হুমায়ূন কী জনপ্রিয় লেখক, নাকি বড় লেখক

হুমায়ূন কী জনপ্রিয় লেখক

গত ৩ বছর আগে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিয় ছাত্র সংসদে হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছি। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো হুমায়ূন পাঠের একটা ইতিবাচক ও কার্যকর ধারা গড়ে তোলা। কিন্তু গত কয়েক বছর পর্যবেক্ষণের পর নিশ্চিন্তে বলা যায় যে, এই ধারা কোনোভাবেই গড়ে উঠেনি। আমাদের অপেক্ষাকৃত কম প্রচারিত অনুষ্ঠানটি হুমায়ূন পাঠে কোনো ধরণের প্রভাব ফেলেনি। এই না পড়াটা আমাদের জন্য খারাপ হয়েছে বলে আমি মনে করি। এখনও হুমায়ূনকে পড়ার তেমন কোনো নজির দেখা যায় না।

হুমায়ূন-ভক্ত পাঠক আছে, হুমায়ূন-ব্যবসায়ীও আছে, যারা বিশেষভাবে হুমায়ুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর তারা হুমায়ূন প্রচার করে। প্রতিবছর হুমায়ূন নিয়ে জন্মদিন ও মৃত্যুদিন নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান হয়। বেশ। একজন জনপ্রিয় লেখক নিয়ে যেসব অনুষ্ঠান হওয়া উচিত, তাকে নিয়েও একই ধরণের অনুষ্ঠান হয়। সেইসব অনুষ্ঠানে তাকে নিয়ে যেসব কথা হয় সেসব ধরণে গত কয়েক বছরের কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। হুমায়ূন যখন জীবিত ছিলেন, তখন তার সম্পর্কে যা বলা হতো, তার মৃত্যুর পরও একই ধরণের কথা হয়। হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদসহ যারা ঔপন্যাসিক হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছিলেন তাদের সম্পর্কে বলেন যে, এরা অপন্যাস লিখে। এরা আরো বলতেন যে, মধ্যবিত্তের হাসি-কান্না হলো এদের উপন্যাসের মূল ব্যাপার। এই কথাটা অনেকেই পছন্দ করে না। এর বিপরীতে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ বয়ান গড়ে উঠেছে, এই জনপ্রিয় লেখালেখি পড়ার ক্ষেত্রে তার কোনো নজির পাওয়া যায় না। গত কিংবা এবছরো হুমায়ূন সম্পর্কে লোকজনকে এখনো একই ধরণের কথা বলতে দেখেছি।

সাধারণত হুমায়ূনকে যারা পছন্দ করেছেন তারা তিন ধরণের কথা বলেন। এক. হুমায়ূন আহমেদ পাঠক তৈরি করেছেন। দুই. অনেক পাঠককে কলকাতা থেকে বাংলাদেশের দিকে চোখ ফিরিয়েছেন। তিন. হুমায়ূন বাংলাদেশে প্রকাশনা শিল্পকে একাই দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।

এই তিনটির যে কোনো একটি যদি সত্যি হয় তাহলে যে পদ্ধতিতে হুমায়ূন আহমেদের বিশ্লেষিত হওয়ার কথা ছিলো সেটা কিন্তু আসলে হয়নি। কারণ এই তিনটি অত্যন্ত গুরুতর কাজ। কিন্তু সংস্কৃতি হ্যাশেলে এই তিনটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা মধ্যবিত্তের মধ্যে হেরফের হয়। যেমন জনপ্রিয় শব্দটি সব সাহিত্যে একইভাবে ব্যবহৃত হয় না। আর জনপ্রিয় কথাটারও আসলে নানানরকম ফের আছে।

আমরা জানি যে, মাসুদ রানা সিরিজ অনেক জনপ্রিয় ছিলো। এটি ছিলো ভারতের পর্যটন করপোরেশনের উপর দেয়া (অ্যাসাইন) একটি কাজ । ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে যেসব অপরাধগুলো সংঘটিত হয়, সেগুলো তারা পরিদর্শন করেন। দুইটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু ফেলুদা নির্মাণের জন্য সত্যজিৎ বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে যে পরিমাণ মূল্য পেয়েছেন সে পরিমাণ তিনি তা পেতে পারেন না। কারণ বইয়ের যে প্রদান তার বৈশিষ্ট্য তার সবগুলো ফেলুদার ক্ষেত্রে নকল করা। একটা বই ও একটা চরিত্র থেকে নেওয়া হয়েছে। আর সেটা হলো শার্লক হোমসমিসির আলী সারা দুনিয়াতে অনন্য চরিত্র। এধরণের চরিত্রের মধ্যে মিসির আলী একেবারেই অদ্বিতীয়। মিসির আলীর মধ্যে শার্লক হোমসের প্রভাব আছে। থাকারই কথা। দুনিয়াতে শার্লক হোমসের পরে লেখা হয়েছে অথচ শার্লক হোমসের কোনো না কোনোভাবে প্রভাব পড়ে নাই এমন কোনো গোয়েন্দা চরিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে মিসির আলীর মধ্যেও শার্লক হোমসের এক ধরণের প্রভাব আছে। মিসির আলী মনস্তাত্ত্বিকভাবে, মিসির আলী হুমায়ূন আহমেদের যে ফ্যান্টাসি গোত্রের যে সায়েন্স ফিকশন তার সঙ্গে যুক্ত এবং এই তিন গোষ্ঠীর সমন্বয়ে যে মিসির আলী, তা অন্য কারো সঙ্গে বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে, কর্মততপরতার দিক থেকে, চরিত্রায়ণের দিক থেকে সমতুল্য নয়। এদিক থেকে মিসির আলী ঢাকায় যত্নের সঙ্গে আরো বেশি পঠিত হতে পারতো। শুধু জনপ্রিয় ধারার বই হিসেবে নয়, আরেকটু গুরুত্ব দিয়ে পঠিত হতে পারতো।

মিসির আলী
মিসির আলী – হুমায়ূন আহমেদ

মিসির আলী নিয়ে লেখার সময় একবার মন্তব্য করেছিলাম যে, শার্লক হোমসের এই এই বৈশিষ্ট্যের কারণে আমরা শার্লক হোমস পড়লে লেইট নাইনটিনথ সেঞ্চুরির ইংল্যান্ডকে পাই, যে ইংল্যান্ড সেকেন্ডের কাটা হিসেব করে চলে, টেলিগ্রাফ, ঘোড়ার গাড়ি ও রেলের উপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। এবং যে ইংল্যান্ড সমস্ত পৃথিবীকে শাসন করার জাতিগত অহমিকা, সে অহমিকা ফেটে ফেটে পড়ছে। এটা যেমন আমরা শার্লক হোমস পড়লে বুঝি, তেমনি মিসির আলী পড়লেও দারুণভাবে বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া যায়, যে বাংলাদেশে সময়ানুযায়ী কোনো ব্যাপারই ঘটে না, যে বাংলাদেশে ইউনিভার্সিটিতে একাডেমি না থাকায় হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলীর মধ্যে দারুণ এক একাডেমিকে আবিষ্কার করেছিলেন। একাডেমিতে যে ধরণের প্র্যাকটিস থাকার কথা, এই প্র্যাকটিস মিসির আলী করে, যেন হুমায়ূন আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপস্থিতিতে একটা বিকল্প ইউনিভার্সিটি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। যে মিসির আলী সম্পূর্ণভাবে অপেশাদার, যেখানে শার্লক হোমস পেশাদারিত্বের বাইরে রিওয়ার্ড এক কদমও চলে না। ফলে আমার সিদ্ধান্ত ছিলো এই- শার্লক হোমস পড়ে আমরা যেমন লেইট নাইনটিনথ সেঞ্চুরির ইংল্যান্ডকে আবিষ্কার করতে পারি, ঠিক তেমনি মিসির আলীকে পড়ে আপনি একটা দূর্দান্ত বাংলাদেশকে আবিষ্কার করতে পারেন, যদি আপনার চাওয়ার মতো চোখ থাকে।

এই যে হুমায়ূন আহমেদ পড়া ও হুমায়ূন আহমেদ পঠিত হয়নি বলে আমার কয়েক বছরের যে হাহাকার তার মূল কারণ হলো কেউ কেউ পড়লে বাকিদের মধ্যে সেই সংস্কৃতি প্রসারিত হয় এবং এই পড়ার সংস্কৃতি নতুন নতুন সংস্কৃতিতে উত্তীর্ণ হয়, সেই দিকে আমরা হুমায়ূনকে নিতেই পারিনি। হুমায়ূন যে একজন বাজারি লেখক ছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। হুমায়ূন একজন খাঁটি বাজারি লেখক ছিলেন। পৈশাচিতভাবে একজন বাজারি লেখক ছিলেন।

পাঠ সরঞ্জাম (রিডিং ম্যাটেরিয়ালস) সরবরাহ ও একটা ভাষা তৈরির ক্ষেত্রে সেবা প্রকাশনীর যে একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। এই বিষয়টা আরো আসলে বিশ্লেষণ করা দরকার। এর আগে রোমেনা আফাজ ছিলেন। রোমেনা আফাজ মারা যাওয়ার পর অন্য একটি অনুষ্ঠানে তার সম্পর্কে আমি কিছু মন্তব্য করেছিলাম। রোমেনা আফাজের মৃত্যুতে ঢাকার কোনো পত্রিকা তাকে নিয়ে কোনো নিউজ করার প্রয়োজন মনে করেনি। অথচ যারা এখনকার পত্রিকা চালায় বা পত্রিকায় লেখে তারা রোমেনা আফাজ পড়ে বড় হয়েছিলো। এবিষয়ে এক বিন্দুও সন্দেহ নেই। দস্যু কিংবা দস্যু বন্য সিরিজসহ রোমেনা আফাজের যেসব উপন্যাস জনপ্রিয় হয়েছিলো। জনপ্রিয়তার এরকম একটি ধারা আছে যেখানে দস্যু বন্যদের মতো সিরিজ হয়, যেখানে মাসুদ রানার মতো সিরিজ হয়, যেখানে অন্যেরা বই লেখে এবং কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে ছাপা হয় কয়েকশো বই। জনপ্রিয়তা এই সারা বিশ্বে আছে। জনপ্রিয় লেখকদের মধ্যে মার্কেজ পৃথিবীর দুয়েকজনের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। মার্কেজের নতুন কোনো বই বের হলে একসঙ্গে পাঁচ ভাষায় অনূদিত হয়ে বের হতো এবং সারা পৃথিবীতে মিলিয়ন মিলিয়ন কপি বিক্রি হতো। সুতরাং মার্কেজ নি:সন্দেহে জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু মার্কেজের জনপ্রিয়তার ধরণ ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা। মার্কেজকে জনপ্রিয় লেখক বলে কেউ উপস্থাপন করবে না। মার্কেজকে আমরা বড় লেখক বলে উপস্থাপন করি। মার্কেজ যেই ধারার লেখক সেই ধারার ভিন্ন প্যাটার্নে আরেকজন লেখক হলেন বোর্হেস। বোর্হেস কিন্তু সারা পৃথিবীতে কোনো লোকই জনপ্রিয় লেখক হিসেবে পড়ে না। গল্পের জন্য, গল্প পড়ার জন্য পড়ে না। ফলে মার্কেজ ও বোর্হেস এর মধ্যে গুরুতর একটা পার্থক্য আছে। দুই লেখকই একই এলাকার, একই ধারার কিন্তু ভিন্ন প্যাটার্নের।

—————————————————————————————————————————————————————————————————-

ড. মোহাম্মদ আজম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

ড. মোহাম্মদ আজম সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মধ্যে একালের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন তাত্ত্বিক। গভীর ও শাণিত যুক্তির মধ্যদিয়ে কোনো বিষয়কে ব্যবচ্ছেদ করার জন্য সুধীমহলে তার খ্যাতি রয়েছে। ঢাকার মতো অস্থির বিদ্বৎসমাজের মধ্যে তার নিবিষ্ট জ্ঞানচর্চা বিশ্ববিদ্যালয় ও যে কোনো তরুণ পাঠকের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বইয়ের ফেরিওয়ালা ’র সাহিত্য আড্ডায় ‘হুমায়ূন আহমেদ : পাঠ পদ্ধতি ও তাৎপর্য’ শীর্ষক একটি গণবক্তৃতা প্রদান করেন। সেই বক্তৃতার প্রথম কিস্তি।

 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png