লতা মঙ্গেশকর , গানের এক রঙীন প্রজাপতি

লতা মুঙ্গেশকর গানের এক রঙ্গীন প্রজাপতি

আমার জাদুমাখা শৈশবের কোনো এক বিকেলে ঝিঙের মাচার আশেপাশে ঘুরছিলাম, হলুদ ফুলের ওপর ওড়া একটা প্রজাপতি ধরব বলে। বাহারী রঙের সেই প্রজাপতিটা ধরতে না পেরে আমি যখন ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদছিলাম, মা আমাকে ইশারায় ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। কোনো লোভনীয় খাবার খেতে পাব ভেবে আমিও সুড়সুড় করে ঢুকে গেলাম ঘরে। কিন্তু মা আমাকে কোনো খাবার খেতে দিলেন না, কোনো গল্পও শোনালেন না। আমাদের মেগা ট্রান্সজিস্টরে বাজিয়ে দিলেন একটা গান,

“ও প্রজাপতি, প্রজাপতি পাখনা মেলো

আমার এই মনের আঁধার কোণে কোণে

রঙে রঙে রংমশাল জ্বালো.

বহে না মন্দ বাতাস ছন্দবিহীন অন্ধ সে আজ

বনে বনে কোয়েল দোয়েল বন্ধ সে আজ……”

শিল্পীর কন্ঠস্বরের মধুতে মুগ্ধ হয়ে পুরো গানটি শুনলাম খুব মন দিয়ে। কী উচ্ছ্বল, টলটলে জলের মতো গানের গলা! যেন আমারই মতো কোনো ছোট মেয়ে গাইছে সে গান! পরক্ষণেই আবার মনে হয়, না বড় কেউই গাইছে। আমি ততোক্ষণে ভুলে গেছি হলুদ ফুলের ওপর ওড়া সেই প্রজাপতির কথা, আর একে একে ধরছি শিল্পীর গানের প্রজাপতিদের— “ও ঝর ঝর ঝরণা, ও পালি বর্ণা”, “কৃষ্ণচূড়া শোন”, “আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি”, “ও পলাশ, ও শিমুল, আমার এ মন কেন রাঙালে”, “মঙ্গল দ্বীপ জ্বেলে”, “প্রিয়তম, কী লিখি তোমায়”, “ও মোর ময়না গো’।

সেই এ্যালবামের শুরুতে ছিল শিল্পীর ছোট্ট একটা বক্তব্য। তিনি বলছিলেন, “বাংলা আমার ভাষা নয়, প্রথমে ভাবছিলাম এসব গান আমার গলায় বসবে কিনা, পরে ভাবলাম, সুর তো কোনো ভাষার প্রতিনিধিত্ব করে না………”, এরকমই কিছু কথা। স্মৃতির সংকটে আজ আর ভালো করে মনে পড়ে না কথাগুলো, কিন্তু এমন কাছাকাছিই ছিল। কথা বলার সময় বাংলায় একটা অন্য ভাষার টান, কিন্তু গানে সেই টান একদম নেই! কী শুদ্ধ উচ্চারণ, প্রতিটি শব্দ আলাদা হয়েই আসে কানে। সেই প্রথম প্রেমে পড়া লতা মঙ্গেশকরের।

তারপর তাঁর গান শুনে চলেছি আমার এই বড় বেলা পর্যন্ত। এমনকি আজও কোনো বেদনার্ত কিংবা প্রেমাক্রান্ত মুহুর্তে সঙ্গ দেয় তাঁর গান। কোনো একাকীত্ব যাপনের মুহূর্তে কখন যেন আনমনেই গেয়ে উঠি, “আপ কি নাযরো নে সামঝা/পেয়ার কি কাবিল মুঝে/দিল কি এ্যায় ধাড়কান ঠাহের যা/ মিল গ্যায়ে মনযিল মুঝে…”। কিংবা “লাগ যা গালে কি ফির ইয়ে হাঁসি রাত হো না হো, শায়াদ ফির ইসে জানাম ম্যায়, মোলাকাত হো না হো…”। এত দরদী, এত প্রাণময় গানের গলা, কেবল শুনতেই ইচ্ছে করে।

সারাজীবন সংগীত সাধনায় ব্রতী এই মানুষটির কিন্তু ছিল না বিন্দুমাত্র অহংকার। আর নিজের লক্ষ্যেও ছিলেন অবিচল, ইস্পাতের মতো দৃঢ়। গানকেই তিনি করে নিয়েছিলেন নিজের ধ্যান-জ্ঞান। তাইতো মৃত্যুর আগে আগে বলে গেলেন,

“পুনরায় জন্ম না নিলেই ভালো। তবে যদি জন্ম আবার নিয়েও থাকি তো অন্তত লতা মঙ্গেশকর আর হতে চাই না! কারণ লতা মঙ্গেশকরের কি কষ্ট একমাত্র শুধু সেই জানে।”

বোঝাই যাচ্ছে, যে কঠিন সাধনার ভেতর দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এমন এক শিল্পী, সেই কথাটাই বোঝাতে চেয়েছেন।

কার জন্য গান গাননি লতাজী? আর কোন ধরনের গান গাননি? ক্লাসিক থেকে পপ ধারার, সব ঘরানার গানই উঠেছে তাঁর গলায়। উল্লেখ করার মতো তাঁর বেশিরভাগ প্লেব্যাক গানই। মাত্র বিশ বছর বয়সে মধুবালার সিনেমায়, চুয়াল্লিশে ডিম্পল কাপাডিয়ার আর ঊনসত্তর বছর বয়সে টুইংকেল খান্নার অভিনীত সিনেমায় গান করেছেন। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, এক বিস্ময়কর সংগীত ভ্রমণের মধ্য দিয়েই তিনি পরিণত হয়েছিলেন উপমহাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তীতে।

এই গানের পাখির ক্যারিয়ার কিন্তু শুরু হয়েছিল অভিনয় দিয়ে। বাবা পন্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর নির্মাণ করতেন সংগীত-নাটক। সেখানে লতাজী শুরু করেন অভিনয়। বয়স তখন ৫। কিন্তু অভিনয় করতে গিয়ে বুঝলেন, পরিচালক যেমন করে হাসতে বলবে তেমন হাসতে হবে, যেমন মাথা নাড়াতে বলবে তেমন করেই মাথা নাড়াতে হবে, এই ব্যাপারটির সঙ্গে তিনি খাপ খাওয়াতে পারছেন না। ব্যস, ছেড়ে দিলেন অভিনয়।

আসলে সংগীত ছিল তাঁর রক্তে। জনশ্রুতি আছে, স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের গানের তালিম দিতে শুরু করেন লতাজী। শিক্ষকরা আপত্তি জানালে সেটা তার ভালো লাগেনি একদমই। তখন নাকি স্কুলও ছেড়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ঘোষণা দিয়েছিলেন, স্কুলেই আর যাবেন না কোনোদিন!

তারপর তো গান নিয়েই মত্ত। গান শুধু গান। ১৩ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকবাসী হলেন বাবা দীননাথ। পুরো সংসারের জোয়াল কাঁধে দিশেহারা লতা এবার আরও বেশি করে জড়িয়ে ধরলেন গানকে। গান গেয়ে জোগালেন সংসারের ডাল-ভাতও। ১৯৪৩ সালে মারাঠী সিনেমা ‘গাজাভাউ’ দিয়ে শুরু তাঁর হিন্দী গানের প্লেব্যাক ক্যারিয়ার। এর আগে গেয়েছেন মারাঠী ভাষাতেই। অন্তত ৩৬ টি ভারতীয় ভাষায় তিনি গান গেয়েছেন, শুনলেই চোখ দুটো বড় হয়ে ওঠে, আর নিজের অজান্তেই চোয়ালটা ঝুলে পড়ে, তাই না?

১৯৪৫ সালে চলে যান মুম্বাই। সেখানে গানের তালিম নেন উস্তাদ আমান আলী খানের কাছে। ১৯৪৬ সালে বিনায়কের হিন্দী সিনেমা ‘শুভদ্রা’য় গান গাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটে বসন্ত দেশাইয়ের। ১৯৪৮ সালে বিনায়কের মৃত্যুর পর তাঁকে গানের নির্দেশনা দেন সংগীত পরিচালক গুলাম হায়দার। তিনি লতাকে নিয়ে যান প্রযোজক শশধর মুখার্জীর কাছে। ওমা! শশধর ঠোঁট উল্টে বললেন, “এর গলা বেশি পাতলা, হবে না।” গুলাম হায়দারও তখন বলে দিলেন যে,

“একদিন এই আপনারাই লতার পায়ে গিয়ে পড়বেন। আপনাদের সিনেমায় তার গান ভিক্ষা চাইবেন।”

তা, কথা তো ঠিকই হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে গুলাম হায়দারই ‘মাজবুর’ সিনেমায় গানের সুযোগ করে দিলেন লতাকে। লতাজী তাঁর আশ্চর্য কিন্নর কন্ঠে গাইলেন, “দিল মেরা তোরা, মুঝে কাহিকা না ছোড়া।” সুপারহিট হয়ে গেল সেই গান। তারপর আর কী, মধুবালা থেকে প্রিয়াংকা চোপড়া, সবার অভিনীত সিনেমাতেই গান গেয়েছেন লতাজী। ২০১৩ সালে নিজের ৮৪তম জন্মদিনে গুলাম হায়দারের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা জানাতেও ভোলেননি এই বিনয়ী শিল্পী। বলেন,

“গুলাম হায়দারই আমার গানের গডফাদার। আমার মেধাকে তিনি পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলেন।”

মদন মোহন, আর ডি বর্মন, লক্ষীকান্ত-পেয়ারিলাল, শচীন দেব বর্মন, এ আর রহমানের মতো বাঘা বাঘা সংগীত পরিচালকদের সঙ্গে তিনি কাজ করে গেছেন। লক্ষীকান্ত-পেয়ারিলাল জুটির জন্য তিনি প্রায় ৭০০ গান গেয়েছেন। ২০০৪ সালে ইয়াশ চোপরার পরিচালিত ‘বীর-জারা’ সিনেমায় একটা পূর্ণ এ্যালবাম প্লেব্যাক করেন তিনি। এটাই ছিল তাঁর পূর্ণ এ্যালবাম হিসেবে শেষ কাজ। কিন্তু কন্ঠস্বরে তখনো সেই এখই মধু। তাঁকে না দেখলে বা না জানলে, শুধু কন্ঠস্বর শুনে কেউ আঁচও করতে পারবে না, তখন তাঁর বয়স পঁচাত্তর!

হীরের গয়নার ডিজাইনও করেছিলেন তিনি। তাঁর তিনটা ডিজাইন রীতিমত নিলামে বিক্রি হয়। ‘এ্যাডোরা’ নামের সেই ডায়মন্ড এক্সপোর্ট কোম্পানির জন্য ডিজাইন করা সেই হীরের দাম উঠেছিল ১০৫,০০০ ইউরো! এই পুরো টাকাটাই লতাজী রিলিফ হিসেবে দিয়ে দিয়েছিলেন ২০০৫ সালে কাশ্মিরের ভূমিকম্প-পীড়িত মানুষদের জন্য। শুধু তাই নয়, আরও পেছনে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের শরনার্থী এবং আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য তিনি ফান্ডে দান করেছিলেন এক লক্ষ রুপি। নিজের কিছু বিখ্যাত গানের রয়্যালটিও লিখে দিয়েছিলেন ফান্ডের নামে। কথা ছিল, যতদিন মুক্তিযুদ্ধ চলবে, এইসব গানের রয়্যালটি জমা হবে সেই ফান্ডে।

সংগীত জগৎ লতাজীকে মনে রাখবে। মনে রাখবে অসংখ্য গান পাগল মানুষ। হয়তো আমারই মতো করে আরও কোনো ছোট্ট মেয়ে, কোনো রঙীন প্রজাপতির পিছু দৌড়াতে গিয়ে, এক নরম রোদের বিকেলে আবিষ্কার করে ফেলবে লতা মঙ্গেশকর নামের আরেক রঙীন প্রজাপতিকে।

আরও পড়ুনঢাকার মূর্খতা ও জড়তার কারণে হুমায়ূন এখনো অপঠিত

সংগীত বিষয়ক বইগুলো দেখুন 

আত্মজীবনীমূলক বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

 

Tashmin Nur

Tashmin Nur

লিখতে ভালোবাসি, কারণ- আমি উড়তে ভালোবাসি। একমাত্র লিখতে গেলেই আসমানে পাখা মেলা যায়। আমার জন্ম কোথায়, পূর্ণ নাম কী, কোথায় কিসে পড়াশোনা করেছি, এটুকু আমার পরিচয় নয়। যেটুকু আমাকে দেখা যায় না, সেটুকুই আমার পরিচয়। বাকিটুকু আমার চিন্তায় ও সৃষ্টিকর্মে।

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading