চার্লস ডিকেন্স : একটি অসুখী জীবনের গল্প!

ddd 1

চার্লস ডিকেন্সের জন্ম ১৮১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের পোর্টস্মাউথে। ইংরেজি ভাষার বিশ্বনন্দিত লেখকদের মধ্যে তাঁর নাম প্রথম সারিতে উচ্চারিত হয়। পড়তে পছন্দ করে না, এমন মানুষদের মধ্যেও তাঁর সৃষ্টিকর্ম কম-বেশি পরিচিত। থিয়েটারে বা টেলিভিশনে যদি ‘এ ক্রিসমাস ক্যারল’ এর ডজনখানেকের অন্তত একটিরও চিত্রায়ন দেখে থাকেন, তাহলে আপনি ডিকেন্সকে চেনেন। তাঁর ‘গ্রেট এক্সপেকটেশন’, ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ এবং ‘এ টেল অব টু সিটিজ’ সাহিত্যের আইকনিক কাজ হিশেবে মূল্যায়িত হয়।

কিন্তু এই বিখ্যাত লেখকের জীবন সম্পর্কে অনেকেই জানেন না, অনেকেই জানেন না যে, ডিকেন্সের চরিত্রগুলোর অসুখী জীবনের অনেকটাই ডিকেন্সের নিজের জীবন থেকে চিত্রিত এবং নিঃসন্দেহে তিনি পৃথিবীর চমৎকার ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন না। এর কোনো কিছুই তাঁর অর্জনকে ছোট করতে পারে না, তা সত্যি। কিন্তু তা অবশ্যই আপনার ডিকেন্স পাঠকে প্রভাবিত করতে পারে।

ডিকেন্সের শৈশব চুরি হয়ে গিয়েছিল ঋণের দায়ে

ডিকেন্সের সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত জন মাত্রই জানেন, ঋণ, দারিদ্র্য, অসুখী শৈশব ডিকেন্সের লেখায় বার বার ফিরে ফিরে এসেছে। এসব থিমের উৎস ডিকেন্সের নিজেরই শৈশব।

চার্লস ডিকেন্সের বাবা জন ডিকেন্স সারা জীবন ধরেই পরিবারের রুটি-রুজির জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। ডিকেন্সের বয়স যখন মাত্র ১২ বছর, তিনি এবং তাঁর বোন ফ্যানি স্কুলের পাঠ চুকিয়ে ‘ওয়ারেন্স ব্ল্যাকিং ফ্যাক্টরি’তে কাজে নেমে পড়েন। অনেক বছর আগের কথা, তখনও ইংল্যান্ডে শিশু-শ্রম আইন ওভাবে গড়ে ওঠেনি। জুতার পলিশের বোতলে লেবেল পেস্টিং’র কাজ করেছেন ডিকেন্স, অন্য অনেক শিশুর সঙ্গে বসে।

ডিকেন্সের জন্য এই অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ। এখনকার সময়ের ইওরোপের টিনেজারদের ‘সামার জব’এর মতো কাজ ওগুলো ছিল না। মাঝে মাঝে ডিকেন্স ১০ ঘন্টাও পলিশ বোতলে লেবেল পেস্টিং-এর কাজ করতেন। পরবর্তীতে ডিকেন্স বলেন, তাঁর শিশু হৃদয়ের গোপন কষ্টকে কোনো শব্দে বর্ণনা করা যাবে না। যে অমানবিকতার আর শোকের মুখোমুখি তিনি হয়েছিলেন, তাই পরবর্তীতে তাঁর কথা সাহিত্যে ফিরে এসেছিল।

শৈশবেই ডিকেন্স হারান এক ভাই ও এক বোনকে

ডিকেন্সের পরিবার তখন সবেমাত্র কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছিল। তখনই মস্তিষ্কে পানি জমে মারা যায় ডিকেন্সের ৬ মাস বয়সী আদরের ভাই আলফ্রেড এ্যালেন ডিকেন্স। তার কিছু পরে হারান ছোট বোন হ্যারিয়েটকে। তখন ডিকেন্সের বয়স মাত্র ৭ বছর। সবচে’ শোকের ছিল ফ্যানির মৃত্যু, যার সঙ্গে ডিকেন্সের বন্ধন ছিল সবচে’ দৃঢ়। ফ্যানির মৃত্যুর পর ডিকেন্সের জীবন একাকীত্বে ভরে যায়।

ঋণের দায়ে ডিকেন্সের পরিবারকে যেতে হয় জেলে

এখনকার সময়ে এটা খুব অবাক হবার মতো ব্যাপার হলেও তখনকার সময়ে এটা খুব সাধারণ একটা ব্যাপার ছিল। ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে লোকজনকে প্রায়ই জেলে যেতে হত। এই বন্দীদশা তাদের জীবনে আরও দুর্দশা ডেকে আনত। কেননা- বন্দী ব্যক্তির রোজগারের কোনো ব্যবস্থা থাকত না। ১৮ এবং ১৯ শতকের ইংল্যান্ডে বছরে প্রায় ১০,০০০ লোককে ঋণের দায়ে জেলে যেতে হত। চার্লস ডিকেন্সের বাবা জন ডিকেন্স ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। চার্লসের মা এবং তাঁর চার ভাই-বোনকেও বাবার সাথে সাথে জেলে যেতে হয়েছিল শুধুমাত্র থাকার জায়গার অভাবে। চার্লসের দাদী মারা যাবার পর উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু সম্পত্তি পাওয়ার কারণে চার্লসের বাবা এই ঋণের কোপ থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলেন, এবং আশার কথা হলো, চার্লস পুনরায় স্কুলে ফিরতে পেরেছিলেন।

চার্লস ডিকেন্স হারান তাঁর প্রথম প্রেমকে

তখন তাঁর বয়স ১৮। তীব্রভাবে মারিয়া বিডনিলের প্রেমে পড়লেন চার্লস। বিয়ের কথাবার্তাও পাকা হয়েছিল প্রায়। কিন্তু মারিয়ার বাবা-মা বাধ সাধেন এই সম্পর্কের পথে। চার্লসের আর্থিক অবস্থা এবং ঋণের দায়ে জেলে যাওয়ার পূর্ব ইতিহাস তাকে মারিয়া পরিবারের জামাতা হওয়ার অনুপযুক্ত করে তোলে। তারা মারিয়াকে প্যারিসের একটি স্কুলে নিয়ে যান স্কুল বদলে, যেখানে সে খুব দ্রুতই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। মারিয়াকে স্মরণে রেখে চার্লস বেশ মোটা একটি কাব্যগ্রন্থ লেখেন। ধারনা করা হয়, চার্লস ডিকেন্সের জনপ্রিয় চরিত্র ডোরা স্পেনলো (ডেভিড কপারফিল্ড) এবং ফ্লোরা ফিনচিং (লিটল ডোরিট) মারিয়াকে দিয়েই অনুপ্রাণিত।

পরবর্তীতে অনেক বছর পর, মারিয়ার সঙ্গে পুনরায় দেখা হওয়ার সম্ভাবনায় দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত চার্লস বেশ উত্তেজিত ছিলেন, কিন্তু দেখা হওয়ার পর চার্লস ডিকেন্স মারিয়ার মধ্য বয়সের রূপে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। মারিয়ার অস্বাভাবিক স্থুলতা তাঁকে হতাশ করে।

অসফল দাম্পত্য জীবন

ততোদিনে ১০ সন্তানের বাবা-মা হয়ে গেছেন চার্লস এবং ক্যাথেরিন। ক্যাথেরিনের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় চার্লসের। অবশ্য দায়টা তাঁর নিজেরই বেশি। নেলী নামের এক অল্প বয়সী তরুণীর প্রেমে পড়ে যান চার্লস ডিকেন্স। সামাজিকভাবে ইমেজ অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে চার্লস অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। যে কারণে, বাইরের দুনিয়ার কাছে হেনস্তার ভয়ে তিনি এমন একটা খবর চাউর করেন যে, ক্যাথেরিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ফলে, নিজের সন্তানদের জন্য সে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাসবিদ লিলিয়ান নাইডারের জবানীতে পাওয়া যায় যে, ডিকেন্স এমনকি তাঁর স্ত্রীকে একটি এ্যাসাইলামে পাকাপাকিভাবে থাকার ব্যাপারেও জোর করেছিলেন তাঁর বক্তব্যকে সত্য বলে প্রমাণ করার জন্য। ক্যাথেরিনের সৌভাগ্য যে, চার্লস ডিকেন্স তাতে সফল হননি। এইসবই তিনি করেছিলেন পাবলিক স্ক্যান্ডালের ভয়ে এবং নেলীর সঙ্গে সম্পর্ক বাধাহীনভাবে শুরু করার অভিপ্রায়ে। এতে করে ক্যাথেরিনকে ছাড়তে তাঁর জন্যে সুবিধা হয়েছিল।

চার্লস  হারান তাঁর আদরের কন্যাকে

ইতিহাসবিদদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ডিকেন্স ছিলেন সন্তান অন্তপ্রাণ। সন্তানদের শৈশব ছিল তাঁর কারণে আনন্দময়। তিনি সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলা করে প্রচুর সময় কাটাতেন। তিনি সন্তানদের খামখেয়ালী ধরনের ডাক নাম দিতেন, দিতেন মনোযোগ। তবে তারা বড় হয়ে উঠতে উঠতে বাবার সঙ্গে তাদের কিছুটা দূরত্ব তৈরি হত। কিন্তু কন্যা ডোরা এ্যানির সঙ্গে সেই দূরত্বের সুযোগও তাঁর হয়নি। ডোরা জন্ম থেকেই ছিল কিছুটা দূর্বল আর ডোরাকে তিনি ভালোও বেসেছিলেন অন্য সব সন্তানের চেয়ে বেশি। লেখক রবার্ট গটলিব লেখেন, চার্লস বাড়ি আর বাগানের মধ্যে ছোট্ট ডোরাকে নিয়ে হাঁটতেন। দুঃখের বিষয় হলো, বয়স এক বছর না গড়াতেই ডোরা মারা যায়। চার্লস গভীরভাবে শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁর বড় মেয়ে ম্যারি ১৮৮৯ সালে লেখেন, “বাবাকে এত বিবর্ণ আর কখনো দেখা যায়নি। সবকিছুই কেমন যেন বদলে যায়।“

চার্লস হারান তাঁর প্রিয় পুত্রকে

চার্লস ডিকেন্সের ১০ ছেলে-মেয়ের মধ্যে তাঁর চতুর্থ সন্তান ওয়ালটারেরই কেবল লেখালেখির প্রতি কিছুটা আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, তিনি সেটা পছন্দ করেন না। এমনকি ওয়াল্টারের টিউটরকে তিনি গোপনে শলাপরামর্শও দিতেন তাকে এই ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে তোলার জন্য। ১৬ বছর বয়সে সৈনিক হওয়ার দিকে ওয়াল্টারের ঝোঁক দেখা গেলে তিনি সেটা সমর্থন করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে কাজ করতে ওয়াল্টার ভারত গমন করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেখানেই, মাত্র ২২ বছর বয়সে ওয়াল্টারের মৃত্যু হয় ‘এ্যানিউরিজমে’।

দুঃখ ও অশান্তিপূর্ণ এক জীবন কাটানোর পর ১৮৭০ সালের জুনের ৯ তারিখে, যুক্তরাজ্যের গ্যাডস হিল প্যালেসে চার্লস ডিকেন্সের জীবনাবসান ঘটে, ৫৮ বছর বয়সে। তার আগে ১৮৬৫ সালে তিনি একটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার সাক্ষী হন, যে ট্রমা থেকে তিনি কখনোই মুক্ত হতে পারেননি। ১৮৬৯ সালে তাঁর মাইল্ড স্ট্রোক হলে ডাক্তার তাঁকে জীবন-যাপনে কিছুটা পরিবর্তন আনতে বলেন। কিন্তু চার্লস ডিকেন্স কখনোই তাঁর কঠোর পরিশ্রম ত্যাগ করেননি। এর মধ্যেও তিনি লেখালেখি করে গিয়েছিলেন।

Image- grunge.com

চার্লস ডিকেন্স এর বই সমূহ

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading