জুল ভার্নের রচনা মানেই স্বপ্নের এক জগৎ

jul vern er sopner jogot

পৃথিবীর এমন কোনাে মানুষ নেই যে কল্পনার পাখায় ভর করেনি। স্বপ্ন দেখেনি। স্বপ্ন আর কল্পনা নিয়েই মানুষের জীবন। কিন্তু দুটোই অলীক। বাস্তবে যার ভিত্তি নেই। তবু মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালােবাসে। কল্পনা করতে মজা পায়। দুটো মানুষ যেমন কখনাে একরকম হয় না। তাদের স্বপ্ন-কল্পনাও কখনাে একরকম হয় না। বিচিত্র মানুষের থাকে আরাে বিচিত্র সব স্বপ্ন-কল্পনা। কিন্তু জুল ভার্নের মতাে আজগুবি অথচ বিজ্ঞান-নির্ভর স্বপ্ন আজ পর্যন্ত কেউ দেখে নি। কেউ কল্পনাও করে নি। তিনি বিজ্ঞানী নন। অথচ বিজ্ঞানীদের পথিকৃৎ তিনি। তার কল্পনায় যে জিনিস ছিল অদ্ভুত আর বিস্ময়কর আজ তার অনেকগুলােই বিজ্ঞানীরা সত্যি করে তুলেছেন। তার কল্পনাকে আবিষ্কার করেছেন। বাস্তব রূপ দিয়েছেন। সার্থক হয়েছে জুলভার্নের স্বপ্ন-কল্পনা।

আজ থেকে দুশ বছর আগে জুল ভার্নের জন্ম। দিনটা ছিল ১৮০০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। জন্মসূত্রে তিনি ফরাসি। কারণ ফ্রান্সের নানতেস দ্বীপে তাঁর জন্ম হয়েছিল। পরে তিনি আমেরিকায় চলে যান। এবং সেখানেই রচনা করেন তাঁর সেরা সৃষ্টিগুলাে। জুল ভার্নের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় নানতেসের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর এখান থেকেই তিনি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি নেন। ভর্তি হন ল-কলেজে। আইন পাশ করে আইনবিদ হন তিনি। অত্যন্ত তুখােড় ও মেধাবী ছাত্র ছিলেন জুল ভার্ন। আইন ব্যবসায় এসেও যােগ্যতা ও ব্যবহার গুণে খুব অল্পদিনেই বিশাল খ্যাতি অর্জন করেন। আর খ্যাতির সাথে সাথে অর্জন করেন বিত্ত ও প্রতিপত্তি।

BUY NOW

জুল ভার্ন বরাবরই ছিলেন নির্জনতা প্রিয়। সমাজের আর দশজন মানুষের মতাে তিনি নন। সংসারের ধরাবাধা জীবন, অর্থের পিছনে অনর্থক ছােটাছুটি তিনি পছন্দ করতেন না। পছন্দ করতেন না অর্থ উপার্জনের জন্যে মিথ্যের আশ্রয় নিতে । তাই আইন ব্যবসায় তাঁর প্রচুর খ্যাতি আর প্রতিপত্তি অর্জিত হলেও তিনি খুব একটা মনােযােগী ছিলেন না সে ব্যবসার প্রতি। তার মন ছিল বিজ্ঞানীসুলভ। নতুন নতুন চিন্তায় ডুবে থাকতেন তিনি। আর পড়তেন বিজ্ঞান বিষয়ক বই, সমুদ্র অভিযাত্রীদের অভিযানের দুঃসাহসিক কাহিনী, মহাকাশের অজানা তথ্য সম্পর্কিত নানান গবেষণামূলক প্রবন্ধ, নিবন্ধ, বইপত্র। পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়ে জানার প্রতি তাঁর ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। একাকি এসব বই-পত্র পড়তেন, আর নিজের মধ্যে ডুবে থাকতেন কী এক অসম্ভব কল্পনায় । বই পড়ায় আর কল্পনায় ডুবে আত্মমগ্ন থাকতে থাকতেই জুল ভার্ন কাল্পনিক বিজ্ঞানের জগতের মানুষ হয়ে গেলেন। অসম্ভব সব কল্পনার পাখায় ভর করে তিনি উড়ে বেড়াতে লাগলেন অবাস্তব অথচ বিজ্ঞানের যুক্তিতে অটুট বাস্তব জগতে।

জুল ভার্নের বাবার স্বপ্ন ছিল— ‘ছেলে হবে নামকরা ধনাঢ্য আইন ব্যবসায়ী।’ বাবার স্বপ্ন তিনি সম্পূর্ণ পূরণ করেননি। কিছুটা করেছিলেন। কিন্তু বাবার স্বপ্নের চেয়েও বড় হয়েছিলেন জুল ভার্ন। আইনবিদ হয়েছিলেন বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে। আবার আইন ব্যবসা ছেড়েছিলেন নিজের মনের স্বপ্ন সাধকে বাস্তবায়িত করতে। আর তাই তাে আজ পর্যন্ত তিনি কল্প-বিজ্ঞানের একচ্ছত্র সম্রাট। তার আশেপাশে কেউ নেই। আরাে অনেকেই অনেক চমকপ্রদ কল্পবিজ্ঞানের বই লিখেছেন, কিন্তু রুদ্ধশ্বাসে পাঠককে আকৃষ্ট করে তার মতাে কেউ রাখতে পারেন নি।

১৮৬৭ সালে তাঁর বয়স যখন ৬৭ বছর তখন তিনি আমেরিকায় চলে যান ফ্রান্স ছেড়ে। আর আমেরিকায় এসেই তিনি পুরােপুরি মনােযােগী হয়ে উঠলেন লেখা নিয়ে। সৃষ্টি করলেন তার কালজয়ী সব কল্প-কাহিনী। তুমুল আলােড়ন সৃষ্টিকারী ‘মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড’, ‘জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ’, ‘দ্য বেগমস্ ফরচুন’, ‘ফাইভ উইকস ইন এ বেলুন’ ইত্যাদি সব উপন্যাস তিনি এসময়েই লেখেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলাে নানান ভাষায় অনূদিত হয়ে পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই কিশাের থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সব পাঠকের মনে তিনি জায়গা করে নিলেন চিরতরে।

BUY NOW 

জুল ভার্ন বিজ্ঞানী ছিলেন না। কিন্তু তার জাদুমাখা কলমে যে কল্প-বিজ্ঞানের কাহিনী রচনা করেছেন তাতে তিনি সমস্ত বিজ্ঞানীদের পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। তার লেখা কল্পনা হলেও সত্যের চেয়ে সত্যি। কল্পনানীত কল্পনার আশ্চর্য বাস্তব। তাঁর সঙ্গে কারাে তুলনা চলে না। জুল ভার্ন পৃথিবীতে শুধু একজনই। কল্প-বিজ্ঞান কাহিনী বা সায়েন্স ফিকশনের তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী লেখক।

জুল ভার্ন জাহাজে চড়ে সাত সাগর চষে বেড়িয়েছেন, বিমানে চড়ে পৃথিবীর আয়তন মেপেছেন, বন-উপবন, অরণ্য উপত্যকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন অজানা তথ্য উদঘাটনের জন্যে কিন্তু সবই কল্পনায়। তিনি যা করেছেন, যা লিখেছেন সব ছিল তাঁর নিজস্ব কল্পনা। বাস্তবে নয়। অথচ আশ্চর্য হতে হয় বাস্তবের সঙ্গে অদ্ভুত মিল দেখে। সত্যিই ‘মিস্টিরিয়াস’! প্রায় অর্ধশত কাহিনী লিখেছেন জুল ভার্ন। পৃথিবীর এমন কোনাে দেশ নেই, যেখানে তার কল্পকাহিনী পৌঁছেনি। কল্প-বিজ্ঞানের এই মহান লেখক ও সাধক ১৯০৫ সালের ২৪ মার্চ আমেরিকার অ্যাসিয়েন্স-এ দেহত্যাগ করেন। মৃত্যু তাকে পৃথিবী থেকে নিয়ে গেলেও তার অমর অসাধারণ সৃষ্টিকে নিয়ে যেতে পারে নি। পারবেও না কোনােদিন। আর তাই তাে জন্মের দুশ বছর পরেও তিনি পৃথিবীব্যাপী রাজত্ব করছেন বিপুল দাপটে। অমর হয়ে আছেন লক্ষ কোটি পাঠকের মণিকোঠায়।

-(জুল ভার্ন রচনাসংকলনের ভূমিকা অংশ থেকে সংগৃহীত)

আরও পড়ুন- শিবরামের রসবোধ: প্রচন্ড অভাবও যার রসবোধ কমাতে পারেনি

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading