স্পাই স্টোরিজ : যে মার্কিন স্পাই গাদ্দাফিকে সাহায্য করতে চেয়েছিল…

spy stories

২০০০ সালের নভেম্বর মাসে নিউ ইয়র্কের লিবিয়ান কনস্যুলেটে পৃথক পৃথকভাবে তিনটি রহস্যময় প্যাকেজ এসে উপস্থিত হয়। প্যাকেজগুলো পাঠানো হয়েছিল এক অজ্ঞাতনামা প্রেরকের পক্ষ থেকে, সরাসরি লিবীয় নেতা মোয়াম্মার আল-গাদ্দাফিকে উদ্দেশ্য করে! কিন্তু কে এই অজ্ঞাতনামা প্রেরক? এরকম ছয়টি রহস্যময় কাহিনী মলাটবদ্ধ হয়েছে আমাদের আলোচ্য ‘ স্পাই স্টোরিজ ‘ থ্রিলারে।

তিনটি প্যাকেজের ভেতরেই ছিল ইংরেজিতে লেখা একটি করে কভার লেটার, দুর্বোধ্য সাংকেতিক ভাষায় লেখা কতগুলো পৃষ্ঠা এবং সেই সাথে সংযুক্ত চূড়ান্ত গোপনীয় কিছু ডকুমেন্ট এবং ছবি। কভার লেটার তিনটি ছিল হুবহু একইরকম। সেগুলোর প্রতিটির উপর ইংরেজিতে বড় হাতের অক্ষরে লেখা ছিল: THIS LETTER CONTAINS SENSITIVE INFORMATION। অর্থাৎ, “এই চিঠিতে স্পর্শকাতর তথ্য আছে“।

শিরোনামের নিচে চিঠিগুলোতে যা লেখা ছিল, তার অংশ বিশেষ ছিল মোটামুটি এরকম:

কভার লেটার ছাড়াও তিনটি খামের প্রথমটির ভেতর ছিল চার পৃষ্ঠার একটি সাংকেতিক চিঠি, যেখানে মোট ১৪৯টি লাইনে একের পর এক সাজানো ছিল অক্ষর এবং সংখ্যার সংমিশ্রণে তৈরি দুর্বোধ্য কতগুলো শব্দ। দ্বিতীয় খামের ভেতর ছিল কীভাবে সুনির্দিষ্ট সাইফার কী (Cipher Key) এবং কোড বুক (Code Book) ব্যবহার করে সাংকেতিক চিঠিটির মর্ম উদ্ধার করতে হবে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত নির্দেশনা।

আর তৃতীয় খামের ভেতর ছিল দুই সেট কোড শিট (Code Sheet)। প্রথম সেটে ছিল সাইফার কী, যা দিয়ে সাইফারটেক্সট (Ciphertext) তথা সাংকেতিক লিপিকে প্লেইন টেক্সট (Plain text) তথা সাধারণ লিপিতে রূপান্তরিত করা যাবে। আর দ্বিতীয় সেটে ছিল ছয় পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা দুই অক্ষরের কয়েক ডজন ব্রেভিটি কোড (Brevity Code) তথা সংক্ষিপ্ত কোড এবং তাদের অর্থের তালিকা, যেগুলো দিয়ে প্লেইন টেক্সটের সংক্ষিপ্ত শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ বোঝা যাবে।

অর্থাৎ তিনটি খামের মধ্যে প্রথমটিতে ছিল মূল সাংকেতিক চিঠি, আর পরের দুটো খামে ছিল সেই সাংকেতিক চিঠির মর্ম উদ্ধার করার চাবি। খামগুলো যে পাঠিয়েছিল, সে নিশ্চিত করতে চেয়েছিল, চিঠিটির প্রকৃত অর্থ যেন কেবলমাত্র গাদ্দাফি কিংবা তার গোয়েন্দাপ্রধানই উদ্ধার করতে পারেন। একটি বা দুটি খাম অন্য কারো হাতে পড়ে গেলেও যেন তারা কিছু বুঝতে না পারে।

কিন্তু তার জানার কথা ছিল না, গাদ্দাফির হাতে পৌঁছা তো দূরের কথা, লিবিয়ান কোনো কর্মকর্তার হাতে পৌঁছার আগেই তিনটি খামই গিয়ে পড়বে কনস্যুলেটের ভেতর আন্ডারকভারে থাকা এফবিআইর এক স্পাইয়ের হাতে!

ডিসেম্বরের এক সোমবার সকালে প্যাকেজ তিনটি এসে পৌঁছে এফবিআইর ওয়াশিংটন ডিসির ফিল্ড অফিসে। কেসটি সমাধান করার দায়িত্ব এসে পড়ে সেখানে কর্মরত স্পেশাল এজেন্ট স্টিভেন কারের উপর।

স্পাই স্টোরিজ
BUY NOW

চার পৃষ্ঠার চিঠিটিকে এনসাইফার (Encipher) তথা সংকেতায়িত করা হয়েছিল ষোড়শ শতকে উদ্ভাবিত ভিগেনিয়ার সাইফার (Vigenère Cipher) নামে অত্যন্ত জটিল একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে, সাইফার কী দেওয়া থাকলেও যা সমাধান করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তারপরেও এফবিআইর নিউ ইয়র্ক ফিল্ড অফিসের কর্মকর্তারা চিঠিটির প্রথম কয়েকটি লাইনের পাঠোদ্ধার (Decipher) করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কার সেটুকুই পড়তে শুরু করেন:

“আমি সিআইএর মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক একজন অ্যানালিস্ট। আমি অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য হস্তান্তরের মাধ্যমে আপনাদের দেশের হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করতে চাই। আমার টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স আছে এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ), ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ), সেন্ট্রাল কমান্ডসহ (সেন্টকম) অনেকগুলো গোয়েন্দা সংস্থার চূড়ান্ত গোপনীয় নথিপত্রে আমার প্রবেশাধিকার আছে। … “

তার দাবি যে ভিত্তিহীন না, সেটা প্রমাণ করার জন্য নিজেকে সিআইএর অ্যানালিস্ট দাবি করা গুপ্তচরটি প্রতিটি খামের ভেতর CLASSIFIED SECRET তথা “গোপনীয় হিসেবে শ্রেণীবিন্যস্ত” এবং CLASSIFIED TOP SECRET তথা “চূড়ান্ত গোপনীয় হিসেবে শ্রেণীবিন্যস্ত” লেখা কিছু ডকুমেন্ট সংযুক্ত করে দিয়েছিল।

এর অধিকাংশই ছিল আমেরিকার স্পাই স্যাটেলাইট দিয়ে তোলা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কয়েকটি সামরিক স্থাপনার ছবি এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর উপর আমেরিকার গোয়েন্দা প্রতিবেদন। এছাড়াও আরো কিছু ডকুমেন্টও সেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে একটি ছিল একেবারে নিচে দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি প্লেন থেকে তোলা ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত গাদ্দাফির একটি প্রমোদতরীর ছবি, যেটি তুলেছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দাবাহিনী!

স্টিভেন কার তার এফবিআইর জীবনে এ ধরনের কিছু দেখেননি। এসব তথ্য যদি আসলেই লিবিয়ার হাতে পড়ে, তাহলে কী অবস্থা হবে, সেটা ভেবে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। গুপ্তচরটিকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে  পরামর্শের জন্য তিনি ছুটে যান তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লিডিয়া জেখোরেকের রুমে। ইতোমধ্যেই অবশ্য তিনি গুপ্তচরটির সম্ভাব্য কিছু বৈশিষ্ট্যের একটি তালিকা তৈরি করে নিয়েছেন, যেগুলো ব্যবহার করলে অনুসন্ধান কার্যক্রম অনেকটাই সহজ হয়ে আসবে।

প্রথমত, ডকুমেন্টগুলো থেকে বোঝা যায়, গুপ্তচরটির টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স আছে। দ্বিতীয়ত, চিঠিতে ব্রেভিটি কোডের ব্যবহার থেকে ধারণা করা যায়, সম্ভবত তার সামরিক প্রশিক্ষণ আছে। তৃতীয়ত, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ইন্টেলিঙ্কে (Intelink) তার প্রবেশাধিকার আছে। কারণ চিঠির সাথে সংযুক্ত ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়, সেগুলো ইন্টেলিঙ্ক থেকে প্রিন্ট করা হয়েছিল। চতুর্থত, গুপ্তচরটি বিবাহিত এবং সম্ভবত তার সন্তান আছে। কারণ চিঠির পরবর্তী অংশে সে লিখেছিল, “গুপ্তচরবৃত্তির মধ্য দিয়ে আমি নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে ফেলছি।”

আর পঞ্চমত, গুপ্তচরটি ইংরেজি বানানে একেবারেই কাঁচা! ছয় পৃষ্ঠার যে ব্রেভিটি কোডের তালিকা সে তৃতীয় খামের ভেতর সংযুক্ত করে দিয়েছিল, যেখানে দুই অক্ষরের বিভিন্ন সাংকেতিক শব্দের প্রকৃত অর্থ লেখা ছিল, কার লক্ষ্য করেন সেখানে অনেকগুলো সহজ শব্দের বানানই ভুল। Anonymous-কে সেখানে লেখা হয়েছে Anonmus, Allegations-কে Alligations, Reveal-কে Reveil, Precaution-কে Precausion … পুরো তালিকাটিই ভুলে ভরা!

ব্যাপারটি খুবই অস্বাভাবিক। সিআইএর একজন অ্যানালিস্ট, যার টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স আছে, যে গুপ্তচরবৃত্তির মতো যোগ্যতা রাখে, জটিল সাংকেতিক ভাষায় বিশাল চিঠি এনক্রিপ্ট করতে পারে, সেই ব্যক্তি এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি চিঠিতে এতগুলো বানান কীভাবে ভুল করে? কার এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেন না …

… এরপর? স্টিভেন কার কি পেরেছিলেন সেই রহস্যময় স্পাইকে খুঁজে বের করতে? নাকি সেই স্পাই অন্য কোনোভাবে ঠিকই গোপন তথ্য পাচার করে দিয়েছিল গাদ্দাফির কাছে? জানতে পারবেন বইমেলায় প্রকাশিত মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহার ” স্পাই স্টোরিজ : এসপিওনাজ জগতের অবিশ্বাস্য কিছু সত্য কাহিনী” বইয়ে।

ট্রু স্পাই থ্রিলার ক্যাটাগরির এই বইটিতে এরকম মোট ছয়টি কাহিনী আছে। প্রতিটি কাহিনীই সত্য, প্রতিটি কাহিনীই শ্বাসরুদ্ধকর – স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন। স্পাই স্টোরিজ প্রকাশিত হয়েছে স্বরে অ প্রকাশনী থেকে। পাবেন বইমেলায় ঐতিহ্য প্রকাশনীর (১৪ নম্বর) প্যাভিলিয়নে। ঢুঁ মারুন ঐতিহ্য প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নে, আর নেড়েচেড়ে দেখুন স্পাই স্টোরিজ দ্য ট্রু স্পাই থ্রিলার!

         স্পাই স্টোরিজ : এসপিওনাজ জগতের অবিশ্বাস্য কিছু সত্য কাহিনী” অর্ডার করুন রকমারিতে 

Mozammel Hossain

Mozammel Hossain

Published 01 Feb 2020
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png