এলিরিন- ফিকশনের মোড়কে চোখ ধাঁধানো সব তথ্য দিয়ে সাজানো মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস।

এলিরিন

“বাইতুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতম স্থান হোলি অফ দ্যা হোলি’জ, যেখানে ঈশ্বরের উপস্থিতি আছে বলে বিশ্বাস করত ইহুদীরা। এ কারণে, একে ঈশ্বরের ঘরও বলতো। বছরে মাত্র একদিন হাই প্রিস্ট সে কক্ষে প্রবেশ করতে পারেন, সেটি হলো পাপমোচনের দিন, ইয়ম কিপুর। সেদিন ইসরাইল জাতির পাপ ঈশ্বর মোচন করেন। একটি দড়ি তার শরীরে শক্ত করে পেঁচিয়ে দেয়া হতো, সে অবস্থায় তিনি পবিত্র কক্ষে প্রবেশ করতেন। যদি তিনি জীবিত বেরিয়ে আসেন, তাহলে ঈশ্বর পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন হাই প্রিস্টের প্রার্থনার বদৌলতে। আর যদি তিনি যোগ্য না হন, তাহলে ইহুদীদের বিশ্বাস ছিল, তাকে সেখানেই ঈশ্বর মৃত্যু দেবেন। তিনি যদি মারা যান, তার মৃতদেহ বয়ে আনবার জন্য যেন আর কাওকে সে কক্ষে প্রবেশ করতে না হয়, সেজন্য তার কোমরে সেই দড়ি, ওটা দিয়েই টেনে আনবে তাকে লোকে।”

ছোটবেলায় মায়ের কাছে অনেক রাজ্যের গল্প শুনতাম। রাজার গল্প, তাদের যুদ্ধের গল্প, যুদ্ধ জয়ের গল্প। গল্প শুনতে শুনতেই চোখের সামনে ভাসত সেসব রাজ্যের ছবি। ‘এলিরিন’ বইটি পড়ে আমার সেসব দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। শুধু তাই না, আমরা যারা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস নিয়ে বেশ একটা তৃষ্ণা অনুভব করি, আমাদের জন্য এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় আছে অমৃতের সন্ধান। শুধু ইতিহাসপ্রেমিক বলেই না, আপনি যদি এই ইতিহাস রাজ্যের নতুন বাসিন্দাও হন, তবে এই বই আপনাকে স্থায়ী বাসিন্দা বানানোর ব্যবস্থা করবে নিশ্চিত। ফিকশনের মোড়কে, চোখ ধাঁধানো সব তথ্য দিয়ে সাজানো লেখক আবদুল্লাহ ইবনে মাহমুদের বইএলিরিন”।

ছবিঃ এলিরিন

এলিরিন” বইটির গল্পে আবর্তিত হয়েছে দুইটি সময়কালকে ঘিরে। একটি ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দের প্রেক্ষাপট দ্বিতীয়টি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট। গল্পটি পবিত্র শহর জেরুজালেম আর সে শহরের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে লেখা। কেমন ছিল হাজার বছর আগের জেরুজালেম যখন আর্চবিশপ, নাইট ও রাজাদের পদচারণায় মুখরিত ছিল শহরটি? হাজারো রহস্যে ঘেরা একটি শহর; এখনো অনেক রহস্যের উন্মোচন হওয়া বাকি যার। এই অনেকগুলো রহস্যের মধ্যথেকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি রহস্যকে বেছে নিয়েছেন লেখক। যার উল্লেখ ধর্মগ্রন্থের পাতায় আছে, যার সাথে ঈশ্বরের উপস্থিতির তুলনা দেওয়া হয়, যাকে নিয়ে এখনো বিভিন্ন দেশ দিয়ে যাচ্ছে নানানরকম উক্তি।

গল্পের শুরু হয় ১১৮৭ সনের প্রেক্ষাপটে। জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় দুই ঘোড়সওয়ার, নাইট থমাস ও রবার্ট। জেরুজালেম শহরে পৌছে দিতে হবে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এটাই তাদের যাত্রার উদ্দেশ্য। কী সেই বার্তা? তা নিয়েও তাদের ধারণা নেই। শুধুমাত্র আজ্ঞাপালন করছে। তবে এই আজ্ঞা পালনের জন্য প্রাণ হারাতে হবে বলেই ধারণা করছেন নাইট থমাস কারণ তার ধারণা অনুযায়ী তাদের মৃত্যুদূত, কয়েকজন ঘোড়সওয়ার পিছু নিয়েছে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু প্রাণের মায়া অনেক আগেই ত্যাগ করেছেন থমাস। তাই তরুণ রবার্টকে পাঠিয়ে দিলেন বার্তা হাতে আর নিজেই এই শত্রুপক্ষকে মোকাবেলার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। তবে শত্রুপক্ষ বলে যাদের আখ্যায়িত করেছেন, তারা কি আসলেই শত্রুপক্ষ? নাকি এর ভেতরে লুকায়িত অন্য কোনো রহস্য? অন্যদিকে, পবিত্রস্থান জেরুজালেমে তখন সালাদিনের সাথে যুদ্ধ চলছে ক্রুসেডারদের। চারপাশে যুদ্ধের বর্বরতার মাঝেও একদল উচ্চপদস্থ ব্যক্তি আছেন যারা স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। জেরুজালেম হাত ছাড়া হলেও যেন জেরুজালেমের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, যার সাথে জড়িত ইহুদী জাতির ঐতিহ্য, যা অপরাজেয় হওয়ার ক্ষমতা দিতে পারে বলে কথিত আছে, তা যেন বিরোধী দলের হাতে না যায়, সেই পরিকল্পনায় ব্যস্ত। কোথায় এই মহামূল্যবান সম্পদ? উত্তর রয়েছে এলিরিনের পাতায়।

ছুটি কাটাতে দেশে আসা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক হাসান ইকবাল বসে আছে হাতিরঝিলের একটি বেঞ্চে, উপভোগ করছে ঢাকা শহরের বিকেলের সৌন্দর্য। কিন্তু তার ছুটি বেশিদিন দীর্ঘস্থায়ী হলোনা। কাজের খ্যাতির কারণে পুরোনো সুপারভাইজর প্রফেসর স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্টে আমন্ত্রণ জানান লেকমন্ট ইউনিভার্সিটিতে। হাসান যখন মার্কিন মুল্লুকে পৌঁছায় তার প্রফেসরের সাথে দেখা করতে, প্রফেসর তখন মাস্টার্সের ইতিহাস ক্লাসে আছেন। এই ক্লাসের বর্ণনায় লেখক আমাদেরকে জেরুজালেমের ইতিহাসের পাতায় নিয়ে যান। বই পড়তে পড়তে একসময় হয়ত নিজেকে মাস্টার্সের সেই ইতিহাস ক্লাসের একজন বলে মনে করবেন পাঠক। গল্পের আরেক চরিত্র জেমস রাইটের আগমন ঘটে। প্রফেসর একটি ছোট টিমের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন হাসানের, যারা সকলেই তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বেশ পটু। এই স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্টের কাজেই হাসান আর জেমসকে পাড়ি জমাতে হবে রহস্যে ঘেরা, পবিত্রভূমি জেরুজালেমে। তাদের এই অ্যাসাইনমেন্টে সহায়তা করছে সে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষেরা, রয়েছে বিশাল ফান্ডিং। তবে ক্ষমতাধর মানুষের হস্তক্ষেপ যেহেতু রয়েছে অবশ্যই বিরোধীদলীয় পক্ষও আছে যারা সমান ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু কেন? কী এই অ্যাসাইনমেন্ট? কেনই বা এই অ্যাসাইনমেন্টের জন্য লাখ লাখ ডলারের ফান্ডিং পেলেন প্রফেসর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই বর্তমান সময়ের সাথে ১১৮৭ সালের জেরুজালেমের ইতিহাসের কী যোগসূত্র? আর এই “এলিরিন”-ই বা কী?

এলিরিন” বইটি শেষ করার পরে মনে হচ্ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরো দ্বিগুণ হয়ে গেল। অনেক তথ্যই সহজলভ্য না হওয়ায় ইতিহাসের অনেক অংশ অজানা থেকে যায়, তবে এই “এলিরিন” তার ঘাটতি কিছুটা পূরণ করেছে, হয়ত সামনেও করে যাবে। “এলিরিন”-এর দ্বিতীয় খণ্ডের ইঙ্গিত পাওয়া যায় বইয়ের শেষে। জেরুজালেম শহরের এই রহস্যময়ী গল্পের টানটান উত্তেজনা পাঠকের মনে দাগ কাটবে অবশ্যই।

 

১৪৪ পাতার বইটি হাতে পেতে অর্ডার করুন- রকমারি ডট কমে

 

বইটির ছোট্ট অংশবিশেষ:

“ভালো কথা মনে করালে, এটা কীভাবে ভুলে যাচ্ছিলাম,” বলে দুটো টিকেট প্রফেসর এগিয়ে দিলেন তাদের দিকে, “এই নাও, প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট, তাই বিজনেস ক্লাস করে দিতে বলেছিলাম তোমাদেরকে। ছয়দিন বাদে শুক্রবার রাত ১১টায় প্লেন ছেড়ে যাবে, এল আল এয়ারলাইন্সের টিকেট। আগে কখনও এ এয়ারলাইন্সে চড়া হয়েছে?”

দুজনেই না করলো মাথা নাড়িয়ে। টার্কিশ এয়ারলাইন্সে করে আজকের ফ্লাইটে ল্যান্ড করেছে হাসান, কিন্তু ‘এল আল’ (El Al)-এর ব্যাপারে ভালো করেই জানে সে। ইসরাইলের প্রধান বিমান সংস্থা “এল আল এয়ারলাইন্স” একটি কারণে বিশেষ নামকরা- এল আল পৃথিবীর একমাত্র যাত্রীবাহী এয়ারলাইন্স যাদের বিমানে মিলিটারি লেভেলের অ্যান্টি মিসাইল সিস্টেম আছে, তাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত কমার্শিয়াল এয়ারলাইনার বলা হয় ‘এল আল’-কে। “আকাশপানে” (হিব্রু ‘এল আল’) নামটা সেই হিসেবে মন্দ হয়নি।

হাসান শুনতে পেলো পেছনে অ্যামেলিয়া তার পাশে বসা জেনিফারকে বলছে নিচু স্বরে, “আমার খুব হিংসা হচ্ছে।

কথাটা প্রফেসর পর্যন্ত পৌঁছালো না।

হাসানের এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না- জেরুজালেম যাওয়া পড়ছে তার!

চেয়ার ছেড়ে আবার উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর, বললেন, “আমার এখন ক্লাস আছে। এরপর লাঞ্চ করব, সারাদিন অনেক ব্যস্ত। রাতও তো বেশিরভাগ সময় এখানেই কাটাতে হয়। বাসায় একা মানুষ আমি।”

“আপনার মেয়ে, স্যার?” হাসান জিজ্ঞেস করল, সে জানে প্রফেসরের স্ত্রী আগেই মারা গেছেন, মেয়েটাই তার একমাত্র রক্তের সম্পর্ক।

মেয়ের কথা শুনতেই প্রফেসর অবাক হলেন মনে হলো। কিন্তু কেন?

 

আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ এর বই সমূহ

 

লিখেছেনঃ অনামিকা রিপা

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading