রসিক রবীন্দ্রনাথ আসলেই কতটুকু রসিক ছিলেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তী। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, নাটক, চিত্রাঙ্কন তথা এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তাঁর বিচরণ ছিল না। যেখানেই হাত দিয়েছেন সফল হয়েছেন। রচনা করেছেন এক সোনালী ইতিহাস। বাস্তব জীবনে তিঁনি ছিলেন খুবই মজার মানুষ। অসাধারণ হিউমার দিয়ে যেকোনো আড্ডা জমিয়ে তুলতেন। এই মহান মানুষটির জীবন থেকে নেওয়া কিছু রস ও রসিকতার ঘটনা

০১।  বিষ খাওয়া

রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজি একসাথে বসে প্রাতরাশ করছিলেন। গান্ধীজি খাচ্ছিলেন পরিজ এবং রবীন্দ্রনাথ গরম লুচি। গান্ধীজি বললেন, ‘গুরুদেব তুমি জানো না যে তুমি বিষ খাচ্ছ’। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বিষই হবে। তবে এর অ্যাকশন খুব ধীরে। কারণ আমি বিগত ষাট বছর যাবৎ এই বিষই খাচ্ছি।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মহাত্মা গান্ধী, ছবিঃ অন্তর্জাল

০২।  দণ্ড দেওয়া

রবীন্দ্রনাথ একবার এক ভদ্রলোককে বললেন, ‘আপনাকে আমি দণ্ড দেব।’ ভদ্রলোক ভীষণ বিব্রত হলেন। বললেন, ‘কেন গুরুদেব! আমি কী অপরাধ করেছি? রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘গতকাল আপনার লাঠি, মানে দণ্ডটি আমার বাসায় ফেলে গেছেন, এই নিন আপনার দণ্ড।’

০৩।  পাথরখণ্ড পার্সেল

একবার শরৎচন্দ্র একখানা টেলিগ্রাম পাঠালেন রবীন্দ্রনাথকে। সেকালে সাধারণত কোনো গুরুতর সংবাদ হলেই টেলিগ্রাম করা হত। সেই টেলিগ্রাম খুলে দেখা গেল, শরৎবাবু ঠাট্টা করে শুধু লিখেছেন- ‘গুরুদেব আমি ভালোই আছি।’ রবীন্দ্রনাথও কি আর ছেড়ে দেবার পাত্র! তিনিও এর উত্তরে বিশাল এক পাথরখণ্ড পার্সেল করলেন শরৎবাবুকে এবং চিরকুটে লিখলেন, ‘তব কুশল সংবাদ পাইয়া আমার হৃদয় হইতে এই পাষাণভার নামিয়া গিয়াছে ‘

রবীন্দ্রনাথ এবং হেলেন কেলার

০৪।  দেহরঞ্জন

একবার দোলপূর্ণিমার দিনে নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল জামার পকেট থেকে আবির বের করে কবিগুরুকে রাঙিয়ে দিলেন। আবিরে রঞ্জিত রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন, ‘এতদিন জানতাম দ্বিজেনবাবু গান ও নাটক লিখে সকলের মনোরঞ্জন করে থাকেন। আজ দেখছি দেহরঞ্জনেও তিনি একজন ওস্তাদ।’

০৫।  নটির দলে

রবীন্দ্রনাথ একদিন বিকেলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে নৃত্যনাট্যের রিহার্সাল করাচ্ছেন। একজন এসে বললেন, ‘গুরুদেব চা খাবেন?’ রবীন্দ্রনাথ বললেন, আমি না-চা’র দলে সেই ব্যক্তি বুঝলেন রবীন্দ্রনাথের রসিকতা, ভাবলেন গুরুদেবকে ইংরেজীতে প্রশ্ন করে জব্দ করবেন। তিনি বললেন, “Won’t you have tea?” রবীন্দ্রনাথ তেমনই মুচকি হেসে বললেন, ‘আমি no-tea’র (নটির) দলে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবি

০৬।  কানাই সানাই

সাহিত্যিক ‘বনফুল’ তথা শ্রী বলাইচাঁদের এক ভাই অধ্যয়নের জন্য শান্তিনিকেতনে পৌঁছে কার কাছে যেন শুনলেন গুরুদেব কানে একটু কম শোনেন। দেখা করতে গেলে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘তুমি কি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি?’ তখন বনফুলের ভাই চেঁচিয়ে জবাব দিলেন, ‘আজ্ঞে না, আমি অরবিন্দ’ । রবীন্দ্রনাথ তখন হেসে উঠে বললেন, ‘না কানাই নয়, এ যে দেখছি একেবারে সানাই ‘

০৭।  উপুড় হয়ে লেখা

জীবনের শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথ একটু সামনে ঝুঁকে উপুড় হয়ে লিখতেন। তা দেখে এক শুভাকাঙ্ক্ষী বললেন, ‘গুরুদেব আপনার নিশ্চয়ই ওভাবে লিখতে কষ্ট হচ্ছে, একখানা চেয়ারে হেলান দিয়ে তো আয়েশ করে লিখতে পারেন।’ চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘তা তো পারি। তবে কি জানো, উপুড় হয়ে না লিখলে কি আর লেখা বেরোয়? পাত্রের জল কমে তলায় এসে ঠেকলে একটু উপুর তো করতেই হয় ।’

০৮।  গাবগাছ

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন কথাশিল্পী প্রমথনাথ বিশী। একবার প্রমথনাথ বিশী কবিগুরুর সঙ্গে শান্তিনিকেতনের আশ্রমের একটি ইঁদারার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওখানে একটি গাবগাছ লাগানো ছিল। কবিগুরু হঠাৎ প্রমথনাথকে উদ্দেশ করে বলে উঠলেন, ‘জানিস! একসময় এই গাছের চারাটিকে আমি খুব যত্নসহকারে লাগিয়েছিলাম? আমার ধারণা ছিল, এটা অশোকগাছ। কিন্তু যখন গাছটি বড় হলো তখনদেখি, ওটা অশোক নয়, গাবগাছ।’ অতঃপর কবিগুরু প্রমথনাথের দিকে সরাসরি তাকিয়ে স্মিতহাস্যে যোগ করলেন, ‘তোকেও অশোকগাছ বলে লাগিয়েছি, বোধকরি তুইও গাবগাছ হবি।’

০৯।  চিনি

মরিস সাহেব ছিলেন শান্তিনিকেতনে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার অধ্যাপক। একা থাকলে তিনি প্রায়ই গুনগুন করে গান গাইতেন। একদিন তিনি তৎকালীন ছাত্র প্রমথনাথ বিশীকে বললেন, ‘গুরুদেব চিনির ওপর একটি গান লিখেছেন, গানটি বড়ই মিষ্টি।’ অতঃপর তিনি গানটি গাইতে লাগলেন, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী, তুমি থাকো সিন্ধুপারে…।’

‘তা চিনির গান তো মিষ্টি হবেই। কিন্তু এই ব্যাখ্যা আপনি কোথায় পেলেন?’ প্রমথনাথ বিস্মিত হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করলেন। উত্তরে মরিস সাহেব জানালেন, ‘কেন, স্বয়ং গুরুদেবই আমাকে বলে দিয়েছেন।’

ছবি আঁকার সময় কবি, ১৯৩৭ সালের বোর্নভিটা এর বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ

১০।  কাশি

কবিগুরুর ৫০ বছর বয়সে পদার্পণ উপলক্ষে শান্তিনিকেতনের একটি কক্ষে সভা বসেছিল, যেখানে তিনি স্বকণ্ঠে গান করছিলেন। তিনি গাইলেন, ‘এখনো তারে চোখে দেখিনি, শুধু কাশি শুনেছি।’ কবিগুরু এটা গেয়েছিলেন আচার্য যতীন্দ্রমোহন বাগচি উক্ত কক্ষে প্রবেশের পূর্বক্ষণে, তাই বাগচি মহাশয় কক্ষে প্রবেশ করে বিস্ময়-বস্ফািরিত নয়নে সকলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তখন বাগচি মহাশয়কে বললেন, ‘সিঁড়িতে তোমার কাশির শব্দ শুনেই গুরুদেব তোমাকে চিনেছেন। তাই তো গানের কলিতে বাঁশির স্থলে কাশি বসিয়ে তাঁর গানটি গেয়েছেন।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সকল বই

 

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

You May Also Like This Article


Notice: Undefined offset: 5 in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-includes/class-wp-query.php on line 3300

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 30

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 31

Notice: Trying to access array offset on value of type bool in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 33
Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading