ঢাকার মূর্খতা ও জড়তার কারণে হুমায়ূন এখনো অপঠিতঃ মোহাম্মদ আজম

হুমায়ূন আহমেদ

 

ড.মোহাম্মদ আজম সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মধ্যে
একালের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন তাত্ত্বিক। গভীর ও শাণিত যুক্তিতে
যে কোনো বিষয়কে ব্যবচ্ছেদ করা ও তার নিবিষ্ট জ্ঞানচর্চা
বিশ্ববিদ্যালয় ও যে কোনো তরুণ পাঠকের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক।
ডঃ মোহাম্মদ আজমের ‘হুমায়ূন আহমেদ : পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য’
পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

এই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হুমায়ূন আহমেদ যত বড় লেখক, তার লেখালেখির গুরুত্ব তার চেয়ে বেশি। ব্যাপারটা হলো- এই গুরুত্ব বেশি কেনো? এর কিছু কিছু ইঙ্গিত আগেই দিয়েছি, বিস্তারিত বলতে হবে না। বাংলাদেশ হলো উপনিবেশিত মনস্তত্ত্বের দেশ। বাংলাদেশে সাহিত্য জনবিচ্ছিন্ন।

বাংলাদেশে সাহিত্য কাজ করতে চাই বিদ্যমান ক্যাটাগরি নিয়ে নয়, সম্ভাব্য ক্যাটাগরি নিয়ে। বাংলাদেশের সাহিত্য দেখানোমূলক নয়, ডাইলেকটিভ। মানে শিক্ষামূলক। যেহেতু সে পশ্চিমা ক্যাটাগরিগুলোকে বা কমপক্ষে কলকাতার ক্যাটাগরিকে, দেখার পদ্ধতিগুলোকে, লেখার পদ্ধতিগুলোকে বাংলাদেশে আমদানি করতে চায়। ফলে সে একইসঙ্গে দেখাতে চায় যে, জীবনটা আসলে এরকম হওয়া উচিত, তোরটা এরকম নয়।

আমি দুটো উদাহরণ দিচ্ছি কথাটা বুঝার জন্য। আপনারা জানেন যে, ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত শওকত আলীপ্রদোষে প্রাকৃতজন‘ বাংলাদেশে খুবই সেলিব্রেটেড একটা লেখা। প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর যে অ্যাসথেটিক্যাল হারমস, ডেফিনেটলি এটি খুবই মূল্যবান। কোনো সন্দেহ নেই। লেখক দারুণ পরিশ্রম করেছেন। লেখক তার কথাটি বলার জন্য একটা যুতসই প্লট তৈরি করেছেন। প্লট- কাহিনীর কথা বলছি না। প্লট তৈরি করেছেন। কিন্তু আমি এই বই পড়তে গিয়ে দারুণভাবে হতাশ হয়েছিলাম।প্রধানত দুটো কারণে। কারণ দুটো মর্মান্তিক। আমরা হুমায়ূন সম্পর্কে যে আলোচনা করছি সেখানে আমাদের কাজে লাগবে। এই বইয়ে ব্যবহার করা হয়েছে সংস্কৃত শব্দবহুল একধরণের ভাষা। যুক্তি সাধুরীতি। যুক্তি দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যদিয়ে একটা আর্কাইক ভঙ্গী তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু লেখক একেবারেই খেয়াল করেননি যে, তিনি এর মধ্যদিয়ে প্রাকৃত লোকদের জীবন কাহিনী বলার জন্য আশ্রয় নিয়েছেন সংস্কৃত লোকদের ভাষার, যে দুটোর দ্বন্দ্ব প্রকাশ করা এই উপন্যাসের মূল উদ্দেশ্য। তিনি সংস্কৃতায়িত ভাষা অবলম্বন করেছেন পুরোনো একটা ইমেজ তৈরি করার জন্য। অথচ সংস্কৃতায়িত ভাষার যারা মালিক তাদের সাথে প্রাকৃত জনগোষ্ঠীর দ্বন্ধ-বিরোধ উপস্থাপন করাই তার উপন্যাসের লক্ষ্য।

কথা সাহিত্যিক শওকত আলী, ছবিঃ অন্তর্জাল

প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর যে অ্যাসথেটিক্যাল হারমস, ডেফিনেটলি এটি খুবই মূল্যবান। কোনো সন্দেহ নেই। লেখক দারুণ পরিশ্রম করেছেন। লেখক তার কথাটি বলার জন্য একটা যুতসই প্লট তৈরি করেছেন। প্লট- কাহিনীর কথা বলছি না। প্লট তৈরি করেছেন। কিন্তু আমি এই বই পড়তে গিয়ে দারুণভাবে হতাশ হয়েছিলাম।

আপনারা যদি কেউ মধুর সাধুখাঁ নামে অমীয়ভূষণ মজুমদারের ছোট্ট দূর্দান্ত লেখাটি পড়ে থাকেন, তাহলে আপনার বুঝবেন যে, এর বিকল্প কি হতে পারতো? পুরনো ভাষা বলতে কি বুঝায়? শুধু তৎসম হলেই পুরনো হয় না। ভাবগত ব্যাপার আছে। এই বইয়ের দ্বিতীয় যে ব্যাপার, যা আমাকে দারুণভাবে প্রতিহত করেছিলো, সেটা হলো এই, আমি দেখলাম, এই উপন্যাসে চরিত্রের নাম, চরিত্রের আচরণ, প্রকৃতির প্রতি দেখার দৃষ্টিভঙ্গী, পারস্পরিক সম্পর্ক, বন্ধুত্বের ধরণ, এগুলো আজকের দিনের, যেটাকে বলা হয় অ্যানাস্ক্রসটিক। কালাত্তরক্রমী দোষযুক্ত, শুধু তাই নয়; আসলে এটা পুরোপুরি রাবীন্দ্রিক। আপনারা যদি আবার কখনো পড়েন, প্রথম বিশ পৃষ্ঠা পড়লেই আমার এই দুই কথা বুঝতে পারবেন। তাহলে আপনারা বুঝবেন যে, নিজের ভাষায় নিজের জীবন নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে নিজের কথা লেখা আসলে কত কঠিক এবং গুরুতর কাজ।

হুমায়ুন আজাদ, ছবিঃ অন্তর্জাল

আমি দ্বিতীয় উদাহরণ দিচ্ছি হুমায়ুন আজাদ থেকে। হুমায়ুন আজাদ প্রমিত ভাষা কাকে বলে সেটা জানতেন। তিনি জানতেন যে, কলিকাতার ভাষা আমরা যে হুবহু গ্রহণ করেছি, যেটা রপ্ত করতে হুমায়ুন আজাদের নিজেরই অসম্ভব পরিশ্রম করতে হয়েছে। আপনারা যারা হুমায়ুন আজাদের নিজের কথা শুনেছেন, তারা জেনে থাকবেন যে, হুমায়ুন আজাদ টেনে টেনে একধরণের নিজের ভঙ্গীতে কথা বলতেন। দারুণ! তার ব্যক্তিত্ব চিহ্নিত ভঙ্গীতে কথা বলতেন। কিন্তু নি:সন্দেহে এই ভদ্রলোক কলিকাতার প্রমিত উচ্চারণ রপ্ত করার চেষ্টার একটা অংশ হিসেবে এই ধরণের একটা কথা বলার শৈলীতে পৌঁছেছিলেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আজাদ জানতেন, ঢাকায় আমরা যে ক্যালক্যাশিয়ান প্রমিত ভাষা ব্যবহার করি, এটা ঠিক নয়। কিন্তু আজাদ মনে করতেন, পূর্ববাংলার ভদ্রলোকেরা এতো অভদ্র, সংস্কৃতজীবীরা এতো অসংস্কৃত, শিক্ষিত লোকেরা এতো অশিক্ষিত যে, এদের ভাষা প্রমিত হতেই পারে না। ফলে আমাদের উচিত কলকাতার ভাষা ব্যবহার করা। কথাটা বুইঝেন। আজাদ জানতেন, প্রমিত সারা পৃথিবীর কোনো লক্ষণ থেকে এটা আসলে বৈধ নয়। কিন্তু আজাদ মনে করতেন বাংলাদেশ একটা পশ্চাদপদ দেশ, এখানকার ভদ্রলোকেরা ভদ্রলোক নয়। শিক্ষিত লোকেরা শিক্ষিত নয়, সংস্কৃতিজীবীরা সংস্কৃতিবান নয়। ফলে আমাদের একমাত্র উপায় হলো কলকাতার জিনিস।

আজাদ একথা সরাসরি বলেছেন, অনেকে সরাসরি বলে না। কিন্তু আসলে এটা হলো ঢাকার আসল প্রধান দৃষ্টিভঙ্গী। এই দৃষ্টিভঙ্গী আবার বলছি আবিষ্কারমূলক নয়, এই দৃষ্টিভঙ্গী দেখানোমূলক নয়। কারণ এই দৃষ্টিভঙ্গী নিজের জীবনের দিকে গুরুতরভাবে তাকানোর ব্যাপারেই আসলে অনীহ। সুতরাং সে আসলে নিজের জীবনকে রূপায়িত করে দুইভাবে। সে হয়তো দেখাতে চায় যে এটা অত্যন্ত নিম্নশ্রেণির। এর উন্নত হতে হবে।

আজাদ মনে করতেন, পূর্ববাংলার ভদ্রলোকেরা এতো অভদ্র, সংস্কৃতজীবীরা এতো অসংস্কৃত, শিক্ষিত লোকেরা এতো অশিক্ষিত যে, এদের ভাষা প্রমিত হতেই পারে না। ফলে আমাদের উচিত কলকাতার ভাষা ব্যবহার করা। কথাটা বুইঝেন। আজাদ জানতেন, প্রমিত সারা পৃথিবীর কোনো লক্ষণ থেকে এটা আসলে বৈধ নয়। কিন্তু আজাদ মনে করতেন বাংলাদেশ একটা পশ্চাদপদ দেশ, এখানকার ভদ্রলোকেরা ভদ্রলোক নয়। শিক্ষিত লোকেরা শিক্ষিত নয়, সংস্কৃতিজীবীরা সংস্কৃতিবান নয়। ফলে আমাদের একমাত্র উপায় হলো কলকাতার জিনিস। আজাদ একথা সরাসরি বলেছেন, অনেকে সরাসরি বলে না।

ধরা যাক, আমাদের খুব বড় লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। আসলে এই জিনিসই দেখিয়েছে। ধরুণ, সে হয়তো বলবে যে, পশ্চিমাগত কোনো একটা চিন্তা বা চেতনার এখানে লোকদের এভাবে শেখাতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আসলে আমাদের সাহিত্য প্রধানত চলছে। যদি আমরা এককভাবে একজন লেখকের কথা বলতে চায়, যে এই ফুল প্যারাডাইমের বাইরে নিজের জীবনকে নিজে আবিষ্কার করে, নিজের গ্রামকে নিজে আবিষ্কার করে, নিজের মনস্তস্ত্বকে নিজে আবিষ্কার করে এবং সবচেয়ে প্যারিফেরিক মানুষগুলোকে আবিষ্কার করে চরিত্র হিসেবে তাদেরকে সাহিত্য আকারে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে যদি বড়ে উদ্যোগ কেউ নিয়ে থাকে, এবং তাতে সাফল্য অর্জন করে থাকে, তাহলে সে কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ। সুতরাং আমার শেষ সিদ্ধান্ত হলো এই যে, হুমায়ূন আহমেদ বড় লেখক। কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্য চর্চার প্রেক্ষাপটে হুমায়ূন আহমেদের গুরুত্ব আসলে তিনি যত বড় লেখক তার চেয়েও বেশি। 

আমরা এককভাবে একজন লেখকের কথা বলতে চায়, যে এই ফুল প্যারাডাইমের বাইরে নিজের জীবনকে নিজে আবিষ্কার করে, নিজের গ্রামকে নিজে আবিষ্কার করে, নিজের মনস্তস্ত্বকে নিজে আবিষ্কার করে এবং সবচেয়ে প্যারিফেরিক মানুষগুলোকে আবিষ্কার করে চরিত্র হিসেবে তাদেরকে সাহিত্য আকারে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে যদি বড়ে উদ্যোগ কেউ নিয়ে থাকে, এবং তাতে সাফল্য অর্জন করে থাকে, তাহলে সে কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ।

আমার শেষ বাক্য এই যে, গত চল্লিশ বছরে ঢাকার মূর্খতা এবং জড়তার কারণে হুমায়ূন আহমেদ যে ঠিকমতো পঠিত হয় নাই, সেটা আমাদের জন্য সামগ্রিকভাবে যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হয়েছে। আমি আশা করছি বিলম্বে হলেও এই ক্ষতি আমরা কাটিয়ে উঠতে পারবো। 

হুমায়ূন আহমেদ এর বই সমূহ

মোহাম্মদ আজম

মোহাম্মদ আজম

Published 01 Jul 2020
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্লেষক।
  1      1
 

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png