০% হিমু। 

আজ ও হিমু, মায়া হল রূপা। রূপার জন্মদিনে ও রূপাকে উপহার দিবে ওরই চরিত্রের স্রষ্টা হুমায়ুন আহমেদের অটোগ্রাফ সম্বলিত বই। হাসান জানে বইটা হাতে পেলে মায়া কি করবে। ও ভেতরে ভেতরে চমৎকৃত হলেও বাইরে ভাব করবে এ আর এমন কি! 

ও হঠাৎ খেয়াল করে সবার হাতে বই, শুধু ওর হাতেই কিছু নাই! আরে তাইতো বই যদি না থাকে তো অটোগ্রাফ নিবে কিসে! গাধা একটা। ওর পেছনে একজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে। উনাকে ওর জায়গা রাখতে বলে, ও অন্যপ্রকাশের কাউন্টারের দিকে এগোয়। প্রচন্ড ভিড়। ১৫-২০মিনিট ঠেলা ধাক্কার পর ওর পালা আসে। পকেট হাতরে বহু দিনের, বহু কষ্টে সঞ্চিত টাকা কয়টা বের করে দেয়। কোনক্রমে মুখে বলে, ‘পেন্সিলে আকা পরী।

বইটা হাতে নিয়ে লাইনের কাছে আসে, তবে বয়স্ক সেই ভদ্রলোককে কোথাও দেখতে পায় না। সামনে পিছনে ও খানিক্ষণ ছুটাছুটি করে। এদিকে লাইন থেকে সবাই বলতে থাকে, ‘লাইন ভাঙবেন না, অনেক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, নিয়ম কানুন মানা শেখেন, লাইনের শেষে যান ইত্যাদি। কী আর করা, ব্যর্থ মনরথে ও লাইনের পেছনে দাঁড়ায়।

হাসান মনে মনে ঠিক করে রেখেছে স্যারকে কী বলবে। ও দেখে প্রায় সবাই স্যারের জন্য ফুল বা অন্য কিছু নিয়ে এসেছে। আর হাসান এনেছে, স্যারের জন্য উনার প্রিয় একটা কবিতা। পুরো আট পাতা মুখস্ত করে এসেছে। ওর ধারণা স্যার অনেক খুশি হবেন। 

ও লাইন থেকে স্যারকে দেখা চেষ্টা করতে লাগল। দেখা যাচ্ছে না। কতগুলা উটকো লোক অটোগ্রাফ টেবিলের সামনে ভিড় করে আছে। হাসানের মেজাজ খারাপ হয়। ও নিজেও অন্যান্যদের মতো চিৎকার করে লাইন ঠিক রাখতে বলে। ‘বাইরে থেকে কেউ লাইনে ঢুকবেন না। এই যে ভাই লাইনে আসেন। ভাইসব নিয়ম কানুন শুধু বৃটিশদের জন্য না’

অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

‘কি নাম?’

‘হা-সা-ন, ন-না মায়া..মায়া…।’ ও তোতলায়। 

লেখক মুচকি হাসেন। হাসান বইটা আগে বাড়িয়ে দেয়।

লেখক গোটা অক্ষরে ‘প্রিয় মায়াকে অনেক প্রীতি ও ভালবাসা’  লিখে একটা সাইন করে দেন। হাসান কাঁপা হাতে বইটা ফেরত নেয়। অনেক কথা বলার ছিল, কিন্তু লেখকের পাহাড়সম অভিব্যক্তির সামনে আর পেছনের অটোগ্রাফ শিকারীর ধাক্কায়  নিজেকে যেন কোথায় হারায়। যখন ফিরে পায়, তখনও ওর আবেগ একটুও কমেনি। ফুটপাতে বসে লেখকের স্বহস্তের লেখনিতে হাত বুলায়। এতো লেখকেরই লেখা, স্বয়ং লেখক। মনে মনে ওর না বলতে পারা কথাগুলো আওড়ায়। মনের অব্যক্ত বাসনা, যদি… যদি লেখক ওর ভালবাসার গল্প শুনে… যদি…

– মোহাম্মদ নজিবুল আলম সুমন, পাঠক

(ফেসবুক পোস্ট)

০৮। আফসোস

সম্ভবত ২০০৯ সালের বইমেলার কথা। 

তখন বাংলা একাডেমি বইমেলাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে যায়নি। বাংলা একাডেমির আঙিনার মধ্যে বইমেলা হয়। ঘিঞ্জির মতো একটা পরিবেশ। নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা নেই। প্রকাশক আর একাডেমির মধ্যে দড়ি টানাটানি চলছে। প্রকাশক চাচ্ছে মেলা বাইরে নিয়ে যাবে। বাংলা একাডেমি বলছে, এতে ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে যাবে। এর মধ্যেই মেলা শুরু হয়েগেলো।  

প্রতি বছরের মতো ওই বছরও মেলায় গেলাম। ভাগ্যের ফেরে আরেকটা মজার ঘটনা ঘটলো ওইদিন। লেখক হুমায়ূন আহমেদ মেলা দেখতে এসেছেন ওইদিন। অন্যপ্রকাশের স্টলে বিশাল লম্বা লাইন। সেই লাইন লম্বা হয়ে একাডেমির আঙিনার বাইরে চলে গেলো। আমি অভাজনও দাঁড়িয়ে আছি লাইনে। জীবনে প্রথম কারো অটোগ্রাফ নিবো। তাও হুমায়ূন আহমেদের! লাইন কোনো রকম আগায় না। দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি। হঠাৎ পেছন থেকে একটা রাম ধাক্কা এলো। সবাই এক একদিকে উলটে পড়লো। আমি ধাক্কার ছুটে ঢুকে গেলাম বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে। ওদের সামনে টেবিলের বইগুলো আর টেবিল উলটে গেলো আমরা কয়েকজনের ধাক্কায়।  

দোকানের একজন এসে আমাকে টেনে তুললো। কনুইয়ের নিচে টেবিলের কোণা লেগে ছিড়ে গেছে। হাতের রক্ত মুছতে মুছতে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম। এই জীবনে আর কোনোদিন কারো অটোগ্রাফ নিবো না। হুমায়ূন আহমেদ বাসায় এসে অটোগ্রাফ দিতে চাইলেও  না। ওটাই আমার প্রথম কারো কাছ থেকে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো। ওটাই শেষ। কোনোদিন আর কারো কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিইনি। ইদানিং তো অটোগ্রাফ নেওয়া আরো সহজ হয়ে গেছে। মেলা এখন বাংলা একাডেমির উঠান ছেড়ে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে চলে এসেছে। দোকান থেকে দোকানের মধ্যে বিশাল ফাঁকা জায়গা। প্রতিটি স্টলে লেখকগণ বিরস মুখে বসে থাকেন। কেউ কেউ গিয়ে অটোগ্রাফ নেন। অনেক লেখক আবার নিজের বই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন অটোগ্রাফ দেওয়ার জন্য। গত বছর দেখলাম– একটা স্টলে জাফর ইকবাল বসে আছেন। দোকানে তেমন ভীড় নাই। উনি কি একটা বই উলটে পালটে দেখছেন। এইসব লেখকদের জায়গায় হুমায়ুন আহমেদকে ভেবে অবাক লাগে। উনি মেলায় আসলে ওইদিন অন্যপ্রকাশের আশেপাশের স্টলগুলোর ব্যবসায় বন্ধ হয়ে যেতো। 

এখন আমি অভাজন কিভাবে হুমায়ূন আহমেদের প্রেমে পড়লাম সেই কাহিনী বলি। তখন কলেজে পড়ি। ফার্স্ট ইয়ার। ক্লাস না করে পাবলিক লাইব্রেরিতে বই পড়ে বেড়াই। একদিন পড়া শুরু করলাম, ‘হোটেল গ্রেভার ইন’। উনার আত্নজীবনীটাইপ লেখা। ওই বইয়ে একটা গল্প আছে। ‘বাংলাদেশ নাইট’। প্রবাসী এক ছাত্র মিজানকে নিয়ে লেখা গল্প। মিজান মোরহেড স্টেট ইউনিভার্সিটির একমাত্র বাংলাদেশি ছাত্র। অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কোনো বাংলাদেশি ছাত্র পড়তে চায় না। মিজান অনেক ট্রাই করেছে আরো স্টুডেন্ট নিয়ে আসতে। কেউ আসে না।  

একবার ইউনিভার্সিটি একটা উৎসব করতে গেলো। এখানকার প্রতিটি দেশের ছেলেমেয়েরা তাদের দেশ এবং সংস্কৃতিকে তুলে ধরবে। মিজানও নাম দিয়েছে এই উৎসবে। সে বাংলাদেশকে তুলে ধরবে। কিন্তু সমস্যা হলো সে একা। তার সাথে আর কেউ নাই। ইউনিভার্সিটির ফরেন স্টুডেন্ট এডভাইজার মিজানকে বুদ্ধি দিলো পাকিস্তানের সাথে আয়োজন করতে। এতে ডেকোরেশনের খরচ কম পড়বে। মিজান তো ফায়ার। এডভাইজারের কতো সাহস! সে পাকিস্তানিদের সাথে বাংলাদেশ নাইট করতে বলে।  

গল্প অনেক লম্বা। এতো লম্বা গল্পের কাহিনী লেখার ধৈর্য আমার নাই। অবশেষে মিজান খেটেখুটে আয়োজন রেডি করলো। সাথে হুমায়ূন আহমেদ আছেন। অনুষ্ঠানের দিন বিকাল বেলা হঠাৎ করে অন্য স্টেট থেকে শিক্ষার্থীরা আসতে শুরু করলো। অনুষ্ঠানের বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা অভাজনের নাই। আমরা লেখকের মুখেই এই বর্ণনা শুনি— 

‘অনুষ্ঠান শুরু হলো দেশাত্মবোধক গান দিয়ে।

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি…

অন্যান্য স্টেট থেকে মেয়েরা যারা এসেছে, তারাই শুধু গাইছে। এত সুন্দর গাইছে। এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে গান শুনে দেশের জন্যে আমার বুক হু হু করতে লাগল। চোখে জল এসে গেল। কেউ যেন তা দেখতে না পায় সে জন্য মাথা নিচু করে বসে রইলাম।

পরদিন ফার্গোফোরম পত্রিকায় বাংলাদেশ নাইট সম্পর্কে একটা খবর ছাপা হলো। খবরের অংশবিশেষ এ রকম—

একটি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ জাতির অনুষ্ঠান দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় দেশের গান দিয়ে। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, গান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি ছেলেমেয়েরা সব কাঁদতে শুরু করল। আমি আমার দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা জীবনে এমন মধুর দৃশ্য দেখিনি…।’

শেষের প্যারাটা পড়ে আমিও কেঁদে উঠলাম হাউমাউ করে। পাবলিক লাইব্রেরিতে এতো মানুষ! আমার কোনো হুঁশ-জ্ঞান নাই। আমি কাঁদছি তো কাঁদছিই। হাউমাউ করে কাঁদছি। অন্য টেবিল থেকে উঠে আরেকজন পাঠক দৌড়ে এলো। 

‘ভাই, কি হইছে? কোনো সমস্যা?’

আমি কান্নার জন্য কোনো জবাব দিতে পারলাম না।  

ওইদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম যে লেখক এতো মমতা নিয়ে যে কোনো জিনিসের বর্ণনা দেন, তার কোনো লেখাই বাদ দেওয়া যাবে না। তার অগণিত পাঠকদের মধ্যে আমিও একজন যে তার সব লেখা পড়ে ফেলেছে।  

এই শক্তিমান লেখক আমাকে আরো বহু বইতে কারণে অকারণে এরকম হুঁ হুঁ করে কাঁদিয়েছেন।   

২০১২ সালের উনিশে জুলাই। টিভি দেখছিলাম। হঠাৎ টিভির নিচে নিউজ স্ক্রল শুরু হলো। ‘বাংলাদেশের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। তিনি আমেরিকার…’

ওইদিন আর কোনো কান্না এলো না। আমি শুধু বুঝতে পারছিলাম ভেতরে কী তোলপাড়। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক আর নাই। একটা ভুল হয়ে গেছে। বিরাট একটা ভুল হয়ে গেছে। অভিমানবসত এই শক্তিমানের অটোগ্রাফ নেওয়া হয়নি আমার। আর কোনোদিন নেওয়া হবে না।  

তারপর থেকে এখনো কারো অটোগ্রাফ নিই না আমি। অটোগ্রাফ নিয়ে আমার কোনো আগ্রহও নাই। শুধু একটাই আফসোস কাজ করে। আর কোনোদিন হুমায়ূন আহমেদের অটোগ্রাফ নেওয়া হবে না আমার। লাইনে দাঁড়িয়েও ছেলেমানুষী অভিমানবসত উনার অটোগ্রাফ নিইনি, এই দুঃখ আমাকে প্রতিনিয়ত ভোগায়। এই কথা ভেবে ভেবে আমার আর কারো অটোগ্রাফ নেওয়া হয় না।  

– অনন্ত আরাফাত, পাঠক

(ফেসবুক পোস্ট)

হুমায়ূন আহমেদের সকল বই

 

আরও পড়ুন হুমায়ূন আহমেদের ২৬টি হাসির ঘটনা

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png