মার্ক টোয়েন সম্পর্কিত ৮ টি তথ্য যা আপনার মনকে নাড়া দেবেই

cover twain

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতে, মার্ক টোয়েনের হাকলবেরি ফিন উপন্যাসটির হাত ধরেই আমেরিকান আধুনিক উপন্যাসের অগ্রযাত্রা শুরু। অনেক জ্ঞানী-গুণী সাহিত্য সমালোচকও তাই মনে করেন। লেখক মার্ক টোয়েন ছিলেন বৈচিত্রময়। তেমনই তার বাস্তব জীবনেও  বৈচিত্রের অভাব নেই। আসুন জেনে নেই এমন কিছু তথ্য।

(১) বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিলো ক্ষীণ

মার্ক টোয়েনের মূল নাম স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লিমেন্স। তার উপন্যাসের ডানপিটে চরিত্রগুলোর মতই তিনি চঞ্চল ছিলেন বলেই বোধ হয় পৃথিবীতে আসার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিয়েছিলেন! নির্ধারিত সময়ের দু মাস আগেই তাকে তার মায়ের পেট কেটে বের করা হয়। অপুষ্ট শরীরের সেই শিশুটির বেঁচে থাকা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। তবে তার মত যোদ্ধাকে আটকিয়ে রাখবে কে! অবশ্য সাত বছর বয়স পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত রুগ্ন ছিলেন। সাধারণ অসুখেই ভেঙে পড়তেন।

মার্ক টোয়েন এর জন্মস্থান

রকমারি ডট কম-এর বেস্ট সেলার (লিঙ্ক এ ক্লিক করুন) সকল বই দেখুন

(২) উদ্বাস্ত’র মত জীবন

১৮৪৬ সালে তার বাবা মারা যান। তখন তার বয়স মাত্র ১১। তখন থেকেই শুরু তার বৈচিত্রময় জীবন সংগ্রামের। কাজ নেন একটি খবরের কাগজে। সেখানে কাজ করার ফাঁকে লিখে ফেলেন কিছু ব্যঙ্গাত্মক ছোট গল্প। সেটাই সাহিত্যে তার প্রথম উদ্যোগ। বেশি দিন এ কাজ তার ভালো লাগলো না। তাই ১৮৫৩ সালে শহর ত্যাগ করেন। পরবর্তী কয়েক বছর নির্দিষ্ট ভাবে কোথাও ঘাঁটি গাড়েন নি। ঘুরেছেন নিউ ইয়র্ক সিটি, ফিলাডেলফিয়া এবং কেওকুক এর পথে ঘাটে।

১৫ বছর বয়সের মার্ক টোয়েন

(৩) স্টিমারের চালক এবং বিয়োগান্তক পরিণতির মুখোমুখী

১৮৫৭ সালে যোগ দেন একটি স্টিমারের শিক্ষানবীশ চালক হিসেবে। মিসিসিপি নদীর দরাজ বুকে কাটতে থাকে তার সময়। প্রাণ ভরে উপভোগ করতে থাকেন নতুন মানুষ, নতুন প্রকৃতি,নতুন অভিজ্ঞতা। সেই বছরেই, পেনিসেলভেনিয়া নামক একটি স্টিমারে কর্মরত অবস্থায় দেখা পান তার ছোট ভাই হেনরির। কিন্তু এই আনন্দময় শুভযাত্রা বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। মুখোমুখি হন প্রবল ঝড়ের। খুব কাছ থেকে দেখেন মৃত্যুকে। সে যাত্রা রক্ষা পান, কিন্তু কিছুদিন পর একটি বয়লার বিস্ফোরণে তার ভাই হেনরি রক্ষা পান নি।

১৮৫৭ থেকে ৬১ সাল পর্যন্ত ছিলেন স্টিমারের চালক, এ সময়ের মাঝেই জীবনের আরেকটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখী হয়েছিলেন

শোকে অভিভূত হলেও কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি। ১৮৫৯ সালে পেয়ে যান বহু আকাঙ্খিত স্টিমার পাইলটের সনদ। ১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধ লাগবার আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। পরবর্তীতে যুদ্ধে যোগ দেন।

Whenever you find yourself on the side of the majority, it is time to pause and reflect- Mark Twain

(৪) যেভাবে মার্ক টোয়েন হলেন 

তিনি ছিলেন ম্যারিয়ন রেঞ্জার্স নামক একটি মিত্রবাহিনী তে। সেখানে অবস্থা মোটেও সুবিধের ছিলো না। পশুর মত খেটে ড্রিল করতে হতো, সে তুলনায় রেশন ছিলও নগন্য। তার ওপর গুজব ছড়ায় ইউলিসিস গ্র্যান্ট পরিচালিত ইউনিয়ন ফোর্স তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। বিশাল তাদের অস্ত্রসম্ভার, বিপুল তাদের শক্তি। এর ফলে ম্যারিয়ন রেঞ্জার্সের সৈন্যরা পিছু হটতে থাকে। একসময় প্রায় সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তিনিও ভাবলেন, অনেক হয়েছে বেলা/এবার সাঙ্গ কর যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। মিসৌরি ছেড়ে গেলেন। সাথে নিলেন ছোট ভাই অরিয়নকে। ভার্জিনিয়া সিটিতে পৌঁছে একটি মনের মত কাজ পান। আবারও সংবাদপত্রে, রিপোর্টার হিসেবে। এখান থেকেই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশের শুরু হলো। তিনি নবজন্ম লাভ করলেন। লেখা শুরু করলেন মার্ক টোয়েন নামে। পিতৃপ্রদত্ত নামটি হারিয়েই গেলো একদম!

১৮৭০ সালের মার্ক টোয়েন

(৫) সোনার খোজে টোয়েনের অ্যাডভেঞ্চার

কিন্তু বেশিদিন কিছুতে থিতু হয়ে থাকা কি এই চিরকিশোর মানুষটিকে মানায়? ১৮৬৪ সালে কোন এক ঝামেলার সূত্র ধরে একজন সংবাদকর্মীকে ডুয়েলে আহবান করেন। তবে লজ্জাষ্কর ব্যাপার হলো, তিনি ডুয়েলের আগেই মানে মানে কেটে পড়েন। আবারও ভিন্ন পরিবেশ। নতুন কাজ। এবারও সংবাদপত্রেই, সান ফ্রান্সিসকোয়। তবে এখানেও কিছুদিনের মধ্যেই বিবাদে জড়িয়ে পড়েন এবং চাকুরিচ্যুত হন। এর মাঝে তার এক জেলঘুঘু বন্ধুর সাথে দেখা হয় তার। তার কাছ থেকে শোনেন ক্যালিফোর্নিয়ার মাটিতে নাকি টনকে টন সোনা মজুদ আছে। আবারও নিজেকে প্রস্তুত করেন নতুন এ্যাডভেঞ্চারের জন্যে। তবে সেখানে পৌঁছে দেখেন খুব কম খননকারীই সেখানে আছেন তখন। বেশিরভাগই সুবিধে করতে না পেরে পাততাড়ি গুটিয়েছে। এ অবস্থা দেখে হতাশ তিনি একটি বারে গেলেন তৃষ্ণা নিবারনের জন্যে। সেখানে এক অদ্ভুত মজার গল্প শোনেন। এক বুড়ো নাগরিক বলছিলেন একটি “লাফ দেয়া ব্যাংদের প্রতিযোগিতা” সম্পর্কে। গল্পটি তার ভারী পছন্দ হলো। সান ফ্রান্সিসকোতে ফিরে একটি চিঠি পেলেন এক লেখক বন্ধুর কাছ থেকে। পত্রিকায় লেখা দেয়ার জন্যে। সেই ব্যাঙ এর গল্পটিই পাঠিয়ে দিলেন। “Jim S

miley and His Jumping Frog” গল্পটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলো। এভাবেই শুরু রস সাহিত্যের রাজা মার্ক টোয়েনের।

আপনি জানেন কি?
অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলবেরি ফিন প্রকাশিত হবার পরপরই বেশ বিতর্ক তৈরী হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো
এই বইয়ে মানবিকতার অভাব আছে। উনবিংশ শতাব্দীতে আবার বিতর্কিত হয়েছিলো এই কারনে যে
বইতে বর্ণবাদের বিপক্ষে বলা হয়েছে ।

(৬) বিশ্বসেরা উপন্যাসের প্রেরণা এক বাস্তব চরিত্র!

অবশেষে ১৮৭৬ সালে সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটলো! মার্ক টোয়েন রচনা করলেন তার সেরা উপন্যাস Adventures of Huckleberry Finn এক অভিযান পিপাসু কিশোরের গল্প, যে তাদের কিশোর ক্রীতদাসকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতো মিসিসিপি নদী ধরে। হাকলবেরি ফিন চরিত্রটি কিন্তু সত্যিকারের একজন কে অবলম্বন করেই তৈরি। নাম তার টম ব্ল্যাংকেনশিপ। সেই শৈশবে, হ্যানিবাল শহরে তাকে দেখেছিলেন মার্ক টোয়েন। সে ছিলো দরিদ্র পরিবারের ছেলে। তার বাবা ছিলো এক মদ্যপ শ্রমিক। দেখতে রুগ্ন, নোংরা কাপড়-চোপড় পরিহিত সেই ছেলেটির মুখে সবসময় একটি দুষ্টু হাসি লেগেই থাকতো। পরে অনেক খুঁজেও আর সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুটি কে খুঁজে পান নি তিনি।

তবে বইটি প্রকাশ হবার কিছুদিনের মধ্যেই তা ব্যাপক বিতর্কিত হয়। লাইব্রেরী এবং স্কুল থেকে সব কপি তুলে নেয়া হয়। অভিযোগ গুলো ছিলো গুরুতর। অতি রূঢ় সংলাপ, মানবিকতার অভাব ইত্যাদি ভারী ভারী কথা। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এটির বিপক্ষে নতুন করে বিতর্ক ওঠে বর্ণ বৈষম্যের অভিযোগে। এদিকে আবার কিছু লেখক সমালোচক দাবী করলেন এটি বর্ণবাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাহলে বুঝুন ঠ্যালা!

(৭) ব্যর্থ ব্যবসায়ী

লেখালেখিতে বিপুল সাফল্য অর্জন করার পর তিনি ভাবলেন এবার তবে কিছু বানিজ্য করা যাক! এবং বরাবরের মত এবারো মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিলো না পথটা। কুসুমাস্তীর্ণ ছিলো না, না বলে “কন্টকাকীর্ণ” বলাটাই শ্রেয় হবে! বিশেষ করে টাইপ রাইটার মেশিনের বিনিয়োগটি তো তাকে একদম দেউলিয়াই করে দিয়েছিলো! অবশেষে তিনি নিজেও নেমে পড়লেন আবিষ্কারের নেশায়। যেমন, নতুন ধরণের স্ক্র্যাপবুক, ইলাস্টিক স্ট্র্যাপ ইত্যাদি। এর কিছু সফল হয়েছিলো, কিছু হয় নি। তবে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন তৎকালীন ক্রেইজ টেলিফোনের ওপর বিনিয়োগ না করে। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলকে না করে দেয়ার আফসোসে নিশ্চয়ই তাকে পুড়তে হয়েছে বাকিটা জীবন!

১৮৯১ সাল পর্যন্ত তিনি ২৫ কক্ষ বিশিষ্ট এক বিশাল বাড়িতে থাকতেন। ব্যাংক কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হবার পর তিনি স্বল্প খরচে থাকার জন্যে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা দেবার কথা ভাবেন। জাহাজে চড়ে বসার পর তিনি ভাবলেন বক্তৃতা দিয়ে বেড়ালে কেমন হয়! এতে কিছু টাকা পাবেন, যা দিয়ে তার দেনা শোধ করতে পারবেন। এই কাজে অবশ্য তিনি বিপুল সফলতা পান।

পরিবারের সাথে মার্ক টোয়েন

(৮) রক্তের অধিকারী বেঁচে নেই কেউইই

পৃথিবীতে তার রক্তের অধিকারী কেউ বেঁচে নেই এখন। তার চারটি ছেলেমেয়ে হয়েছিলো। পুত্রসন্তান শিশু অবস্থাতেই মারা যায়। কন্যা সন্তান দুটিও মারা জয়ায় ২০ না পেরুতেই। কন্যা ক্লারা মারা যান ১৯৬২ সালে। তার একমাত্র কন্যা নিনার কোন সন্তান হয় নি। রক্তের সম্পর্কে কেউ না থাকলেও কালির সম্পর্কে তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য গুনগ্রাহী। মার্ক টোয়েন বেঁচে আছেন, চিরদিন থাকবেন তার লেখা এবং বক্তৃতার জন্যে।

বিচিত্র মার্ক টোয়েনের বৈচিত্রময় জীবনের কথা তো জানলেন এবার এক নজরে দেখে নিন তার সকল সাহিত্যকর্ম 

আরো দেখুনঃ 
আত্মজা ও একটি করবী গাছ: মূলভাব ও ফিরে দেখা  
কেন লিখি – শাহাদুজ্জামান
কি হতো আপনার পেন নেম, ভেবেছেন??

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png