প্রেম কখনো সামাজিক হতে পারে না

প্রেম কখনো সামাজিক হতে পারে না

উপন্যাস কাহিনী নয়। বেশির ভাগ মানুষ জানে না যে, উপন্যাস কাহিনী নয়। উপন্যাস আসলে ইমেজ, যে ইমেজ কাহিনী থেকে রূপান্তরিত হয়। উপন্যাস আসলে প্লট, যে প্লট কাহিনীকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করার মধ্যদিয়ে উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়। আর নতুনভাবে বিন্যস্ত করার মধ্যদিয়ে আসলে কাহিনীর সমস্ত তাৎপর্য পরিবর্তিত হয়ে যায়। ওই যে ‘প্রিয়তমেষু’ উপন্যাসে হুমায়ূন আসলে কাজ করেছেন ধর্ষণের মতো একটা নারীমূলক ঘটনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, চেনা লোকদের পরিসরে।

একটা বৃহত্তর পরিসরে যে অসংখ্য ধরণের ডাইমেনশন আসলে সম্ভব এবং পুরো ব্যাপারটি যে কিছুতেই আইনের আওতায় আনা সম্ভবপর নয়। এই ধরণের একটা জটিল শ্রেণিগত, সমাজতত্ত্বগত, সংস্কৃতিগত, আইনগত এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে হুমায়ূন এই বইতে যে নিরীক্ষা করেছেন, সেটি অগোচরে থেকে গেছে বলেই আমার ধারণা। আমার লেখায় ওই বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।

আরেকটা বইয়ের উদাহরণ দেবো। এটিও সম্প্রতি প্রচার করেছি। বইটি হলো ‘নি’। আমি এটা আগে থেকে প্রচার করছিলাম যে, নি হলো একটা ফ্যান্টাসি ধরণের রচনা। হুমায়ূন ফ্যান্টাসি লেখার একজন উস্তাদ ছিলেন। বাংলা ভাষায় ফ্যান্টাসি ধরণের রচনার ক্ষেত্রে এবং ফ্যান্টাসীকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে একেবারে জড়িয়ে প্যাঁচিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে হুমায়ূনের তুল্য লেখক বাংলা ভাষায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আর একজনও নেই। নি হুমায়ূনের ফ্যান্টাসী ধরণের রচনার মধ্যেও এক্সট্রা অর্ডিনারী, এবং অসাধারণ। আমি দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থবার পড়তে গিয়ে আসলে আবিষ্কার করলাম যে নি ফ্যান্টাসী, তবে এই ফ্যান্টাসি আসলে অন্য একটা কাজ করেছে। সেই কাজটা হলো এই নি প্রেম ধারণার নতুন সংজ্ঞায়ন করেছে এবং বলেছে যে, প্রেম হলো একটা ফ্যান্টাসী। একটা ফ্যান্টাসটিক রচনা, যেটা ফ্যান্টাসি হিসেবে যে কেউ পড়বে। যেখানে বলা হচ্ছে যে, এই লোক হলো নি।

আসলে নি কে? মানুষের ক্রমোজম থাকে ২৩ জোড়া, ৪৬টা। আর এদের আছে ৪৭টা। একটা ক্রমোজম বেশি, এই কারণে তাদের ক্ষমতার স্বভাব এই রকম হয়। সাপের সঙ্গে জীবনযাপন করা… ইত্যাদি ইত্যাদি। যে কেউ গল্পটি এভাবে পড়বে। কিন্তু আপনি দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চমবার পড়লে আবিষ্কার করবেন যে, এটা আসলে বিশুদ্ধ প্রেমের উপন্যাস এবং এখানে প্রেমের নতুন সংজ্ঞায়ন হয়েছে। এখানে প্রেম আমি, তুমি মার্কা প্রেম নয়। এখানে প্রেম একেবারেই দুই ব্যক্তি তার বিশিষ্ট অবস্থানগত বাস্তবতার মধ্যে একটা সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। সেই সম্পর্কের ধরণ যেরকম তা নতুনভাবে নির্ণীত হচ্ছে, চিহ্নিত হচ্ছে এবং এর মধ্যদিয়ে খোদ প্রেম নতুন আকারে উপস্থাপিত হচ্ছে। আমি বলেছি এই উপন্যাস ফ্যান্টাসি হতে বাধ্য। কারণ যে প্রেমের সংজ্ঞায়ন হুমায়ূন করছেন, তা আসলে শেষ পর্যন্ত ফ্যান্টাসীই বটে।

হুমায়ূন প্রেমের গল্প ও উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর বয়ান তৈরি করেছেন। তার এই বিষয়ে সফল রচনার সংখ্যা বিপুল এবং হুমায়ূন বরবরই প্রেমের নতুন সংজ্ঞায়ন করেছেন। এই সংজ্ঞায়নের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই যে, প্রেম কখনো সামাজিক হতে পারে না। প্রেম মাত্রই অসামাজিক। এই বইয়ের মধ্যেও সেই ব্যাপারটি আছে। আমি তিনটা বইয়ের কথা সংক্ষেপে বললাম। যেখানে বললাম যে, হুমায়ূন অত্যন্ত জটিল দার্শনিক প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছেন, এরকম বইয়ের সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে থাকা সত্ত্বেও হুমায়ূনকে লোকে সেইভাবে পড়ে নাই। অথচ লোকে যে দর্শন পড়ার জন্য উপন্যাস পড়ে না তাতো নয়। লোকে আসলে জীবনের দার্শনিক গভীর সমস্যা পড়ার জন্যে উপন্যাস পড়ে। এবং পড়ে অভ্যস্ত। তাহলে হুমায়ুনের ক্ষেত্রে সে এই জিনিস আবিষ্কার করতে পারলো না কেনো।

আমি একটা প্রবন্ধ প্রচার করেছিলাম আগে, যে প্রবন্ধের নাম ছিলো ‘পাঠের সমস্যা’। সেইখানে আমি একথা বলেছিলাম যে, হুমায়ূন পাঠের এক নাম্বার সমস্যা হলো যে, হুমায়ূন সাহিত্য বা আর্টের বাজারে প্রচলিত ক্যাটাগরি নিয়ে কাজ করতেন না। এটা আসলে বড় লেখকেরই লক্ষণ। ধরা যাক, সাহিত্য কী নিয়ে হবে? বাংলাদেশে সাহিত্য কী নিয়ে হয়েছে? বাংলাদেশে সাহিত্য হয়েছে আধুনিকায়ন নিয়ে। ধরেন, আপনি গ্রাম কিংবা শহরের সাহিত্য দেখবেন। আপনি দেখবেন গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে লেখা সাহিত্যের একশোটার মধ্যে শতকরা পচানব্বইটার মধ্যে পশ্চাদপদ রক্ষণশীল জনসমাজ আছে এবং তার মধ্যে শিক্ষিত নতুন প্রগতিশীল তরুণরা কাজ করছে। এবং এই দুইয়ের মধ্যে দ্বন্ধ উপস্থাপিত হচ্ছে এবং আখেরে প্রগতির জয় হচ্ছে। এই ক্যাটাগরিতে আপনি হাজার হাজার সাহিত্য কর্ম পাবেন। আপনি জাতীয়তাবাদী ক্যাটাগরিতে সাহিত্য কর্ম পাবেন। আপনি দেখবেন বাঙালি জাতি যে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো এই বস্তু প্রচার করে বহু সাহিত্যকর্ম হয়েছে। এসব করা খারাপ আমি কিন্তু সেটা বলছি না। কিন্তু আমি বলছি যেগুলো হলো প্রতিষ্ঠিত ক্যাটাগরি, যেগুলো দিয়ে লোকে আসলে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পড়ে থাকে।

আপনি বাংলাদেশের সাহিত্যকর্মের তিন নাম্বার যে ‘গুরুতর’ ধারাটি পাবেন, সেই ধারাটি হলো এই যে, এখানে একধরণের মার্ক্সীয় কায়দায় শ্রেণিসংগ্রাম প্রচার করা হয়েছে। এই তিন ধারার মধ্যে আপনি বাংলাদেশের প্রধান সাহিত্যকে আসলে আঁটিয়ে ফেলতে পারবেন। এর বাইরে যে নেই তা নয়। কিন্তু প্রধান ধারাগুলো এরকম। গত বিশ-ত্রিশ বছর ধরে একধরণের সাহিত্যকর্ম হচ্ছে, যে সাহিত্যকর্মকে কৌতুক করে কিংবা আদা নিন্দা করে কেউ কেউ এনজিও সাহিত্য বলে থাকেন। এই এনজিও সাহিত্যের একটা ক্যাটাগরি আছে, যেটা অপেক্ষাকৃত ফিলানট্রোফিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে প্রধানত গ্রামের গরীব মানুষ অথবা শহরের বস্তির মানুষের দিকে তারা তাদের জীবনের উপস্থাপন করে। এর বাইরে আরো নানান ধরণের ক্যাটাগরি সম্ভব। বিশ্ব সাহিত্যে আমরা নানান দার্শনিক প্রকল্প দেখবো এবং আমরা রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রকল্প দেখবো। হুমায়ূনের সাহিত্যকর্ম এই গুরুতর বা গুরুতর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমাদের মনোযোগ যে অপেক্ষাকৃত কম আকর্ষণ করেছে তার অন্যতম প্রধান কারণ হুমায়ূনের সাহিত্যকে এই প্রধান ক্যাটাগরির আওতায় পাঠ করা যায় না।

হুমায়ূন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য উপন্যাস লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, সিনেমা বানিয়েছেন। আমি বিপুল পরিমাণ ফিকশন ও ননফিকশন এবং ভিজুয়্যাল নিজের লেখার জন্য পরীক্ষা করে এবিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের যে কোনো ধরণের রিপ্রেজেনটেশনের ক্ষেত্রে হুমায়ূন এককভাবে শ্রেষ্ঠ লেখক। হুমায়ুনের মুক্তিযুদ্ধ, যে কোনো বইয়ে আপনি দেখবেন, যে কোনো বই আপনি পড়বেন, হুমায়ুনের মুক্তিযুদ্ধকে আপনি জাতীয়তাবাদী ক্যাটাগরিতে পাঠ করা যায় না। ব্যাপারটা এই নয় যে, হুমায়ূন জাতীয়তাবাদী নয়। বরং হুমায়ুনের মধ্যে জাতীয়, রাষ্ট্রীয় ও আবেগ যথেষ্ট আছে। হুমায়ূন নিজেও আবেগী লেখক এবং অন্যের মধ্যে আবেগ তৈরি করতে চান। এই ধরণের একটা মানসিকতা হুমায়ূনের মধ্যে আছে। হুমায়ূন একজন বড় লেখক যে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই যে, হুমায়ূন নিরাসক্তভাবে আবেগী বয়ান তৈরি করতে পারেন। আবেগের যোগান দিতে পারেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হুমায়ূনের লেখা আবেগে টইটুম্বুর, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এতে বিশুদ্ধভাবে জাতীয়তাবাদী আবেগের রিডিউজ করা সম্ভব নয়। কেন সম্ভব নয়, সেই সম্পর্কে পরে আমি একটু বলবো।

———————————————————————————————————————————————————————————————–

ড. মোহাম্মদ আজম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

ড. মোহাম্মদ আজম সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মধ্যে একালের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন তাত্ত্বিক। গভীর ও শাণিত যুক্তির মধ্যদিয়ে কোনো বিষয়কে ব্যবচ্ছেদ করার জন্য সুধীমহলে তার খ্যাতি রয়েছে। ঢাকার মতো অস্থির বিদ্বৎসমাজের মধ্যে তার নিবিষ্ট জ্ঞানচর্চা বিশ্ববিদ্যালয় ও যে কোনো তরুণ পাঠকের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বইয়ের ফেরিওয়ালা ’র সাহিত্য আড্ডায় ‘হুমায়ূন আহমেদ : পাঠ পদ্ধতি ও তাৎপর্য’ শীর্ষক একটি গণবক্তৃতা প্রদান করেন। সেই বক্তৃতার তৃতীয় কিস্তি।

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png