২০২১ বইমেলা উপলক্ষ্যে নিশাত ইসলামের দুটো অসামান্য উপন্যাস ‘মনে পড়ে তোমাকে’ ও ‘মায়া’

মনে পড়ে তোমাকে ও মায়া

বৃষ্টির অবিরাম ছন্দে যখন প্রকৃতি ভিজে একাকার হয় তখন জানালার পাশে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটির মন হাহাকার করে একটুখানি ভেজার আশায়। যে মানুষটি আজ তাঁর মন ভিজিয়ে শীতল করতে পারতো, বর্ষার চালতে ফুল এনে খোপায় গুজে দিতো, বৃষ্টির ছন্দে তাল মিলিয়ে গান  শোনাতে পারতো সেই মানুষটি আজ পাশে নেই।

এমন এক বেদনাময় ভালোবাসার গল্প দিয়ে শুরু হয়েছে নিশাত ইসলামের ‘তোমাকে পড়ে মনে’ উপন্যাস। পড়তে পড়তে মনে হবে নিজেরই হারিয়ে যাওয়া কোনও ভালোবাসার ছিন্নপত্র। মনের খুব গভীরে লুকিয়ে থাকা আবেগ।

পেশায় শিক্ষক, নাট্যকার, কলামিস্ট এবং সাহিত্যিক নিশাত ইসলাম। পেশাজীবনের শুরুতেই অভিনেত্রী হিসেবে ‘চাঁদপুর গ্রুপ থিয়েটার পরিষদের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পুরস্কার-১৯৯৯’ তাঁর ঝুলিতে। আর লেখিকা হিসেবে সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য পেয়েছেন অনেক স্বীকৃতি। তাঁর মধ্যে অন্যতম ‘বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার-২০০৭’ প্রদান করে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চিটাগং, বাংলার সঙ্গীত সংগঠন কতৃক প্রদত্ত ‘সেরা লেখিকা পুরস্কার-২০১৭’ , ‘ইনডেক্স মিডিয়া স্টার এওয়ার্ডস-২০১৭’।

গল্প, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনীসহ সব শাখাতেই লেখিকার সমান বিচরণ। তবে উপন্যাস তাঁর স্বস্তির জায়গা। লেখিকার উপন্যাসের বইগুলোই পাঠকদের বেশি আন্দোলিত করে। সাহিত্যরস আর জীবনগল্পের ছন্দ তন্ময় করে পাঠকদের।

এ বছর ২০২১ বইমেলা উপলক্ষে নিশাত ইসলামের দুটো নতুন উপন্যাস প্রকাশ হয়েছে। যার মধ্যে একটি রোম্যান্টিক উপন্যাস ‘মনে পড়ে তোমাকে’ অন্যটি সমকালীন উপন্যাস ‘মায়া’ । দুটি উপন্যাসেই আছে প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ, আবেগ আর গভীর জীবনবোধ।

মনে পড়ে তোমাকে

জানালার পাশে বসে বৃষ্টির এক ঝাপটা যখন শরীরে দোলা দেয়। কেবলই মনে পরে সুরভির কথা। কেমন আছে সুরভি? অবেলায় যখন কেউ পাশে থাকেনা তখন কি নীলের কথা মনে পরে তাঁর। সেই দিনগুলোর কথা, মিষ্টি মধুর মুহূর্তগুলোর কথা?  মনে পড়ে কি সেই চেনা গানের সুর?

এমনই এক বেদনাময় ভালোবাসার স্মৃতি রোমন্থন দিয়ে শুরু হয় ‘মনে পড়ে তোমাকে’ উপন্যাস। নীল আজও বিশ্বাস করে যা কিছু ওদের দূরত্ব বাড়াচ্ছে তা নিছক একটি স্বপ্ন। ভোরবেলার স্বপ্ন, যা কখনও সত্য হয় না। সুরভিও কি একই স্বপ্ন দেখে? হয়তো দেখে আবার হয়তো দেখে না। কিন্তু নীল এখনও বসে আছে পথ চেয়ে।

ওদিকে সুরভি। সে-ও তো ভালো নেই। নীলের চিঠি পড়ে যখন, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। নিজের দুঃখ লুকোতে ছুটে যায় বৃষ্টির কাছে। ভিজে একাকার হয়। সেই সাথে ধুয়ে যায় স্মৃতিগুলো, মুছে যায় দুঃখের ছাপটুকু, বিলীন হয় শেষ চিঠিটাও।

মনে পড়ে তোমাকে
মনে পড়ে তোমাকে (হার্ডকভার) by নিশাত ইসলাম

BUY NOW

সেই ক্লাস নাইনে থাকতে নীলের সাথে পরিচয় হয় সুরভির। পরীক্ষার পর বেড়াতে গিয়েছিল মামাবাড়ি। বাড়ান্দা থেকে দেখে একটি বোকামত ছেলে বৃষ্টির মধ্যে কদম ফুল হাতে কোথায় যেন ছুটে যাচ্ছে। দেখেই খুব হাসি পাচ্ছিল সুরভির। সেবারই প্রথম কথা হয় ওর সাথে। কী মনে হলো সুরভির, ওর কাছে ফুল চেয়ে বসে। নীল ওই কাজল চোখের দিকে তাকিয়ে সব ফুল সুরভিকে দিয়ে দেয়।

এরপর গ্রামের পথে ঘুরতে ঘুরতে নীলের সাথে সুরভির ভালো লাগাগুলো মিলে যেতে থাকে। ফুল আর বৃষ্টির সাথে মিতালি হয়ে রূপ নেয় তীব্র ভালোবাসায়। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে নীল ছুটে আসে সুরভির জানালায়। সেই দেবীর মত মুখ একটিবার দেখতে আকুল হয় নীলের মন। সেই কাজল চোখে তাকিয়ে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। সুরভিও দুচোখের পাতা এক করতে পারেনা। কেবলই মনে পরে তাঁর কথা। সব ভয় আর লোকলজ্জা ছাপিয়ে মাঝরাতে সুরভি বাড়ির বাইরে আসে শুধু নীলের ডাকে।

মাঝরাতে চাঁদের আলোয় ভালোবাসা মধুর, বৃষ্টির মাঝে প্রেয়সীর খোপায় চালতে ফুল গুজে দেয়ার অনুভূতি মধুর, গলা ছেড়ে প্রিয়তমার জন্যে গান গাওয়াও ভালোলাগার। কিন্তু সব মধুর মুহূর্ত ম্লান হয়ে যায় বাস্তবের মুখোমুখি এসে। সমাজ, সংস্কার আর ধর্ম বৈষম্যের মত বিভীষিকা ভালো থাকতে দেয় না ভালোবাসাকে। আর তাইতো হিন্দু পরিবারের ছেলে নীলের আর মুসলমান মেয়ে সুরভির ভালোবাসা কোন পরিণতি পায়নি। বিরহ দীর্ঘ হতে হতে এক সময় দুজনের জগতটাই আলাদা হয়ে যায়। যেখানে কান্না জড়ানো চোখে একটিবার ছুঁয়ে দেখা যায় না প্রিয় মানুষকে।

নীলের কোনও এক গানের সুরে সেই বিরহের কথাই হয়তো রোমন্থন হয় –

‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণ যাত্রা যেদিন যাবে,

মরণ যাত্রা যদিন যাবে।

তুমি বারান্দাতে দাঁড়িয়ে থেকে শেষ দেখাটা দেখতে পাবে

মরণ যাত্রা যেদিন যাবে।

আমায় দেখতে তোমায় দেয়নি যারা

জানবে না যে কেউ তো তারা

আমি পাহাড় চোখের দৃষ্টি দিয়ে দেখব তোমায় বিভোরভাবে

মরণ যাত্রা যেদিন যাবে।

তুমি ফুল ছুড়ো না উপর থেকে,

একটু ফেলো দীর্ঘ নিঃশ্বাস

আমার শিয়রে জ্বলা ধুপের ধোঁয়ায় ওটাই হবে সুখের বাতাস।’  

মায়া

নিজের একটি অস্তিত্বের জন্য ভেতরটা হু হু করে ওঠে মায়ার। শুভর হৃদয়ে নিশ্চয়ই এমনভাবেই হাহাকার। কিন্তু মায়াকে সে বুঝতে দেয় না। বড় আগলে রাখে তাকে। নিঃসন্তান এক দিশেহারা দম্পতির নির্মম সত্য নিয়েই শুরু হয়েছে ‘মায়া’ উপন্যাস।

মায়া
মায়া (হার্ডকভার) by নিশাত ইসলাম

BUY NOW

মায়া আর শুভ ডাক্তার দেখাতে গিয়েছে। চারপাশে তাদেরই মতো অনেক পেশেন্ট। কারও সন্তান জন্ম নেওয়ার আগেই মারা গেছে, কারও হয়তো মেয়ে আছে ছেলে চাই, আবার কেউ হয়তো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও গর্ভধারণ করতে পারেনি। মানুষের কষ্টগুলো একেক রকম। নিভৃতে সেই যন্ত্রণা নিয়েও মানুষ বেঁচে থাকে। প্রথমদিন সিরিয়াল পায়নি ডাক্তারের। অনেকগুলো টেস্ট করাতে হবে মায়াকে। সাধারণ সব টেস্টের মতো নয়। এ ধরনের টেস্ট খুব যন্ত্রণা দেয়। একেতো আড়ষ্টতা থাকেই সেই সাথে প্রচণ্ড ব্যাথা। সব মিলিয়ে খুব কাতর হয়ে পড়ে মায়া। যত কষ্টই হোক তবু যদি সন্তান আসে ওদের কোলজুড়ে। অনেক ঝামেলা করে অবশেষে সবগুলো টেস্ট করানো গেছে। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে কিছু ওষুধ দিলেন আর তিন মাস সময় বেঁধে দিলেন। বোঝা গেল নিঃসন্তান হবার সকল দায় মায়ার একার।

এদিকে শুভ অনেক আড়াল করতে চাইলেও মায়া কি রেহাই পাবে সমাজ কিংবা পরিবার থেকে? কতশত নিঃসন্তান মায়ের এ দুঃসহ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে কাটাতে হয়। অথচ এরাও তো মানুষ, সন্তান না থাকার কষ্ট তো তাদেরই সবচেয়ে বেশি, সেই সাথে সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ভয়।

তিনমাস পর মায়া আর শুভ গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে। ওষুধে তেমন লাভ হয়নি। আইভিএফ করাতে হবে। সন্তান যেভাবেই হোক শুভ কেবলই চায় সে যেন মায়া আর শুভর অস্তিত্বের অংশই হয়। অন্য কারো অস্তিত্ব যেন এখানে বিরাজ না করে।

আবার সময় নিতে বললেন ডাক্তার। সেবাকেন্দ্রের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছে মায়া। এখন দিন যায় ঘরে বসেই। শুভ চলে যায় অফিসে। রুম থেকেও বেড় হতে ইচ্ছে করে না। সময় কাটাতে মায়ের রেখে যাওয়া ডায়েরি পড়ে। ডায়েরির পাতায় পাতায় হারিয়ে যায় মায়া। মায়ের সেই সময়গুলোতে। মায়ের কষ্টগুলো কিছুটা হলেও নিজের মধ্যে ধারণ করে।

কোনও এক অজানা কারণে মায়ের ডায়েরি পড়া মায়ার বাবার পছন্দ নয়। মায়া বুঝতে পারে না কেন? কী কথা লুকিয়ে আছে যা মায়ার জানতে নেই? ডায়েরিতে মায়ার জন্ম নিয়ে কিছু একটা লিখেছিল মা। তবে কী মায়ার জন্ম নিয়ে আছে কোনও রহস্য?

দিন যত যাচ্ছে মায়া বুঝতে পারছে। পৃথিবীটা তার জন্য কঠিন হয়ে পরেছে। প্রিয় মানুষটিকেও হয়তো ছেড়ে যেতে হবে। মাঝে মাঝে মায়ার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে ‘হে আল্লাহ, আমাকে একটি সন্তান দাও’। আসলে মায়া জিনিসটাই বড় কষ্টের, খুব যন্ত্রণার। এই মায়ার জাল ছিঁড়ে বেরোতেও পারছে না আবার থেকেও সুখী হতে পারে না। কী করবে মায়া?

এভাবেই দিনশেষে মানুষ মায়াকে ভুলতে চায়, ভুলতে চায় স্মৃতিগুলো, ভুলতে চায় ভালোবাসাকে। কিন্তু পেছন ফিরে দেখা যায় ভোলা যায়নি কিছুই…

নিশাত ইসলাম এর বই সমূহ পেতে ক্লিক করুন!

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading