পেপসিকোর সিইও থাকাবস্থায় ইন্দ্র নওয়ীর অর্জিত ৮ শিক্ষা

ইন্দ্র নওয়ীর

২০০৬ সালে স্টিভেন রেইনমান্ড ঘোষণা দিলেন যে, তিনি পেপসিকো-এর প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিবেন এবং ইন্দ্র নওয়ীর কাছে এদায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ নারীদের মধ্যে জায়গা করে নেন তিনি।

সুদীর্ঘ ১২ বছর ইন্দ্র নওয়ী আইকনিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড ও বেভারেজ কোম্পানি’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সালের শেষের দিকে এই কোম্পানি ত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি আমাজন, ওয়াল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ইয়েল স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট ও ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল’র একজন বোর্ড সদস্য। “কোম্পানিকে বিশেষ একটি ধাপে উন্নীতকরণ, কর্মী বিনিয়োগকারীদের পরিচালনা করা, অর্থনৈতিক সংকট ও আমাদের সব ধরণের খাতে হুমকিগুলো মোকাবেলা করা ছিলো বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ।” ২০১৯ সালের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অনুষ্ঠিত গ্রোথ ফ্যাকাল্টি’র একটি অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “এই ১২ বছর আমার জন্য খুবই কঠিন মুহূর্ত ছিলো।”

ইন্দ্র নওয়ী কোনো কিছু আধাআধি করে ফেলে রাখার মানুষ নন। একই সময়ে তিনি মাদ্রাজ ক্রিস্টিয়ান কলেজে নারীদের জন্য ক্রিকেট দল তৈরি করে বিশ্বের জ্যেষ্ঠ নির্বাহীদের পিতামাতাদের কাছে ৪০০ চিঠি লিখে পেপসিকোর এই সাবেক প্রধান নির্বাহী তার বিপ্লবী উদ্যোগের গৌরব-গাঁথা তুলে ধরেন। এধরণের উদ্যোগ ইতোপূর্বে ভারতে ছিলোই না।

“আপনি কত ভালোভাবে কোম্পানি পরিচালনা করছেন, তার উপর আপনার সফলতা নির্ধারিত হয় না। বরং আপনার সহযোগীরা (সাকসেসর) কত ভালোভাবে কোম্পানি পরিচালনা করে তার উপর আপনার সফলতা নির্ধারিত হয়।”- ইন্দ্র নওয়ী

পেপসিকোর একটি বিজ্ঞাপনের প্রচার নিয়ে কোম্পানিতে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে তিনি নিজের গৃহীত সিদ্ধান্তের জন্য তীর্যক সমালোচনার মুখোমুখীও হন। কিন্তু বিষয়টি তিনি খুবই স্মার্টলি সমাধান করেছিলেন। তার ভাষায়, “আমি কখনো তাদেরকে বুঝতে দিইনি যে, এটি একটি বিশাল সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয়েছিলো কারণ সামনে সফলতা লাভের জন্য তাদেরকে কোম্পানির প্রয়োজন ছিলো।”

ইন্দ্র’র নেতৃত্বে পেপসিকোর মুনাফা (রিভেনিউ) ১২ বছরে দ্বিগুণ হয়ে ৬৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হলো, যার অর্ধেক আসে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পণ্যখাত থেকে (২০০৬ সালে ৩৮ শতাংশের বেশি)। একজন নারী হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক শিল্পকারখানায় দুই দশকের বেশি কাজ করেছেন তিনি। এসময়ের মধ্যে মাল্টিবিলিয়ন-ডলার কোম্পানি পরিচালনায় এই বিদূষী প্রজ্ঞার জ্যোতি ছড়িয়ে গেছেন।

নিয়ম ০১: ভারসাম্য চাবিকাঠি খুঁজে বের করা

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব হলো চব্বিশ ঘণ্টা (ফুল-টাইম জব)। একজন মা ও স্ত্রীকেও চব্বিশ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয়। ভারতের প্রেক্ষিতে, একজন কন্যা সন্তান ও নাতনী হওয়া মানেও চব্বিশ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করা। সুতরাং, আমাদের কাছ থেকে সকল কাজে বিশাল কিছু আশা করা হয়। এর কোনো সহজ উত্তর নেই। প্রথমত, আপনি একজন সঠিক মানুষকে বিয়ে করেছেন। এটি বিশ্বে আপনাকে সবকিছুতে আলাদা করে তৈরি করে দেয়। আমি একজন যথাযথ ব্যক্তিকে বিয়ে করেছিলাম। চল্লিশ বছর পর, আমি বলতে পারি যে, তিনি আমার জন্য  একজন রক্ষাকর্তার ভূমিকা পালন করেছেন।

এমনকি বর্তমানে আমার স্বামী ও আমি একই সময়ে আগামী ছয় মাসে আমরা কি করতে যাচ্ছি, কে কি করবে এবং কিভাবে আমরা পরিবার পরিচালনা করতে যাচ্ছি তার পরিকল্পনা তৈরি করি। দ্বিতীয়ত, যৌথ পরিবারকে মেনে নিন। আমি যৌথ পরিবার ভালোবাসি। তাদের সবাইকে স্বল্প সময়ের জন্য অবসর নেওয়া এবং আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতে তাদেরকে একমত পোষণ করতে সক্ষম হয়েছি। তাদেরকে অবহিত করে রেখেছি যে, তিন মাস ধরে আমাদের বাড়ি ঘুরে যেতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে আসার টিকেটটি আমি ব্যবস্থা করবো। এভাবে পরিবারের সবাইকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছি। গত তিন বছর ধরে এই নিয়ম পালন করে আসছি।

দেখুনঃ ব্রায়ান ট্রেসি’র সময় ব্যাবস্থাপনা নিয়ে লেখা রকমারি বেস্টসেলার বই টাইম ম্যানেজমেন্ট

নিয়ম ০২ : নমণীয় বা সুবিধামতো কাজ করতে সক্ষম হয়ে উঠুন

কাজের ধরণে পরিবর্তন এসেছে। অতীতে কাজের ধরণ ছিলো নারীরা বাসায় থাকবেন আর পুরুষ সকাল নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত বাইরে কাজ করবেন। বর্তমান জীবন এভাবে চলে না। প্রযুক্তিকে আমাদের আরো দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।

“নারীদের প্রতি আমার অনুরোধ হলো নিজের চাকুরির প্রতি যত্নবান হউন। কাজের ফলাফল ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী হ্রাস পেতে থাকবে। কারণ, স্বয়ং কাজই আপনার মূল্যায়ন করবে।”- ইন্দ্র নওয়ী

নিয়ম ৩ : প্রতিযোগিতামূলক কাজ সফলতা নিয়ে আসে

সি-সুইট’র সকল পরিসংখ্যানের ৭৫ শতাংশে আমরা দেখতে পেয়েছি যে, নির্বাহীগণ সহকর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক কর্মকান্ডের ব্যবস্থা করেছে। এসব পরিসংখ্যান মতে, এধরণের কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করলে ভালো দল বা টিম তৈরি করা যায়। প্রতিযোগিতামূলক কর্মকান্ড নেতৃত্ব বিকাশের জন্য সহায়ক। নারীদের এধরণের কাজে অংশগ্রহণ করতে আমাদের উৎসাহ দেওয়া উচিত।

নিয়ম ৪ : জেন্ডার নিয়ে কথাবার্তা এড়িয়ে চলুন

আমাকে কোনো ধরণের লেবেল না দিয়ে বরং আমার কাজের গুণাগুণ দিয়ে বিবেচনা করুন। লেবেল, অভিজ্ঞতা সবকিছু মাথায় রেখে আমাদের কাজ করতে হবে। কোনো একজন নারীর প্রশংসা করতে গিয়ে আমরা বলি, “সে ভয়াবহ একজন নারী, কিন্তু …।” আর পুরুষের ক্ষেত্রে বলি, “সে চমৎকার একজন পুরুষ, এবং …।” কোম্পানিতে নেতা হিসেবে এসবের পরিবর্তন আনতে হবে।

নিয়ম ৫ : সবকিছু যথাযথভাবে করুন

নারীদের প্রতি আমার অনুরোধ হলো যে, নিজের কাজের প্রতি যত্নবান হউন। কাজের ফলাফল যতই ভালো হবে তেমনি খুব কম সংখ্যক ব্যক্তিই আপনাকে পিছিয়ে ফেলে দিতে পারবেন। কারণ, কাজই স্বয়ং আপনার মূল্যায়ন করবে।

আমার বিশ্বাস যে, যদি আপনি পরিকল্পনা করে বলেন যে, “১০ বছরের মধ্যে আমি একজন নির্বাহী প্রধান কর্মকর্তা (সিইও) হতে চাই, তাহলে তা হবে খুবই ভয়াবহ। আপনি এপথে আপনার ক্যারিয়ারে আবদ্ধ হয়ে পড়লেন। আপনাকে ভালো করতে হবেই এমন দায়িত্ব নিবেন না। আমি কোন দিকে এগুচ্ছি সে বিষয়ে উদ্বিগ্ন নয়। বরং আমাকে যা দায়িত্ব দেওয়া হউক না কেন সবই অসাধারণভাবে করতে আমি প্রস্তুত।

নিয়ম ৬ : একজন উদ্বাস্তুর মানসিকতা নিয়ে কাজ করুন

অধিকাংশ উদ্বাস্তু কোনো বিদেশে জায়গা পেলে উদ্বিগ্ন থাকেন যে, এখানে বেশিদিন থাকা যাবে না। হয়তো তারা নিজের চাকরি হারাতে পারে অথবা এখানে বাস করতে পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা নাও হতে পারে, কিংবা ফিরে যেতে বাধ্যও হতে পারেন। এধরনের মানসিকতা লালন করলে তা আপনাকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রেরণা যোগাবে, যা অভাবনীয় উদ্যম সৃষ্টি করে। আমি এধরণের মানসিকতা লালন করি।

নিয়ম ৭ : নিজের সহযোগী নির্বাচনে সক্রিয় হউন

আমরা ১০ বা ১৫ জন কর্মী বাছাই করি। আমরা মনে করি যে, তারা সকল ধরণের কাজ করতে পারে। তাছাড়া আমরা এও নিশ্চিত হই যে, এসব কর্মী বিভিন্ন বয়সে দলভুক্ত। কারণ, বোর্ড তাদের মধ্য থেকে যে কাউকে তাদের অবস্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। চার বা পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের কাজগুলো আমরা বোর্ডে উপস্থাপন করি। বোর্ডে তারা যাতে নিজেদের কর্মদক্ষতা দেখাতে পারে সে ব্যবস্থা করা হয়। এতে তারা নিজেদের দল নিয়ে বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করে, যা আমরা বিশেষভাবে প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করে থাকি। খুব সন্নিকটে আপনি নিজের প্রতিযোগী বা প্রার্থী হ্রাস হতে দেখবেন এবং নিজেকে উপরের কাতারের একজন হিসেবে দেখে খুশিতে টগবগ করবেন।

নিয়ম ৮ : কাজের উপকার ভোগীদের উপর আপনার সফলতা নির্ধারিত হয়

সাকসেসন (কর্মকর্তাদের ধাপ) সম্ভবত সবচেয়ে জটিল বিষয়, যা বোর্ড নির্ধারণ করে। একজন দায়িত্বশীল প্রধান নির্বাহীকে এবিষয়টিতে খুবই গুরুত্ব দিতে হয়। আপনি কত ভালোভাবে কোম্পানি পরিচালনা করছেন, তার উপর আপনার সফলতা নির্ধারিত হয় না। বরং আপনার উত্তরাধিকারী সহযোগীরা (সাকসেসর) কত ভালোভাবে কোম্পানি পরিচালনা করেন তার উপর আপনার সফলতা নির্ধারিত হয়। আমার উত্তরাধিকারী সহযোগীদের অবস্থানের চেয়ে একজন প্রধান নির্বাহী (সিইও) হিসেবে আমার কর্মদক্ষতা নিয়ে আমি বেশি উদ্বিগ্ন ছিলাম। কোম্পানি থেকে আমার প্রস্থানের পর যদি তা ধ্বসে পড়ে তাহলে এর অর্থ হলো আমি এটিকে যথেষ্ট শক্তভিত্তি ও কর্মদক্ষ টিম দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি।

 

আরও পড়ুনঃ
বিল গেটস এর মতে সাফল্যের ৮ মূলমন্ত্র
বিশ্ব বিখ্যাত ধনী বিল গেটসের পড়া ৫ বই
নেলসন ম্যান্ডেলা-কিংবদন্তির জীবন থেকে নেওয়া কয়েকটি ঘটনা !

source: CEO ম্যাগাজিন, ইন্দ্র নুয়ী

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png