গ্রোথ হ্যাকার মার্কেটিং – টু বি অর নট টু বি

আমরা অনেকেই হটমেইলের কথা ভুলে গেছি। যদিও ১৯৯৬ সালে শুরু হওয়া প্রোডাক্টদের মধ্যে হটমেইল এখনো টিকে আছে, নাম পরিবর্তন করে। আমাদের এখানে এখনও অনেকেই হটমেইল ব্যবহার করেন। একসময় গড়ে ৩৫-৩৬ কোটি ব্যবহারকারী প্রতিমাসে হটমেইল ব্যবহার করতো। এখন জিমেইলের পাল্লায় পড়ে অনেকে সেখান থেকে সরে এসেছে।
হটমেইলের সহ প্রতিষ্ঠাতা সাবির ভাটিয়া আর জ্যাক স্মিথেওর কথাও এখন সেভাবে অনেকেই জানে না। তবে, হটমেইল সম্ভবত ডট কম বাবলের প্রথম সবচেয়ে বড় বেচা-কেনা। মাইক্রোসফট সে সময় রেকর্ড পরিমান টাকায় হটমেইল কিনে নিয়েছিল। এডাম পেনবার্গের ভাইরাল লুপ বইতে হটমেইলের মার্কেটিং-এর শুরুর কথাটা আছে। সাবির ভাটিয়া আর জ্যাক স্মিথ সিলিকন ভ্যালির ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট টিম ড্রেপারের সঙ্গে মিটিং করছেন। টিম এরই মধ্যে ওদের জানিয়েছে যে, বিনামূল্যের ওয়েববেজড ই-মেইল সম্পর্কে তার যথেষ্ট আগ্রহ আছে।
ভাটিয়া তৎক্ষণাৎ জবাব দিয়ে দিল – “আমরা সব জায়গায় বিল বোর্ড বসায় দিবো”।“কিন্তু” টিম জানতে চান – তোমরা এই খবরটা কেমন করে সবার কাছে পৌছে দেবে?
বিনামূল্যের কোন পন্যের জন্য এরকম ব্যয়বহুল চিন্তা সরাসরি নাকচ করে দেন টিম।
রেডিও বিজ্ঞাপন? ভাটিয়ার প্রস্তাব। একই কথা। অনেক টাকা।
তাহলে ইন্টারনেটে যাদের ই-মেইল আছে তাদের ই-মেইল পাঠায় দেই! ভাটিয়া মোটামুটি আইডিয়া ফ্যাক্টরি।
“না। কারণ স্প্যাম মেইল কেউ পছন্দ করে না।’
তাহলে? সবাই একটু ভাবতে শুরু করলো। তারপরই টিম ড্রেপার একটা অদ্ভুত প্রস্তাব করলেন – “আচ্ছা, তোমরা কি প্রত্যেকের স্ক্রিনে একটা মেসেজ দেখাতে পারবে?”
“হায়, হায়। আমরা নিশ্চয়ই সেটা করবো না।” ভাটিয়া আর স্মিথ দুজনই আপত্তি জানালো।
“কিন্তু তোমরা সেটা কারিগরিভাবে করতে পারবে কিনা। ধরো, আমি জোর করছি। তোমরা একজনের ই-মেইলে একটা মেসেজ বসায় দিতে পারবা? তারপর ঐ বার্তা যখন আর একজনকে পাঠাবে তখন কি তাকেও মেসেজ দিতে পারবা?”
ইয়া, ইয়া – ভাটিয়া আর স্মিথের জবাব।
“ঠিক আছে। তাহলে বসিয়ে দাও ,” P.S : I Love you. Get your free e-mail at Hotmail at the bottom”।
সামান্য এই বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ সিনারিওকে পরিবর্তন করে দেয়। এর মানে হলো প্রত্যেক হটমেইল ব্যবহারকারী যারাই হটমেইলে বার্তা পাঠাচ্ছে প্রত্যেকে হটমেইলের বিজ্ঞাপক হয়ে যাচ্ছে, নি:শব্দে। এটি খুবই কার্যকরী একটি কৌশল। বাড়তি কোন খরচ নাই। এটি ছোট্ট এবং সুন্দর বাক্য। যে পাচ্ছে সে কিন্তু এটিকে সেঅর্তে মার্কেটিং ভাবছেও না। বরং ভাবছে আমিতো এটা ব্যবহার করে তৃপ্তি পাচ্ছি, তাহলে আমার বন্ধুও সেটা ট্রাই করতে পারে।   খেয়াল করলে বোঝা যায় আবার যারা এই বিজ্ঞাপনটি দেখছে তারা কোন পেইড মার্কেটিয়ারের কাছ থেকে এটি শুনছে না। বরং সে শুনছে এমন কারো কাছ থেকে যে কিনা নিজেই ঐ প্রোডাক্টটি ব্যবহার করছে। তার মানে ব্যবহারকারী মানেই নতুনকে ডেকে আনা, প্রতিবার বার্তা পাঠানো মানে বিজ্ঞাপন প্রচার করা। আর হটমেইলের লোকেরা সেগুলো এনালিসিস করে বের করে ফেলতে পারছে কে তাদের কাস্টোমার হচ্ছে, তার চিন্তা প্রকৃতি কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি।
সে সময় এই আইডিয়াটা কতোটা বৈপ্লবিক ছিল তা চিন্তা করাটা এখন বেশ কঠিন। রায়ান হলিডে তার গ্রোথ হ্যাকার মার্কেটিং বই-এর শুরুতে গ্রোথ হ্যাকিং কী বোঝাতে এই উদাহরণটি ব্যবহার করেছেন। তারপর তিনি পেটস ডট কমের উদাহরণও দেন যারা কিনা হটমেইলের বছর কয়েক পর টিভি আর বিলবোর্ডের পেছনে ১.২ মিলিয়ন ডলার খরচ করেও দোকান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
Refference: গ্রোথ হ্যাকিং সম্পর্কে জানতে দেখুন মুনির হাসানের বই গ্রোথ হ্যাকিং মার্কেটিং
কিন্তু ড্রেপারের পরামর্শ গ্রহণের পর হটমেইলের জ্যামিতক হারে উন্নতি হয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে তাদের ব্যবহারকারীর সংখ্যা হয় ১০ লক্ষ। তারপরের ৫ সপ্তাহে সেটি দ্বিগুণ হয়েছে। ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে ১ কোটি ব্যবহারকারী নিয়ে হটমেইল মাইক্রোসফটের কাছে বিক্রি হয় মাত্র ৪০০ মিলিয়ন ডলারে! শুরুর মাত্র ৩০ মাসের মধ্যে হটমেইলের ব্যবহারকারী ৩০ মিলিয়নে (৩ কোটি) পৌঁছে। নতুন নামে হটমেইল কিন্তু এখনও টিকে আছে।
নতুন পদ্ধতির এই হলো বাহাদুরি। ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ব্র্যানড শুরু হয়েছে মাত্র তিন লক্ষ ডলারের বিনিয়োগ থেকে এবং জন্ম দিয়েছে একটি নতুন মার্কেটিং পদ্ধতির। আর হটমেইলের ঘটনাটি কোন ফ্লুক নয়। জি-মেইলের শুরুর কথা মনে আছে? প্রথমে গুগল একটা প্রোডাক্ট বানালো, হটমেইল থেকে ভাল। তারপর এটাকে বানালো “ইনভাইট অনলি”। মানে একজন তার পরিচিত জনকে কেবল জিমেইল একাউন্ট পাবার জন্য একটা ইনভাইটেশন পাঠাতে পারবে। তারপর একসময় এটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিল। সেই একই হটমেইল মার্কেটিং পলিসি। আর এখন ফ্রি ই-মেইল সার্ভিসের মধ্যে জিমেইলই সম্ভবত সেরা!
গত কদিন ধরে একটি নতুন উদ্যোগের জন্য মার্কেটিং পলিসি ঠিক করার চেষ্টা করছি। আর সেটা করার জন্য পড়ালেখা করছি নতুন করে। এর আগে ইনোসন্টের শরবত পড়ার সময় তাদের মার্কেটিং কৌশলটা সবার সঙ্গে শেয়ার করেছিলাম। এরপর অনেকদিন মার্কেটিং নিয়ে তেমন একটা পড়ালেখা করা হয়নি। এখন আবার পড়ছি। খান কতক বই পড়বো। এরমধ্যে গ্রোথ হ্যাকিং মার্কেটিংটা রেখেছি। মজার ব্যাপার হলো এই বই না পড়েই আমি আমার পড়ো পড়ো পড়োর জন্য নাকি এ বইতে বলা পদ্ধতিই অনুসরণ করেছি।
সে যাই হোক, মার্কেটিং নিয় আমার এমনিতে কিছু ধারণা আছে যদিও আমি সে অর্থে মার্কেটিং-এর লোক নয়। কিন্তু, আমার নিজের ধারণা গণিত অলিম্পিয়াডের মার্কেটিং-এ আমরা ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং-এর সর্বোচ্চ পন্থাটাই ব্যবহার করেছি। পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন পদ্ধতি। এগুলো সামারি করে একটা নতুন উদ্যোগের মার্কেটিং-এ সাহায্য করবো আর নতুন কিছু পড়রে সেটা সবার জন্য শেয়ার করবো।
মার্কেটিং হলো উদ্যোক্তাদের এক ধরণের যন্ত্রণার নাম। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের। একটা বড়ো কারণ হলো প্রোডাক্ট বানাতেই তাদের ধারকর্জের দিন মেষ হয়। ফলে মার্কেটিং-এর জন্য বাড়তি টাকা পয়সা থাকে না। ফলে প্রচলিত মার্কেটিং টুলসগুলো ব্যবহার করাটা তেমন একটা সম্ভব হয় না। আমাদের সবেধন নীলমনি তাই হয়ে দাড়িয়েছে ফেসবুক মার্কেটিং। যদিও এটা সবার জন্য সাফল্য বয়ে আনছে না। আমার হিসাবে মাত্র ১০-২০ শতাংশ নতুন উদ্যোক্তা তার মার্কেটিং-এর খরচকে সার্থক ভাবতে পারেন। আমাদের দেশেও অনেক বৈপ্লবিক মার্কেটিং-এর চিন্তা আছে। বিশেষ করে ৩০০ টাকার এনার্জি বাল্ব ১০০ টাকায় বিক্রির ব্যাপারটা আমাদেরই উদ্ভাবন মনে হচ্ছে (এটা নিয়ে কেউ কোন রিসার্চ করেছে? )। কাজে আমরা হয়তো নতুন কোন পদ্ধতি এরই মধ্যে বের করে বসে আছি। যাহোক আমার অন্বেষা চলুক।
সবার মার্কেটিং-এর সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল নেগেটিভ হোক।
সেই সাথে যারা গ্রোথ হ্যাকিং নিয়ে আগ্রহী তারা যে বইগুলো সংগ্রহ করতে পারেন 
সেগুলো হলোঃ
১) গ্রোথ হ্যাকিং মার্কেটিং
২) গ্রোথ হ্যাকার মার্কেটিং এ প্রাইম অন দ্য ফিউচার অব পিআর মাকেটিং অ্যান্ড অ্যাডভারটাইজিং
৩) হ্যাকিং গ্রোথঃ হাউ টুডেস ফাস্টার গ্রোইং কোম্পানিস ড্রাইভ ব্রেকআউট সাকসেস

মার্কেস ও মেটাফিকশন

লাতিন আমেরিকায় আমার সবচে পছন্দের লেখক হুয়ান রুলফো। সেটা এজন্য না যে, তিনি ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রবর্তকদের একজন। সেক্ষেত্রে হোসে মার্তি কিংবা কার্পেন্তিয়েরকেও একই স্বীকৃতি দিতে হবে। আস্তুরিয়াস কিংবা কর্তাজার পড়েছি, চোখ-ধাঁধানো ’ম্যাজিক’ তাদের ফিকশনে! অনুবাদে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব তাই আরগুইরাস পড়াই হল না এ জীবনে। বোর্হেস অনেক বেশি প্রলিফিক এবং প্রহেলিকাময়। ইয়োসা বা ফুয়েন্তেস-এ ম্যাজিক তেমন নাই, কিন্তু অনেক বেশি ভার্সেটাইল তারা। কিন্তু গোটা  লাতিন আমেরিকা নামক ভূখণ্ডটাকে কলম বানিয়ে লিখেছেন একজনই: গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
হুয়ান রুলফো, জাদুবাস্তবতার পূর্বসুরী লেখক। লেখক হিসেবে পরিচিত হলেও আলোকচিত্রী হিসেবেও তিনি অনন্য।
লাতিন আমেরিকা থেকে বহু দূরে, এই গোলার্ধে, আমরা বেড়ে উঠছিলাম মূলত ইংরেজি-ফরাসি নন্দনতত্ত্বে-র তত্ত্বাবধানে।‘লাতিন আমেরিকা’ নামক এই উদ্ভাসের কথা প্রথম শুনি কবি মোহাম্মদ রফিকের মুখে। আশির দশকের শেষ দিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নামক এক জাদুবাস্তব উপত্যকায়। তিনি তার পাঠের আকাশ থেকে ছিটেফোঁটা বৃষ্টি ঝরাতেন, সতের-আঠার বছর বয়সে চাতক পাখির মত তাইই হা করে গিলতাম। তখন পর্যন্ত ইংরেজিতে আস্ত একখানা উপন্যাস পড়ে ফেলবার সামর্থ কুলিয়ে উঠতে পারি নি। মার্কেসের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস  অব সলিচিউডএর বাংলা অনুবাদ আরো কিছুকাল পরের ঘটনা। ফলে, দু’চারটা গল্প বাংলায় ও ইংরেজিতে পড়ে এবং মোহাম্মদ রফিকের মুগ্ধ ন্যারেশন থেকে আন্দাজ করতাম এই জলে-ভাসা শৈলচূড়ার নিচে কী বিশাল সিন্ধুপর্বত অপেক্ষা করছে!
The Fragrance of Guava বইয়ের প্রচ্ছদ
প্রথম দিকের সেই দুয়েকটা গল্প বাদ দিলে, আমার মার্কেস-পড়া জোরেশোরে শুরু হয় তার সাক্ষাৎকারভিত্তিক বই দ্য ফ্র্যাগর‌্যান্স অব গুয়াভা দিয়ে। সম্ভবত ১৯৮৮র দিকে খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের অনুবাদে এটি বের হয় বাংলা একাডেমী পত্রিকায়। আমার ধারণা, মার্কেসের যে বইটির কথা লোকে সবচে বেশি বলে, কিন্তু সবচেয়ে কম লোক সেটি পড়েছে, তার নাম ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড। বিপরীতে, মার্কেসের যে বইটির কথা লোকে (বিশেষত লেখকেরা) একেবারেই বলে না, কিন্তু সম্ভবত সবচে বেশি লোকে সেই বইটির বিষয়-আশয় অবগত, সেটির নাম দ্য ফ্র্যাগর‌্যান্স অব গুয়াভা মার্কেস-ডিসকোর্সে দ্য ফ্র্যাগর‌্যান্স অব গুয়াভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই। এই বই অনেকে হয়ত সরাসরি পড়েনি, কিন্তু নানান কৌশলে এটি আমাদের মার্কেস পঠনপ্রক্রিয়ার ভেতর সঞ্চারিত হয়ে গেছে।
কী আছে ফ্র্যাগর‌্যান্স অব গুয়াভায়? খেয়াল রাখতে হবে, বইটি বেরিয়েছিল ১৯৮২ সালে, অর্থাৎ ঠিক যে বছরে মার্কেস নোবেল পান সে বছরেই। নোবেল পুরষ্কার পাবার সুবাদে সাহিত্যেও বৈশ্বিক মঞ্চে কেবল ঢুকতে শুরু করেছেন তিনি। এই বইয়ের মাধ্যমে তিনি ফিকশনের সাথে তার বহুমাত্রিক সম্পর্কের সুবাস ছড়িয়ে দিলেন তার সম্ভাব্য পাঠকসমাজে। ফিকশন এবং ফিকশনের পূর্বাপর বয়ান — প্রায় একসঙ্গেই হাজির হল তারা। এজন্যই এই প্রক্রিয়াটিকে আমি মেটাফিকশন বলছি। প্লিনিও মেন্দোজার সাথে দীর্ঘ আলাপে তিনি লাতিন আমেরিকার সাহিত্যকে খুব পোক্ত ঐতিহাসিক, নান্দনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিয়েছেন। আবার বিশ্বসাহিত্যে তার ব্যক্তিগত ভ্রমণটিকে তার স্বভাবসুলভ ভঙিতে হাজির করেছেন। ফলে, আমরা জানতে পারলাম তলস্তয় তার দৃষ্টিতে ‘মহত্তম’ হওয়া সত্বেও মার্কেজ বেশি নিয়েছেন হেমিংওয়ে আর ফকনার থেকে। জানলাম, মার্কেসের বিচারে পাবলো নেরুদা হলেন “বিংশ শতাব্দীর যে কোনো ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি”! এই সাক্ষাৎকার সিরিজ ক্রমশই চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠতে লাগল, যখন তিনি তার নিজের লেখার পদ্ধতি সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন। কোন্ উপন্যাসটিকে তিনি কত বছর ধরে লিখলেন, কোনো উপন্যাসের মোক্ষম একটি আরম্ভের জন্য কী ধরনের দৃশ্যকল্পের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল, বইয়ের একটি চরিত্র যখন মারা যাবে– সেটি লেখকের পারিবারিক বলয়ে কিভাবে উদযাপিত হচ্ছে, তার বৈষয়িক ও সাংসারিক ব্যবস্থাপনা কোন জাদুবাস্তবতায় সম্পন্ন হতে থাকল, ইত্যাদি। তার স্ত্রীর কথা জানলাম আমরা এই পর্বে– যিনি মার্কেস-এর  আগ্রহ টের পেয়ে পার্টিতে-আসা সুন্দরী নারীটিকে তার সাথে আলাপ করিয়ে দেন, এবং আলাপ-ক্লান্ত মার্কেসকে আবার ঠিক সময় মত পুনরুদ্ধার করেন।  তার উপন্যাসের চরিত্রগুলো বাস্তবের যেসব চরিত্র থেকে প্রেরণা পেয়েছে, তাদেরও হাজির করলেন পাঠকের সামনে। এভাবে, হান্ড্রেড ইয়ার্স-এর চরিত্রগুলো মার্কেস এর পারিবারিক ফোটোগ্রাফের ফ্রেমওয়ার্কে একে একে এঁটে যেতে থাকল। মার্কেসের জাদুকরি বর্ণনায় ইতিহাসের চরিত্রগুলো ফিকশনের চরিত্রগুলোর মতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল, কারণ আমরা দুটোকে মিলিয়ে পড়তে অবচেতন প্রলোভনে পড়ে গেলাম।
এভাবে, নতুন সাহিত্যের স্বাদ নেবার আগেই ঐ সাহিত্যের পদ্ধতির সাথে এবং সাহিত্যিকের ব্যক্তিত্বের সাথে আমার অরিয়েন্টেশন হয়ে গেল। ফলে আমার পক্ষে সাহিত্য ও সাহিত্যিকের এই দু’মখো রিফ্লেক্সিভ কৌশলের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে মার্কেস এর ফিকশনের  ‘শুদ্ধ’ স্বাদ নেয়া সম্ভব হয়-ই নি। দ্য ফ্র্যাগর‌্যান্স অব গুয়াভা  যেহেতু ১৯৮২ সালেই বেরিয়েছিল, ফলে অনুমান করি এই অভিজ্ঞতা একান্ত আমারই নয়। হয়ত এটাই পদ্ধতি যে, মার্কেসের প্রতিটা গল্প তার পাঠককে এমনি একটা মেটাফিকশন প্রক্রিয়ায় সামিল করবে: পাঠক মার্কেস-এর গল্পটা পড়বে, এবং সেই গল্পের গল্পটাও সে অবগত হবে। পাঠক-হৃদয়ে মার্কেসের ফিকশন আর ফিকশনের মার্কেস দুটোই হাজির থাকবে। আর সে কারণেই পাঠকের পক্ষে মার্কেসকে এতটা নির্ণায়ক অবস্থান দেয়া সম্ভব হবে।
ফিকশনের ঘটনা বা চরিত্রকে বাস্তবের জমিনে খুঁজে পাওয়ার পদ্ধতিই মেটাফিকশনের একমাত্র পদ্ধতি নয়। উল্টোদিক থেকেও এটা হতে পারে। যেমন, বাস্তবের আরাকাটাকা শহর, যার আদলে মার্কেস তার বিখ্যাত “মাকোন্দো” গ্রাম বানিয়েছেন, সেও যখন এই নিখিল ফিকশনের হিস্যা চাইতে আরম্ভ করে, তখনো মেটাফিকশন ঘটে। ২০০৬ সালে আরাকাটাকা শহরের মেয়র একটা মেমোরেন্ডাম আনেন যেখানে তিনি শহরের ভবিষ্যত নাম আরাকাটাকা-মাকোন্দো করার প্রস্তাব করেন। অবশ্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ভোটারের অভাবে সেই প্রস্তাব গৃহিত হয়নি। এভাবেও মেটাফিকশন রচিত হয়। বাঙালি পাঠক হুমায়ুন-এর চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসি রদ করার দাবিতে মিছিল করেছে এক সময়। সেই ফাঁসিও রদ হয়নি। কিন্তু মেটাফিকশন রচিত হয়েছে।
মার্কেস-ডিসকোর্সে জাদুবাস্তবতাই একমাত্র জাদু নয়। সেরকম হলে আমরা লাতিন আমেরিকার আরো অনেক লেখককে আরো অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক জায়গায় দেখতে পারতাম। মার্কেসকে আলাদা করে দিয়েছে তার ফিকশন-সম্পর্কিত বয়ান। এই বয়ানগুলো ফিকশনের সমবায়ে এক কার্যকর এবং সমসাময়িক মেটাফিকশন উপহার দিয়েছে বিশ্বপাঠককে। সমসাময়িক বলছি যেহেতু তারা পাঠকের কাছে একই সময়ে হাজির হয়েছে। সমসাময়িক হওয়ার কারণে পাঠকের পক্ষে ঐ বয়ানগুলোকে আর ফিকশনের পরিশিষ্ট কিংবা ভণিতা আকারে ভাবা সম্ভব হয় না। বরং তারা একই নান্দনিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে।
সমসাময়িক লেখকদের মাঝে উমবার্তো একো এবং হারুকি মুরাকামির মধ্যে এ ধরনের মেটাফিকশন তৈরির সচেতন প্রচেষ্টা খেয়াল করা যায়। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত দ্য নেইম অব দ্য রোজ উপন্যাসের পোস্টস্ক্রিপ্টাম লেখেন একো ১৯৮৩ সালেই। রিফ্লেকশনস একটা আলাদা বই, সেই বইয়ের ভূমিকায় তিনি রঁলা বার্থের অনুকরণে বলছেন যে, লেখা শেষ হওয়ার পর অথরের মরে যাওয়া উচিত — যাতে সে তার টেক্সটের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে! তারপরও একো আস্ত একটা বই লিখেছেন একটামাত্র নভেল নিয়ে। পোস্টমডার্ন জমানায় আমরা একোর এই গদ্যগ্রন্থকে হয়ত নেইম অব দ্য রোজ এর অথেনটিক ইন্টারপ্রিটেশনরূপে মানবও না। কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না যে, লেখকের এই ইন্টারপ্রিটেশন অপরাপর পাঠকের কাছে উপন্যাসটিকে মেটাফিকশনাল টেক্সট হিসাবেই হাজির করবে। প্রায় একইরকম অভিপ্রায় থেকে মুরাকামি তার উপন্যাসগুলো নিয়ে লাগাতার ইন্টারভিউ দিয়ে বেড়ান। এভাবে আমরা পাঠকনন্দিত লেখকদের মেটাফিকশন তৈরির প্রবণতাকে একটি সাধারণ প্রবণতা হিসাবেও খেয়াল করতে পারি।
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস  এর লেখা সকল দেখুন রকমারি ডট কম-এ
নেরুদা সম্পর্কে মার্কেস যা বলেছেন, তার সম্পর্কেও একই মন্তব্য করা যায়: তিনি বিংশ শতাব্দীর যে কোনো ভাষার শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী। যে কথাটি বললাম, এটা কি শুধুই প্যারাফ্রেজ? দ্য ফ্র্যাগর‌্যান্স অব গুয়াভা-র এক জায়গায় মার্কেস বলছেন, আন্তর্জাতিক পাঠকের মনোযোগের ভেতর চলে আসার পর তার জন্য লেখাটা অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে। এখন তিনি স্প্যানিশে এক প্যারা লেখার পর ইংরেজি, ফ্রেঞ্চসহ অপরাপর প্রধান ভাষাগুলোতে এর প্রকাশভঙ্গি কেমন দাঁড়ায় — সে বিষয়টিও বিবেচনা করতে শুরু করেন। সে অনুযায়ী ভাষার বা প্রকাশভঙ্গির সম্পাদনাও করেন। আমি যখন লিখেছিলাম মার্কেস বিংশ শতাব্দীর যেকোন ভাষার শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী– তখন এই তথ্যটি আমার স্মরণে ছিল না। লিখবার পর এখন মনে পড়ল। এভাবেই মেটাফিকশন কাজ করে।
শুরুতে বলেছিলাম, রুলফো আমার সবচে পছন্দের লাতিন আমেরিকান লেখক। এজন্য না যে তিনি মোটে একখানা উপন্যাস আর গোটা দশেক গল্প লিখেছেন সারাজীবনে। এজন্যও না যে, তিনি রঁলা বার্থ-কথিত সেই মৃত অথর, যার কোনোরকম মেটাফিকশন তৎপরতা নাই।  মার্কেস তার ৩২ বছর বয়সে রুলফো পড়েছিলেন। ততদিনে মার্কেসের প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়ে গেছে, আরো দুটি পাণ্ডুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায়। যে বছর তিনি রুলফো পড়েছিলেন, সে বছর মার্কেস আর কোনো বই পড়ে শেষ করতে পারেন নি। রুলফো পড়বার পর প্রতিটা বইই পানসে লাগত তার কাছে। মার্কেস পড়ার পর যখন অপরাপর সাহিত্যগুলো মূল্য হারাতে শুরু করে আমার কাছে, রুলফোকে আঁকড়ে ধরেছিলাম উজ্জ্বল উদ্ধাররূপে। নিরাশ করেন নি তিনি। তাই আজ মার্কেস-এর শ্বাসরোধী মেটাফিকশনের প্রভাব বলয়ের বাইরে রুলফোতে এসে দু’দণ্ড জিরিয়ে নিতে পারি। আর এভাবেই, খুব-অল্প-লেখা রুলফো, একাডেমিক জগত থেকে ফিকশনের জগতে আসা উমবার্তো একো, ভার্সেটাইল হুমায়ুন, এসেনশিয়াল বিকসেল, অদ্ভূতুড়ে সিঙ্গার আর উইয়ার্ড মুরাকামি-সহ বিশ্বসাহিত্যে আমার ব্যক্তিগত পর্যটনকেন্দ্রগুলো নির্ভয়ে শনাক্ত করতে পারি।

লিখেছেনঃ সুমন রহমান। ড. সুমন রহমান কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক বিশ্লেষক হিসেবেও পরিচিত। তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিঁঝিট’। আরো রয়েছে প্রবন্ধের বই ‘কানার হাটবাজার’ ও গল্প সংকলন ‘গরিবি অমরতা’। তার ‘নিরপরাধ ঘুম’ বাংলাভাষায় লিখিত প্রথম গল্প হিসেবে কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজের জন্য শর্ট লিস্টেড হয়, এছাড়া অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে বের হচ্ছে ‘মাইগ্রেশন অব মেটাফরস’। ড. সুমন রহমান কর্মরত আছেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের মিডিয়া অধ্যয়ন ও সাংবাদিকতা বিভাগে।

পোস্টম্যানের পোস্টমর্টেম: গল্পগুলো বাড়ি গেছে

প্রিয় কেক শেক আপু ওরফে মাহরীন,

আচ্ছা, আমরা যে একে অপরকে কেক-শেক আপু-ভাইয়া বলি এর শানে নজুলটা কি অন্যরা জানে? আজ যেহেতু তোমার সাম্প্রতিক গল্পের বই নিয়ে লিখবো বলে বসেছি, সেই সুন্দর গল্পটাও বলে ফেলা যাক কী বলো? জানো তো, গল্পরাই শুধু বেঁচে থাকে এই পৃথিবীতে, আমরা চলে যাই যদিও দূরে।
সেটা ২০০৯/১০ সাল। চতুর্মাত্রিকে আমার জন্মদিনে ভেবু পোস্ট দিয়েছিলো। সেসময় ছোট্ট তুমি খুব চাঞ্চল্যে কিছু ইমোখচিত শুভেচ্ছা জানিয়ে দিলে। চতুর্মাত্রিকের সেই বিখ্যাত ইমোগুলো! মজার ছিলো না? সেসময় আমি অত্যন্ত দুর্বল গতির সিটিসেল জুম মডেম ব্যবহার করতাম। তোমার অজস্র ইমোসমৃদ্ধ কমেন্টটা লোড হতে সময় নিচ্ছিলো। তখন আমি ইমোগুলো না দেখে শুধু কোডগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। তোমার কেক এবং কোকময় শুভেচ্ছা বার্তাটি টেক্সটরূপে এভাবে দেখতে পেয়েছিলাম- বাড্ডে বাড্ডে কেকশেক কেকশেক, বাড্ডেবাড্ডে কেকশেক কেকশেক, বাড্ডেবাড্ডে কেকশেক কেকশেক! আজ তোমার গল্পের বই নিয়ে এই লেখাটি লিখতে গিয়ে চতুরে ঢু মারতে ইচ্ছে হলো। গিয়ে কি দেখি জানো? চতুর্মাত্রিকের বাতি নিভে যাচ্ছে। হ্যাঁ প্রিয় কেক-শেক আপু, আমাদের চতুর্মাত্রিক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ জার্নি নিয়ে একদিন তুমি আর আমি বড় করে কিছু লিখবো নিশ্চয়ই? আমরা জানি তো গল্পরাই কেবল বেঁচে থাকে।
তোমার এবারের বইয়ের সূচিপত্রটা বেশ মজার হয়েছে! ১০টা গল্পকে ৩ ভাগে ভাগ করেছো প্রথম প্রহর, দ্বিতীয় প্রহর এবং তৃতীয় প্রহর নামে। প্রতিটিতে আছে যথাক্রমে ৩, ৪ এবং ৩টি গল্প। আমি জানি না ঠিক কোন ভাবনা থেকে এ ধরণের শ্রেণীকরণ করেছো। আমি ভেবেছিলাম প্রতিটি প্রহরের আলাদা চরিত্র থাকবে বুঝি। তা অবশ্য ঠিক মেলাতে পারি নি। মনে হয়েছে টাইমলাইন অনুযায়ী ভাগ করা। তাই কি? বলে দাও তো!
মাহরীন ফেরদৌস এর লেখা বই 'গল্পগুলো বাড়ি গেছে' বইটি প্রকাশিত হয়েছে বইমেলা ২০১৮ সালে
প্রথম প্রহর আমার কাছে মনে হয়েছে বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। কেন জানো? কারণ এই গল্পগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ‘গল্প’ আছে। আমি অনেকবারই একটি কথা বলে এসেছি (যা মূলত আহমেদ মোস্তফা কামাল স্যারের উপদেশ হতে প্রাপ্ত) আমাদের গল্পের ধারা দুরকম। অনুভূতিনির্ভর আর আখ্যান নির্ভর। আখ্যান নির্ভর গল্প লেখা আমার কাছে খুব কঠিন মনে হয়। কারণ এত এত গল্প লেখা হয়েছে, যে একদম নতুন গল্প তৈরি করা মুশকিল। তাই আমি এবং আমরা মূলত যা করি, তা হলো পুরোনো গল্পকে নানারকম মেটাফর, আর বিমূর্ত অনুভূতি দিয়ে তৈরি করি। আখ্যান নির্ভর গল্পগুলোই সাধারণত ক্লাসিকের মর্যাদা পায়, পাঠক মনে রাখে। তোমার প্রথম প্রহরের দুটি গল্প- বোকামানুষি আর ত্রিভূজের চতুষ্কোণ আমার মনে থাকবে। এই দুটি খুবই শক্তিশালী গল্প, আছে শক্তিশালী টুইস্ট আর শক। তবে সেজন্যেই হয়তো গলতির দিকটাও বেশি করে চোখে পড়ছে!
যেমন ধরো ত্রিভূজের চতুষ্কোণ গল্পটি, এখানে মূল চরিত্রের সাথে এরিকা এবং তার বাবা হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো এবং শ্বেতাঙ্গ নারী এরিকা অলমোস্ট লস্ট বাঙালি তরুণটির সাথে কী মনে করে প্রেম করা শুরু করলো বিষয়টি আমার কাছে মোটেও স্পষ্ট নয়। কিন্তু এটি বাদে বাদবাকি গল্পটা খুবই জম্পেশ। সম্ভবত তোমার সবচেয়ে বড় গল্প, তাই না? জানো, আগে রহস্যপত্রিকায় এমন গল্প পড়ে রোমাঞ্চিত হতাম প্রায়ই। এই গল্পের ট্রাজেডিটা একদম আমার বুক বিদীর্ণ করে দিয়েছে। করেছোটা কি তুমি বলো তো! আর এত ভায়োলেন্স! বেশ চমকে গেছিলাম কিন্তু।
প্রথম গল্প বোকামানুষিতে আমার পছন্দের বিষয় নিয়ে কাজ করেছো। মনস্তাত্বিক টানাপোড়েন। আমাদের অন্তর এমন কত বোঝা টেনে ক্লান্ত তাই না? সে পরিশুদ্ধ হবে কীভাবে বলো তো? এই গল্পটা প্রথমদিকে খুবই প্লেইন আর প্রেডিক্টেবল মনে হচ্ছিলো। আচমকা মোচড়ে হতভম্ব হয়েছি তো বটেই! তবে তুমি যে অতিপ্রাকৃত একটা আবহ নির্মাণের মাধ্যমে একটা ট্রাঞ্জিশন আনতে চেয়েছিলে, সেটা আরেকটু দীর্ঘ হলে ভালো হতো। আরেকটু গা ছমছমে করা যেতো। আর গল্পের শেষে কেন মূল চরিত্রটির ভুনা মাংসের জন্যেই কেবল আক্ষেপ হবে বলো! অন্য কোনো এলিমেন্ট বা মেটাফর এলে বিপন্নবোধ আরো প্রবল হতে পারতো।
দ্বিতীয় প্রহরের “তাহের ফিরে এসেছিল” গল্পটায় বেশ চমৎকার এক্সপেরিমেন্ট করেছো! মাঝখানে তোমার একটি স্ট্যাটাসে দেখেছিলাম লেখালেখি থেকে বিরতির সময়টাতে তোমার প্রচুর পড়াশোনায় নিজেকে ঋদ্ধ করার/হওয়ার ছাপ।
মাহরীন ফেরদৌস এর বই গল্পগুলো বাড়ি গেছে বইয়ের প্রচ্ছদ। বইটি দেখুন রকমারিতে । মুল্যঃ ২৩৮ টাকা মাত্র
এই গল্পটাতে তার প্রতিফলন দেখতে পেলাম। বর্ণনায়, আঙ্গিকে সবদিক দিয়েই অন্যরকম। কেউ যদি মনে করে এটা স্রেফ একটা ভুতুড়ে গপ্প, ভুল করবে। এই গল্পের ফিলোসফিটা কিন্তু দারুণ! বারে বারে হারিয়ে যায়, মরে যায়, থেতলে যায় আবার ফিরে আসে, বিয়ে করে এমন একটা চরিত্র কি আমাদের অন্তর্গত বিপন্নতা আর ভাঙনের কায়া রূপ? আরেকটু ভাংলেই পারতে! না থাক, এই ঠিক আছে! তবে এই বইয়ের যে গল্পটা আমাকে একদমই টানে নি, সেটা হলো “শেষ প্রিয়মুখ”। নামটাও যেমন সেকেলে, গল্পটাও মেলোড্রামাটিক। পুরোনো দিনের প্যাকেজ নাটকের মত। এই বইয়ের সাথে একদমই বেমানান!
তবে এই বইয়ের সবচেয়ে ভালো গল্প আমার কাছে কোনটা মনে হয়েছে জানলে হয়তো অবাক হবে। “পালট” গল্পটা আমার কাছে বুননের দিক দিয়ে সবচেয়ে আঁটোসাঁটো মনে হয়েছে।
“ফিরে যাওয়ার চেয়ে চলে যাওয়া বুঝি সহজ”, তাই না? ছোট্ট কিন্তু শক্তিশালী একটি গল্প। তৃতীয় প্রহরের “হিজলবনে জোনাকি” আগেই পড়া ছিলো। এই গল্প নিয়ে ভালোলাগার অনুভূতি আগেই জানিয়েছি।
তবে তোমার সবচেয়ে সফল গল্প বলবো “মুনিয়া ও একজন ভালোমানুষ”কে। কেন জানো? তোমাকে এর আগে কখনও এত বিস্তারিত ভাবে অসুন্দর প্রকাশ করতে দেখি নি। রীতিমত অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে আমার ভেতর। বিশেষ করে মুনিয়া যখন ফোনে শরীর হাতড়াতে প্রমত্ত এবং প্রকান্ড হয়ে ওঠা হবু স্বামীর নির্দেশনা অনুযায়ী কলের পুতুলের মত দেহমন্ত্র উচ্চারণ ভুলে থাকতে দশ থেকে এক গুণতে থাকে, এবং সেই সময় প্রতিটি গণনার সাথে অতীতের ফ্ল্যাশব্যাক- আমার অনেকদিন মনে থাকবে। আমি অনেককেই পড়তে বলবো।
তবে একটু অনুযোগ আছে। তুমি দেহক্ষুধায় মত্ত লোকটির ভালোমানুষীকে তার তরফ থেকে বারবার প্রকাশিত করতে দিয়ে ব্যাপারটা কিছুটা ক্লিশে করে ফেলেছো, কিংবা যেভাবে তাকে বলিয়েছো তা খুব একটু বাস্তবসম্মত লাগে নি।
তোমার লেখা একটি উপন্যাস আগে পড়েছিলাম। “কিছু বিষাদ হোক পাখি”। সেটা পড়ে তোমাকে ছোট্ট করে মন্তব্য জানিয়েছিলাম। আর এই গল্পগ্রন্থটি পড়ে একটু বড় করে লিখতে ইচ্ছে করলো। আমি জানি সামনের দিনগুলোতে আরো অনেক বড় করে লিখতে ইচ্ছে করবে।
ভালো থেকো আকাশের সব থেকে উচ্ছল পাখিটির মত

ইতি
পোষ্টম্যান


পোস্টম্যানের পোষ্টমর্টেম- লিখেছেন হাসান মাহবুব, একজন লেট ব্লুমার! জন্ম ১৯৮১ সালে হলেও লিখতে শুরু করেন ১৯৯৮ সাল থেকে। প্রথমে পদ্য লিখতেন, পরে ঝুঁকলেন গদ্যের দিকে। মাঝখানে দু বছর লেখেন নি। তবে ব্লগে আসার পর থেকে লিখেই চলেছেন। প্রকাশিত বই- প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত (২০১২), আনন্দভ্রম (২০১৬), নরকের রাজপুত্র (২০১৭) এবং মন্মথের মেলানকোলিয়া (২০১৮)। প্রথম তিনটি গল্পগ্রন্থ, শেষেরটি উপন্যাস। তাঁর সবগুলো বই দেখুন রকমারি ডট কম-এ

জাপান কাহিনীঃ জাপানি মিডিয়া

বলেনতো দেখি বিশ্বের সর্ববহুল প্রচারিত পত্রিকা কোনটি?
গুগল করে দেখি প্রথম ৫টি পত্রিকার মধ্যে ৪টিই জাপানি [১]।
.
Yomiuri ছাপে দৈনিক দশ মিলিয়ন কপি আর Asahi আট মিলিয়ন। জাপানের জনসংখ্যা ১২০ মিলিয়ন। বাকি পত্রিকা গুলোর সার্কুলেশন সংখ্যা যোগ করলে পরিবার প্রতি ৩টা পত্রিকা হবার কথা। এত পত্রিকা পড়ে কে?
.
সে হিসাব পরে হবে। তবে এই বিরাট পাঠক সংখ্যা ধরে রাখার পেছনে আমি সাংবাদিকদের অবদানের কথা বলব। ওনারা জানেন পাঠক কিভাবে ধরে রাখতে হয়,পাঠকদের সম্মান কীভাবে অর্জন করতে হয়। দুটো নমুনা দিচ্ছি।
(ক) একটি জাহাজ ডুবি, ৯ জন নিখোঁজ, দুইটা দেশ 
.
২০০১ সালের কথা। জাপানের শিকোকু দ্বীপের এহিমে জেলার একটি ফিশারি কলেজের ছাত্ররা “এহিমে মারু” নামক একটা জাহাজ নিয়ে ৭৪ দিনের শিক্ষা সফরে বের হলেন। সর্বমোট সদস্য সংখ্যা ৩৫, তার মধ্যে ২০ জন ক্রু, ১৩ জন ছাত্র আর ২ জন শিক্ষক। জাহাজ ঘুরছিল আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপের কাছে। ওখানে তখন আমেরিকা-নেভির সাবমেরিনের একটা মহড়া চলছিল। সাবমেরিনের পাইলট সাহেব জাপানী জাহাজ এহিমে মারু কে নীচ থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে গুতো দিয়ে বসলেন। জাহাজ ডুবল। মুহূর্তে আমেরিকার কোস্ট গার্ড এর হেলিকপ্টার চলে এল। ২৬ জনকে উদ্ধার করলো। ৯ জন নিখোঁজ হলো। জাহাজ চলে গেল সমুদ্রের গভীরে।
.
পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুকে মেনে নিচ্ছেন কিন্তু নিখোঁজ হওয়াটাকে মেনে নিচ্ছেন না। এটাকেই সেলিংপয়েন্ট ধরে নেমে পড়লেন জাপানের মিডিয়া।
.
সাংবাদিকরা জাপানের জাহাজ স্পেশালিস্ট দের কাছ থেকে চাইলেন কারিগরি ব্যাখ্যা, রাজনীতিবীদ দের কাছে চাইলেন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। টেলিভিশনে, নিউজপেপারে দেখাতে লাগলেন পরিবারের সদস্যদের শান্ত ভাষার কঠিন দাবী- কেউ হাউ মাউ করে কাঁদছেনা, ভাষা পরিষ্কার, দাবী পরিষ্কার – “পারিবারিক কবরে কবর দিতে চাই, একটা হাড্ডি হলে ও খুঁজে এনে দাও”। জাহাজ ডুবানোর জন্য দায়ী আমেরিকা- সুতরাং লাশ খুঁজে দেয়ার দায়িত্ব ও তাদের।
.
সাংবাদিকরা জনগণের মানবিক দিকগুলোকে জাগিয়ে দিলেন-
.
এক মা তার সন্তানের কলেজের ইউনিফর্ম ধরে বসে আছেন- কোন কথা বলছেন না, একটু পর পর গন্ধ শুকছেন। আরেক মা তার সন্তানের পছন্দের খাবার নিয়ে বসে আছেন- আনিসুল হক এর “মা” উপন্যাসের সেই মা এর মতো।
.
এসব নিঃশব্দ দৃশ্য মানুষ কে দুর্বল করে দেয়। একটা মানুষ নিখোঁজ থাকবে, প্রতিটা দিন প্রতিটা মুহূর্ত পরিবারের মানুষ অপেক্ষা করবে- এটা সহ্য করা কঠিন।
.
এর মধ্যে আবিষ্কার হলো ঘটনার সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী গলফ খেলছিলেন। উনি গলফ খেলা ইস্তফা দিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশকে ফোন করতে দেরী করেছেন। মিনিটে সেকেন্ডে হিসাব করে জনগনকে বুঝিয়ে দিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী খুব স্লো। জনগন একসংগে হওয়া মানে প্রধানমন্ত্রীর গদিকে নড়বড়ে করে ফেলা।
.
পররাস্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাখলেন প্রেশারে। দিন নাই রাত নাই একটু পর পর সাংবাদিকরা ওনাদের কাছে আপডেট জানতে চান। রাত দশটা বেজে যাচ্ছে তারপর ও মন্ত্রলায়ের কেউ বাড়ি ফিরতে পারছেন না। বের হতে গেলেই ইন্টার্ভিউ নেবেন। আপডেট জানতে চাবেন।
.
কোন থ্রেট না, ভাঙ্গাভাঙ্গি-রক্তারক্তি কিছুই না। সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে বাধ্য হলেন।
.
ডিটেইলে যাচ্ছি না। [২] এ দেখে নিন। উপসংহার টানি। সরকার প্রেশার দিলেন আমেরিকাকে। শেষতক প্রেসিডেন্ট বুশ টেলিভিশনে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলেন- I’m deeply sorry about the accident that took place; our nation is sorry. ক্ষমা চাইলেন কলিন পাওয়েল আর রামসফিল্ড। এবার দাবি আদায়ের পালা।
.
ইউএস নেভি US$11.47M জরিমানা দিলেন এহিমে জিলা কে, US$13.9M দিলেন পরিবারকে। দুই পরিবার টাকা নিতে শর্ত জুড়িয়ে দিলেন। শর্তানুযায়ী আমেরিকার রাষ্ট্রদূত আর সাবমেরিনের চালক সশরীরে এহিমে তে এসে প্রতিটি পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়ে আশ্বস্ত করলেন।
.
বোঝেন, ৯জন নিখোঁজ ব্যক্তির জন্য সাংবাদিক রা দুটো রাষ্ট্র কে কোন লেভেলে ইনভলভ করলেন।
আশির আহমেদের লেখা জাপান কাহিনী বইগুলোর প্রচ্ছদ, বইগুলো দেখতে ভিজিট করুন রকমারি ডট কম-এ
(খ) একটি হত্যা, একজন পলাতক আসামি 
.
১৯৮২ সালে কাযুকো ফুকুদা নামক এক মহিলা তার কলিগ কে হত্যা করে পালালেন। দুজনেই একটা হোস্টেস বার এ কাজ করতেন। সারা দেশে “ধরিয়ে দিন” পোস্টার লাগানো হলো। ফুকুদা চাল্লু মহিলা। প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারা পরিবর্তন করে ফেললেন। পুলিশ খবর পেয়ে যখনি ধরতে যান তখনি তিনি চেহারা ও জায়গা পালটান। সাতবার চেহারা পাল্টিয়েছেন বলে ওনার নাম হয়ে গেল সাত-মুখী ফুকুদা।
.
জাপানের নিয়মে ১৫ বছর মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে না পারলে আসামি আর আসামি থাকবেননা।
.
১৯৯৭ সাল। ১৫ বছর পার হতে আর ২ সপ্তাহ বাকি।
.
মিডিয়া মাঠে নামলেন। ফুকুদা কে ধরতে হবে। বিচার তার করতেই হবে। একটা আসামি কে বিনা বিচারে থাকতে দেয়া মানে সহস্র অপরাধ কে প্রশ্রয় দেয়া।
.
রবিবার সকালের একটি প্রোগ্রামে হৃদয়স্পর্শি একটা প্রোগ্রাম দেখাল। নিহত পরিবারের নিঃশব্দ দাবি, করুন আকুতি – ফুকুদা এসে ক্ষমা চাক। ফুকুদার ৭ চেহারা, হাঁটার স্টাইল, কথা বলার স্টাইল, ১৫ বছর পর তার চেহারা কেমন হতে পারে তা ও এঁকে দেখাল। আমি সেই প্রোগ্রাম টা দেখেছি। আমি ও এতটা কনভিন্সড হয়েছিলাম যে, আমি দেখলেই ফুকুদাকে চিনবো আর সাথে সাথে পুলিশে সোপর্দ করবো।

পাঁচ দিনের মাথায় ফুকুদা ধরা খেল। বেশ নাটকীয় ভাবে।
.
একটি স্ন্যাক্স-বার এ নিয়মিত যেতেন ফুকুদা। কথা বলার স্টাইল, হাঁটার স্টাইল দেখে মালিকের সন্দেহ হলো। সন্দেহের আলোকে কাউকে আটকানো যাবেনা। পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে ফন্দি আঁটলেন।
.
ফুকুদা দোকানে আসলেন। অন্যান্য দিনের মতোই। মালিক ড্রিঙ্ক করতে বোতল, গ্লাস এগিয়ে দিলেন। ফুকুদা গ্লাসে হাত দিতেই তার হাতের ছাপ লেগে গেল। দোকানের মালিক হাতের ছাপ ওয়ালা গ্লাস টা রেখে অন্য একটা গ্লাস দিলেন। হাতের ছাপ ভেরিফাই করে পুলিশ নিশ্চিত হলেন – এটাই ফুকুদা
.
পরদিন সারা দোকানে সাদা পোশাক পরিহিত অবস্থায় একদল পুলিশ কাস্টমারের ভান করে বসে দোকানে রইলেন। ফুকুদা এলেন। গতানুগতিক ভাবে গ্লাসে চুমুক দিলেন। একজন পুলিশ এসে নাম ধরে বললেন- ফুকুদা সান, আর পালানোর সুযোগ নেই। ইউ আর আন্ডার এরেস্ট। ফুকুদা একটু টু শব্দ করলেন না, হাত পেতে দিলেন। শুধু বললেন, “আমি ক্লান্ত, আর পারছিনা, আমার বিচার করুন” ।
.
মিডিয়া কী করতে না পারে!!
.
বিচারকাজ শুরু হল। ১৫ বছর পুর্ণ হবার মাত্র ১১ ঘণ্টা আগে তার বিচারের রায় হল। আমৃত্যু জেল। জেলে বসে ফুকুদা সমাজের জন্য কাজে লেগে গেলেন। ১৫ বছর পালিয়ে থাকার কাহিনি নিয়ে বই লিখলেন। সেই বই থেকে আয় হল ৮ মিলিয়ন ইয়েন। পুরোটাই সমাজে দান করে দিলেন। তারপর একদিন জেলেই ঠুস করে মরে গেলেন।
.
(গ) আমাদের লঞ্চ ডুবি, আমাদের নিখোঁজ মানুষ 

আমার শৈশব কেটেছে চাঁদপুরের মতলব থানার এখলাছপুর গ্রামে। পাশে মেঘনা নদী। ওপার দেখা যায়না। কারন মেঘনার পরেই আছে পদ্মা। ঢাকা চাঁদপুর বরিশাল নারায়ণগঞ্জ রুটের লঞ্চ যায়। শহরের সাথে আমাদের অন্যতম যোগাযোগব্যবস্থা হল নৌপথ। বর্ষাকালে নদী ফুলে ফেঁপে উঠে। আমরা ভয় পাই। বড় লঞ্চ গুলো পর্যন্ত ভয় পায়। নদীর মাঝখানে না গিয়ে তীর ঘেঁষে চলে। বড় বড় ঢেউ হয়। নদীর পাড় ভাঙে। গ্রামের আয়তন (ক্ষেত্রফল) কমতে থাকে।
.
বর্ষাকালে প্রতি বছর লঞ্চডুবি হয়। গ্রামের অধিকাংশ লোক স্বল্প আয়ের চাকুরীজীবী। ঈদের ছুটিতে গ্রামে আসেন। ঈদ শেষে ঢাকা ফিরেন। লঞ্চ ভর্তি মানুষ থাকে। তারপরও দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে উঠেন। জীবন হারানোর সম্ভাবনা ২% কিন্তু একদিন দেরিতে গেলে চাকুরী হারানোর সম্ভাবনা ৯০%।
.
পিনাক-৬ এর ভিডিও দৃশ্য (৪ঠা অগাস্ট,২০১৪) টা দেখেছেন ? [৩]
.
চেয়ে চেয়ে দেখলাম …
তুমি ডুবে গেলে …এ এ এ এ …….চেয়ে চেয়ে দে..খ..লা..ম ……
আমার করার কিছু করার ছিলনা ………
নৌ-মন্ত্রী সাহেবের কি করার ছিল? ঘটনা ঘটার টাইম, t=0 তে হয়ত ওনার কিছু করার ছিলনা। t=(-1hr, -1 min), t=(+1min, +1hr, weeks, years) এ যা করার ছিল তা জাপানি সাংবাদিক হলে সাংবাদিকরা খুঁচিয়ে বের করে ছাড়তেন। মেরিন প্রফেশনালদের ব্যস্ত রাখতেন জাহাজের ত্রুটি গুলোকে লিস্ট করতে। ছাত্রদের, গবেষকদের রিসার্চ টপিক হতো কীভাবে মানুষের ভুল গুলো স্বয়ংক্রিয় মেশিন দিয়ে রোধ করা যায়।
.
পরিবারের লোকজন তীর পর্যন্ত এসে পানির দিকে তাকিয়ে থাকেন। রানা প্লাজা যেখানে ছিল সেই শূন্যস্থানে এখনও কিছু পরিবারের লোকজন এসে শুধু তাকিয়ে থাকেন। শূন্যের মাঝে নিখোঁজ ব্যক্তিটিকে খোঁজেন।
.
১৫ বছর আগে আমার এক খালার একমাত্র ছেলে চাঁদপুরে এক লঞ্চডুবিতে নিখোঁজ হলেন। একজন নিখোঁজ মানুষের জন্য অপেক্ষা করা কি বেদনাদায়ক তা খালার চেহারায় দেখেছি। একটা ক্ষীণ আশা নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। গভীর রাতে একটু বিড়াল নড়া আওয়াজে ও খালা জেগে উঠেন, এই বুঝি ছেলে এলো। দীর্ঘ ১৪ বছর অপেক্ষা করে গত বছর খালা মরে গিয়ে আমাদের বাঁচালেন।
.
পিনাক-৬ এ দুই শতাধিক লোক ছিলেন। কতজন মরলো, কতজন নিখোঁজ হলো তার পরিসংখ্যান আমার কাছে নেই। কার কাছে আছে?
.
লঞ্চ ডুবি ছাড়া ও বিভিন্ন কারণে গ্রাম থেকে লোকজন নিখোঁজ হন। অপেক্ষা করতে থাকেন খালারা। বাংলাদেশে এই ধরনের খালাদের সংখ্যা কত কেউ জানেন?
.
নীচের [৪] ও [৫] একটু ক্লিক করে দেখুন। দুঃখ পেলেও খুশি (?) হবেন জেনে। গ্রামের মা-খালাদের কাছে এরা কিন্তুকম বেশি সবাই নিখোঁজ।
[১] বহুল প্রচারিত পত্রিকা http://en.wikipedia.org/…/List_of_newspapers_in_the_world_b…
[২] এহিমে মারু এক্সিডেন্ট http://en.wikipedia.org/…/Ehime_Maru_and_USS_Greeneville_co…
[৩] পিনাক-৬ এর ভিডিও https://www.youtube.com/watch?v=uPb886LaPlE
[৪] দেখলে দুঃখ পাবেন-১ http://www.bbc.com/news/world-south-asia-18579318
[৫] দেখলে কষ্ট পাবেন-২ http://www.uri.edu/artsci/wms/hughes/pakistan.htm

এক নজরে আশির আহমেদঃ জাপান কাহিনী ধারাবাহিক ভাবে লিখেছেন আশির আহমেদ, তিনি জাপানের কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক । দীর্ঘ ২৮ বছরের জাপানের অভিজ্ঞতা বাংলাভাষীদের জন্য লিখে যাচ্ছেন আশির-ঢঙের জাপানকাহিনি। তিনি দেশটিকে ও টুরিস্টদের মতো বাইরে থেকে দেথেনি- দেখেছে একজন বিদেশি হিসেবে যে বহুদিন সে দেশে থাকতে থাকতে নানা বাস্তব ও মানবিক অভিজ্ঞতায় ভরে উঠেছে। এ বই তারই উষ্ণ সজীব বিবরণ। জাপান এর বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪( জাপান কাহিনী-১ থেকে ৪ খন্ড)। তাঁর সবগুলো বই দেখুন রকমারি ডট কম -এ

যে উপন্যাসগুলো না পড়লে আপনার পাঠ অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে – আহমাদ মোস্তফা কামাল

বাংলাদেশের যে উপন্যাসগুলো না পড়লে আপনার পাঠ অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে, তার একটা সংক্ষিপ্ত-প্রাথমিক তালিকা এটি। এই তালিকায় গত শতকের চল্লিশ থেকে আশির দশকের লেখকদের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর নাম দেয়ার চেষ্টা করেছি। নব্বই দশক এবং এরপরও বেশ কিছু ভালো উপন্যাস লেখা হয়েছে, সেগুলোর তালিকা তৈরির দায়িত্ব তরুণদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি।
দ্রষ্টব্য : এই তালিকা আমার ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে তৈরি করা। যে-কেউ দ্বিমত করতে পারেন, নতুন নাম যুক্ত করতে পারেন, এখান থেকে কোনোটা বাদও দিতে পারেন। আমার আপত্তি নেই।

[বইগুলোর কিছু অংশ পড়ে দেখতে বইয়ের নামের উপর ক্লিক করুন]

১. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ – লালসালু, কাঁদো নদী কাঁদো
২. আবু ইসহাক – পদ্মার পলিদ্বীপ, সূর্য দীঘল বাড়ী
৩. শওকত ওসমান – ক্রীতদাসের হাসি
৪. রশীদ করীম – আমার যত গ্লানি
৫. সৈয়দ শামসুল হক – দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, খেলারাম খেলে যা
৬. জহির রায়হান – হাজার বছর ধরে, আরেক ফাল্গুন
৭. শওকত আলী – প্রদোষে প্রাকৃতজন
৮. মাহমুদুল হক – কালো বরফ, জীবন আমার বোন
৯. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস – চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা
১০. রাহাত খান – অমল ধবল চাকরি
১১. হুমায়ূন আহমেদ – শঙ্খনীল কারাগার, যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
১২. মঈনুল আহসান সাবের – মানুষ যেখানে যায় না, এই দেখা যায় বাংলাদেশ
১৩. শহীদুল জহির – জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
এই উপন্যাসগুলো পড়া হলে কেউ যদি আরেকটু এগোতে চান তাদের জন্য আরো কিছু নাম :
১৪ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ – চাঁদের অমাবস্যা
১৫. আবু জাফর শামসুদ্দীন – দেয়াল
১৬. শামসুদ্দীন আবুল কালাম – কাশবনের কন্যা
১৭. শহীদুল্লা কায়সার- সংশপ্তক, সারেং বউ
১৮. শওকত ওসমান – জননী
১৯. রশীদ করীম – উত্তম পুরুষ, মায়ের কাছে যাচ্ছি
২০. আনোয়ার পাশা – রাইফেল রোটি আওরাত
২০. রিজিয়া রহমান – বং থেকে বাংলা
২০. সৈয়দ শামসুল হক – দূরত্ব, স্তব্ধতার অনুবাদ, ত্রাহি, স্মৃতিমেধ ও নীল দংশন
২১. আলাউদ্দিন আল আজাদ – তেইশ নম্বর তৈলচিত্র
২২. শওকত আলী – যাত্রা, দক্ষিণায়নের দিন
২৩. আবু বকর সিদ্দিক – খরাদাহ
২৪. হাসনাত আবদুল হাই – নভেরা, সুলতান
২৫. হাসান আজিজুল হক – আগুনপাখি, বৃত্তায়ন
২৬. মাহমুদুল হক – অনুর পাঠশালা, খেলাঘর
২৭. আহমদ ছফা – একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন, গাভী বৃত্তান্ত, ওঙ্কার
২৮. শেষ পানপাত্র – বশীর আল হেলাল
২৯. হুমায়ুন আজাদ- সব কিছু ভেঙে পড়ে
৩০. সেলিনা হোসেন – হাঙর নদী গ্রেনেড
৩১. রশীদ হায়দার- খাঁচায় অন্ধ কথামালা,
৩২. হুমায়ূন আহমেদ – আগুনের পরশমনি, সৌরভ, ১৯৭১
৩৩. ইমদাদুল হক মিলন – যাবজ্জীবন, কালো ঘোড়া, কালাকাল
৩৪. মঞ্জু সরকার – তমস, প্রতিমা উপাখ্যান
৩৫. মঈনুল আহসান সাবের – ঠাট্টা, কবেজ লেঠেল
৩৬. হরিপদ দত্ত – অজগর
৩৭. শহীদুল জহির – সে রাতে পূর্ণিমা ছিল, মুখের দিকে দেখি
৩৯. নাসরীন জাহান – উড়ুক্কু
৪০. আনিসুল হক – ফাঁদ

এক নজরে আহমেদ মোস্তফা কামাল। যাবতীয় বৈষয়িক সাফল্যের সম্ভাবনাকে নাকচ করে যিনি কেবল লেখালেখিকেই জীবনের সব স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছেন তিনি। পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। লেখালেখির শুরু নব্বই দশকের গোড়া থেকেই। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দ্বিতীয় মানুষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। রকমারি ডট কম-এ দেখুন আহমাদ মোস্তফা কামালের রকমারি ডট কম- বেস্ট সেলার সকল বই।

আমার দেশের মাটির ঘ্রাণে- তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পায়ে হেঁটে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লব্দ গল্প

যখন যেখানে থাকি আমার কেবল মন ছুটে যায় কৃষকের শর্ষে ফলানো হলুদ গালিচা বিছানো মাঠে। স্বপ্নের ঘোরে ঘুরে আসি সোনানী ধান ক্ষেত কিংবা গাড় সবুজ ভূট্টার পাশ দিয়ে। দিগন্তজোড়া গ্রামের কুড়েঘর ছুয়ে হৃদয়ে বাজে পালতোলা নৌকার গলুইয়ে বসে গাওয়া মাঝির গানের সুরে। ক্ষেতের আল ধরে হেঁটে যায় কৃষানী গামছায় বেঁধে পান্তাভাতের বাটি। গরুর গাড়ি চলে ক্যাচর ক্যাচর আরো কতো কী!
ছোট বেলায় বইয়ে পাতায় ঘুরে বেড়িয়েছি বিশ্বময়। বিশ্ব জয়ের কথা, সুইস ফ্যামিলি রবিনসন, হোয়াইট ফ্যাং, সার্কাসের কুকুর, হ্যান্সব্যাক অব নোতরদম, একশ আশি দিনে পৃথিবী ভ্রমণ, চাঁদের পাহাড়, রবিনসন ক্রুশো আরো কত বাস্তব অভিযান আর কল্পনার রোমাঞ্চকর গল্প। বাস্তবে কখনো যাওয়া হয়নি মিসিসিপি নদীর পাশ ঘিরে জংলীদের আস্তানায়। যাওয়া হয়না ব্যবিলনের শুন্য উদ্যানে, যাওয়া হয়না গ্রীণল্যান্ডের বরফগলা নদীর ধারে যাওয়া হয়নি কখনো কালাপানি দ্বীপের জনালয়ে। অথবা নায়াগ্রার উৎসমুখে কিংবা নীলনদের সূত্রমুখে। তাতে কি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ষোলোকোটি মানুষের দেশ। এখানে হাটে ঘাটে মাঠে সর্বত্র কেবল মানুষ আর মানুষ। তাই মানুষ দেখতে, মানুষের জীবন ও তাদের কাঁদামাখা হাসি, ধুলিমাখা স্বপ্ন দেখে সে এক দেশদেখার অভিযানে পায়ে হেঁটেই বেরিয়ে পড়ি ২০১৬ সালের ১২ ফ্রেব্রুয়ারী।
সেদিন পদযাত্রা শুরু করি বেলা এগারোটায় বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট থেকে ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিকেল ৫টার মধ্যে তেঁতুলিয়া উপজেলা শহরে। বিকেলে মহানন্দা নদীর সূর্যাস্ত দেখলাম। মহানন্দাকে দেখলে মনে পড়ে যাবে রবীন্দ্রনাথের সেই ছোটনদী কবিতা।
পথ নয় যেন এক উদার উন্মুক্ত বাংলাদেশ আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পথের ধারে চা বাগান ভূট্টাক্ষেত, গরুর গাড়ি সরিষার ঘানি এসব দেখে দেখে পথচলার আনন্দ কষ্টকে ছাপিয়ে যায় সত্যি। পঞ্চগড় শহরে পৌছি তৃতীয় দিন। এখানে সুপারীগাছের খাট, আর নাপিতদের ফুটপাতে বসে চুলকাটার দৃশ্য। মনে গেঁথে আছে এখনো।
জাহাঙ্গীর আলম শোভনের লেখা বই দুটি দেখুন এখানে 
তারপর দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির তারপর সৈয়দপুর, রঙপুরের ভিন্নজগত, মিঠাপুকুর পাড়ি দিলাম বেগম রোকেয়ার বাড়ীর সামনে দিয়ে, পীরগঞ্জ ড. ওয়াজেদ মিয়ার বাড়ীর গেট মাড়ালাম একইদিনে, পরেরদিন গেলাম গোবিন্ধগঞ্জ।
বগুড়ার স্বাতন্ত্রটা খুব সহজের চোখে পড়ে।  হিউয়েন সাঙ এর বিবরণ থেকে আরো জানা যায়, অঙ্গের পর তিনি পুন্ড্রে এসেছিলেন। তিনি ক লা তু নামে এক বড় নদীর কথা উল্লেখ করেন। গবেষকরা মনে করেন এটি করতোয়া নদী। মূলত করতোয়া নদীকে ঘিরেই পুন্ড্রবর্ধন এর সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল।
 
বগুড়া থেকে সিরাগঞ্জে। এখানে স্বাধীনজীবন নামে একটি পরিবেশ বাদী সংগঠনের হয়ে একটি স্কুলে শিশুদের পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতার কথা বললাম।তারপর স্বপ্ন দুয়ার নামে একটি সামাজিক সংগঠনের অভ্যর্থনা পেলাম। উষ্ণ ভালোবাসা জানালো সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স। জেলা প্রশাসক মহোদ্বয় সময় দিলেন কিছুক্ষণ।
এখানখার শষ্যক্ষেত, জালের মতো বিস্তৃত নদী, পুরনো বিস্তৃত গাছ গাছালি, বিস্তৃত যমূনা সব কিছু মিলিয়ে যেন মানুষের মনকে একটা বিস্তৃতি দিয়ে গেলো।
ততদিনে পথে পথে মানুষের বিশেষকরে ড্রাইভারদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছি। গাড়ির চালকরা হাত নাড়িয়ে আসা যাওয়ার পথে অভিবাদন জানায়। রোদে পুড়ে তখন কালো হওয়ার আর বাকী নেই। সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইলমির্জাপুর থেকে আশুলিয়া,তারপর ঢাকা। আবদুল্লাপুরে আসার পর ফুল দিয়ে বরণ করলো গাজীপুরের শিশুর জন্য আমরা সংগঠনের তিন তরুন। পরের জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আমরা ফেনীবাসীর ব্যানারে আয়োজিত হলো গণসংবর্ধনার।
ঢাকা ছেড়ে নারায়নগঞ্জে আবার ঐহিত্যকে হাতছানিতে প্রাচীন বাংলা ও লোক ঐতিহ্য এর সাথে পরিচয়।  লোকশিল্প যাদুঘর পরিদর্শণ শেষে পরের দিন চান্দিনা। মানে ৮ মার্চ। ২০১৬। কৃষিভিত্তিক কুমিল্লার পরিচয়কে স্বার্থক করে দিলো আলু, টমেটা আর বাঙ্গিক্ষেত। মার্চ এর দশ তারিখ তখন কুমিল্লা ময়নামতি শালবহনবিহার দেখছিলাম।  শালবিন বিহার পরিচ্ছন্নতায়ও হাত লাগালাম।
পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বিহার, মুড়া দেখে রওনা  সুয়াগাজী, চৌদ্দগ্রাম হয়ে ফেনী আমি।  সেদিন রাতে আমার থাকার ব্যবস্থা ছিলো জেলাপ্রশাসকের মেহমান হিসেবে সার্কিট হাইসে। ফুলেল শুভেচ্ছা জানালেন ডিসি আমিনুল আহসান কামাল। সম্ভবত এখন খুলনায় আছেন।
ফেনী থেকে বারইয়ার হাট হয়ে সীতাকুন্ড। ইকোপার্কে দেখা ও ছবিতোলা হলো। তারপর ভাটিয়ারী হয়ে ভাটিয়ারী হয়ে চট্টগ্রাম।  বেশ কয়েকটা সামাজিক অনুষ্ঠান যোগ দিয়েছি। রাতে ছিলাম পুলিশ ভাইদের সাথে সিএমপির ব্যারাকে। পরেরদিন রোটারী ক্লাবের অনুষ্ঠানে দরিদ্র নারীদের চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দান করে দেই।  এর মধ্যে সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমীতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দেই। পরের দিন রক্তদান করি রেড ক্রিসেন্টে, সাথে ছিলো সিটিজি ব্লাড গ্রুপের কর্মীরা।
কর্ণফূলি ব্রিজ, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, পাঁচলাইশ পেরিয়ে ঠেকে গেলাম চুনুতি গিয়ে। ছোট একটি পাহোড়ের উপর বাংলোতে রাত কাটিয়ে বনের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারের পথ ধরি। একটি রাত কাটালাম কেরানীহাটে।
কক্সবাজারে অপ্রতাশিতভাবে ফুলেল শুভেচ্চা জানিয়ে বরণ করলো প্রেট্রোনাইজ হাউজিং নামে একটি কোম্পানী, কক্সবাজার ই শপ ও হোটেল উপল। আন্তরিক আতিথিয়েতা গ্রহণ করলাম কক্সবাজারের থ্রি স্টার হোটেল বেস্ট ওয়েস্টার্ণ হেরিটেজ এর।
কক্সবাজার থেকে ২৫ মার্চ সমুদ্রকুল ধরে রওনা দিলাম টেকনাফের পথে। একপাশে পাহাড় অন্যপাশে সমুদ্র এভাবে প্রায় আশি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলাম।  এরমাঝে একরাত গ্রামবাসীর সাথে কাটালাম।  টেকনাফে একদিন থেকে গন্যমান্য ব্যক্তি যেমন চেয়ারম্যান, টিএনও সবার সাথে দেখা করে। ২৮ মার্চ দুপুরের পর টেকনাফ শহর থেকে পথচলা শুরু করি শেষ ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ার জন্য।
তখন মনের ভেতর কি উত্তেজনা কাজ করছে সেটা বুঝিয়ে বলতে পারবনা। ৪৬ দিন ধরে পায়ে ব্যথা, ফোসকা অবর্ননীয় কষ্ট সব কিছু অবসান হতে চলেছে মাত্র কয়েক ঘন্টা পর। আমি কাংখিত সাফল্য ছুতে চলেছি।এরমধ্যে ঢাকা থেকে আমার ৩ বন্ধু এসে যোগ দিয়েছেন ছোটনভাই, শিপন ভাই এবং আশরাফভাই যোগ দিয়েছেন স্থানীয় বন্ধু সাংবাদিক জসিম স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তি ও বিজিবির সিনিয়র অফিসার।
শাহপরীর দ্বীপের গোলার চরের শেষ বিন্দুতে যেখানে আছড়ে পড়ছে নীল সাগরের ঢেউ সেখানে দেশ ও মানুষের প্রতি উৎসর্গ করে শেষ সীমানায় পত পত করে উড়িয়ে দিলাম লাল সবুজের নিশাণ। সে পতাকা পত পত করে উড়ছিলো আর জানান দিচ্ছিলো এই দেশ ও জাতির আগামী দিনের সম্ভাবনার কথা।
 কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। বিজয়ের এই আনন্দের সাথে পৃথিবীর কোন সুখেরই তুলনা হয়না। ধন্যবাদ জানালাম ট্যুর বিডির ইমরান ভাই, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, পাটার তৌফিক রহমানসহ সকলকে।
এই দীর্ঘ পথযাত্রায় মানুষ দেখেছি, মানুষের জীবন দেখেছি। এমন অনেক কিছু দেখেছি জেনেছি যা অন্যকোনোভাবে ভ্রমণ করলে সম্ভব হতো না। আমি প্রায় হাজার পঞ্চাশেক মানুষের সাথে মিশেছি, কথা বলেছি। তাদের ভাবনা জেনেছি। প্রান্তিক মানুষদের জীবন দেখেছি। মানুষ দেখার অমোঘ নেশায় আবারো বেরিয়ে পড়তে চাই আরো বেশী বড়ো বা লম্বা কোনো পথের সন্ধানে। ফিরে এসে আপনাদের আবার শোনাবে সে গল্প। মাটি ও মাটির মানুষের ঘ্রাণ আমাকে ঘুমের মধ্যে, কাজের মধ্যে, আনভোলা দুপুরে ঢেকে ঢেকে যায়? যেন বলে কোথায় আছ বঙ্গবালক তোমাকে যে ডাকছে বাংলার শিমুল বিছানো গাঁয়ের পথ, মহুয়াঝরা বুনো রাস্তা, আর সরল হাসি ঝরা নগর বন্দরের অলি গলি।
আর যদি পুরো গল্পটা শুনতে চান। তাহলে এ বিষয়ে লেখা আমার বইদেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশপড়ুন রকমারি ডট কম থেকে।

“মানুষই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে” – আহমাদ মোস্তফা কামালের পাঠ প্রতিক্রিয়ায় হাসান আজিজুল হক

হাসান আজিজুল হকের খুব ভিন্ন ধরনের একটি গল্প ‘সাক্ষাৎকার’। নানা সময়ে গল্পটি ফিরে ফিরে পড়ি আমি। যে ‘লোকটা গত শতাব্দীর কায়দামাফিক সূর্যাস্ত দেখছিল’ আর ‘তার চোখে ফুটে উঠেছিল তন্ময় কল্পনা’ তাকে ধরে নিয়ে যায় কতিপয় অচেনা লোক, তাকে ‘রহমান সাহেব’ সম্বোধনে শুরু হয় জেরা, যদিও তার নাম রহমান নয়, হুমায়ুন কাদির। তারা ঠিক কী জানতে চায় পুরো গল্পে তা পরিষ্কার হয় না, বোঝা যায় তারা তার কাছ থেকে একটি স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করছে, কিন্তু কিসের স্বীকারোক্তি তা-ও বোঝা যায় না, বরং তাদের মুখে শোনা যায়-
বুঝতে পারছি আপনি কিছুই স্বীকার করতে চান না। তাতে কিছুই এসে যায় না অবিশ্যি। কারণ আমরা সবই জানি কাজেই আর কিছু জানার নেই। কারণ আমরা কিছুই জানি না অতএব আর কিছুই জানার নেই।
বইটি দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন
এরকম পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা আর রহস্যময় আচার আচরণ পাঠককে বিমূঢ় করে তোলে। মনে হয়, যেন কোনো অ্যাবসার্ড নাটকের মহড়া চলছে (গল্পটি লেখাও হয়েছে অ্যাবসার্ড নাটকের ফর্মে)। পারম্পর্যহীন কথাবার্তার আরেকটি উদাহরণ দিই –
আমরা নিজেরা নিজেরা একতা আইন-শৃঙ্খলা, দাঁড়িয়ে বসে বা মাটিতে শুয়ে যদি তা কোনোদিন দেখিয়ে দিতে পারি একসঙ্গে একসঙ্গে যে যেখানে আছে ঠিকঠাক পরিকল্পনা ঘাসে ভিটামিন জনকল্যাণ বন্যা প্লাবন মহামারী বাঁধ দাও লবণ ঠেকাও যতোরকম চালবাজি রকবাজি ঠকবাজি নিলামবাজি জোতদারি মুনাফাখোরি খুন জখম রাহাজানি ভাবনাচিন্তা জাতীয় প্রেস দুই আর দুইয়ে চার আর সাতে ষোলো যার ফলে ছেষট্টি মোট নিশো তেত্রিশ কোটি দেশী বিদেশী চাল গম আটা সব মিলিয়ে সব।
হুমায়ুন কাদির এসব কথাবার্তা-জিজ্ঞাসাবাদ-আচার-আচরণ কোনোকিছুরই অর্থ উদ্ধার করতে পারে না, পারি না আমরাও। অবশেষে অজানা অপরাধে হুমায়ুন কাদিরের মৃত্যুদণ্ড হয়, এবং দণ্ড কার্যকর করার আগে তাকে দুমিনিট ভাববার সুযোগ দিলে সে ভাবে-
অনেককাল আগে একবার সবুজ ঘাসের মধ্যে শুইয়া আকাশের দিকে চাহিয়াছিলাম। উহার এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত দেখা গিয়াছিলো, উহা হালকা নীল ছিলো। পরে উহা চুম্বনের দাগের মতো মিলাইয়া যায়। ইহার পর মানুষের জগতে ফিরিয়া আসি – তাহাতে নোনা টক গন্ধ আছে এবং আক্রোশ ও ঘৃণা রহিয়াছে এবং ভালোবাসা ও মমতা রহিয়াছে। মানুষের জীবনে কোথায় অন্ধকার তাহার সন্ধান করিতে গিয়া আমি ঘন নীল একটি ট্যাবলেটের সন্ধান পাই – মানুষ যে সামাজিক, সে নিজের ইতিহাস জানিতে চাহিয়াছে, তাহাতে সর্বদাই অন্ধকার নর্তনকুর্দন করিতেছে। তবু আমি মানুষেরই কাছে প্রার্থনা জানাইব – কারণ মানুষেই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে – যদিও ওই দাগ দেখা যায় না। অসংখ্যবার সঙ্গম করিয়াও যেমন আমি নারীতে ঐ দাগ কখনো দেখি নাই। কোথাও কিছু পাই না বলিয়াই বাধ্য হইয়া আমি শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই প্রার্থনা ও আবেদন জানাইব। ইতিমধ্যে সব কিছু চমৎকার ঘটিয়াছে। অবশ্য অনেক কিছুই বাকিও রহিয়া গেল কারণ কিছুই শেষ হইবার নহে।
আমরা যে অ্যাবসার্ডিটির ভেতরে বাস করি, বিনা কারণে, অজানা অপরাধে আমাদের মৃত্যুদণ্ড হয়ে যায়, আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয় কিন্তু আমরা বুঝেই উঠতে পারি না যে, আমাদের কাছে আসলে কী জানতে চাওয়া হচ্ছে – তার একটি প্রতীকি উপস্থাপন রয়েছে এই গল্পে।
তবে সান্ত্বনা ওটুকুই – যা কিছুই ঘটুক না কেন, মৃত্যুমুহূর্তেও আমরা মানুষের কাছেই প্রার্থনা ও আবেদন জানাবো, কারণ মানুষই মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়! কারণ ‘মানুষই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে!’

এক নজরে আহমেদ মোস্তফা কামাল। যাবতীয় বৈষয়িক সাফল্যের সম্ভাবনাকে নাকচ করে যিনি কেবল লেখালেখিকেই জীবনের সব স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছেন তিনি। পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। লেখালেখির শুরু নব্বই দশকের গোড়া থেকেই। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দ্বিতীয় মানুষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। রকমারি ডট কম-এ দেখুন আহমাদ মোস্তফা কামালের রকমারি ডট কম- বেস্ট সেলার সকল বই।

শুদ্ধ রিভিউ – পাঠক সমালোচকের সততা!

আন্তর্জালের প্রসারিত ধারায় পাঠক কাগজ পড়ে কম। লেখাপড়ার এহেন সহজলভ্যতা ও উন্নয়নে সামগ্রিক অগ্রযাত্রা যেমন প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি মানসম্মত শিক্ষা ও চেতনায় সন্দেহ থেকে যায়। দিন শেষে কি দেখছি, কতটা শিখছি সেটা বিশাল এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আসে চোখের সামনে। বইমেলা হচ্ছে, বই বাড়ছে। পাঠকও বাড়ছে। আশার কথার সাথে সাথে কিছু হতাশা হল শেখার জন্য যে বই তা থেকে কতটা জানতে পারছি, শিখতে পারছি!
 পড়া আর জানার পরে যে বিষয় থাকে তা হল শিক্ষা। শিক্ষার ক্ষেত্রটা খুব বেশি পরিষ্কার হয় তখন যখন ক্ষেত্র নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হয়, ভুলগুলো নিয়ে সমালোচনা হয়। এতে লেখক ও পাঠক দুই পক্ষই শিক্ষা চেতনায় নিজেকে শানিত করতে পারে। সমৃদ্ধ হতে পারে। কিন্তু বর্তমান ভেসে বেড়ানো সমালোচনায় সেগুলোর দেখা মেলে যথাকিঞ্চিৎ। এহেন সমালোচনা কখনো নিন্দার আকার ধারণ করে সৃষ্টিকে অপমানিত করে। আবার অহেতুক প্রশংসাও শিক্ষাকে ছিটকে ফেলে, জানার পথকে সংকির্ণ করে। তাই সমালোচকদের হতে হয় স্পষ্ট ও দীপ্ত। কালে কালে বহু গুণী লেখকগণও সাহিত্য সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছেন। নির্মোহ সমালোচক হয়েছেন, দোষ গুন নিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর আলোচনা করেছেন।
 বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথের পাঁচালী‘ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা রিভিউ লিখেছিলেন। জীবনের শেষ বয়সে বিভূতিবাবু পত্রমারফৎ রবিঠাকুরকে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন তার বইটি নিয়ে কিছু লেখেন। অর্থাৎ সমালোচনা। পরে স্থূল সমালোচনার সাথে চমৎকার প্রশংসাসহ পরিচয় পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো সেই রিভিউ।
 পথের পাঁচালী’র আখ্যানটি অত্যান্ত দেশি। কিন্তু কাছের জিনিসেরও অনেক পরিচয় বাকী থাকে। যেখানে আজন্মকাল আছি, সেখানেও সব মানুষ সব জায়গায় প্রবেশ ঘটেনা। ‘পথের পাঁচালী‘ যে বাংলা পাড়া-গায়ের কথা সেও অজানা রাস্তায় নতুন করে দেখতে হয়। লেখার গুণ এই-যে নতুন জিনিস ঝাঁপসা হয়নি। মনে-হয় খুব খাঁটি ও উচুদরের কথায় মন ভোলানোর জন্যে সস্তা দরের রাঙতার সাঁচ পরাবার চেষ্টা নেই। বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্যের জোরে। এই বইখানাতে পেয়েছি যথার্থ গল্পের স্বাদ। এর থেকে শিক্ষা হয়নি কিছুই, দেখা হয়েছে অনেক যা পুর্বে এমন করে দেখিনি। এইগল্পে গাছ-পালা, পথ-ঘাট, মেয়ে-পুরুষ, সুখ-দুঃখ সমস্তকে আমাদের আধুনিক অভিজ্ঞতার প্রাত্যহিক পরিবেষ্টনের থেকে দূরে প্রক্ষিপ্ত করে দেখানো হয়েছে। সাহিত্যে একটা নতুন জিনিস পাওয়া গেল, অথচ পুরাতন পরিচিত জিনিসের মত সে সুস্পষ্ট।
 বুঝতে পারা যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বই পাঠাবার পরেও তার অসাধারণ সৃষ্টি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি স্থূল সমালোচনা করেছেন।
 সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন ধারাবাহিকভাবে ‘পালামৌ লিখছিলেন হঠাৎ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওনাকে চিঠি লিখে বসলেন। চিঠিটি খুব গভীরভাবে নেড়ে চেড়ে দেখলেন, হ্যাঁ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের চিঠি! পড়ার পরে সঞ্জীবচন্দ্র দুটো বিষয় ভেবেছিলেন, এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার লেখা পড়েন। এবং শুধু আনন্দ নিতে পড়েন না বরং তিনি তার বিস্তীর্ণ লেখালেখির ফাঁকে ‘পালামৌ’ পড়ার সময়ও বিশ্লেষণ করেই পড়েছেন এবং পরে লেখাটির সমালোচনা করেছেন। সঞ্জীবচন্দ্র তারপরে আর লেখাটি থামাননি। রবীন্দ্রনাথ পরে আবারও চিঠি দিয়েছেন, সঞ্জীব তাও শোনেননি। এরপরে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেও চিঠি দিয়েছিলেন ভাই সঞ্জীবের পালামৌ সম্পর্কে। তাতেও কাজ হয়নি, অগত্যা কী আর করার। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ‘পালামৌ’ উপন্যাসের প্রতি পর্বের একটা একটা সমালোচনা বা রিভিউ ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় প্রকাশ করতে শুরু করেন। তবে কোথাও তিনি ব্যক্তি সঞ্জীবচন্দ্রের সমালোচনা করেননি বরং প্রশংসা করেছিলেন।
 সঞ্জীবচন্দ্রকে তখনো খুব বেশি পাঠক চিনত না। কিন্তু সেই সমালোচনার পরে তার ঈর্ষনীয় লেখনশৈলী নিয়ে মন্তব্য করেছেন ওই সময়কার বাংলা সাহিত্যের দিকপালগণ।
 তখনো পুরোদস্তুর লেখক হয়ে ওঠেননি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তবে তার কবিতায় ধার ছিল, সাহিত্য পাড়ায় তার যে কিঞ্চিৎ পদচারনা শুরু হয়েছে তা বেশ প্রশংসিত ছিল। আনন্দ পত্রিকার মালিকের ছেলে ডেকে বললেন, সাহিত্য সমালোচনা করতে। কঠিন বিষয়, তবে সুনীল রাজি হয়েছিলেন কারণ তখনো তার নামডাক শুরু হয়নি। শুরু করলেন প্রতিষ্ঠিতি লেখকদের সাহিত্য সমালোচনা, কারও গল্পতো কারও কবিতার। দেখা গেল আনন্দতে লেখেন এমন এক লেখকের গল্পের পরের সপ্তাহেই সুনীলের সমালোচনা ছেপেছে আনন্দ পত্রিকা। প্রতিষ্ঠিত ওই লেখক পরে হুমকি দিলেন আনন্দ পত্রিকায় তিনি আর লিখবেনইনা। কোথাকার এক পুঁচকে ছেলে তার লেখার ভুল ধরছে। সুনীল মনে মনে হাসেন। কারণ তিনি বুঝতে পারেন নিজের লেখা ধার হচ্ছে, ওই লেখক তার সমালোচনার উত্তর দেয়নি, বরং রাগ হয়েছে! অর্থাৎ তিনি তার ভুল বুঝতে পেরেছেন।
 আবার একজন লেখক সুনীলের বন্ধু মহলে বলেছেন, ঐ বাঙালের হাত পচে যাবে। কুষ্ঠ রোগ হবে। সুনীল তখনও খেয়াল করলেন তার সমালোচনার যৌক্তিক উত্তর নেই। এসময়য়ে তিনি একটা খিদে অনুভব করলেন, নিজেকে শাণ দেবার খিদে। নিজের লেখার অনাহূত কোন ভুল না আসে; লোকে তার লেখালেখি নিয়ে সমালোচনার সুযোগ না পায়। সুনীলের লেখা যে তার পরেও সমালোচিত হয়নি তা নয়, হয়েছে। কিন্তু নিজে যেভাবে ক্ষুরধার সমালোচনা করেছেন তেমন সুযোগ ছিল না। পেশাদার লেখক হবার পরে নিজেকে ছাড়িয়েছেন বারে বারে।
 একজন লেখক যখন লেখেন তখন নিজের সেরা দিয়ে লেখার চেষ্টা করেন। ঠিক ওই মুহূর্তে সেটা তার নিজের কাছে সেরা লেখা বলে বিবেচিত হয়। বলা চলে, অনেকটা নিশ্চিত হয়েই তিনি ছাপার জন্য প্রেসে পাঠান। লেখালেখি শুরু করাটা সাহসের ব্যাপার, ধৈর্য ও একটা বিষয় আছে। যিনি সত্যিকারের লেখক তাকে অনেক পড়তে হয়। যত বেশি পড়েন লেখায় তত বেশি ধার হয়। অনেকে হয়ত তরতর করে লিখে যেতে পারেন, অনেকে আবার বছরের পরে বছর ধরে একটা উপন্যাস শেষ করেন। এরপরে প্রকাশিত লেখা নিয়ে কাটাছেড়া হয়। এটা অবশ্য অন্যায় কিছুনা, পাঠক আপন মনে প্রিয় লেখকের লেখা নিয়ে মতামত জানাবেন সেটাই স্বাভাবিক। বরং অস্বাভাবিক হল মতামত না জানানো! মতামতের পন্থা আলাদা হতে পারে, এই ধরুন অনেকে বিষদ রিভিউ লেখেন আবার অনেকে প্রিয় বন্ধুর কানে কানে বলেন, ‘দোস্ত, অমুক লেখকের লেখা পড়ছ! জোস লেখেন…’ দিন শেষে কানে কানে ভেসে ভাল লেখাগুলো আলো ছড়ায়, আর যেগুলো আসলে লেখা হয়ে ওঠেনি সেগুলো ডুবে যায়।
 বিষদ রিভিউ বা সাহিত্য সমালোচনা করতে হলে যে আপনাকে দারুণ লেখার ক্ষমতা থাকতে হবে অথবা সাহিত্যিক হতে হবে তা নয়! বরং বই আলোচনার জন্যেও কিছু নিয়ম রয়েছে, মোটামুটি সেগুলো রপ্ত করলেই চলে। যেমন যেমন ধরুন কুইন্টাস হোরেসিয়াস ফ্ল্যাককাস। প্রায় একুশ’শ বছর আগে জন্ম নেওয়া হোরেস ছিলেন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমালোচনায় তিনি ছিলেন তৎকালীন সাহিত্যের প্রাণ পুরুষ। তিনি বলেছেন,
সমালোচককে হতে হবে নিরপেক্ষ ও সৎ। সমালোচক অবশ্যই সত্য ও মিথ্যের প্রভেদ লেখককে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হবেন। অহেতুক নিন্দা ও স্তুতি শিষ্ট সমালোচনা গ্রহনীয় নয়। লেখককে সত্য সন্ধানে সহায়তা করতে পারেন, এমন পণ্ডিত ও নিষ্ঠাবান সমালোচকই হোরেসের প্রত্যাশা।
 এখানে খেয়াল করলে বোঝা যায়, সমালোচক শুধু পাঠকের জন্য নয় বরং তিনি লেখকের জন্য বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। তার লেখার মাঝে লেখকের দুর্বলতাগুলো যেন লেখকের উদ্দেশ্যে হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।
 হোরেস নিজেকে সমালোচকের ভূমিকায় উপস্থাপন করে বলেছেন,- ‘আমি শান পাথরের ভূমিকা পালন করবো। যা নিজে কাটতে পারেনা, কিন্তু অস্ত্রকে ধারালো করতে পারে ঠিকই। যদিও আমি নিজে কিছু লিখি না।
হোরেসের মতে সমালোচক শান পাথরের মত। পাথর যেমন নিজে কাটতে পারেনা কিন্তু কাটার অস্ত্রকে ধারালো করতে পারে; তেমনি সমালোচক কবিকে সার্থকতা অর্জনে সহায়তা করবেন, কবির কবিত্বকে শানিত করবেন। সমালোচক কবির কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেবে, উপকরণের উৎস বলে দেবে, কবির কবিত্ব শক্তিকে সমৃদ্ধ করার উপায় বলে দেবে। কবির কোন কাজটি প্রথম করনীয় তা বলে দেবে। কোন পথে চললে কবি সঠিক লক্ষ্যে পৌছতে পারবেন, ইত্যাদি।
 উপরক্ত সব আলোচনা থেকে একজন সমালোচক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, সততা ও নিষ্ঠার সাথে ছড়িয়ে দিতেও পারেন। সমালোচকের মৌলিক চোখে লেখার যে দুর্বলতা বইয়ের মূল বার্তাকে নষ্ট করে না তার অনর্থক আলোচনা নতুন পাঠককে বই থেকে ছিটকে ফেলতে পারে। খেয়াল রাখা দরকার, দুর্বলতা থাকার পরেও লেখকের উদ্দেশ্যকে প্রকাশে কিঞ্চিৎ অনিহা সমালোচকের সততা নিয়ে যেন প্রশ্ন না তোলে। আবার মূল প্রাত্যহিক অর্থও বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ নষ্ট করতে পারে, সুতারং সমালোচক যেন সততা ও সাবধানতার পরীক্ষণপূর্বক মন্তব্য প্রকাশ করেন।

‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’- জীবনকে কেন্দ্রে রেখে কদম কদম হেঁটে অগণিত গল্পের ইশারায় রচিতঃ ইফতেখার মাহমুদ

লম্বা জীবনকেও একদিন একদিন করেই যাপন করতে হয়। ঘর বারান্দা উঠোনের মধ্যে কাটিয়ে দেয়া জীবন একই সাথে গ্রহ,মহাবিশ্ব এসবের মধ্যেও থাকে। মানিকগঞ্জের জহিরুল হক-জাহেদা বেগম তাদের পাঁচ সন্তানকে নিয়ে রোজকার যে ছিমছাম জীবন কাটাচ্ছিলেন—বিরাশি সালের মার্চে দেশজুড়ে সামরিক শাসন চেপে বসল বলে, তাদের সেই জীবন ভিন্ন পথ ধরল, যেমন পথ বদলালো বাংলাদেশও। একই কেন্দ্র থেকে অসংখ্য বৃত্ত যেভাবে নির্মিত হতে পারে, একইভাবে এক জীবনকে কেন্দ্রে রেখে কদম কদম হেঁটে অগণিত গল্পের ইশারা রচিত হয়, তাই লেখা রইল আহমাদ মোস্তফা কামালের নিরুদ্দেশ যাত্রা’ উপন্যাসে।
এই গল্প বাংলাদেশের। একটি পরিবারের স্নেহ, মায়া, ভালোবাসা আর স্বপ্নের। জন্মভূমি ছেড়ে এসে ‘নিজদেশ’-‘ভিনদেশ’ এইসব রাজনৈতিক বোঝাপড়া মনোজগতে মোকবেলার। এই গল্প প্রকৃতির নিবিড়ে অবগাহনের। প্রেমের। সেনাপতির রাজা হওয়ার গল্পও এ। পোকায় কাটতে শুরু করা দেশটিকে সুরক্ষার প্রচেষ্টার। দেশের জন্য খুইয়ে দেয়া জীবনের অনুচ্চারিত বহু প্রশ্নের উত্তরের। নিরর্থকতার দোলাচল মোকাবেলার। বন্ধুদের গল্পও এটা বটে। বন্ধুতার গল্প। শিউরে ওঠা ত্যাগের, নিবেদনের অবিচলতার, সঁপে দেয়ার সত্যের। জনম জনমের ভালোবাসার। জন্মমৃত্যুর বহতার। গমনের গল্প এটি, নিরুদ্দেশে।
২.
দীর্ঘসময় ধরে সাথে থাকার কারণেই বোধহয়, যেকোনো দীর্ঘলেখা পাঠ শেষে যে ছেদ ঘটে, তাহার শূন্যতা সামলানো মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ যখন শুরু হয়, সজীব দশম শ্রেণির। ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর (তিনশ সাতষট্টি পৃষ্ঠা, লিপইয়ারের চেয়েও একদিন বেশি)ওর জীবনের সাথে কাটিয়ে, নিজের জীবনে যে সংযুক্তি ঘটে, তার এক দুঃসহ ভার আছে, মন মাথা মগ্নতা থেকে বেরুতে সময় নেয়।
আহমাদ মোস্তফা কামালের ছবি আঁকাটা, আঁকা ছবি বলে ধরা যাচ্ছে না শেষে এসে। প্রাণ বসানো এই লেখায় যেন তিনি কিছু প্রমাণ করতে চাচ্ছেন না। যেন এতদিন পর কাউকে করে দেখানোর কিছু নেই। মুন্সিয়ানার সতর্কতা অনুপস্থিত। আগলখোলা কবিততাড়িত ভাষায় বলে যাচ্ছেন সেই গল্পটি যার জন্য দীর্ঘদিবস দীর্ঘরজনী তিনি অপেক্ষা করেছেন। জীবন বলেছেন, জীবনী অগ্রাহ্য করে।
আমরা যখন একটা ঘরে বসে কোনোদিকে তাকাই, ধরা যাক, সামনের সোফাটার দিকে চোখ রাখি যখন, তখনো পেছনের জানালাটার কথা ভুলে যাই না। সোফার ওপরে পড়ে থাকা খয়েরিরঙা বেল্ট আর পাশের আড়ংয়ের ব্যাগ দেখে যা বুঝি, যা মনে আসে, তার সাথে এও মনে থাকে আজ পনেরোই ফেব্রুয়ারি ছোট—বোনটার জন্মদিন, ওকে শুভেচ্ছা জানানোর কথা যেন না ভুলে যাই। এই যে সামান্য বসে থাকার মুহূর্তটিতে অসামান্য অনেক কিছু থাকে, বেছে দুতিনটাকে আমরা সামনে আনতে পারি, কোনোটাকেই ভুলে গিয়ে অসত্য করে দিতে চাই না যেমন, কামাল-ও তার এই লেখায় তাই করেছেন। বেছে লিখেছেন, কিন্তু একই সময়ের অনেককিছুকে ঠাঁই দিয়েছেন, কয়েকদিক থেকে দেখে নিয়ে তবেই লিখেছেন। রশোমনের চোখ তাকে সময়কে দেখিয়েছে নিবিড় করে। পড়তে পড়তে তাইই মনে হয়।
৩.
সজীব, তার বড়ভাই হাসিব, ভাবি রুনু, আরেক ভাই-ভাবি রাজীব-শান্তা, আপা তৃণা, পিঠাপিঠির বোন স্বর্ণা—এদের মা জাহেদা বেগম, বাবা জহিরুল হক, যিনি তার বাবার পীড়াপীড়িতে ভারত ছেড়ে পাকিস্থানে আসা ঠিকানাহীন জীবনবিভোর মানুষ—এদের গল্পে লেখক পাঠককে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যেমন, তেমনি একই সময়ে ধীরে ধীরে পরিচয় ঘটে, সম্রাটের বেশপরা সিপাহশালারের সাথে। গোলযোগ যোগ করে ঝংকার। কামালের গল্পগদ্যের যে প্রবন্ধ-দোষ, সত্যের মতো তা-ই তার কণ্ঠস্বর, তাই তার বিশেষ। সামরিক কূট পদক্ষেপ আর স্বাভাবিক বিকাশের বিপর্যয় যে জীবনের সামনে দাঁড় করায় আমাদের, সংগ্রামে লড়াইয়ে মাঝে মাঝে তার তাত্ত্বিক বোঝাপড়া জরুরী বলেই বোধ হয়। কামালের গদ্যশৈলী তাই এই উপন্যাসের সাথে একাকার হয়ে মিশে যেতে পারে। আটকায় না কোথাও।
উপন্যাসটির প্রথম পর্যায়ের জীবনে কোথাও কোনো কলহ নেই। দুঃসহ যাতনা নেই। অসুবিধাগুলো যেন গেরো পাকায় না। আপনিই খুলে যায় জটিল জট। কেউই অপরের হাতে পায়ে গায়ে কদর্য কাদা ছুঁড়ে দেয় না। এই পর্যায় পার করে কাহিনিক্রম প্রবেশ করে তছনছের এক প্রবল জীবনে। গল্প এগিয়ে যায় অন্য আবেশে। কিছুই সেখানে মনের মতো নয়। জীবন ভাঙতে থাকে। স্মৃতি ধুয়ে ধুয়ে নোংরা জল। মৃত্যু, হত্যা, দুর্ঘটনা, দাম্পত্যের হীনতা জেঁকে বসে কাহিনিতে। সংঘাত পাঠককে আঘাত দেয়। খোসা খসে পড়ে। জিহ্বার ভেতরের দিকে ছোটমাছের বিঁধে যাওয়া কাঁটা বহনের মতো, আরামের জীবন বয়ে চলে চির-অস্বস্তির যাতনা, স্থির হয় না আর তা।
নৌকা এগিয়ে চলেই, যে মৃদু ঢেউগুলো আসে তারা তাকে আটকাতে না পারলেও দোলা দিয়ে যায়। উপস্থিতি জানান দেয়া এইসব ঢেউ নদীবুকে ভাসতে থাকা নৌকাজীবনকে নিথর-অনড় থাকতে দেয় না। এই উপন্যাসে কিছুদূর পরপরই দোলা দেয়ার দোহাই জুটে যায়। ঢেউয়ের মতো করে চিন্তা আসে। উপন্যাসটিতে অনর্গল ঘটনা ঘটে চলে না। চলতে চলতেও ভাবা আছে। জীবনের মধ্যে চিন্তার অবসর আছে। রাজনৈতিক ঘটনার একটা বড় অংশ রাজীবের মনোদেশে উঁকি দেয়া ভাবনা আর দ্বন্দ্বের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণত গল্পের মানুষেরা একটার পর একটা ঘটনা দুর্ঘটনা পার করে, কখনো গল্পের দরকারে ভাবে, গল্পের দরকারেই তারা উদাস হয়। অদরকারের জীবনটা লেখা হয় কমই। যা ঠিক মূল গল্পের সাথের নয়, অথচ জীবনের অংশ, (কী নয় জীবনের অংশ?),—বড় আর দীর্ঘ লেখায় সেসবকে জায়গা দেয়ার ফুরসত আছে। এই উপন্যাসে সেরকম অতলে নেমে পড়ার, ভাবনা-গহনে স্থাণু হওয়ার সুচিন্তিত আয়োজন আছে। এগুতে এগুতে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে হয়।
৪.
এরশাদকে চেনার জন্য এই বই চিরদিনের পাঠতালিকায় যুক্ত হয়ে গেল। সামরিক সরকারের হঠকারিতা, ছদ্মকল্যাণাকাঙ্ক্ষা, স্তাবকতোষণ, ঋজুতাকে কূটকৌশলে নমনীয় পদলেহনে রূপান্তর—সব, ছোট করে হলেও এসেছে গল্পে গল্পে। এদেশের দুর্নীতিবৃক্ষের চারাগাছগুলো যে তারই রোপণ করা এই সত্য নিপুণে, শৈলীতে আঁকা রইল পাতায় পাতায়। হাসিনা-খালেদা’র তিরাশি, চুরাশি, পঁচাশি, ছিয়াশি, সাতাশি, আটাশি, নব্বই—পুনর্বার ফিরে দেখা হলো। অতীতের হাতেই ভবিষ্যতের মানচিত্র—কথাটা মিথ্যে নয়।
কতভাবে যে এল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল সেসব দিনের কথা, ডাকসু নির্বাচন, ক্যাডার রাজনীতি, সংসদ নির্বাচন, হ্যাঁ-না ভোট, সপ্তম সংশোধনী, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফ্রিডম পার্টি দিয়ে বেতারে টিভিতে ফিরে আসা, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ—আরো অনেক কথা—এতো কিছুকে মাধুর্যে সৌকর্যে বহন করল এই লেখা। বিভোর হবেন যত্নশীল পাঠকমাত্রই। অনেক ছোট কথাও হেলা ফেলা করে ফেলে দেয়ায় নয়। এই যে সামরিক সরকার সোডিয়াম লাইট লাগালো, হলুদ সোডিয়াম পরিষ্কারকে করে দিল ঘোলা, সামরিক সরকার বারবার স্পষ্টতাকে ঝাপসা করে আড়ালে নিয়ে যেতে চায়, তাই জানলাম রূপকে।
৫.
‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ একসময় রূপ নেয় বন্ধুদের গল্পে। তুমুল বন্ধুত্বে বুঁদ হয়ে থাকা সজীব, অমিত, অপু মামুনদের বন্ধু-ছাড়া জীবনের গল্প হয়ে ওঠে একফাঁকে। নিজেদের কাছে প্রত্যাবর্তনও আছে। প্রত্যেকের জীবনকে জায়গা দিয়েছেন লেখক। পরিবারগুলোকে চিনতে দিয়েছেন পাঠককে। তাদের প্রেম পরিসর পেয়েছে লেখায়। শারীরিক সংলগ্নতায় লেখকের এক অনাড়ষ্ট মন আমাদের চোখে পড়ে। গল্পে সেসবের অকুণ্ঠিত উপস্থিতি নারী পুরুষসম্পর্ককে উদার মর্যাদা দেয় বৈকি। দুয়েকজায়গায় অবশ্য অতিরিক্তও ঠেকে শরীরীজীবন।
বন্ধুদের ত্যাগ এবং বিচ্ছেদ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই উপন্যাসের। মারাত্মক এবং মানবিক সে উপাখ্যানাংশ।
মৃত্যুদৃশ্যকে এত সহজিয়া বিভোর ঢঙে আঁকা কমই দেখেছে বাংলাভাষার পাঠক। নির্মোহ শান্তির মৃত্যু, গভীর ভালোবাসায় জীবন-বিদায়কে এই যে লিখে রাখা, অন্তত দুটো মৃত্যু দৃশ্য আছে, পাতা উল্টে বের করে ফের পড়ে নিতে ইচ্ছে করবে সংবেদনশীল পাঠকের। তবু ফুরাবে না। ফের ফিরতে হবে।
৬.
উপন্যাসের ভাষা, বাক্যগড়ন, বর্ণনা, কোথাও পীড়ন নেই। কবিতাকে প্রাণে বসতে দিলে গদ্যে যে ছন্দ উপ্ত হয়ে যায়, তার প্রতিফলন লেখায় চোখে পড়বে। বাক্যের পুনরাবৃত্তি আছে বেশ কয়েকজায়গায়। অন্তত বারো পনেরো জায়গায়। লেখার কালে চিন্তার ছেদ থাকার ফলেই হয়তো এটা হয়েছে। বিরতি দিয়ে লেখার ফলেও এটা হয়ে থাকতে পারে। যে নাম একবার বলা হয়েছে, তাকে আবার পরিচয় করিয়ে দেয়ার মতো, কিংবা বলা কথা আবার সরুস্বরে পুনর্বার বলা—এরকম ঘটেছে কয়েকক্ষেত্রে।
কিছু বিশেষণ বোধহয় লেখকের প্রিয়তার জন্যেই প্রশ্রয় পেয়েছে বেশি। ভারি সুন্দর, ভারি অবাক, ভারি ভালো লাগত, ভারি চঞ্চলমতি মেয়ে। ‘অন্য’ শব্দটিও পক্ষপাতিত্বের মনে হচ্ছে। অন্যকোথাও অন্য কোনোখানে, এরা অন্যরকম মানুষ, জীবনের অন্য সব আয়োজন। জোড়াশব্দের ব্যবহারেও চোখে পড়ার মতো আধিক্য আছে। ‘নিঃসঙ্গতা এবং নির্জনতা’ বা ‘স্বস্তি ও আনন্দ’ —এরকম সব শব্দ পাশাপাশি থাকছে অনেক জায়গায়।
‘দৌড়ের ওপর’ থাকা বলে এক অভিব্যক্তি আছে। আশির দশকের শেষে এই বাক্যবন্ধ চালু ছিল কি না, নাকি এই শব্দগুচ্ছ আসলে এই কালের, সে প্রশ্ন জাগে মনে। বইয়ের মাঝখানে আরেক জায়গায় পড়লাম, ‘আড্ডাবাজি’, এটাও সাম্প্রতিকের শব্দ বোধহয়। পড়ার সময় সময়ের সাথে বেমানান লাগে। অবশ্য গল্পের শেষে আরও তিন-চার জায়গায় ‘আড্ডা’ শব্দটিই লেখা হয়েছে, আড্ডাবাজি লেখার দরকার হয়নি।
দুতিন স্থানে বানান নিয়ে খটকা লাগে। উনার (ওনার না হয়ে), উনাদের (ওনাদের না হয়ে)—বানানগুলো কি প্রথমার নিজস্ব নির্বাচন? অবশ্য প্রথমারও বানান ফসকে যাচ্ছে ইদানীং। বইয়ের শুরুতে নাম, ঠিকানা,পরিচয়ের ঘরে লেখা আছে, A Nobel (Novel নয়) in Bangla by Ahmad Mostafa Kamal, প্রথমার কাছে সামান্য সচেতনতা আশা করা অতিরিক্ত দাবী নয় বোধকরি।
শব্দ নিয়ে আরেকটা কথা তোলা দরকার। দ্বিত্ব শব্দের ব্যবহার মৌখিক রীতিকে লেখায় প্রাণবন্ত করে তোলে এ নিয়ে দ্বিধা নেই কোনো। কামাল তার এই লেখায় এই কাজটি করছেন কয়েকজায়গায়। এই যেমন, ‘রাজনীতি-ফাজনীতি’ বা ‘বলে-টলে’ এইসব শব্দযুগলকে জায়গা দিয়েছেন। গতি জুটেছে গদ্যের তাতে।
কামাল খুব সংবেদনশীল, নিঃসন্দেহে। ধর্ষণদৃশ্যে ধর্ষণ কথাটা কোথাও লেখেননি তিনি। পরেও উচ্চারণ করেননি। লিখেছেন, মেয়েটিকে ‘ক্ষতবিক্ষত’ করল তারা। ধর্ষণ না লিখে, নতুন শব্দে দৃশ্যটি নির্মাণ করেছেন তিনি। যে লেখক চালু শব্দের বিপরীতে দাঁড়ান তিনি ভাষায় তুচ্ছ নন।
৭.
কোথাও কোথাও গল্পকে দ্রুত টানতে দেখা যায়। ধীরে বলার ভঙ্গিটি ব্যহত হয়। শেষের আগে আগে যেন গল্পটিকে জোর করে টেনে বর্তমানে আনা হলো। মাঝখানে আরো কতগুলো অধ্যায় যেন নেই। দশবারোটা অধ্যায় বা আরো শ খানেক পাতা জরুরী ছিল মনে হয়।
মাঝে মাঝে গল্পের কথক সীমা অতিক্রম করে বেশি ভেতরে ঢুকে পড়েছেন, এ কথা বললে কি সীমা অতিক্রম করা হবে? তার বেমানান কণ্ঠস্বরে লয় কেটে গেছে কোথাও কোথাও। সংবাদপত্রের কণ্ঠ যেন উপন্যাসে হাজির হয়ে পড়েছে। ‘প্রাইভেট সেক্টর ফুলে ফেঁপে উঠেছে’- এইভাবে চরিত্রটি ভাবছে না, যেন লেখক ২০১৭ সালে এসে বুঝে গিয়েছেন, তাই পেছনে গিয়েও এই ঢঙ্গে কথা বলছেন। বেঢপ লাগে।
কোথাও কোথাও, সামান্য যদিও, কিছু বিষয়ে খটকা লাগে।
সজীব ছোটসন্তান, তার ডাকনাম খোকা, তার মা তার বাবাকে ‘খোকার বাবা’ বলে সম্বোধন করছেন। বড়ছেলে হাসিব, মেয়ে তৃণা বা রাজীব, স্বর্ণা—এরা খোকার আগে জন্মেছে, খোকার জন্মের আগে কি জাহেদা বেগম তার স্বামীকে কোনো নামে ডাকতেন না? খোকার বাবা না হয়ে জহিরুল হকের তো হাসিবের বাবা হওয়ার কথা।
পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা আটাশে ফেব্রুয়ারি লেখা আছে, এটা কি চোদ্দই ফেব্রুয়ারির ঘটনা নয়?
তারপর, জেলা পার করে, উপজেলায় উপজেলায় সামাজিক জীবনে এরশাদকে যেভাবে বরণ করে নেয়ার দৃশ্য রচিত হয়েছে, সামরিক সরকার যে দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে প্রিয় হয়ই, সেটার ব্যাপারে আলোকপাত নেই, বিশ্লেষণ থাকলে মজবুত হত। এরশাদকে যে নয় বছর মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, সমর্থন জোটাতেও যে সে পেরেছিল, সেদিকেও ইংগিত নেই। CMLA যে, শুধু চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর নয়, বরং এরশাদকে বিদ্রূপে(CMLA –এর আরেক ইলাস্ট্রেশন) ক্যান্সেল মাই লাস্ট এনাউন্সমেন্টের প্রবক্তা হিসেবে দেখা হতো, যার মধ্যে তার সামরিক সরকারের কঠোরতার বদলে আপসের ইংগিত রয়েছে, যে জায়গায় কৌশলে তিনি অন্যদের চেয়ে অগ্রবর্তী ছিলেন, তার টিকে থাকার ইতিহাস তার গৃহীত নীতির মধ্যেই আছে, এসবও উপন্যাসে বিশ্লেষিত হতে পারত হয়তো।
৮.
বড় যাত্রা ছোট ছোট পদক্ষেপের যোগফলমাত্র। দীর্ঘ আখ্যানকেও মানবজীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম চিরগুলোকে গ্রাহ্য করতে হয়। আতশ কাচের কদর আছে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রকে দেখে ফেলতে পারে বলেই।
নিরুদ্দেশ যাত্রা উপন্যাসটায় বহু কিছুকে, ছোট ছোট বহু ঘটনাকে, মনোযোগ দিয়ে, যত্ন করে গাঁথা হয়েছে। কল্পনার গভীরে নামতে দেয়া আছে। মিথকে জায়গা ছাড়া হয়েছে। সব প্রচলিতকে হটিয়ে দেয়া হয়নি। লেখাটির অদ্ভুত শক্তি হলো লেখার ভেতরের জীবনকে বিশ্বাস করা যায়। প্রকৃতির পাশে গভীরভাবে দাঁড়ানো আছে, ইতিহাসকে গ্রাহ্য করেছেন, ঠাট্টা হাসিকে-ও ফুরসত পেতে দেখি। বিষণ্ণতার প্রেম যেমন আছে, তুমুল প্রেমিক-মাতালকেও জায়গা দেয়ার কথা ভুলে যাননি লেখক। চরিত্রগুলোকে নিয়ে ভাবতে বসলে খেই হারিয়ে যায়। কত দিকেই না ছড়িয়েছে গল্প। বিপুলবিস্তারি এই যাত্রার সাথী হইলাম—আনন্দ হয় ভেবে।
হাজারো অভিজ্ঞতার ভ্রমণ ছিল যেন। আর স্মৃতির কাছে সমর্পণের শপথ করিয়ে নিতেও তার আপত্তি আছে দেখে নতুনত্বের স্বাদ মেলে। ‘স্মৃতি বা স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে পারাটাও মানুষের জন্য খুব প্রয়োজনীয় ব্যাপার। সবাই যদি অনন্তকাল ধরে এসব ধরে রাখতে চাইত, তাহলে সারা পৃথিবীই হয়ে উঠত সমাধিক্ষেত্র। মানুষ সমাধির ওপর জীবনের সৌধ গড়ে তুলতে জানে বলেই চলমান থাকে।’
বইয়ের ভেতরে ভেতরে অসংখ্য দার্শনিক জিজ্ঞাসায় মতামত দিয়েছেন লেখক, গল্প বলার ছলে। সেসবের গুরুত্বও কম নয়। বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ—এমন কথা বলতে ইচ্ছে করছে, পাছে না রত্ন সনাক্ত করার কারণে জহুরীর নামদাবী রত্নকে ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে, সংবরণ করছি নিজেকে।
রোজকার আয়নায় নিজের দিকে তাকালেও, চোখে পড়ে না কতটা পথ পার করে এসেছে এই মুখমণ্ডল। অথচ পুরনো ছবির এ্যালবাম ঠিকই মনে করিয়ে দেয় পার হয়ে আসা পথ কম নয়। ভুলে যাওয়া ছবির মতো, বাংলাদেশের কয়েকজন মানুষের জীবনকে সময়ের জাদুঘরে এনে রাখা গেল এই বইয়ে। পাতা উল্টে বারবার দেখে নেয়া যাবে বাংলাদেশের জীবন।
শেষে শুধু এইটুকু বলে যেতে চাই, মানুষকে স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে দিলে পাণ্ডুলিপির তরে তার কোনো আপস থাকে না।
সত্য তো এই, লিখিত হওয়ার জন্য মানুষ জীবন যাপন করে না।
সব জীবনের ভেতরেই যে নিরুদ্দেশ যাত্রা আছে, নিজের সাথে চলতে চলতে তাকে খুঁজে পাওয়া, তাহার দিকে নিজেকে টেনে নেয়াই এই লেখার না-লেখা মন্ত্রতুল্য কথাখানি।
অশেষ কষ্ট-স্বীকার করা নিবেদিত গদ্য লেখকের কঠোর শিল্পী-জীবন আমাদেরকে ক্রমশ ঋণী করে দেয়। সবকিছুর জন্য আহমাদ মোস্তফা কামালকে জানাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

ইবিকাসের বংশধর রচনার ইতিবৃত্ত- স্বকৃত নোমান

আমি মূলত উপন্যাস লিখি। উপন্যাসের প্রতিই আমার সমস্ত মনোযোগ। কিন্তু মাঝেমধ্যে গল্পের দিকেও মনোযোগ দিতে হয়। কখন দেই? যখন ভালো কোনো গল্প পড়ি। সেই পাঠ যদি আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, তখন ভাবি, আচ্ছা, আমিও তো লিখতে পারি একটি গল্প। এছাড়া ছোট ছোট নানা ঘটনা আমাকে নাড়া দিয়ে যায়। ভীষণ নাড়া দেয়। তখন ভাবি, এই নাড়া দিয়ে যাওয়া ঘটনাটিকে তো আমি একটা শিল্পরূপ দিতে পারি। গল্পের মধ্য দিয়ে সেই ঘটনার শিল্পরূপ দিয়ে দেই। নাড়া দিয়ে যাওয়া সব ঘটনার কিন্তু শিল্পরূপ দাঁড়ায় না। গল্পের তো কিছু শর্ত আছে। যখন বুঝতে পারি সেই শর্তগুলো আমি পূরণ করতে পারব, তখনই গল্প রচনায় হাত দেই।
আমার লেখালেখির শুরুটা উপন্যাস দিয়ে। প্রথম প্রকাশিত বইটি উপন্যাস। ছয়টি উপন্যাস প্রকাশের পর প্রকাশিত হয় প্রথম গল্পের বই, নিশিরঙ্গিনী। দুই বছর পর প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পের বই, বালিহাঁসের ডাক। আরো দুই বছর বিরতি দিয়ে আগামী বইমেলা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তৃতীয় গল্পের বই, ইবিকাসের বংশধর
ইবিকাসের বংশধর গল্পটি বইয়ের নাম গল্প। গল্পটির আইডিয়া মাথায় আসে প্রায় দেড় বছর আগে, যখন আমি সমরেন্দ্রনাথ চন্দের ‘জীবজগতের লোকশ্রুতি’ বইটি পড়ছি। বইটিতে বক বা সারস সম্পর্কে একটি অধ্যায় আছে, যেখানে প্রসঙ্গক্রমে লেখা আছে গ্রিসের কবি ইবিকাসের কথা। প্রাচীন গ্রিক লোককথায় হত্যা কখনো লুকানো যায় না। মার্ডার উইল বি আউট ―এই আপ্তবাক্য সম্বন্ধে একটি রোমাঞ্চকর ঘটনার কথা জানা যায়। যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় সাড়ে পাঁচ শ বছর আগের কথা। গ্রিসে ইবিকাস নামে এক জনপ্রিয় কবি ছিলেন। অজ্ঞাত কারণে এক দস্যুর দল তাকে নির্জন জায়গায় ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কবির মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক বক উড়ে যাচ্ছিল। কবি তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা হলে আমার হত্যার একমাত্র সাক্ষী। আমার হত্যার প্রতিশোধ তোমাদের নিতে হবে।’
অনেক দিন চলে গেল। কবির মৃত্যু একটা রহস্য হয়ে রইল। একদিন এক উন্মুক্ত রঙ্গমঞ্চে কোনো এক নাটকের অভিনয় চলছিল। এমন সময়ে হঠাৎ এক ঝাঁক বক মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখেই একজন অভিনেতা নিজের পাঠ বলার বদলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠে, ‘এই যে ইবিকাসের হত্যার প্রতিশোধকারীরা উড়ে যায়।’ এই উক্তি শোনামাত্র সচকিত রাজকর্মচারীরা সেই অভিনেতাকে আটক করে ইবিকাস হত্যা মামলা নতুন করে আরম্ভ করে। অবশেষে আসল হত্যাকারীরা ধরা পড়ে। কবির মৃত্যু রহস্যের কিনারা হয়।
আমি যখন ‘জীবজগতের লোকশ্রুতি  বইটির বককে নিয়ে অধ্যায়টি পড়ছিলাম, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তখন গুপ্তঘাতকরা কোনো এক বাউলকে হত্যা করে। আমার মাথায় তখন খেলে যায় ইবিকাসের কথা। তাকেও অজ্ঞাত কারণে গুপ্তঘাতকরা হত্যা করেছিল, বহু বছর পর হাজার হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের বাউলটিকেও গুপ্তঘাতকরা হত্যা করল। দুই হত্যাকা-ের একটা ঐক্য খুঁজে পেলাম আমি। গ্রিসের ইবিকাসকে কীভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ফেলে একটা গল্প লেখা যায়, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। এটাকে বিনির্মাণ বলা যেতে পারে। আমি ভাবতে ভাবতে থাকি…ভাবতে থাকি। ভাবতে ভাবতে চলতি বছরের জুন মাসের কোনো একদিন আমার মাথায় গল্পটির একটা অবয়ব দাঁড় করিয়ে ফেললাম। সেদিনই গল্পটি লিখতে শুরু করি। লিখতে দুদিনের বেশি লাগল না।
মাস দুয়েক পর দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সাহিত্য পাতায় গল্পটি ছাপা হলো। ছাপা হওয়ার হওয়ার পর ফেসবুকে, মেইলে এবং ফোনে আমি প্রচুর পাঠপ্রতিক্রিয়া পাই। কেউ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। কেউ বললেন, এই গল্পে নাটকীয়তা বেশি। আবার কেউ বললেন, আমার অন্য গল্পগুলোর তুলনায় এটি দুর্বল একটি গল্প। আবার একজন নাট্যপরিচালক গল্পটি অবলম্বনে একটি নাটক নির্মাণের ইচ্ছার কথাও ফোন করে আমাকে জানালেন। পরে অজ্ঞাত কারণে তিনি আর যোগাযোগ করেননি। হয়ত পরে কখনো করবেন।
ইবিকাসের বংশধর গল্পটি চলতি বছরে লেখা আমার সর্বশেষ গল্প। এর আগে আমি দশটি গল্প এ বছরেই লিখেছি। এক বছরে এগারটি গল্প রচনা লেখক হিসেবে আমার জন্য খানিকটা বিস্ময়কর। কারণ আমি কষ্টলেখক। অর্থাৎ কষ্ট করে করে, আস্তে-ধীরে লিখি। বেশি বেশি লেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। বেশি লিখতে পারাটাকে আমি লেখককের বড় গুণ, বড় যোগ্যতা বলে মনে করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার সংখ্যা এত বেশি যে, এক জীবনে তা পড়ে শেষ করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তরাশঙ্কর-মানিক-বিভূতি-তলস্তয়-দস্তয়ভস্কি-মার্কেস-সিরাজ-সন্দীপনের মতো লেখকরাও কম লেখেননি। তাঁদের রচনার পরিমাণ বিপুল। জীবনানন্দের লেখার পরিমাণও কি কম? বড় বড় লেখকদের লেখার সংখ্যা আসলে বেশি। মহামতি হুমায়ূন আজাদ যে কথাটি বলেছেন, ‘ইতর প্রাণী বেশি প্রসব করে’―কথাটির সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত নই। লেখকের সঙ্গে ইতর প্রাণীর প্রসবের তুলনাটা ঠিক যায় না। একজন লেখক ক্ষমতা থাকলে অসংখ্য অসংখ্য লিখবেন। ক্ষমতা না থাকলে অবশ্যই জোর করে লিখবেন না। জোর করে লেখা আর যাই হোক, শিল্প হয়ে ওঠে না। সেই অসংখ্য লেখার মধ্যে কোনটা পাঠক গ্রহণ করবে, কোনটা কালের বিচারে টিকে যাবে, তা তো তো আগে থেকে বলে-কয়ে রাখা যায় না।
যাই হোক, এ বছর তো লিখলাম এগারটি গল্প, আগের বছরে লেখা ছিল পাঁচটি গল্প। মোট গল্প সংখ্যা দাঁড়াল ষোল। এবার তো চাইলে একটা বই করা যায়। চলতি বছরের শুরুতে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.-এর প্রকাশক কামরুল হাসান শায়ক ভাই আমার উপন্যাস প্রকাশের আগ্রহ ব্যক্ত করলেন। আমি তখনো লিখতে থাকা উপন্যাসটি শুরু করিনি। কীভাবে শুরু করব ভাবছি কেবল। শায়ক ভাইকে বললাম, উপন্যাস দিতে পারব কিনা সন্দেহ, একটা গল্পের পা-ুলিপি করার ইচ্ছে আছে। চাইলি এটি বের করতে পারেন। তিনি রাজি হলেন। আমিও ধীরে ধীরে গল্পগুলো লিখতে থাকি। অক্টোবরের মধ্যে পান্ডুলিপি তৈরি হয়ে গেল। পড়তে দিলাম কলকাতার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক অমর মিত্রকে। আমি তাঁর ¯েœহধন্য এবং তাঁর গল্প-উপন্যাসের একজন নিবিষ্ট পাঠক। আমার গল্পগুলো পড়ে তিনি একটা মন্তব্য আমাকে মেইল করে পাঠালেন।
অমর মিত্র লিখেছেন, “স্বকৃত নোমানের গল্প বাংলাদেশের গল্প। এক একটি গল্প বাংলাদেশের হৃদয়কে ছুঁয়েছে। গ্রাম, নদী, বাওড়, দিঘি, গাছগাছালি, বন-বাদাড়, বান-বন্যা, অনাবৃষ্টি নিয়ে বাস করা দরিদ্র মানুষের জীবনের রূপকার স্বকৃত। নিম্নবর্গের মানুষ স্বকৃত নোমানের গল্পের মানুষ। তাদের কথা লিখতে লিখতে স্বকৃত যেন বাংলাদেশের আত্মাকে দেখিয়ে দেন। তার গল্পের মানুষ ক্ষুধার্ত বাংলার মানুষ। সমস্ত জীবন কাটায় যেন ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য। স্বকৃতর গল্পের মানুষ ভাত আর মাংসের কথা ভাবে। স্বপ্ন দেখে। তবুও তাদের এক জীবন-দর্শন আছে। তা তাদের জীবন এবং জন্ম থেকে উপলব্ধ। জীবন আর ধর্মের নিগড় দুই যে মেলে না তা স্বকৃতর গল্প আমাদের দেখিয়ে দেয়। এই গ্রন্থে আছে যে ক্ষিদরের গল্প (বাঙাল), তা আমাদের সাহিত্যের সম্পদ। কী অনায়াসে ক্ষিদর অগ্রাহ্য করে বড়হুজুর, মোল্লার ফতোয়া, সতর্কতা। নদীর ওপারে মৌলবি যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে, তা নদীর ওপারেই রেখে আসে ক্ষিদর। তাকে খেটে খেতে হয়। তার নিজস্ব জীবনে অনধিকার প্রবেশ করা সহজ নয়। স্বকৃত নোমানের লেখায় যে দার্শনিকতা আছে, তাইই তাকে বিশিষ্ট করেছে। ঔপন্যাসিক স্বকৃতর গল্পের অনুরাগী না হয়ে থাকা যায় না। প্রতিটি গল্প চিনিয়ে দেয় অবারিত এক বাংলাদেশ এবং তার মানুষজনকে।”
এরই মধ্যে বইটির প্রচ্ছদ হয়ে গেল। প্রচ্ছদ করলেন শিল্পী ধ্রুব এষ। আমার বেশিরভাগ বইয়ের প্রচ্ছদ এই গুণী শিল্পীর করা। শ্রদ্ধেয় অমর মিত্রের ছোট মন্তব্যটি প্রচ্ছদের ব্লার্বে যুক্ত করে দিলাম। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লেখক নিজেই নিজের বইয়ের প্রচ্ছদের ব্লার্ব লিখে থাকেন। এটা আমার জন্য খুব কঠিন একটা কাজ মনে হয়। এই কঠিন কাজটা সাধারণত আমি করি না। কখনো আমার কোনো অগ্রজ লেখককে দিয়ে, কখনো কোনো লেখকবন্ধুকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নেই। কখনো ব্লার্বে তাদের নাম যায়, কখনো যায় না। তারাই নিষেধ করেন বলে নাম দেওয়া হয় না। অমর মিত্রের পাঠপ্রতিক্রিয়াটি ব্লার্বে যুক্ত করতে পেরে ভালো লাগল। এই সুযোগে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখি। প্রিয় অমরদা, আজীবন পেতে চাই আপনার স্নেহাশিষ।
বইটি প্রকাশের আগে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে আমাকে জানানো হলো যে, প্রতিটি বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে বইটি সম্পর্কে ছোট্ট করে একটি মন্তব্য দেওয়া হয়। আমাকেও সেরকম একটি লেখা লিখে দিতে বলা হলো। কিন্তু আমি তো নিজের বই সম্পর্কে নিজে কিছু লিখতে পারি না। নিজের সম্পর্কে এক শব্দও আমার কলমের ডগা গিয়ে বেরোয় না। শ্রদ্ধেয় অগ্রজ, প্রিয় বন্ধু, শক্তিমান লেখক হামীম কামরুল হককে বললাম, ভাই, আপনি কিছু লিখে দিন। মহৎ হৃদয়ের অধিকারী হামীম ভাই লিখলেন, “স্বকৃত নোমানের স্নায়ুতে ইতিহাস-চেতনা আর মর্মে রাজনৈতিক ভাঙাগড়ার দোলাচল। সেখানে সমকালকে চিরকালে নিয়ে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য। আবার সমকালকে সমকালেই ছেনে দেখার লীলাও তাঁকে নাড়িয়ে দেয়। তিনি সাড়া দেন ছোটগল্প লিখে। এজন্য হয়ত চলার পথে তিনি একটি একটি করে ছোটগল্পের খুঁটি গাঁড়েন। সমকাল ও চিরকালের ঠোকাঠুকিতে তাঁর গল্পগুলিতে বার বার দেখা দেয় জীবনের ফুল ও ফুলকি। তাঁর গল্পগুলি আমাদের স্বস্তি দেয় না, বরং প্রশ্নকাতর করে, আঘাত করে আমাদের প্রচলিত জীবনযাত্রা, রীতিনীতি ও জীবনভাবনায়।”
তার মন্তব্যটি নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। মন্তব্য করবেন বিজ্ঞ পাঠকরা। আমি চেয়েছিলাম হামীম ভাইর নামসহ লেখাটি প্রচ্ছদে যাক। কিন্তু পাঞ্জেরী থেকে জানানো হলো, এক্ষেত্রে সাধারণত নাম দেওয়া হয় না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন প্রচ্ছদটি আমাকে মেইল করা হলো, দেখলাম, লেখকের নামটি যথারীতি আছে। দেখে ভালো লাগল। কবি ও প্রাবন্ধিক ড. মাসুদুজ্জামান বর্তমানে পাঞ্জেরীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। তিনিও হামীম ভাইর নামটি রাখার পক্ষপাতী। শুনে ভালো লাগল। আমাদের দেশে এই রীতিটা চালু হওয়া উচিত বলে মনে করি যে, একটা পান্ডূলিপি পড়ে সমসাময়িক লেখকরা মন্তব্য করবেন এবং তাদের মন্তব্যগুলো বইয়ের প্রচ্ছদে ছাপা হবে। এতে বইটি সম্পর্কে একটা মূল্যায়ন হয়, পাঠকদের কাছে একটা ইতিবাচক বার্তা যায়।
ইবিকাসের বংশধর’ গল্পটি রচনার নেপথ্য গল্প আগেই বলেছি। এবার বলি আরো দুটি গল্প রচনা নেপথ্য গল্প। গত বর্ষা মৌসুমের শুরুতে আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তার নাজমা ও কন্যা নিশাত আনজুম সাকিকে নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে গিয়েছিলাম। শ্রীমঙ্গলের অন্যতম দর্শনীয় স্থান বাইক্কা বিল। অসাধারণ একটি জায়গা। ওখানে ভ্রমণে গিয়ে বিলের এক তরুণ প্রহরীর সঙ্গে, যে কিনা মাইমাল গোত্রের, হাওড়-বাওড়ে মাছ ধরাই যাদের পেশা, আলাপকালে সে আমাকে জানাল যে, কয়েক বছর আগে বাইক্কা বিলের মাছ লুট হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ এসে সংরক্ষিত এই বিলের মাছ লুট করে নিয়ে যায়। আমার মাথায় তখন একটি গল্পের প্লট উঁকি দিল। শ্রীমঙ্গল থেকে ফেরার কয়েকদিন পরেই ‘বাঘাইড়’ নাম দিয়ে গল্পটি লিখতে শুরু করলাম। গল্পের প্রধান চরিত্র সোনাফর আলী। এক বর্ষায় পুত্র সাজুসহ একটি গরুকে বিলের জলে গোসল করাচ্ছিল সোনাফর। হঠাৎ বিশাল আকৃতির একটি বাঘাইড় মাছ এসে সাজুর তলপেটে ঢুঁশ মেরে পেটটা ফুটো করে দিয়ে পালিয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সাজু মারা যায়। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে সোনাফর মাছটিকে খুঁজে বেড়ায়। তার পুত্রহন্তা বাঘাইড়টিকে সে হত্যা না করে ছাড়বে না। দিনের পর দিন বিলে পড়ে থাকে, অথচ মাছটিকে খুঁজে পায় না।
এক শীতের মৌসুমে হাইল হাওরে জলে টান ধরে। জল শুকিয়ে যেতে থাকে। বিলের মোকাম বাইক্যা বিলের জল তলানিতে ঠেকে। জলের অভাবে মাছেদের দাপাদাপি শুরু হয়। কিন্তু সংরক্ষিত বিল, মাছ ধরা বারণ। সোনাফরের মনে তো ক্ষোভ। পুত্রহন্তা বাঘাইড়টিকে হত্যা করতেই হবে। সোনাফর এলাকায় গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, বাইক্কা বিলের মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে সরকার, মাছ ধরতে এখন আর কোনো বাধা নেই। দেরিতে হলেও সরকার বুঝেছে বিলে মাছ মরে পচার চেয়ে মানুষের পেটে যাওয়া ভালো। কিন্তু বিল সংরক্ষণ কমিটির নেতারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা গোপন করছে। ইজারাদারদের সঙ্গে চুক্তি করেছে তারা। কদিনের মধ্যে মাছ ধরা শুরু হবে। সব মাছ চলে যাবে শহরে।
গুজবটি ছড়িয়ে পড়ল দিগ্বিদিক। শত শত মানুষ আসতে শুরু করল বাইক্যা বিলে। জাল, পলো ইত্যাদি দিয়ে মাছ ধরতে লাগল। অবস্থা বেগতিক দেখে স্থানীয় প্রশাসন বিল এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করল। কিন্তু এলাকার মানুষ নিষেধাজ্ঞা মানে না। পুলিশের সামনেই চলে তাদের লুটপাট। সবাই মাছ লুট করে, সোনাফর খুঁজে বেড়ায় তার পুত্রহন্তা সেই বাঘাইড়টিকে। দ্বিতীয়দিন সে সেই বাঘাইড়টির দেখা পায়। পিছু ধাওয়া করে। সারাদিন মাছটার পিছে ছোটে। কিন্তু মাছটাকে সে ধরতে পারে না। সেদিন সন্ধ্যায় একটা খালের ভেতর দেখতে পায় মাছটিকে। ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। বিশাল বাঘাইড়ের সঙ্গে শুরু হয় তার লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোনাফর হেরে যায় এবং মাছটি পালিয়ে যায়।
এই গল্পগ্রন্থের আরেকটি গল্প হচ্ছে ‘কুয়ার বাইরে’। গল্পটি লেখার পর প্রকাশের জন্য কোনো পত্রিকায় না দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম। মনে আছে, প্রায় ১৩৮৯ জন পাঠক গল্পটিতে লাইক দিয়েছিলেন, মন্তব্য করেছিলেন ৩৫৬ জন এবং শেয়ার নিয়েছিলেন ৬৮৬ জন। বাংলাদেশ, কলকাতা, আগরতলা ও আসামের বিভিন্ন অনলাইন, মাসিক পত্রিকাসহ বাংলা ভাষার মোট ১৭টি পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়। একজন পাঠক গল্পটির প্রিন্ট নিয়ে ৫ শ ফটোকপি করে একটি ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে পাঠিয়ে দেন। একটি গল্প নিয়ে পাঠকদের এমন উচ্ছ্বাস, এমন প্রশংসা সত্যিকারার্থেই আমাকে দারুণ আপ্লুত করেছিল। এর আগে কোনো গল্প লিখে এত সাড়া, এত প্রশংসা এবং এত পাঠক আমি পাইনি।
গল্পটির বিষয় ছিল সমমায়িক ঘটনাবলী। মাওলানা আবুল কাশেম ফেনবী গল্পের প্রধান চরিত্র। তিনি একটি কওমি মাদ্রাসার মুহতামিম (পরিচালক) এবং একটি ইসলামি মৌলবাদী সংগঠনের আঞ্চলিক নেতা। তার ছেলে থাকে ইন্দোনেশিয়ায়। ঢাকার হাইকোর্টের সামনে থেকে তখন গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য সরানোর জন্য হেফাজতে ইসলামসহ সমমনা কয়েকটি ইসলামি রাজনৈতিক দল আন্দোলন করছে। ঠিক সেই সময়ে মাওলানা আবুল কাশেম ফেনবী ইন্দোনেশিয়ায় তার ছেলের কাছে বেড়াতে যায়। ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ, অথচ সেদেশের এয়ারলাইনসের নাম মহাভারতের পাখি গারুড়ার নামে। সেদেশে ভারতীয় পুরাণ ‘রামায়ণ’ মঞ্চস্থ হয়। সেদেশের রাজ্য বালিদ্বীপের সর্বত্র নানা ভাস্কর্য স্থাপিত। সেদেশের টাকার গায়ে হিন্দুদেবতা গণেশের মূর্তি আঁকা। মাওলানা আবুল কাশেম ফেনবীর অবাক লাগে। মুসলিম দেশ, অথচ সংস্কৃতি কিনা সম্পূর্ণ আলাদা! এইসব ঘটনা তাকে দারুণ প্রভাবিত করে। দেশে ফিরে তিনি সম্পূর্ণ বদলে যান। ইসলামি মৌলবাদী সেই সংগঠন থেকে পতদ্যাগ করেন। তিনি বুঝতে পারেন, ধর্ম ও সংস্কৃতি যে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়।
আগেই বলেছি, নিজের গল্প সম্পর্কে মন্তব্য করা আমার পক্ষে কঠিন। হয়ত সব গল্পকারের পক্ষেই কঠিন। সংক্ষেপে শুধু এটকু বলি, অতীতে যে দুটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে, সে দুটির ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে আমি অতিক্রম করার চেষ্টা করেছি। লেখকজীবনে আমি মোট চুয়াল্লিশটি গল্প লিখেছি। চুয়াল্লিশটি গল্প থেকে যদি আমাকে শ্রেষ্ঠ দশটি গল্প নির্বাচন করতে বলা হয়, তাহলে বেশিরভাগ গল্পই নিতে হবে প্রকাশিতব্য গল্পের বই ‘ইবিকাসের বংশধর’ থেকে।
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.-এর প্রকাশক কামরুল হাসান শায়ককে অসংখ্য ধন্যবাদ। বাংলাদেশে গল্পের বই যে খুব বেশি বিক্রি হয় তা কিন্তু নয়। এই কথাটি শায়ক ভাই জানেন। জেনেও তিনি আমার মতো অখ্যাত একজন লেখকের গল্পের বই প্রকাশের ঝুঁকি নিয়েছেন। গল্পগুলো পড়ে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে তার নাম সুপরিচিত। নিশ্চয়ই তিনি তার অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার মাধ্যমে আমার বইটিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন, এই বিশ্বাস আমার আছে। আশা করছি পাঠকরা বইটিকে গ্রহণ করবেন।
স্বকৃত নোমানের লেখা সকল বই দেখুন এখানে
আরোও দেখুনঃ
স্বকৃত নোমান প্রকৃতই একজন ঔপন্যাসিকঃ মহসিন আলী