যে কারণে মোহাম্মদ আলীর বইগুলো পাঠককে উজ্জীবিত করবেই !

2021-01-23 যে কারণে মোহাম্মদ আলীর বইগুলো পাঠককে উজ্জীবিত করবেই2

সাধারণ সাহিত্য ও অসাধারণ সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য কি জানেন? খুবই সোজা। একজন নারী যদি গয়নাগাটি না পরেন, সাজুগুজু না করেন তবে তাকে একজন সাধারণ নারী মনে হতে পারে। যদি গয়নাগাটি পরেন, সাজুগুজু করেন তবে তাকে মনে হবে অসাধারণ নারী। তেমনি সাহিত্যও। এখানে গয়নাগাটি হচ্ছে উপযুক্ত শব্দ, নির্ভুল বাক্য, যথাযথ অর্থ, চমৎকার উপমা-উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি। সাজুগুজু হচ্ছে গল্পের বিষয়বস্তুর কাহিনি-বিন্যাস। এ উপাদানগুলো সাহিত্যে খুব দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারলে সেটি একটি অসাধারণ সাহিত্যে পরিণত হয়মোহাম্মদ আলী তেমনই একজন সচেতন লেখক। যার লেখার চমৎকার সাহিত্যরস ইতোমধ্যেই পাঠক-মনে সাড়া ফেলেছে। বিভিন্ন বিষয়ে লেখালিখি করলেও লেখকের উপন্যাস সংখ্যা ৪টি৷ সেগুলো হলো ‘মাধুরিমা‘, ‘আঁধার আয়তন‘, ‘নর্তকী (১ম খণ্ড)‘ ও ‘নর্তকী (২য় খণ্ড)‘।
যাদের অভিযোগ বর্তমানে ভালো সাহিত্য হচ্ছে না তারা মোহাম্মদ আলীর এ ৪টি বই পড়ে দেখতে পারেন—

মাধুরিমা
মাধুরিমা (হার্ডকভার) by মোহাম্মদ আলী

BUY NOW

মাধুরিমা : নারীমুক্তি আন্দোলনের মঞ্চ

মাধুরিমা দেখল, বোমাটা ফাটল বাশার ভাইয়ের পায়ের কাছে। ওর চোখের সামনে মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেন বাশার ভাই।
‘ওহ’ শব্দ করে কেঁদে ফেলল মাধুরিমা।
বোমার শব্দে দিগ্বিদিক ছুটে পালাতে গেল মহিলারা। কেউ কেউ পড়ে গেল নিচে। পূর্ব দিকে আরও কয়েকটা বোমা ফাটল। পুলিশগুলো আরও পিছন দিকে সরে যাচ্ছে। কয়েকজন পুরুষ মানুষ এগিয়ে আসছে মঞ্চের দিকে।
শায়লা আপু আর রুবি আপু মাধুরিমাকে টেনে নামাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিথর পড়ে থাকা বাশার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে নিস্পলক মাধুরিমা।
বাশার ভাইয়ের মৃত শরীর থেকে যেন জন্ম নিচ্ছে জীবন।
মঞ্চের উপরে বোমা ঢিল ছুড়ল কেউ।
রুবি আপু আর শায়লা আপু ছেড়ে দিলেন মাধুরিমাকে। একে টেনে লাভ নেই। এ নড়বে না। ছুটে পালাল দুজন।
মঞ্চ ছেড়ে মাধুরিমা নড়বে কী করে? ওর হৃদপিণ্ড যে থেমে আছে, দম যে বন্ধ হয়ে আছে। একজন মানুষ যে বোমাটার ঠিক পিছে পিছে ছুটে আসছে ওর দিকে। মানুষটাকে যে সে চেনে। শুধু চেনে? ঐ মানুষটাই যে তার হৃদপিণ্ড। ঐ মানুষটাকে বিরহের আঘাত দিয়ে সমাজের দুর্গন্ধ থেকে বের করে আনতে চেয়েই তো আজ এতটা সামনে এসে পড়েছে সে। মঞ্চে এসে পড়েছে। আজও যে মঞ্চ থেকে তাকে বাঁচাতে জীবনের ভয়কে তুচ্ছ করে দৌড়ে আসছে তার প্রিয়তম মানুষ শিবলি।
এই বুঝি ফাটল বোমা। শিবলিও কি বাশার ভাইয়ের মতো? না, আর ভাবতে পারছে না মাধুরিমা। তার চেতনা আর কাজ করছে না। তবু সে টের পেল, শিবলি তার কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে। তাকে নিয়ে শিবলি লাফ দিলো মঞ্চ থেকে। দুজনই পড়ে গেল নিচে।
ঠিক তখনই বিকট শব্দে ফাটল বোমাটা।

কানে তালা লেগে গেল মাধুরিমার। সে শরীরের কোথাও ব্যথা অনুভব করল না। তবে টের পেল, শিবলি গড়িয়ে ওর শরীরের উপরে উঠে ওকে আড়াল করে ফেলেছে। শিবলির পিঠে কেউ যেন বাড়ি মারল লাঠি দিয়ে। গুঙিয়ে উঠল শিবলি। আবার পড়ল বাড়ি। আর শব্দ করছে না শিবলি।
শিবলির গায়ের সেই পরিচিত মিষ্টি গন্ধ মাধুরিমার নাকে লাগল। কিন্তু ও নড়ছে না কেন? শব্দ নেই কেন?
আতঙ্কে মাধুরিমা চিৎকার দিলো, ‘শিবলি?’
কিন্তু ওর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুল না। ওর মুখের সাথে লেপ্টে রয়েছে শিবলির মাথা।
আর কোনো মানুষের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না মাধুরিমা। সবাই কি চলে গেছে? সে শিবলিকে বুকের উপর থেকে সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু শিবলি অচেতন। শক্ত করে আটকে ধরে আছে ওকে।
শক্তি প্রয়োগ করে শিবলির হাত থেকে ছাড়া পেল সে।
উঠে বসল মাধুরিমা। শিবলির মাথাটা দুই হাতে উঁচু করে নিজের কোলের উপর নিল। নিঃশ্বাস নিচ্ছে শিবলি। আনন্দে ওর দুই চোখ ভরে গেল অশ্রুতে। সে এগিয়ে আসতে থাকা পুলিশদের লক্ষ্য করে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘এ্যাম্বুলেন্স। বেঁচে আছে মানুষটা।’
নারীমুক্তি আন্দোলনের এই মঞ্চে পৌঁছুতে প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার উপন্যাসটিকে পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন লেখক।

প্রথম অধ্যায় : আপন গহিনে তাকাও
গহিনে বসত করে আলোর শিশু
দ্বিতীয় অধ্যায় : আলোর শিশু মেলেছে দৃষ্টি
খুলেছে দুয়ার, সৃষ্টি অনাসৃষ্টি
তৃতীয় অধ্যায় : আলোর শিশু খুলিল বাহিরের দ্বার
চিনিল আলেয়া, দেখিল অন্ধকার
চতুর্থ অধ্যায় : আলোর শিশু বলিল কথা, শিখিল হাঁটা
দেখিল অন্ধকার, পায়ে তার বিঁধিল কাঁটা
পঞ্চম অধ্যায় : আলোর যাত্রায় নেই জয় পরাজয়
আলোতে আলোর শিশু আলো হয়ে রয়
মাধুরিমা উপন্যাসটি একটি সাধারণ মেয়ের অসাধারণ হয়ে উঠার গল্প। পাঁচটি অধ্যায়ে লেখক মাধুরিমার বাইরের জীবন ও অন্তর্গত চেতনা বদলের কাহিনি চিত্রের পর চিত্র এঁকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এইসব চিত্রে তিনি উন্মোচন করেছেন একের পর এক পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার গভীর ক্ষত চিহ্নগুলো। রূপ দিয়েছেন, নারীর অব্যক্ত বেদনার চিৎকারকে।
নারী মুক্তিকে লেখক আলোর শিশু বলে তার বাহ্যিক রূপ দিয়েছেন মাধুরিমার মেয়ে শিলুর চিত্র এঁকে। এই উৎপ্রেক্ষা উপন্যাসটিকে দিয়েছে একটি মহৎ সৃষ্টির লক্ষণ।

আঁধার আয়তন
আঁধার আয়তন (হার্ডকভার) by মোহাম্মদ আলী

BUY NOW

আঁধার আয়তন : মানুষ-মনের জটিল অন্ধকারের চিত্রখণ্ড

মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস আঁধার আয়তনে লেখক আঙ্গিক হিসেবে বেছে নিয়েছেন ঢাকা শহরে অতি সফল ব্যবসায়ী জুলফিকার খানের পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের মনের অন্ধকারকে। এই পরিবারে আগুন্তক আসিফ সাহেব একজন ঔপন্যাসিক। তিনি আধ্যাত্মিক গবেষণা করেন। সেই গবেষণার বিষয়বস্তু উঠে আসে তাঁর গল্পে। কেন লেখেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,
‘বিশ্বে প্রতি মুহূর্তে লক্ষ-কোটি ঘটনা ঘটছে। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হয়। মনে হয় একটার সাথে আরেকটার সম্পর্ক নেই। কিন্তু প্রত্যেকটা ঘটনার সম্পর্ক আছে। সম্পর্ক আছে বলেই বিশ্ব টিকে আছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলে এই বিশ্ব সম্পর্কের একটা ঐক্যসংগীত অনুভব করা যায়। আমি এই সংগীত শুনতে পাই। যে সংগীত শুনতে পাই, তার রূপটা প্রকাশের জন্যে আমি বেছে নিয়েছি উপন্যাস। গল্পের মাধ্যমে আমি পাঠককে সেই সংগীত শোনাতে চেষ্টা করি। আমি পাঠকের অবচেতন কানে একটা বাক্য পৌঁছে দিতে চাই। তা হলো, তুমি একা নও, তুমি বিচ্ছিন্ন নও, তুমি একের অংশ, একক বিশ্বসংগীতের তুমি এক বোল।’
আঁধার আয়তনের লেখক মানুষ-মনের জটিল অন্ধকার দিকগুলো সরল ও স্বচ্ছ করে ছোট ছোট চিত্র এঁকেছেন। তার একটি উদাহরণ দেখানো যেতে পারে—

সকাল এগারোটায় খান পরিবারে প্রবেশ করলেন আসিফ সাহেব। বিশাল ড্রয়িংরুমে বাসার সবাই মিলে আশ্চর্য এক নাটক করছিল তখন।
রুমের মাঝখানে ভয়ংকর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সালমান। তার হাতে উঁচিয়ে ধরা তরকারি কাটার ধারালো চাকু। জুয়েল, ইরা, আয়েশা—এরা তিনজন সোফার পাশে দাঁড়িয়ে। তাদের চোখে মুখে মৃত্যুর আতংঙ্ক। সালমানের পিছনে দাঁড়িয়ে জুলফিকার সাহেব আর জুলিয়ান।
জুলফিকারের হাতে একটা ইনজেকশন দেখতে পেলেন আসিফ সাহেব।
জুলফিকার সাহেব বারবার ‘সালমান’ ‘সালমান’ বলে হুংকার দিচ্ছেন। তিনি এক পা এগিয়ে আবার পিছিয়ে যাচ্ছেন ভয়ে।
ডাইনিংরুমের কাছে পর্দা সামান্য ফাঁক করে নাটক দেখছে কাজের মেয়েরা আর বিদেশি বাবুর্চি।
সালমান চাকু বাগিয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ওর মায়ের দিকে। আয়েশা তখন চলে যাচ্ছেন সোফার পিছনে। সোফাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে আতংঙ্কিত মা আর ভয়ংকর ছেলে।
মায়ের সাথে না পেরে সালমান এবার আক্রমন করতে যাচ্ছে জুয়েলকে।
দরোজার কাছে দাঁড়িয়ে নাটক দেখছিলেন আসিফ সাহেব।
সালমানের টকটকে লাল চোখে খুনের তৃষ্ণা দেখতে পেলেন তিনি। আয়েশা, জুয়েল আর ইরার চোখে দেখতে পেলেন মৃত্যু-আতঙ্ক। না, এটা নাটক নয়। নাটকে এতটা নিখুঁত অভিনয় করা অসম্ভব।
আতঙ্কিত জুয়েল পড়ে গেল সোফার পেছনে।
এবার অট্টহাসি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো সালমান।
আর দেরি করা যাবে না। নিজের কর্তব্য ঠিক করে ফেলেছেন আসিফ সাহেব। তিনি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে হা হা করে প্রচণ্ড হাসিতে ফেটে পড়লেন।
সবাই তাকিয়েছে এবার আসিফ সাহেবের দিকে। সালমান ও তাকাল। সালমানের দিকে তাকিয়ে হা হা করে হাসতে লাগলেন তিনি। হাসির সাথে হাততালি দিতে শুরু করলেন।
ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন সালমানের দিকে।
জুয়েল উঠে সরে গেল সালমান থেকে দূরে। হাঁপাচ্ছে সে।
সালমান ভ্রু কুঁচকে দেখছে আসিফ সাহেবকে।
আসিফ সাহেব হাসছেন আর হাততালি দিচ্ছেন। তিনি হাততালি বন্ধ করে দুই হাত প্রসারিত করে ধরলেন সালমানের দিকে। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, ‘সাবাস সালমান। সাবাস, জিতে গেছো তুমি।’
আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটল সালমানের। সে হাত থেকে চাকু ফেলে দিয়ে এগিয়ে এলো আসিফ সাহেবের দিকে। আসিফ সাহেবের দুই হাতের মধ্যে চলে এলো সে।

আসিফ সাহেব সালমানকে বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, ‘সাব্বাস সালমান। জিতে গেছো তুমি।’
সালমান আসিফের কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছে এখন।
অবাক চোখে দৃশ্যটা দেখল সবাই। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। বেঁচে যাওয়ার আনন্দে ঝলমল করছে জুয়েলের মুখ।
কিন্তু মুখ অন্ধকার করে রেখেছেন জুলফিকার সাহেব। তিনি ইঞ্জেকশন হাতে এগিয়ে আসছেন সালমানের দিকে।
চোখের ইশারায় জুলফিকার সাহেবকে না করে দিলেন আসিফ সাহেব।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও আসিফের কথা মেনে নিলেন জুলফিকার সাহেব। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। তিনি হারিয়ে দিতে আসিফ সাহেবকে বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। অথচ প্রথম দৃশ্যেই পরাজয় মেনে নিতে হচ্ছে তার।
তিনি পিছন ফিরে চলে গেলেন দোতলায়।
আসিফ সাহেব অন্যদেরকেও ইশারায় চলে যেতে বললেন। তার কাঁধে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদছে সালমান।
সবাই চলে গেলে আসিফ সাহেব ছেড়ে দিলেন সালমানকে।
ওর কান্না থেমে গেছে এখন। মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
আসিফ সাহেব বললেন, ‘তুমি তো দুর্দান্ত খেলোয়াড় হে। এইসব কাঁচা খেলোয়াড়ের সাথে তোমার খেলা মানায় না। আমার সাথে খেলবে?’
‘কী খেলা?’ চোখ তুলে তাকাল সালমান। চোখে লালচে ভাবটা আর নেই। তার বদলে সারল্য দেখতে পেলেন আসিফ সাহেব।
তিনি বললেন, ‘আমার বয়স হয়ে গেছে বাবা। শক্তিতে তোমার সাথে পারব না। তুমি রাজি থাকলে বুদ্ধির খেলা খেলতে পারি আমরা।’
‘আমার তো বুদ্ধি নাই। বাবা বলেন, আমার মাথায় শুধু গোবর। পরীক্ষায় পাশ করতে পারি না’
‘কোন পরীক্ষায় পাশ করতে পারোনি?’
‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম। ফার্স্ট ইয়ারে পাশ করতে পারিনি। এখন আর যাই না ক্লাসে।’
‘ধুর! আইনস্টাইন যে এত বড় বিজ্ঞানী, সেও পরিক্ষায় ফেল করত। এইসব স্কুলের পাশ ফেল দিয়ে কারো বুদ্ধি বিচার করা যায় না। তোমার চাকু ধরার কৌশল দেখেই বুঝেছি, তোমার বুদ্ধি অসাধারণ।’
‘তাই? খেলব তাহলে। কী করতে হবে?’
‘কিছু করতে হবে না। একটা প্রশ্ন করব তোমাকে। তুমি প্রশ্নটার উত্তর দেবে। এখন নয়। আগামীকাল সন্ধ্যায় উত্তর দিবে। উত্তর যদি পছন্দ হয়, তাহলে তখন তুমি আমাকে একটা প্রশ্ন করবে। আমি তার উত্তর দিব পরদিন সন্ধ্যায়। কেমন?’
‘তাহলে তো অনেক সময় পাওয়া যাবে। আপনার প্রশ্নটা কী?’
‘তার আগে তুমি তোমার মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসো, আমার থাকার ঘর কোনটা। তারপর আমার সাথে হাত লাগিয়ে এইসব জিনিসপত্র গুছিয়ে দেবে আমার ঘরে। পারবে না?’
‘পারব। আমি মাকে বলে আসি।’
সালমান উপরে চলে গেলে আসিফ সাহেব ওনার নোটবুকটা বের করলেন। লিখলেন, “প্রশংসা একটি আলোশক্তি। প্রশংসা দিয়ে কালো শক্তিকে দমন করা যায়।”
আধ্যাত্মিকতার মতো গভীর বিষয় নিয়ে কত সরল ও থ্রিলারধর্মী উপন্যাস লেখা যায়, তা জানতে পাঠককে শুধু একবার বইটা চোখের সামনে ধরতে হবে। বইটা মুহূর্তে পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে গল্পের অচেনা জগতে।

নর্তকী (১ম খণ্ড)
নর্তকী-১ম খণ্ড (হার্ডকভার) by মোহাম্মদ আলী

BUY NOW

নর্তকী (১ম খণ্ড) : পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বুকে মিথ্যা প্রেমের আগুন জ্বালানোর উপাখ্যান

পাপিয়া খালার আশ্রয়ে বদলে গিয়েছিল পারুল।
পাপিয়া খালার চোখের আগুণ তখন পারুলের চোখে জ্বলতে শুরু করেছিল। খালা খুশি হয়ে বলেছিল, ‘তুই পারবি পারুল। তবে আরও কিছু ব্যপার বুঝতে হবে। বলতো সোনার এত দাম কেন?’
‘কেন?’
‘কারন সোনা দুস্প্রাপ্য। তুই এখন রুপার মতো দুস্প্রাপ্য। তোকে আরও দুস্প্রাপ্য হতে হবে’
‘কীভাবে?’
‘মিথ্যার দেয়াল তৈরি করে।’
‘মিথ্যা?’
‘হ্যাঁ মিথ্যা। মিথ্যা প্রেমের দেয়াল। নারী আর পুরুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ—কুত্তা আর কুত্তির শারীরিক আকর্ষণের মতোই। ওটা প্রাকৃতিক। যেটাকে আমরা বলি প্রেম, সেটা প্রাকৃতিক নয়। প্রেম মানুষের বানানো। নারীর শরীর ভোগের আনন্দ বাড়াতে প্রাচীনকালের কবিসাহিত্যিকরা নারীকে নিয়ে নানান কল্পিত সাহিত্য রচনা করেছিল। তার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। যুগের পর যুগ নারীর শরীর নিয়ে, নারী পুরুষের মিলন নিয়ে কল্পিত সাহিত্যের চর্চায় মানুষের মগজে এই প্রেম এখন স্থায়ী হয়ে গেছে। এই মিথ্যা শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে তোর। মিথ্যার শক্তি অপরিসীম। এতই অপরিসীম যে, প্রেমকে এখন স্বর্গীয় বলা হচ্ছে’।
‘প্রেম মিথ্যা?’ পারুলের বিশ্বাস হয় না পাপিয়া খালার কথা।
‘হ্যাঁ, মিথ্যা। কত বড় বড় মিথ্যাকে আমরা সত্য হিসেবে সম্মান করি জানিস? এই ধর একটা দেশের কথা বলি। মনে কর আমেরিকা যেতে চাস তুই। তোকে যেতে দেবে না। নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে ভিসা পেলে যেতে পারবি। কিন্তু সেখানে তুই বিদেশি। কেন? দুনিয়া তো একটাই। যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারবি না কেন? কারন আমেরিকান মানুষেরা তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কিছু নিয়ম বানিয়েছে। সব দেশই তাই করেছে। নিজেদের স্বার্থের জন্যে গড়ে তুলেছে রাষ্ট্র। এখন আমরা দেশ বা রাষ্ট্রকে সত্য মনে করি। আমাদের মগজে ঢুকে গেছে এটা। দশ বিশ হাজার বছর আগে এটা মিথ্যা ছিল। এখন রাষ্ট্র সত্য হয়ে গেছে। হয়তো মানুষের ভালর জন্যেই হয়েছে। কিন্তু জিনিসটা মিথ্যা।’
‘হায় আল্লাহ, রাষ্ট্রও তাহলে মিথ্যা?’
‘হ্যাঁ, আমরা মিথ্যার সাগরে ডুবে আছি। আর সব বড় বড় মিথ্যাগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে পুরুষ মানুষেরা। কারন মিথ্যাগুলো তৈরি করেছে তারা। মেয়েদের হাতে আছে একটাই অস্ত্র। প্রেমের ফাঁদ। মিথ্যা প্রেমের ফাঁদ’।
‘ফাঁদ? সেই জন্যে দেয়ালের কথা বলছেন?’

‘হ্যাঁ, মিথ্যা প্রেমের দেয়াল। তোর শরীরের প্রতি আকর্ষিত হবে পুরুষেরা। শরীর পেয়ে গেলে তোর আর দাম নেই। তাই শরীরের বাইরে দেয়াল তৈরি করতে হবে। স্তরে স্তরে অনেকগুলো দেয়াল তৈরি করতে হবে। এইসব বই পুস্তক পড়ে তোর যে জ্ঞান হবে, সেটা হবে একটা শক্তিশালী স্তর। তোর হাসি বা কান্না হবে আরেক স্তর। তোর ব্যবহার, আচরণ, রুচি হবে আরেক স্তর। সবার বাইরে প্রকাশিত শক্তিশালী স্তরটা হবে তোর নাচ। তুই একজন শিল্পী। তুই নাচবি, পুরুষেরা আকর্ষিত হবে। তোকে সম্মান করবে, পয়সা দেবে। বাইরের স্তরেই রাখবি বেশিরভাগ পুরুষদের। যাদের আরও বেশি পয়সা আছে, দিতে চায়, তাদের ঢুকতে দিবি দ্বিতীয় স্তরে। মানে, কথা বলবি, আচরণ দেখাবি, রুচি দেখাবি। আরও বেশি পয়সা দিলে হাসি বা কান্নার সহযোগী বানাবি। আরও বেশি দিলে তোর জ্ঞানের স্তর দেখাবি। জ্ঞানের স্তর ভেদ করে শরীরে পৌঁছুলে তোর দাম শেষ। শিল্পী স্তর থেকে জ্ঞানের স্তরের অদৃশ্য দূরত্বটাই হলো প্রেম। এই দূরত্ব যত বেশি হবে, তুই ততই দুস্প্রাপ্য হবি পুরুষের কাছে। কাজেই স্তরগুলোর দূরত্ব বাড়াতে হবে এবং সঠিক দাম না পেলে কাউকে এক স্তর থেকে আরেক স্তরে যেতে দিবি না।’
পাপিয়া খালার আশ্রয়ে, উপদেশ ও শিক্ষায় দুই বছরেই অনেক পরিণত হয়ে উঠেছিল পারুল। সে সমস্ত মনোযোগ ঢেলে দিয়ে নিজেকে তৈরি করছিল পাপিয়া খালার স্বপ্নের রূপ দিতে। একজন শ্রেষ্ঠ নর্তকী হতে।
নর্তকী প্রথম খণ্ড একটি এপিকধর্মী উপন্যাস। পারুল নামের একটি মেয়ে—যে কৈশোরে মা ও দুই বোনের সঙ্গে গণধর্ষণের শিকার হয়। বাবা লজ্জায় আত্মহত্যা করেন। মা মেয়েদের নিয়ে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসে বিপদে পড়েন। জীবনের চরম গ্লানি মেনে নিয়ে একজন বেশ্যা হবার পথে এগিয়ে যাচ্ছিল পারুল। তাকে উদ্ধার করেন পাপিয়া নামের একজন মহিলা। যার অতীত ছিল পারুলের মতোই। তিনি পারুলকে প্রস্তুত করেন পুরুষতান্ত্রিকসমাজের বুকে মিথ্যা প্রেমের আগুন জ্বালিয়ে ছারখার করে দিতে।
পারুল তার রূপ আর নাচের শিল্পকে ব্যবহার করে ছারখার করে দেয় পুরুষদের। আগুন জ্বালায় কিন্তু ধরা দেয় না কারো কাছে। ‘অভাবের চেয়ে বড় পাপ কিছু নাই’ এই মন্ত্রে সে অর্জন করে বিপুল অর্থ। সেই অর্থ সে ব্যবহার করে মেয়েদের শিক্ষায় আর অসহায় মেয়েদের জীবন বাঁচাতে। অতীতের সকল যন্ত্রণার প্রতিশোধ নেয় সে। এইসব করতে গিয়ে সে সত্য প্রেমের পুরুষদের দেখে বিচলিতও হয়। তার মিথ্যা ভালোবাসায় একজন হয়ে উঠে কবি ও দার্শনিক। আরেকজন তার ছলনার আঘাত সহ্য করতে না পেরে হয়ে যায় সন্ন্যাসী, সাধক পুরুষ।
বাংলাদেশ ও ওমানের বিরাট পটভূমিতে একজন নর্তকীর জীবন যুদ্ধের গল্পে এসে যায় কাব্য, দার্শনিকতা, সুফি মনোভাব, রাজনীতি ও দুর্নীতিআক্রান্ত সমাজের নানান চিত্র।
এরকম একটি উপন্যাস পাঠকের সামনে নিয়ে আসায় সার্থক লেখককে শুধু ধন্যবাদ দিলে চলে না। শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াতে হয়।

নর্তকী (২য় খণ্ড)
নর্তকী দ্বিতীয় খণ্ড (হার্ডকভার) নর্তকী সিরিজ by মোহাম্মদ আলী

BUY NOW

নর্তকী (২য় খণ্ড) : ভালোবাসার মাতাল খেলা

রাত একটা বাজে। তালালের রিডিংরুমের বারান্দায় আলো জ্বলছে এখনো। নিচে ঘুমিয়ে পড়েছে উট। উপরে পাম গাছের মাথা ছাড়িয়ে অনেক উপরে আকাশে হাসছে পরিপূর্ণ চাঁদ। বারান্দায় পাশাপাশি ঝলমলে দুটো প্রাণ বসে আছে চেয়ারে। তালালের মুঠোর মধ্যে পারুলের হাত।
পারুল বলল, ‘বলো তো ভালোবাসা কী?’
‘নেশা’, বলল তালাল। ‘চোখের নেশা, কথার নেশা, হাসির নেশা, শিল্পের নেশা, মগ্নতার নেশা, আলোর নেশা, শরীরের নেশা’।
‘না’, বাধা দিলো পারুল। সে বলল, ‘নেশা নয়। নেশার দূরত্ব হলো ভালোবাসা’।
‘যেমন?’
‘তোমার আর আমার মাঝে দূরত্ব ছিল। তাই তোমার আমাকে দেখার নেশা, নাচ দেখার নেশা, তাকিয়ে থাকার নেশা। দূরত্ব না থাকলে এই নেশা কেটে যেত’।
‘এখন তো দূরত্ব নেই। তবু নেশা আছে।’ বলল তালাল।
পারুল বলল, ‘দূরত্ব এখনো আছে। আরও কাছাকাছি এলে, মিলন হলে নেশা কেটে যাবে’।
‘তাহলে দূরত্ব থাকুক।’
‘আমিও চাই দূরত্ব থাকুক। তোমার ভালোবাসা হারাতে চাই না আমি।’
‘তাহলে মাহার কথায় চলে এসেছো কেন?’
‘মাহাকে পছন্দ হয়েছে আমার। অধিকার আদায়ের আন্দোলন ভালো লাগে আমার’।
‘ও প্রতারণা করেছে আমার সাথে।’
‘না, প্রতারণা নয়। ওটা কৌশল। ভালোবাসা ফিরে পেতে যুদ্ধ করেছে ও।’
‘ভালোই তো বাসতাম এত দিন। তাতে চলল না কেন?’
‘ভালবাসতে না। দায়িত্ব পালন করতে। কিন্তু ও চায় ভালোবাসা। যা তুমি আমাকে দিয়েছো।’
‘আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। যা হবার তাই হয়েছে।’ ব্যাখ্যা দিলো তালাল।
‘তুমি ইচ্ছে করে হোটেলে গিয়েছো। বিয়ার খেয়েছো। তারপর আমার প্রেমে পড়েছো। এবার ইচ্ছে করে হোটেলে যাওয়া বন্ধ করো।’
‘তুমি তাহলে হোটেলে নাচা বন্ধ করো। দেশে চলে যাও।’
‘এটা আমার প্রফেশন। আমি টাকার জন্যে এটা করি। শিল্পের জন্যে নাচ করি।’
‘টাকা আমি পাঠিয়ে দিয়েছি। মুক্তিপণের জন্যে তোলা এক কোটি টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি তোমার একাউন্টে।’ বলল তালাল।
চমকে উঠল পারুল। এত টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে তালাল? কথা বলতে পারছিল না সে।
তালাল বলল, ‘তুমি দেশে চলে যাও। যখন যত টাকা লাগবে, জানাবে আমাকে। পাঠিয়ে দেব।’
পারুল বলল, ‘একটা মাস। থার্টি ফার্স্ট নাইটে নাচের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে চাই আমি।’
‘তাহলে এই একটা মাস আমাকে হোটেলে যেতে দাও। নাচ দেখি তোমার।’

‘না, মন্ত্রী হচ্ছো তুমি। হোটেলে যাবে না আর।’
‘তাহলে তুমিও প্রতিযোগিতা বাদ দাও। দেশে চলে যাও।’
‘আমার কষ্ট হবে। শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার একটা সুযোগ এটা।’
‘তুমি শিল্পী। এতে স্বীকৃতির কী দরকার? ঢাকায় জলসাঘর তো বানাচ্ছোই।’
‘ঠিক আছে। আমি চলে যাব। তুমি আর হোটেলে যাবে না।’
‘ঠিক আছে। যাব না।’ বলল তালাল।
‘মাহাকে ক্ষমা করে দাও। ভালোবাসা দাও ওকে।’
‘দিলাম।’
‘লক্ষ্মীসোনা আমার।’ বলল পারুল। ‘এবার তোমার নতুন কবিতা শোনাও আমাকে।’
‘অনেক রাত তো হলো। ঘুমাবে না?’ বলল তালাল।
‘না। কাল সকালে আমি হোটেলে ফিরে যাব। এই সময়টুকু ঘুমিয়ে নষ্ট করব না।’
‘মাহা তোমাকে ঘর ছেড়ে দিয়ে ফাতিমার ঘরে গিয়েছে কিন্তু।’
‘জানি। মাহা বলেছে আমাকে। ও আমাদের মিলন চায় হয়ত। মিলনের মধ্য দিয়ে আমাদের ভালবাসারও শেষ চায় হয়ত। কিন্তু আমি তা চাই না। অতি নৈকট্যে পরিশ্রান্ত হতে চাই না আমি। এই রাতটাকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত হিসেবে রাখতে চাই। আমার স্মৃতির ক্যালেন্ডারে জ্বলজ্বল করে জ্বলবে একটা তারিখ। ডিসেম্বর দুই, দুই হাজার আঠারো। এবার তুমি কবিতা শোনাও তালাল।’
তালাল ওর কবিতার খাতা নিয়ে এলো। আকাশের গায়ে চাঁদ এখন হেলান দিয়ে আছে। তালালের বুকে পড়ছে চাঁদের মখমলে আলো। পারুল কাঁত হয়ে তালালের বুকে মাথা রেখে মুখে চাঁদের আলো মেখে নিচ্ছে। তালাল তার নতুন কবিতা পড়ছে।
কবিতার মগ্নতায় পারুলের চোখ ভিজে উঠল। মাহাকে কথা দিয়েছে সে, তালালকে হোটেলে যাওয়া বন্ধ করে দেবে। পেরেছে সে। তালাল মেনে নিয়েছে তার কথা। মানুষটা এতোটাই ভালোবাসে তাকে, ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার যুক্তিতে দূরত্ব মেনে নিয়েছে সে। নিজেকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে হল ওর। এই মিথ্যা দুনিয়ায় সত্য ভালোবাসা সে কম পেল না। কিন্তু সব ভালোবাসা দূরে ঠেলাই যে তার নিয়তি। সে যে নর্তকী। সে কাউকে ভালবাসবে না। শুধু ভালোবাসা ভালোবাসা খেলবে।
ওমানের পটভূমিতে লেখা নর্তকী দ্বিতীয় খণ্ড যেন প্রথম খণ্ডকে ছাপিয়ে উচ্চতার শিখরে উঠে গেল। প্রতিটা চরিত্র তাদের নিজ নিজ অবস্থায় এক একজন পরিণত মানুষ হয়ে উঠল। তাদের সাথে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়ে গেল পাঠকের। এই উপন্যাস পড়ার দীর্ঘকাল পরে পাঠক হয়ত ভুলে যাবেন কাহিনি। কিন্তু ভুলতে পারবেন না কয়েকটি চরিত্রকে। পারুল, তালাল, শাহিন, রবি—এসব চরিত্র চিরদিনের পরিচিত মানুষ হয়ে থাকবে পাঠকের হৃদয়ে।
বাংলাসাহিত্যে নর্তকী প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড স্থায়ী আসন পাবে, তাতে সন্দেহ নাই।

মোহাম্মদ আলী এর বই সমূহ

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading