সাইরাস: একজন জাতির পিতা, আইনপ্রণেতা এবং মুক্তিদাতার গল্প

2021-03-09 সাইরাস- একজন জাতির পিতা, আইনপ্রণেতা এবং মুক্তিদাতার গল্প

প্রজার প্রতি তার আচরণ ছিল স্নেহপূর্ণ এবং সম্মানজনক। যেন তারা তার নিজের সন্তান। প্রজারাও তাকে মান্য করতো নিজেদের পিতা হিসাবেই। আর কে আছে যে সাম্রাজ্য উপড়ে ফেলার পরেও ‘পিতা’ উপাধি নিয়ে মরতে পেরেছেন? উপাধিটা আবার তাদের কাছ থেকেই, যাদের পরাজিত করে এনেছেন নিজের অধীনে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, তিনি এসেছিলেন কিছু নেবার জন্য না; দেবার জন্য।

কথাটা বলেছেন প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিক ও ঐতিহাসিক জেনোফোন (৪৩১-৩৫৪ খ্রি.পূ.)। নাহ, গ্রীসের কোন মহাপুরুষের প্রসঙ্গে না। পারস্যের আকিমেনিড সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সাইরাসকে নিয়ে। মুগ্ধতায় রীতিমতো জীবনদর্শন লিখে ফেলেছেন সাইরোপেডিয়া নামে। হিরোডোটাস, টিসিয়াসের মতো ঐতিহাসিক এবং প্লেটোর মতো পণ্ডিতেরাও কৃপণতা করেননি প্রশংসায়। ব্যাবিলনীয় শিলালিপি এবং বাইবেল তো এগিয়ে গেছে আরো কয়েক ধাপ।

পারসিক কার্পেটে সাইরাসের প্রতিকৃতি

সাইরাস। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী চরিত্র। সমসাময়িক পারসিক জাতির কাছে পিতা, গ্রীকদের কাছে আইনপ্রণেতা এবং ব্যাবিলনীয়দের কাছে মুক্তিদাতা। একমাত্র ইহুদি তিনি, যাকে ইহুদি ধর্মবিশ্বাস মেসায়াহ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। আধুনিক মুসলিম তাফসির বিশারদগণ কোরআনে বর্ণিত যুলকারনাইন হিসাবে উপস্থাপন করতে চান তাকে। বিশ্ববিজেতা আলেকজাণ্ডার, জুলিয়াস সিজার এবং লরেন্স অব অ্যারাবিয়া তার থেকে নিয়েছেন অনুপ্রেরণা। থমাস জেফারসন, ডেভিড ভেন গুরিয়ন কিংবা রেজা শাহ পাহলভীদের মতো অনেকের জন্য তিনি আদর্শ। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার সুরক্ষার দলিল, জোরেসোরে স্বীকার করে সাইরাসের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

সাইরাস হিসাবে পরিচিতি পেলেও নামের প্রকৃত উচ্চারণ কুরুশ। তিনি এতো দূর সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন, যা তার আগের পৃথিবী দেখেনি। যদি গণতন্ত্রের জনক তকমাটা গ্রীকদের দেয়া হয়, তবে সাইরাসকে বলতে হবে বিশ্বায়নের জনক। ভূখণ্ড জয় করেননি, করেছেন সেখানকার নাগরিকদের। অগণিত জাতি, ভাষা আর ধর্মবিশ্বাসের মানুষ এসেছিল একই ছাতার নিচে। চলেছে ন্যায়বিচারের চর্চা। যুদ্ধ হয়েছে, অথচ বন্দী শত্রুকে প্রতিশোধের খায়েশে উন্মত্ত হয়ে হত্যা করা হয়নি। স্থাপন করেছেন মুক্তি আর উদারতার নয়া অধ্যায়। এটি কতো বড় বিপ্লব, তা স্পষ্ট বুঝা যাবে খ্রিষ্টপূর্ব ৯১১-৬১২ অব্দের আসিরিয়দের তাণ্ডবের ইতিহাস পড়লে। যখন শাসক মানেই খোদা আর প্রজা মানেই দাস। বর্তমানে ফ্যাসিবাদ আর মানবিক অধিকারের খেয়ানতের যুগ চলছে সর্বত্র। যেন সেই আসিরিয় আর ব্যাবিলনীয়দের দিগন্তভেদী নৃত্য। যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবরুদ্ধ হয়ে যায় কেবল আদর্শিক ভিন্নতার দোষে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে সেই গল্প।

সাইরাসের সমাধি

সাইরাসের বড় বিশেষত্ব বোধ হয় তার সময় এবং অবস্থানে। এটা এমন যুগ, যখন আর্য আর সেমেটিক জাতিগোষ্ঠী ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পরকে প্রভাবিত করছে। জরাথুস্ত্রবাদের সাথে বৈদিক ধর্মের যে ঘনিষ্ঠতা, আবেস্তার সাথে বেদের যে মৈত্রী, তা যেমন স্পষ্ট; একই ভাবে পারসিক বিশ্বাসের সাথে ইহুদি পরবর্তী সেমেটিক বিশ্বাসের যোগাযোগ অগভীর নয়। ফলে সাইরাসের সময়কাল যেভাবে হিন্দুধর্ম আর ইসলামের মতো দূরবর্তী দুটি ধর্মের মধ্যবর্তী সম্পর্কের ইশারা দেয়; সেই সাথে দেয় প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের চিরায়ত সংঘাতের সূত্র। এশিয়া মাইনরে গ্রিকদের বসবাস সেই সূত্রের প্রথম সবক। এশিয়ায় সংযুক্ত ভূখণ্ড হিশাবে বারবার তারা পদানত হয়েছে প্রাচ্যের কাছে। অন্যদিকে নাগরিকদের গ্রিক ঐতিহ্যের দরুণ বারবার মূল গ্রিকদের সাথে যোগাযোগ করে ঘটিয়েছে বিদ্রোহ। সাইরাসের সময়কালটা সেই সম্পর্কের আদি অবস্থা।

পাশ্চাত্যের সমান্তরালে প্রাচ্যের দলিলও নেহায়েত কম নেই। সাইরাস সিলিন্ডার, নেবুনিদাস ক্রনিকলস্, বেহিস্তুন লিপি এবং বাইবেল। তারপরও সাইরাসের পরিপূর্ণ জীবনী নিয়ে যেন অনন্ত ধোঁয়াশা। ইতিহাসের সাথে জড়াজড়ি করে আছে কিংবদন্তি এবং উপকথা। ফলে সব কিছুর মিশেলে এই যাত্রা বলতে গেলে অভিনব। বাংলাভাষী পাঠকের হাতে সাইরাসকে তুলে ধরার প্রয়াস। বিভিন্ন উৎসে ছড়িয়ে থাকা উপাত্তগুলো একত্র করার প্রচেষ্টা।

BUY NOW

ভূমিকা আর গ্রন্থপঞ্জি বাদ দিলে বইটি পাঁচ পর্বে বিভক্ত। প্রথমে সাইরাসের শিকড় সন্ধান, সেই সময়ের পৃথিবী এবং বেড়ে উঠা। দ্বিতীয় পর্বে স্বীয় জাতির মুক্তি এবং মসনদ অধিকারের জন্য সংঘাত। ঠিক এর পরেই তৃতীয় পর্বে বিজেতা হিসাবে বিভিন্ন দিকে অভিযানগুলো। চতুর্থ ভাগ সজ্জিত হয়েছে ব্যাবিলন বিজয়, ইহুদিদের মুক্তি থেকে সাইরাসের মৃত্যু সংক্রান্ত জটিলতা অব্দি। পঞ্চম ভাগ অনেকটা বিশ্লেষণধর্মী। সাইরাসের সমগ্র জীবন সেঁচে বের করে আনা প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি। তাতে শাসনপ্রণালি যেমন আলোচিত হয়েছে, তেমন এসেছে সামরিক নেতৃত্ব এবং ধর্ম। সাইরাসকে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলেছে নতুন আলোয়। চেষ্টা চলেছে মাজদাইজম, জুদিও-খ্রিষ্টান এবং ইসলামের সাথে তার সম্পর্ক আলোচনার। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে না। বর্তমানে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কিংবা জুলিয়াস সিজার নিয়ে বাহাসের জলসায় তার নাম থাকে না। দমন-পীড়নের সংস্কৃতিতে সাইরাস যদি হঠাৎ আলোচনার প্রসঙ্গ হয়ে উঠে, মন্দ কী!

সাইরাসকে জানতে অন্য যে বইগুলো পড়া যেতে পারে 

 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading