“আমাদের মতো গেঁয়ো ভূতের বই পড়া ঠাট্টার ছলে দেখা হয়”

2021-01-07 আউট বই পড়া প্রসঙ্গ
আমার একজন বইপোকা বাবা আছেন। তার পাঠরুচি ও মননশীলতা এমন ধারায় বিকশিত হয়েছিল, যা আমাকেও প্রলুব্ধ করেছিল বইপাঠে, বই পড়ার আনন্দ আস্বাদে।  বয়স চুয়াত্তর পেরিয়ে এখন পঁচাত্তরে। গ্রামে থাকেন কিন্তু ঢাকায় কোন বইটা নতুন বেরোল, কলকাতা থেকে কোন বইটা এলো, সব খোঁজ-খবর রাখেন তিনি নিত্যদিন।
আমি আমার বাবাকে শ্রেষ্ঠ বাবা মনে করি, সবচে’ প্রজ্ঞাবান মানুষ বলে মনে করি। কারণ- বাবা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বইয়ের জগতের সাথে।  তার পাঠাভ্যাসে যে মননশীলতার প্রকাশ ঘটতো, শুধু তাই নয়, তার বিকাশ ঘটেছে তার লেখায়ও।
আমার গ্রামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি পাঠাগার আছে। আমার গ্রামের নামেই পাঠাগারটির নাম ‘শুনই প্রগতি পাঠাগার’। বর্তমানে সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা দুই হাজারের মতো। সেটার রক্ষণাবেক্ষন করেন আমার বাবা-মা। এই পাঠাগারটি এখন সবার জন্য উন্মুক্ত। আমাদের পরিবারের সদস্যদের বাইরেও অনেক মানুষ সেখান থেকে বই নিয়ে পড়ে। আমাদের গ্রামে সৃজনশীল ও মননশীল বিনোদনের অন্য কোনো মাধ্যম নেই। সেখানে আমার বাবার পাঠাগারটি এখন পাঠকদের কাছে একটি ভালোবাসার জায়গায় পরিণত হয়েছে। অনেক মানুষের আনাগোনা বাড়ে আমাদের বাড়িতে। যখন আমার দাদু বেঁচে ছিলেন, উঠোনে পাটাতন বিছিয়ে পুঁথির আসর বসতো। দাদু এখন বেঁচে নেই। এখন বই পড়া র জন্য অনেক দূর থেকে মানুষ আসে। আড়াইশো বছর আগের প্রাচীন অনেক পুঁথিসহ বহু দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ রয়েছে এই পাঠাগারে।
(দুই.)
বলছিলাম বই, পাঠাগার আর বাবার গল্প। আমার প্রতি মাসের বাজারের লিস্টিতে চাল, আটা, মাছ, সবজির পাশাপাশি বইও থাকে, আমার বাবার অনুসন্ধিৎসু মনের খোরাক যোগানোর জন্য। তো, এই বই কেনাটাই আমার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রকমারি ডট কম সম্ভবত আমার ও আমার বাবার সে প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিল।
বাবা- ‘দোজখনামা’ পড়েছ?
আমি- না, বাবা। সংগ্রহ করব নাকি? ‘আয়নাজীবন‘ও তো বেরিয়েছে।
বাবা- হ্যাঁ, রবিশংকরেরটা, সাথে পারলে বাংলার সাহিত্য সম্মেলনের একটা বই।
আমি- জি বাবা, ঠিক আছে।
বাবা- তোর তো অফিস ছুটি নেই, বিকেলও ইউনিভার্সিটির ক্লাস। কী করে বইয়ের দোকানে যাবি?
আমি- হবে, বাবা। একটা উপায় তো হবেই।
বাবা তখনো রকমারির কথা জেনে উঠতে পারেননি। একদিন ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া আমার কাজিন সোহাগের কাছে শুনে রীতিমত লাফিয়ে উঠলেন-
‘বলিস কী? বাংলাদেশ তো অনেক এগোল দেখছি! ঘরে বসে বই পাওয়া যায়!’
আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। আমার স্কুলের হেডমাস্টারের বাড়ি থেকে বই আনতে গিয়েছিলাম। তখন আইয়ূবের মৌলিক গণতন্ত্রের যুগ ছিল। আমি সাড়ে ছ’ মাইল হেঁটে কিছু বই সংগ্রহ করেছিলাম।’
(তিন.)
রকমারির একটা গল্প মনে পড়ে। বছর দুয়েক আগে ইদের ঠিক আগে, ট্রেনের টিকিট কেটে অফিসের পথে পা বাড়িয়েছি। দুদিন বাদেই গ্রামের বাড়ি ফিরব কন্যাকে নিয়ে সবাই মিলে। অফিসে ফিরে রিসিপশনে একটা বাদামী রংয়ের সুন্দর প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন রিসিপশনিস্ট রুমা আপা। খুলে দেখি ৮/১০ টা শিশুতোষ বই। আমার কাছে এরচে বড় উপহার আর কী হতে পারে! সবকটা বই আমার কন্যা দারুণ পছন্দ করেছিল। আমার আজও জানা হলো না, রকমারি এই বইগুলোই কেন পাঠিয়েছিল। রকমারি আমার পাঠরুচি জানে। কিন্তু এক ক্ষুদে পাঠকের যে হৃদয়-মন ভরিয়ে দিয়েছিল এই অসাধারণ উপহারে, সেটা সম্ভবত রকমারই জানে না। সে কৃতজ্ঞতা আজও রকমারিকে জানানো হয়নি।
(চার.)
একদিন বাবা মুঠোফোনে ঠিকঠিক আবিষ্কার করলেন রকমারিকে। গ্রামে বসে। এই খুশির বার্তা
জানানোর মুহূর্তটি ছিল স্বর্গীয়। তিনি জানালেন-
বাবা- তোর বইওতো দেখছি রকমারিতে। এটা তো অসাধারণ ব্যাপার। “ভাষা, নারী ও পুরুষপুরাণ” দেখলাম, “দুষ্ট লীলাবতী”, ‘ভাটকবিতায় মুক্তিযুদ্ধ‘ বইটিও দেখলাম।
আমি- ‘জীবনবৃত্তে’ও আছে। এখন সবার সব বই-ই পাওয়া যায়।
বাবা- দেখিস তো আমার লেখক বন্ধুদের বইও আছে কিনা?
আমি- জি বাবা, দেখব।
(পাঁচ.)
আমাকে অনকেই বলেন, বই পড়ার সময় কই। কিংবা বই কিনে পড়ার সময় কই। কেউ কেউ বলে, বই কেনার টাকা কই? আমি বলব, এটা নিছক মিথ্যে কথা। আপনি প্রতিদিন দুপৃষ্ঠা করে বই পড়লে মাসে ষাট পৃষ্ঠা, বছরে সাতশো কুড়ি পৃষ্ঠা। বছরে সাতশো কুড়ি পৃষ্ঠা পড়তে পারা মানে অনকেগুলো বই পড়তে পারা। আর কৃপণ না হলে কেউ কি দুপৃষ্ঠাই পড়ে? আর বই কেনার জন্য কি আসলে বই বাজারেই যেতে হয়?
(ছয়.)
বই পড়া নিয়ে বাবা বলেন, সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রটি অবশ্য দুই ধারায় বহমান। আর পাঠরুচি মূলত ভোগবাদী ধারা অনুসরণ করলেও বাংলাদেশে আমাদের মতো গেঁয়ো ভূতের বই পড়াকে ঠাট্টার ছলে দেখা হয়। এত বই পড়ে কী হয়! বাবার কথা হলো, বই পড়ে কী না হয়? কেউ বই পড়ে ঠকেছে, এমন তো দেখিনি! তবে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই শুদ্ধ গণতন্ত্র বা যুক্তিবাদী ধারার অনুসারী প্রগতিভাবনা অনুপস্থিত নয়, নয় প্রগতিবাদী গ্রন্থাদির পাঠ। আমাদের প্রজন্মরা সারাদিন ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকে, কিন্তু মননশীল বুক? বই ছাড়া তাদের মধ্যে শুভবুদ্ধি ও মানবকল্যাণচিন্তা হয়তো নান্দনিকতার সঙ্গে এক ধরনের ইতিবাচক সমঝোতায় পৌঁছতে পারবে না। কারণ- আত্মঘাতী চেতনা ব্যতিক্রমী, তা মানুষের স্বভাবসুলভ নয়। অস্তিত্ব রক্ষাই শেষ পর্যন্ত তার চেতনায় বড় কথা হয়ে ওঠে। এটাই মানবিক সত্য। তরুণরা বই না পড়লে ব্যাক্তি মনস্তত্ত্ব, সমাজ মনস্তত্ত্ব কী করে বুঝবে? কী করে মানুষের কাছাকাছি যাবে? প্রেম করার জন্য হলেও বই পড়া উচিত।
(সাত.)
জীবনে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন- বই, বই এবং বই।
কষ্টের দিনগুলোতে, হাসির দিনগুলোতে, অবসরের দিনগুলোতে, উৎসবের দিনগুলোতে, ভ্রমণের দিনগুলোতে, একাকীত্বের দিনগুলোতে, একসাথে থাকার দিনগুলোতে, বন্ধুত্বের দিনগুলোতে বই পড়ুন, বই বড় বন্ধু।
শুভকামনা সকলের জন্য।
হাসান ইকবালের বইসমূহ দেখতে ক্লিক করুন 
রবিশংকর বল-এর বইসমূহ দেখুন 
শিশু-কিশোরদের পড়ার উপযোগী কিছু বই 
Hasan Iqbal

Hasan Iqbal

Published 23 Feb 2020
ই-মেইল: hasan_netsu@yahoo.com
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading