শিল্প সাহিত্যের আতুরঘর ‘বিউটি বোর্ডিং’

বিউটি বোর্ডিং নিয়ে জানা-অজানা যত কথা
beauty boarding

আধুনিক বাংলা সাহিত্য এবং সাহিত্যকদের সঙ্গে বিউটি বোর্ডিং নামটি অপরিহার্যভাবে উচ্চারিত হয়। এখানেই আড্ডার মধ্যে অনেকে খুঁজে পেতেন সৃষ্টিশীলতার উপাদান। কিন্তু সেদিনের প্রাণ মাতানো আড্ডা আর নেই। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এ বোর্ডিং আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অংশ। শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় লিখেছেন-

বিউটি বোর্ডিং

মনে পড়ে, একদা যেতাম

প্রত্যহ দুবেলা বাংলাবাজারের শীর্ণ গলির ভেতরে সেই

বিউটি বোর্ডিং-এ পরস্পর মুখ দেখার আশায়

আমরা কজন

তখন তুমুল সময়কে

দিয়েছি গড়িয়ে স্রেফ চায়ের বাটিতে

কখনো জ্বলন্ত পুণ্য ঝোপের মতন

মাথা আর জঠরাগ্নি নিয়ে

পড়েছি কবিতা শাপভ্রষ্ট দেবতার স্বরে। কখনো জুটেছে

ফুল চন্দনের ঘ্রাণ, কখনোবা হুল বেশুমার।

বিউটি বোর্ডিংয়ের খোঁজে

বাংলাবাজারে ঢুকেই শ্রীশ দাস লেনে মোড় নিলেই চোখে পড়বে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বিউটি বোর্ডিং। গেটটা ঘষে-মেজে একটু সময়োপযোগী করলেও সেটা পার হলেই ফিকে হলুদ পুরোনো দেয়াল আর ঘন সবুজ রঙের দরজাওয়ালা নোনাধরা একটি দোতলা বাড়ি। বাড়ির মাঝখানে প্রশস্ত উঠোন দেখলেই বোঝা যায় আড্ডার উপযোগী জায়গা। পাশে খাবার ঘর, শোবার ঘর, পেছনে সিঁড়ি ঘর সবই পুরোনো গল্পের বাড়ির মতো করে সাজানো। এই বিউটি বোর্ডিং বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির গুণী মানুষদের আড্ডার একটি কেন্দ্র বা ইতিহাসের ভিত্তিভূমি। এখানে এসে দাঁড়াতেই একটি জ্যান্ত ইতিহাসের খোঁজ মেলে। মুখে বোল ফোটে জড় দেয়ালগুলোর। বলতে চায় তার হারানো অতীতের জয়গাথা। এক সময়ের জৌলুস অহংয়ের সেসব কথা। হয়তো কান পেতে কেউ শুনতে চাইলে ঠিক শুনতে পাবে তার কথা। সারাক্ষণ আড্ডায় আর ঝলমলে তারকাদের ভিড়ে মুখর থাকত এর প্রাঙ্গণ।

পুরোনো দিনের ঢাকার আড্ডার মধ্যে নামকরা ছিল ব্রাহ্মসমাজ গৃহ, নবাববাড়ি, ঢাকা প্রকাশের কার্যালয়, বান্ধব কার্যালয়, মুসলিম সুহৃদ সম্মিলনী, রূপলাল হাউস, ঢাকা সাহিত্য পরিষদ, শিখা গোষ্ঠী এবং বিউটি বোর্ডিং। তৎকালীন তরুণ এবং আজকের খ্যাতিমান যারা তারা সবাই তখন বিউটি বোর্ডিংকেন্দ্রিক আড্ডাবাজ ছিলেন। বিউটি বোর্ডিং ও এর আড্ডার ইতিহাস চল্লিশের দশক থেকেই ঢাকার সুখ্যাতি লাভ করেছিল। সমমনা লোকদের তখন বিভিন্ন বিষয়ে চলত তোলপাড় করা সব আড্ডা। সমমনা মানুষ ইচ্ছা করেই আড্ডা বসাতেন। টাকা-পয়সার চিন্তা না করে যে করেই হোক চলত নির্জলা আড্ডা। এসব আড্ডার ধরনও ছিল আলাদা। এমনও হতো যে, আড্ডা দিতে দিতে কারো একটা লেখাও হয়তো শেষ হয়ে যেত। অনেক কবি-সাহিত্যিকেরই এভাবে লেখা তৈরির বহু ইতিহাস রয়েছে এই বিউটি বোর্ডিংয়ে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই কোনো না কোনো রেস্তোরাঁ পাওয়া যাবে যা লেখক-শিল্পীদের আড্ডার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে। বর্তমানে শাহবাগ, ঢাকার বাইরে কুমিল্লার দাদার রেস্তোরাঁ, চট্টগ্রামের মোমিন রোডের চায়ের দোকান, ময়মনসিংহের তাজমহল হোটেলের আড্ডা, নারায়ণগঞ্জের বোস কেবিন, চাঁদপুরের কৃষ্ট কাফে কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন। সারাদেশ খুঁজলে এমন বহু আড্ডার জায়গা পাওয়া যাবে। কিন্তু বিউটি বোর্ডিংয়ের বিশেষত্ব ছিল আলাদা। এখানে যারা আড্ডা দিতেন তারা ছিলেন সৃষ্টিশীল। কারো কারো হাত দিয়ে কালি নয়, ঝরত রক্ত আর সৃষ্টি হতো বিখ্যাত সব কবিতা কিংবা উপন্যাস। এখানেই বসে তৈরি হতো রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রস্তুতি কিংবা মননশীলতার চর্চা।

বিউটি বোর্ডিংয়ে শ্রেষ্ঠত্বের  কারণ

বিউটি বোর্ডিংয়ে শ্রেষ্ঠত্বের অজস্র কারণ ছিল। এই বিউটি বোর্ডিংয়ের জন্মলগ্ন থেকেই এখানে আড্ডা দিতেন এ দেশের প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্র পরিচালক, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, অভিনেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বসেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আন্দোলনের সভা করেছেন, দিয়েছেন বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা। তবে এখনকার জমজমাট আড্ডার প্রাণপুরুষ ছিলেন কবি শহীদ কাদরী ও বেলাল চৌধুরী। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় এই বিউটি বোর্ডিং হয়ে ওঠে দেশের শিল্প-সাহিত্যের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। দেশবরেণ্য কবি শামসুর রাহমান, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক এখানে বসে সকাল-সন্ধ্যা আড্ডা দিতেন। এখানে বসেই জন্ম দিতেন তাদের বিখ্যাত সব লেখার। এছাড়াও এখানকার আড্ডা মাতাতেন খালেদ চৌধুরী, শিল্পী দেবদাস, চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, সঞ্জীব দত্ত, ফজলে লোহানী, ফতেহ লোহানী। আসতেন বিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। আসতেন হামিদুর রহমান, বিপ্লব দাশ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী ব্রজেন দাশ। খোয়াবনামা’র স্রষ্টা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমদ ছফা, হায়াৎ মামুদ, অমর সুরকার সত্য সাহা, সাদেক খান, এনায়েত উল্লাহ খান, কবি আল মাহমুদ, আল মুজাহিদী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শফিক রেহমান, নির্মলেন্দু গুণ, বাংলাদেশের জাদু সম্রাট জুয়েল আইচ প্রমুখ।

বিউটি বোর্ডিং-এর মালিকের সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হক ও শামসুর রাহমান
বিউটি বোর্ডিং-এর মালিকের সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হক ও শামসুর রাহমান

তারা সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখতেন বিউটি বোর্ডিং। তাদের মধ্যে জমে উঠত নির্জলা আড্ডা। আর সেই আড্ডা থেকেই উঠে আসত বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির অমর সব সৃষ্টি। শামসুর রাহমান এখানে বসেই লেখেন তাঁর বিখ্যাত সব কবিতা। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকও তাঁর সেরা রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম আরণ্যক, অনুপম দিন, এক মহিলার ছবি, কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন, জনক ও কালো কফিন, সীমানা ছাড়িয়ে, রক্ত গোলাপ ইত্যাদি এখানে বসেই লিখেছেন। সেই তুমুল আড্ডায় ছেদ পড়ে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে। ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী গণহত্যা শুরু করে। পাক আর্মিরা খবর পায়, বিউটি বোর্ডিং বাংলাদেশের মেধাবীদের সর্ববৃহৎ আড্ডা। অতঃপর হামলা। ২৮ মার্চ বিউটি বোর্ডিং ঘিরে ফেলা হয় এবং মালিক প্রহ্লাদ সাহা, বোর্ডিংয়ের ম্যানেজার-বোর্ডারসহ প্রায় ১৭ জনকে হত্যা করে পাক সেনারা।

স্বাধীনতার পর বিউটি বোর্ডিং 

দেশ স্বাধীন হয়। তারপর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চালু হয় বিউটি বোর্ডিং। শহীদ প্রহ্লাদ সাহার স্ত্রী, তাঁর দুই ছেলে তারক সাহা এবং সমর সাহাকে নিয়ে চালু করেন বোর্ডিং ব্যবসা। কিন্তু সেই পুরোনো ইমেজ ততোদিনে হারিয়ে যায়। আর একটি স্পর্শকাতর ইতিহাস হিসেবে রয়ে গেছে অনেকের স্মৃতির কোটরে।

জন্মকাহন

এক সময় বিউটি বোর্ডিংয়ের জায়গায় একটি প্রেস ছিল। প্রেসটার নাম ছিল ‘সোনার বাংলা’ প্রেস। ওই প্রেস থেকে ‘সোনার বাংলা’ নামে একটি পত্রিকাও বের হতো। ক্যালেন্ডারে যখন ১৯৪৮, তখন জন্ম নেয় নতুন দুটি দেশ। দেশ ভাগের পর সোনার বাংলা প্রেস ক্যালকাটা চলে যায়। প্রেসের মালিক ছিলেন তখন জমিদার সুধীর চন্দ্র দাস। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে প্রহ্লাদ সাহা ও নলিনী মোহন সাহা দুই সহোদর মিলে তৎকালীন জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের কাছ থেকে এ জায়গাটুকু নিয়ে গড়ে তোলেন আজকের সাহিত্যকর্মীদের তীর্থক্ষেত্র বিউটি বোর্ডিং। প্রহ্লাদ সাহা ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের ফাড়িংবাজার গ্রামে একটি হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার তামাক পাতার ব্যবসা ছিল। পিতার ব্যবসা দিয়েই বড়ো ভাই নলিনী মোহন সাহার সঙ্গে তামাক পাতার ব্যবসা শুরু করেন প্রথম জীবনে।

বিউটি বোর্ডিং এর ডাইনিং
বিউটি বোর্ডিং এর ডাইনিং

বাংলাবাজারে প্যারিদাস রোডে দুই ভাই মিলে বিক্রি করতেন তামাক পাতা। ১৯৪৮-৪৯ পর্যন্ত তারা এ ব্যবসা করতেন। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা দুই সহোদর মিলে তৎকালীন জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের কাছ থেকে এ জায়গাটুকু নিয়ে গড়ে তোলেন আজকের বিউটি বোর্ডিং। বিউটি বোর্ডিং গড়ে তোলার প্রাথমিক ইতিহাসের শুরু এখানেই। তারপর ধীরে ধীরে এখান থেকেই জন্ম হয় এ দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী। মালিক প্রহ্লাদ বাবুর কারণে বিউটি বোর্ডিং আর শুধু একটি নিছক বোর্ডিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না, প্রহ্লাদ বাবুর বিউটি বোর্ডিংকে কেবলই আড্ডা কেন্দ্রে পরিণত করল। এ আড্ডা ক্রমেই বাড়তে লাগল। বিউটি বোর্ডিং ক্রমেই হয়ে উঠল লেখক-শিল্পীদের ঠিকানা। লেখক-শিল্পীদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও অত্যাচার সহ্যের মানসিকতা। এখানে যারা আড্ডা দিতেন তারা সত্যিই সৃষ্টিশীল ছিলেন। কিন্তু ঢাকার বাইরে থেকে আসা চাল নেই, চুলো নেই, এমন প্রতিভার সবই এখানে এসে জুটতেন। আর তাদের সবার ঝুট-ঝামেলা মেটানোর জন্য বিউটি বোর্ডিংয়ের মালিক প্রহ্লাদ বাবু খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখতেন।

প্রথম সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে

এখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বসে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আন্দোলনের সভা করেছেন, দিয়েছেন বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা। প্রথম অনেক সৃষ্টির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বিউটি বোর্ডিংয়ের নাম। চলচ্চিত্রকার আবদুল জব্বার খান বিউটি বোর্ডিংয়ের ভেতরের মাঠটুকুর মধ্যে বসেই তৈরি করতেন চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট। এখানে বসেই তিনি লিখেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পাণ্ডুলিপি। ‘কাচের দেয়াল’-এর পাণ্ডুলিপি এখানে বসেই তৈরি হয়েছিল। সমর দাস বহু গানে সুর তৈরি করেছেন এখানে বসে। অনেক কবির প্রথম কবিতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিউটি বোর্ডিং।

স্মৃতির পাতায় ২৮ মার্চ ১৯৭১

বাংলাদেশ তখন স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য মরিয়া। ১৯৭১ মার্চ মাস সারাদেশে তখন যুদ্ধ পূর্ববর্তী অবস্থা বিরাজ করছে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী সারা ঢাকা শহরে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ঢাকা শহর ছিল ভীতিকর অবস্থায়। সেই ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মার্চ কী ঘটেছিল। বিউটি বোর্ডিংয়ে সেসব কথাই শোনালেন শহিদ প্রহ্লাদ সাহার ছেলে তারক সাহা। তার বয়স তখন ৬ বছর। স্মৃতির পাতা তখন তার খুব শক্তিশালী না হলেও মনে আছে অনেকটাই।

বাবা প্রহ্লাদ সাহা প্রতি রাতে বাড়ি ফেরার সময় বিউটি বোর্ডিং-এ তৈরি বেঁচে যাওয়া খাবার নিয়ে আসতেন বাড়িতে। তারা থাকতেন নর্থব্রুক হল রোডের একটি বাড়িতে। সেই খাবারের স্বাদের আশায় জেগে থাকতেন সমর সাহা ও তারক সাহা। ২৫ মার্চ রাতেও এর ব্যতিক্রম হলো না। বাবা হাতে নিয়ে ফিরলেন খাবার। প্রহ্লাদ সাহার একটি পিতলের টিফিন ক্যারিয়ার ছিল। সেই ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে বাসায় ফিরলেন। স্ত্রী প্রতিভা সাহাকে বললেন, দেশের পরিস্থিতি ভালো না। রাস্তায় আসার পথে তার টিফিন ক্যারিয়ার খুলে চেক করেছে পাক সেনারা। সেদিনই শেষ বাবার কোলে বসে খাবার খায় তারক সাহা। ২৬ তারিখ সকালে বোর্ডিংয়ে আসে প্রহ্লাদ সাহা। রেস্টুরেন্টের আয়োজন ছিল অল্প। তিনি ভাবলেন এখানে আর থাকা যাবে না। ২৭ তারিখ তারা চলে গেলেন হৃষিকেশ দাস রোডের মামাবাড়ি। পরিকল্পনা করে একসঙ্গে চলে যাবেন ইনডিয়া। ২৮ তারিখ সকালবেলা কারফিউ শিথিল করে সরকার। তারপর বোর্ডিং বন্ধ করার জন্য কর্মীদের বেতন দিতে প্রহ্লাদ সাহা আসেন বিউটি বোর্ডিং-এ। এখান থেকে আর বাসায় ফেরা হয়নি তার। পাক আর্মিরা খবর পায় বিউটি বোর্ডিং বাংলাদেশের মেধাবীদের সর্ববৃহৎ আড্ডা। দুপুরবেলা প্রহ্লাদ সাহার স্ত্রী প্রতিভা সাহা খবর পান তার স্বামীসহ ২৮ জনকে গুলি করে পাক সেনারা জিপে তুলে নিয়ে গেছে। তারপর অনেক ক্যাম্পে স্বামীর লাশ খুঁজে বেড়িয়েছেন প্রতিভা সাহা। সঙ্গে ছিল দুই অবুঝ শিশুসন্তান অমর সাহা ও তারক সাহা।

২৮ মার্চে শহীদ হওয়া ২৮ জনের নাম
২৮ মার্চে শহীদ হওয়া ২৮ জনের নাম

সুধী সংঘ

হারিয়ে যাওয়া জ্যান্ত ইতিহাস পুনরুদ্ধারে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে ইমরুল চৌধুরী (প্রাক্তন সংবাদ পাঠক) নেতৃত্বে বিউটি বোর্ডিংয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানের মহাকাব্য তুলে ধরতে সুধী সংঘ গঠন করে। সুধী সংঘ তরুণ কবিদের সৃজনশীল কবি সংসদ বলে এটি প্রতি মাসে একটি করে আবৃত্তি অনুষ্ঠান পরিচালনা করে। এরা প্রতি বছর ৫০ দশক থেকে বিউটিয়ানদের নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক মিলনমেলা করে। তারপর থেকে প্রতি বছর সুধী সংঘের কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে সুধী সংঘকে সুধী সংঘ ট্রাস্টে রূপান্তরিত করা হয়। প্রতি বছর ট্রাস্টের মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

এখনো বিউটি বোর্ডিং আছে। আছে ২৪টি কক্ষ। এর মধ্যে সিঙ্গেল কক্ষ ৮টি। প্রতিটি কক্ষের ভাড়া ৭৫ টাকা। ডাবল কক্ষ রয়েছে ১৫টি। প্রতিটির ভাড়া ১৪০ টাকা। তিনবেলাই খাবার ব্যবস্থা আছে। সকালের আগে সেই রেস্টুরেন্টকে কেন্দ্র করেই আড্ডা চলত। তৈরি হতো অনেক মুখরোচক খাবার। আর সেই খাবার ছিল অনেকের প্রিয় খাবারের তালিকায়।

ভেজিটেবল চপ, পটেটো চপ, ক্রাম চপ, কাটলেট, মোগলাই, ঢাকাই পরোটা, কেক টোস্ট, বাটার টোস্ট, মাটন চপ, আর এরই সঙ্গে ছিল চা। এখন রেস্টুরেন্ট বন্ধ সেই আড্ডাও নেই। রুটিনমাফিক বোর্ডারদের জন্য খাবার তৈরি করা হয়। সকালে ভাত, আলু ভর্তা, ডাল; দুপুরে বা রাতে কোনো বিশেষ উপলক্ষ্যে মুড়িঘণ্ট, সরিষা-ইলিশ, মাংস কিংবা কখনো কখনো ভুনা খিচুড়ি। বোর্ডার কিংবা বাইরের লোকজন অনেকে শখ করে দূর থেকে আসে কালের ইতিহাসের সাক্ষী এ বিউটি বোর্ডিংয়ে। তবে এত কিছুর পরও ভালো নেই বিউটি বোর্ডিং। বিউটি বোর্ডিংয়ের সঙ্গে মিশে থাকা মানুষদের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো এ নামটি এসে যায় তখন হয়তো কেউ নস্টালজিয়ায় ভোগে। আবেগতাড়িত হয় বিউটি বোর্ডিং নিয়ে।

এম মামুন হোসেন

সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

আরও পড়ুন- আদি অন্তে ঢাকা : ঢাকার পত্তন থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস 

বিউটি বোর্ডিং সম্পর্কে আরও জানতে 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading