হুমায়ূন আহমেদ কোন অর্থে একজন বড় লেখক!

হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ কে বুঝার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক রচনাগুলোর মধ্যে তুলনা করি। আমি এটা বহুবার বলেছি যে, হুমায়ূন ঢাকার গুটিকয়েক লেখকদের মধ্যে একজন, যারা মুক্তিযুদ্ধের লেখালেখির ক্ষেত্রে এটা আবিষ্কার করতে পেরেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আসলে কোনো উপন্যাস হতে পারে না। কারণ মুক্তিযুদ্ধ- এই নামটা একটা ডিসাইসিভ ব্যাপার, যেটা আবশ্যিকভাবে এক পক্ষকে ভালো, এবং আরেকপক্ষকে খারাপ হিসেবে উপস্থিত করবে। যেটা আবশ্যিকভাবে এক পক্ষের জয় ঘোষণা করবে। কারণ এর বাইরে কোনো উপায় নেই। শব্দটা মুক্তিযুদ্ধ। সুতরাং মুক্তিযু্দ্ধের লেখা কেবলি তখনি লেখা হবে যখন সেটা হবে যুদ্ধ নিয়ে লেখা। যেটা শেষ পর্যন্ত মুক্তিযু্দ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হবে। আমি আবার বলছি। একমাত্র সম্ভব যদি আমি একটি যুদ্ধের বয়ান লিখি, যেটা কর্মতৎপরতার মধ্যদিয়ে উপন্যাসিকসূলভ নিরাসক্তির মধ্যদিয়ে অনেকগুলো ডিসকোর্সের মধ্যদিয়ে শেষ পর্যন্ত দেখাবে এটা ছিলো একটা মুক্তিযুদ্ধ। যেখানে বিচিত্র রকমের ডিসকোর্সের দ্বন্ধ ও টানাপোড়েন ছিলো।

হুমায়ূনকে বুঝার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক রচনাগুলোর মধ্যে তুলনা করি। আমি এটা বহুবার বলেছি যে, হুমায়ূন ঢাকার গুটিকয়েক লেখকদের মধ্যে একজন, যারা মুক্তিযুদ্ধের লেখালেখির ক্ষেত্রে এটা আবিষ্কার করতে পেরেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আসলে কোনো উপন্যাস হতে পারে না। কারণ মুক্তিযুদ্ধ- এই নামটা একটা ডিসাইসিভ ব্যাপার, যেটা আবশ্যিকভাবে এক পক্ষকে ভালো, এবং আরেকপক্ষকে খারাপ হিসেবে উপস্থিত করবে। যেটা আবশ্যিকভাবে এক পক্ষের জয় ঘোষণা করবে।

মুক্তিযুদ্ধ আসলে ফেরেশতা আর শয়তানের লড়াই ছিলো না। আমরা জানি যে, ফেরেশতা এবং শয়তানের লড়াই সাহিত্যে খুব খারাপ চোখে দেখে থাকি। আমরা একধরণের টানাপোড়েন চাই, দ্বন্দ্ব-বিক্ষোভ চাই, মিলমিশ চাই। এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে মুক্তিযুদ্ধের লেখালেখি করেছে এমন লেখকের সংখ্যা ঢাকায় খুবই কম। যারা করতে পেরেছেন তাদের মধ্যে হুমায়ূন আসলে প্রধান। যদি আমি সংখ্যার বিচারে বলি, বৈচিত্র্যের বিচারে বলি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা কেমন ছিলো? আপনি কী এই ছবি চান? সবচেয়ে ভালো বিবরণীগুলোর একটা পাবেন হুমায়ূনের লেখায়। আপনি তাহমিমা আনামের লেখায় ভালো পাবেন। এই বিষয়ে ঢাকার সবচেয়ে ক্লাসিকস লেখা জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি-এর মধ্যে পাবেন। কিন্তু আপনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিবরণী পাবেন হুমায়ূনের লেখাগুলোতে।

মুক্তিযুদ্ধে একজন ব্যক্তি কত বিচিত্রভাবে নিগৃহীত হয়েছে সেটা মেইনস্ট্রিম ডিসকোর্সে নেই। অসম্ভব উপস্থাপন করা। আপনি কী তার হদিস চান? আপনি সবচেয়ে বেশি পাবেন হুমায়ূন আহমেদের লেখায়। ব্যক্তির যে বিচিত্র টানাপোড়েন, নিগ্রহ, আকাঙ্ক্ষা, অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া। একটা যুদ্ধ মানুষের জীবনে কত বিচিত্র রকম ঢেউ তৈরি করে, প্রণোদনা তৈরি করে, হতাশা তৈরি করে। আপনি কী তার ছবি চান। আপনি হুমায়ূন আহমেদের লেখার মধ্যে সবচেয়ে ভালোভাবে সেটা পাবেন।

আমি সবসময় মনে করি যে, হুমায়ূন আহমেদ আসলে অন্য কিছু নয়। লেখার ক্র্যাফটম্যানশীপের দিক থেকেই, ঔপন্যাসিকসূলভ ভাষা তৈরি করার সাফল্যের দিক থেকেই ঢাকার বেশিরভাগ লেখকের চেয়ে যথেষ্ট আগুয়ান। সেটা পড়ার জন্য আপনি সবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখা হাতে নেন এবং তারপর মিলিয়ে পড়ুন। তাহলে আপনি দেখবেন যে আসলে হুমায়ূন আমরা ঠিকমতো পড়তে পারিনি। কিন্তু এতক্ষণ ধরে আমরা যা বললাম সেটার থেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। কথাটা হলো এই আমরা বলতে চাইলাম, দেখাতে চাইলাম হুমায়ূন ঠিকমতো পঠিত হয়নি।

লেখার ক্র্যাফটম্যানশীপের দিক থেকেই, ঔপন্যাসিকসূলভ ভাষা তৈরি করার সাফল্যের দিক থেকেই ঢাকার বেশিরভাগ লেখকের চেয়ে যথেষ্ট আগুয়ান। সেটা পড়ার জন্য আপনি সবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখা হাতে নেন এবং তারপর মিলিয়ে পড়ুন। তাহলে আপনি দেখবেন যে আসলে হুমায়ূন আমরা ঠিকমতো পড়তে পারিনি।

আমরা বলতে চাইলাম হুমায়ূনের সিরিয়াস ধরণের দার্শনিক এবং জীবন সমস্যামূলক রচনায় যথেষ্ট পরিমাণ আছে। আমরা বলতে চাইলাম যে, হুমায়ূনের ‘নভেলা’কে যদি আমরা ক্যাটাগরি ধরি, ছোটোগল্পকে যদি ক্যাটাগরি ধরি, তাহলে হুমায়ূন আহমেদের ক্র্যাফটম্যানশীপ এবং তার অন্যান্য যে কথাসাহিত্যিকসূলভ যোগ্যতা এটা খুবই উচুঁমাপের। তারপরও হুমায়ূনের মধ্যে আমরা যেমনটি আগেই বলেছি বড় লেখকসূলভ অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যতো গড় হাজির আছেই। যেমন ধরা যাক হুমায়ূন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে লেখালেখি করেছেন এই লেখালেখির একটা দারুণ অপূর্ণতা হলো মুক্তিযুদ্ধকে তিনি কখনোই একটা রাজনৈতিক ক্যাটাগরি হিসেবে আবিষ্কার করতে পারেননি। আমার নিজের ধারণা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যদি এই বিষয়ে তার উপন্যাসটা যদি লিখতে পারতেন, তার আগের দুটি উপন্যাসের মূল্যের প্রেক্ষাপটে আমি বলতাম যে, মুক্তিযুদ্ধকেই একটা রাজনৈতিক ক্যাটাগরি হিসেবে আবিষ্কার করার ক্ষেত্রে ওই বই আমাদের শ্রেষ্ঠ রচনা হতো।

নানান ধরণের সীমাবদ্ধতা হুমায়ূন আহমেদের আছে। কিন্তু আলোচনার শেষ পর্বে আমি যে কথা বলবো সেটা হলো এই হুমায়ূন বড় লেখক। হুমায়ূন এমন লেখক যে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়নি। হুমায়ূন কোনো একটা লেখায় লিখেছিলেন, সোমেন চন্দের ইঁদুর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি মধ্যবিত্তের জীবন লিখেছেন। সোমেন চন্দ যেহেতু আমাদের পুরনো ক্যাটাগরিদের মধ্যে পড়ে, ফলে ঢাকার ছেলেরা সোমেন চন্দকে বড় লেখক মনে করে। কিন্তু সত্যি বলতে কি সোমেন চন্দ আসলে বড় লেখক নন। হুমায়ূন বড় লেখক। সোমেন চন্দের ইঁদুর লেখার প্রভাব আসলে পরোক্ষভাবে থাকতে পারে। এটা হুমায়ূনের লেখাকে চিহ্নিত করে না। হুমায়ূন এই অর্থে বড় লেখক যে, নিজের লেখার ক্যাটাগরিগুলো অন্য কারো কাছ থেকে ধার করেননি। বাংলাদেশে ডমিনেন্ট ডিসকোর্সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে যা মনে করেন, ইতিহাস সম্পর্কে যা মনে করেন, তা সাহসের সঙ্গে লিখেছেন। এমন লেখকদের মধ্যে হুমায়ুনের সঙ্গে তুল্য আর একজন লেখকও নেই। বাংলাদেশে দেখা থেকে লেখা, যেই জনজীবন দেখছি, সেই জনজীবন থেকে লেখার বিষয় আবিষ্কার করা এবং সেই জনজীবনকে অবলম্বন করে সেই বিষয়কে রূপায়িত করা লেখকের ক্ষেত্রে হুমায়ুনের তুল্য দ্বিতীয় কোনো লেখক নেই। এটা প্রমাণ করে হুমায়ূন বড় লেখক। বড় লেখক তারা, যারা নিজের কথা লেখেন। বড় লেখক তারা, যারা নিজের কথা বলার জন্য নিজের মতো ভঙ্গী তৈরি করে। এই অর্থে হুমায়ূন একজন বড় লেখক

হুমায়ূন এই অর্থে বড় লেখক যে, নিজের লেখার ক্যাটাগরিগুলো অন্য কারো কাছ থেকে ধার করেননি। বাংলাদেশে ডমিনেন্ট ডিসকোর্সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে যা মনে করেন, ইতিহাস সম্পর্কে যা মনে করেন, তা সাহসের সঙ্গে লিখেছেন। এমন লেখকদের মধ্যে হুমায়ুনের সঙ্গে তুল্য আর একজন লেখকও নেই। বাংলাদেশে দেখা থেকে লেখা, যেই জনজীবন দেখছি, সেই জনজীবন থেকে লেখার বিষয় আবিষ্কার করা এবং সেই জনজীবনকে অবলম্বন করে সেই বিষয়কে রূপায়িত করা লেখকের ক্ষেত্রে হুমায়ুনের তুল্য দ্বিতীয় কোনো লেখক নেই। এটা প্রমাণ করে হুমায়ূন বড় লেখক।

হুমায়ূন আহমেদ এর বই সমূহ

 

—————————————————————————————

ড. মোহাম্মদ আজম সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মধ্যে একালের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন তাত্ত্বিক। গভীর ও শাণিত যুক্তির মধ্যদিয়ে কোনো বিষয়কে ব্যবচ্ছেদ করার জন্য সুধীমহলে তার খ্যাতি রয়েছে। ঢাকার মতো অস্থির বিদ্বৎসমাজের মধ্যে তার নিবিষ্ট জ্ঞানচর্চা বিশ্ববিদ্যালয় ও যে কোনো তরুণ পাঠকের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক। – রকমারি ব্লগ

মোহাম্মদ আজম

মোহাম্মদ আজম

Published 01 Jul 2020
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্লেষক।
  0      1
 

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png