যেভাবে উদ্ধার হয়েছে বঙ্গবন্ধুর তিন পান্ডুলিপি

0001-5954954708_20210815_042057_0000

বঙ্গবন্ধু জেলে থাকার সময় তাকে তার স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কয়েকটি খাতা কিনে দিয়েছিলেন জেলখানায় আত্মজীবনী লেখা আরম্ভ করার জন্য। তিনি তখন আত্মজীবনী লেখার ব্যাপারে তেমন কোনও উৎসাহবোধ করেননি, যা তিনি তার স্ত্রীকে খাতা দেওয়ার সময় বলেছিলেন। এবং এ কথার উল্লেখ পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর শুরুতেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কখনও তার স্ত্রীর অনুরোধ উপেক্ষা করেননি। সম্ভবত এই কারণে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ তিনটি বই আমরা এতদিন পর এসে পড়তে পেরেছি।

এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর লেখা বই প্রকাশিত হয়েছে তিনটি। তিনটি বই-ই সময়ের কথা বলে। একটি সময়কে তুলে আনা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর ভেতর। তাছাড়া সেসময় এই অঞ্চলের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সবচেয়ে বড় স্বাক্ষী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। স্বাভাবিক ভাবেই সেই সময়ের টানাপোড়েন এত কাছ থেকে কেউ দেখেননি। পেশাদার লেখক না হলেও তিনটি বইতেই আমরা বঙ্গবন্ধুর জবানিতে পাই ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা। সেলিনা হোসেন বইগুলো সম্পর্কে লিখেছেন,

‘সময়কে খুঁজে পাওয়া যায় তিনটি বইয়ে। এখানে একদিকে ব্যক্তি হিসেবে শেখ মুজিবের চিন্তার মগ্নতা গভীরভাবে রূপায়িত হয়েছে, অন্যদিকে নিজের রাজনৈতিক জীবন তখনকার সময়ের পটভূমিতে চমৎকারভাবে তিনি উঠিয়ে এনেছেন। পাশাপাশি চোখ রেখেছেন জগতের নানা দিকে। খুঁটিনাটি নানা বৃত্তান্ত এবং নিজের অনুভবের সারাৎসারে তাঁর প্রতিটি বই হয়ে উঠেছে অনন্য। এই বইগুলোতে কেবল একজন রাজনীতিকের দৃষ্টিভঙ্গিই নয়, লেখকের দায়বোধও ফুটে উঠেছে। ফলে বলা যায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শিল্পের সুষমা—এটিই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তিন বইয়ের একমাত্রিক ব্যঞ্জনা’।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী

শেখ মুজিবর রহমানের লেখা চারটি খাতা ২০০৪ সালে আকস্মিকভাবে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হস্তগত হয়। খাতাগুলো ছিলো অতি পুরনো, প্রায়শ অস্পষ্ট নিয়ে জীর্ণপ্রায় পাতা। সেসব খাতাগুলো পড়ার পর জানা যায় এটি মুলত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী যা তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীন অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি। এ সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই লিখেছেন,

 ‘যখন (বঙ্গবন্ধুর) স্মৃতিকথা ও ডায়েরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে সেই সময় আমার হাতে এল নতুন চারখানা খাতা, যা আত্মজীবনী হিসেবে লেখা হয়েছিল। এই খাতাগুলো পাবার পিছনে একটা ঘটনা রয়েছে। আমার হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে বঙ্গবন্ধু এভেনিউতে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়। মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভী রহমানসহ চব্বিশজন মৃত্যুবরণ করেন। আমি আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যাই। এই ঘটনার পর শোক-কষ্ট-বেদনায় যখন জর্জরিত ঠিক তখন আমার কাছে এই খাতাগুলো এসে পৌঁছায়। এ এক আশ্চর্য ঘটনা। এত দুঃখ-কষ্ট-বেদনার মাঝেও যেন একটু আলোর ঝলকানি……।

আব্বার হাতের লেখা চারখানা খাতা। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খাতাগুলো নাড়াচাড়া করতে হয়েছে। খাতাগুলোর পাতা হলুদ,জীর্ণ ও খুবই নরম হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় লেখাগুলো এত ঝাপসা যে পড়া খুবই কঠিন। একটা খাতার মাঝখানের কয়েকটা পাতা একেবারেই নষ্ট, পাঠোদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। পরদিন আমি, বেবী মওদুদ ও রেহানা কাজ শুরু করলাম। রেহানা খুব ভেঙে পড়ে যখন খাতাগুলো পড়তে চেষ্টা করে। ওর কান্না বাঁধ মানে না……।

এই লেখাগুলো বারবার পড়লেও যেন শেষ হয় না। আবার পড়তে ইচ্ছা হয়’।

বঙ্গবন্ধু
BUY NOW

অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ড. ফকরুল আলম, উর্দুতে ইয়াওয়ার আমান, জাপানি ভাষায় কাজুহিরো ওয়াতানাবে, চিনা ভাষায় চাই শি, আরবিতে মুহাম্মদ দিবাজাহ, ফরাসিতে ফ্রান্স ভট্টাচার্য, হিন্দিতে প্রেম কাপুর, তুর্কিতে আতাতুর্ক সংস্কৃতি ও গবেষণা কেন্দ্র, নেপালিতে অর্জুন বাহাদুর থাপা ও মহেশ পৌড়েল, স্পেনীয়তে মারিয়া হেলেনা বারেরা-আগারওয়াল ও বেঞ্জামিন ক্লার্ক, অসমীয়াতে ড. সৌমের ভারতীয়া ও ড. জুরি শর্মা, রুশ ভাষায় ড. ভি নমকিন, ইটালি ভাষায় আন্না কোক্কিয়ারেল্লা এবং মালয় ভাষায় অনুবাদের কাজ এখনও চলছে। এছাড়াও বইটি দৃষ্টিহীনদের জন্য ব্রেইল সংস্করণেও প্রকাশ হয়েছে।

কারাগারের রোজনামচা

এই বইটি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঘটনাবহুল জেল-জীবনচিত্র এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবন, জেল-যন্ত্রণা, কয়েদীদের অজানা কথা, অপরাধীদের কথা, কেন তারা এই অপরাধ জগতে পা দিয়েছিলো, তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের দুঃখ-দুর্দশা, গণমাধ্যমের অবস্থা, শাসক গোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন, ৬ দফার আবেগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাস ঘাতকতা, প্রকৃতি প্রেম, পিতৃ-মাতৃ ভক্তি, কারাগারে পাগলদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে।

এই বইটির ভূমিকায় বইটি প্রকাশের শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা নিজেই। কীভাবে ১৯৭১ সালের আগুন ঝড়া কোন এক দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে জিম্মি অবস্থায় উদ্ধার করা হলো বঙ্গবন্ধুর হাতে লেখা খাতা তা উঠে এসেছে তার লেখায়। এই বইটির নামকরণ করেন বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা।

‘এই সময়ে (মুক্তিযুদ্ধের আগুন ঝড়া কোন এক দিনে) এক মেজর সাহেব এসে বলল, “বাচ্চা লোগ সুকুল মে যাও” (বাচ্চারা স্কুলে যাও)….। যাহোক স্কুলে যাবে বাচ্চারা, জামাল, রেহানা আর রাসেল। আমি বললাম বই খাতা কিছুই তো নাই, কী নিয়ে স্কুলে যাবে আর যাবেই বা কীভাবে? জিজ্ঞেস করল বই কোথায়? বললাম, আমাদের বাসায়, আর সে বাসা তো আপনাদের দখলে আছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসা।

বলল, “ঠিক হ্যায় হাম লে যায়গে; তোম লোগ কিতাব লে আনা।“

ওরা ঠিক করল, জামান, রেহানা, রাসেলকে নিয়ে যাবে যার যার বই আনতে। আমি বললাম, আমি সাথে যাব। কারণ একা ওদের সাথে আমি আমার ভাইবোনদের ছাড়তে পারি না। তারা রাজি হলো।

আমার মা আমাকে বললেন, “একবার যেতে পারলে আর কিছু না হোক তোর আব্বার লেখা খাতাগুলো যেভাবে পারিস নিয়ে আসিস।“ খাতাগুলো মার ঘরে কোথায় রাখা আছে তাও বলে দিলেন। আমাদের সাথে মিলিটারির দুইটা গাড়ি ও ভারী অস্ত্রসহ পাহারাদার গেল।

২৫শে মার্চের পর এই প্রথম বাসায় ঢুকতে পারলাম। সমস্ত বাড়িতে লুটপাটের চিহ্ন, সব আলমারি খোলা, জিনিসপত্র ছড়ানো ছিটানো। বাথরুমের বেসিন ভাঙা, কাচের টুকরো ছড়ানো, বীভৎস দৃশ্য!

বইয়ের সেলফে কোনো বই নাই। অনেক বই মাটিতে ছড়ানো, সবই ছেড়া অথবা লুট হয়েছে। কিছু তো নিতেই হবে। আমরা এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাই, পাকিস্তান মিলিটারি আমাদের সাথে সাথে যায়। ভাইবোনদের বললাম, যা পাও বইপত্র হাতে হাতে নিয়ে নিউ।

আমি মায়ের কথামতো জায়গায় গেলাম। ড্রেসিং রুমের আলমারির উপর ডান দিকে আব্বার খাতাগুলি রাখা ছিল, খাতা পেলাম কিন্তু সাথে মিলিটারির লোক, কী করি? যদি দেখার নাম করে নিয়ে নেয় সেই ভয় হলো। যাহোক অন্য খাতা লিছু হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে একখানা গায়ে দেবার কাঁথা পড়ে থাকতে দেখলাম, সেই কাঁথাখানা হাতে নিলাম, তারপর এক ফাঁকে খাতাগুলি ঐ কাঁথায় মুড়িয়ে নিলাম। সাথে দুই একটা ম্যাগাজিন পড়েছিল তাও নিলাম……।

যখন ফিরলাম মায়ের হাতে খাতাগুলি তুলে দিলাম। পাকিস্তানি সেনারা সমস্ত বাড়ি লুটপাট করেছে, তবে রুলটানা এই খাতাগুলিকে গুরুত্ব দেয় নাই বলেই খাতাগুলি পড়েছিল।

BUY NOW

আব্বার লেখা এই খাতার উদ্ধার আমার মায়ের প্রেরণা ও অনুরোধের ফসল। আমার আব্বা যতবার জেলে যেতেন মা খাতা, কলম দিতেন লেখার জন্য। বার বার তাগাদা দিতেন। আমার আব্বা যখন জেল থেকে মুক্তি পেতেন মা সোজা জেল গেটে যেতেন আব্বাকে আনতে আর আব্বার লেখাগুলি যেন আসে তা নিশ্চিত করতেন’।

কারাগারের রোজনামচা বইটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছেন ড.ফকরুল আলম এবং অসমীয়াতে অনুবাদ করেছেন সৌমেন ভারতীয়া।

আমার দেখা নয়াচীন

বঙ্গবন্ধুর লেখা তৃতীয় বই হিসেবে ২০২০ সালে এটি প্রকাশিত হয়। এটিও কারাগারে রাজবন্দী থাকার সময়ে রচিত। বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে চীনের পিকিংয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। সে সময় নয়াচীন দেখার অভিজ্ঞতার আলোকে বইটি রচিত। তবে এখানে তিনি শুধু ভ্রমণবৃত্তান্তই তুলে ধরেননি, নয়া চীনের সমাজ-দর্শনও এসেছে। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকদর্শন ও মূল্যায়নমূলক পর্যালোচনাও সমৃদ্ধ করেছে বইটিকে।

BUY NOW

এতে মাতৃভাষার মর্যাদার প্রশ্নে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন বঙ্গবন্ধু, ‘চীনে অনেক লোকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে, অনেকেই ইংরেজি জানেন, কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলবেন না। দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলবেন। আমরা নানকিং বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যাই। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ইংরেজি জানেন, কিন্তু আমাদের অভ্যর্থনা করলেন চীনা ভাষায়। দোভাষী আমাদের বুঝাইয়া দিল। দেখলাম তিনি মাঝে মাঝে এবং আস্তে তাকে ঠিক করে দিচ্ছেন, যেখানে ইংরেজি ভুল হচ্ছে। একেই বলে জাতীয়তাবোধ। একেই বলে দেশের ও মাতৃভাষার উপর দরদ।’

এই বইটির পান্ডুলিপি উদ্ধার করা হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর অন্য দুটো পান্ডুলিপির সাথেই। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর চারটি খাতা তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হাতে আসে ২০০৪ সালে। আর কারাগারের রোজনামচার লেখাগুলো শেখ হাসিনা খুঁজে পান তাদের নিজেদের বাড়িতেই। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি সেসব পান্ডুলিপি লুকিয়ে আনতে সক্ষম হন। ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটির পান্ডুলিপি সেগুলোর মধ্যেই একটি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান পেশাদার লেখক না হলেও তিনি সাংবাদিকতা করেছিলেন বেশ খানিকটা সময়। ১৯৪৫-৪৬ সালের দিকে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের কাগজ ‘সাপ্তাহিক মিল্লাত’ লিখতেন তিনি। অনিয়মিতভাবে লিখেছেন ইত্তেহাদ এবং ইত্তেফাকে। তিনি নিজে পত্রিকাও বের করেন ১৯৫৬ বা ১৯৫৭ সালের দিকে—সাপ্তাহিক ‘নতুন দিন’। তিনি ছিলেন প্রধান সম্পাদক এবং কবি জুলফিকার ছিলেন সম্পাদক।

বঙ্গবন্ধুর লেখা পান্ডুলিপিগুলো থেকে এখন পর্যন্ত তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখায় বারবার উঠে এসেছে ইতিহাসের বিভিন্ন অলি-গলি। সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি শেখ মুজিবর রহমানের মনস্তত্ব। কিন্তু নিজেকে আনকোড়া লেখক ভাবতে গিয়ে অকপটে বলেছেন তিনি লেখক নয়। ক্ষমাও চেয়েছেন। এই বিনয়ের মধ্যে আমরা খুঁজে পাই অনন্য এক বঙ্গবন্ধুকে।

‘আমি লেখক নই, আমার ভাষা নাই, তাই সৌন্দর্যটা অনুভব করতে পারছি, কিন্তু গোছাইয়া লেখতে পারি না। পাঠকবৃন্দ আমায় ক্ষমা করবেন।’

-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান (আমার দেখা নয়াচীন)

 

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বই সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading