মিমির দুই নম্বর নোটবই: একবসায় শেষ না করে ওঠার মতো একটি উপন্যাস

মিমির দুই নম্বর নোটবই

কিছু উপন্যাস আছে, যা শুরু করলে পাঠক একটা অদ্ভুত অপেক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে থাকেন। ‘মিমির দুই নম্বর নোটবই’ বইটিতে নাম-ভূমিকায় মিমির কথা দেখলেও মিমির দেখা পেতে একটু দেরি হতে পারে। এটাই  লেখক আন্দালিব রাশদীর নিজস্ব লেখনশৈলী। পাঠকের মধ্যে তিনি প্রথমে একটা অপেক্ষা তৈরি করেন, তারপর ধীরে ধীরে মূল চরিত্র ও মূল কাহিনীর মধ্যে নিয়ে যান। মিমির ফারকুন্দা ওরফে ভুট্টো আন্টি, বড় চাচা, বুয়া আসগরী- এদের সবার সাথে পরিচয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রধান চরিত্র মিমির আগমনের পূর্বাভাস। এরা সকলেই মিমির জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা মানুষজন, যাদের সরাসরি প্রভাব পড়ে তার জীবনে, তার দুই নম্বর নোটবইয়ে। মিমির সাথে পরিচয়ের আগে তাঁর জীবন সম্পর্কে পাঠককে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া হয়, যা কি না মূল কাহিনীর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করবার জন্য খুবই ভালো একটি পদ্ধতি। 

লেখক আন্দালিব রাশদীর সবগুলো বইয়ের নাম দেখেই যেন একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক সহজ ও নাগরিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত। এ বইটি ছাড়াও তাঁর বেশ কিছু উপন্যাস রয়েছে- ‘কাজল নদীর জলে’, ‘হাজব্যান্ডস’, ‘পপির শহর’, ‘ঝুম্পানামা’, ‘অধরা’, ‘জলি ফুপু’, ‘ম্যাজিশিয়ান’, ‘ভারপ্রাপ্ত সচিব, প্রতিমন্ত্রী’, ‘কাকাতুয়া বোনেরা’, ‘সূচনা ও সুস্মিতা’, ‘ট্যারা নভেরা’, ‘লুবনা ও কোকিলা’, ‘ডোনাট পিলো’, ‘কঙ্কাবতীর থার্ডফ্লোর’, ‘শিমুর ভোরবেলা’, ‘বুবনা’ ইত্যাদি। 

শুধু উপন্যাস নয়, ছোটগল্প লেখার হাতও বেশ ভালো তাঁর। আদতে ফিকশনধর্মী লেখার প্রতি তাঁর অন্যরকম ভালোলাগা রয়েছে। আর নিজের ভালোলাগার জঁনরা নিয়ে কাজ করতেও ভালো লাগে তাঁর। তবে শুধুই ফিকশন নয়, তাঁর লেখনীতে স্থান পেয়েছে প্রবন্ধ এবং অনুবাদও। প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে তিনি বেছে নিয়েছেন মনস্তত্ত্ব এবং বিশ্বসাহিত্য। আর বিশ্বসাহিত্যের অফুরান আকর থেকে কিছু রচনা অনুবাদ করে বাংলা অনুবাদের জগতে অবদান রেখেছেন আন্দালিব রাশদী। মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত ‘একাত্তরের দলিল’ নামের একটি বইও অনুবাদ করেছেন তিনি। 

প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু-কিশোর, বয়সের সীমানায় বাঁধা নেই তাঁর পাঠক। ভিন্ন ভিন্ন বয়সের জন্য তাঁর রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চমক, তাই কোনো বইমেলায় পরিবারের সব সদস্যের মনের খোরাক মেটাতেই আন্দালিব রাশদীর বইয়ের তুলনা নেই।

মিমির দুই নম্বর নোটবই 2
মিমির দুই নম্বর নোটবই

পাঠকের মন বুঝে ফেলা এ লেখক জন্ম নিয়েছিলেন ১৯৫৭ সালের ৩১শে ডিসেম্বর, বছরের শেষদিনে। জন্ম-কর্ম ঢাকাতেই। তাই নগরজীবনের নগরগল্প সরাসরি প্রভাব রেখেছে তাঁর মৌলিক গল্প ও উপন্যাসগুলোতে। আশেপাশের মানুষের জীবনযাপন ও প্রতিদিনের জীবনে ঘটে যাওয়া মজার সব ঘটনাকে একেকটি নতুন মলাটে বাঁধতে ভালোবাসেন এই লেখক। ‘মিমির দুই নম্বর নোটবই’টিও তেমনই চেনা পরিচিত গণ্ডির অচেনা কিছু অনুভূতি নিয়ে লিখেছেন। পড়াশোনার প্রথম দিকটা ঢাকাতেই চুকে গেলেও পরের ধাপটা বিদেশে সম্পন্ন হয় তাঁর। ঢাকা থেকে একটা সময় পাড়ি জমান ওয়েলসে। 

বই আর বইমেলার প্রতি প্রেম তাঁর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি গুরুতের। তাঁর ভাষ্যমতে, যখন আমার বই প্রকাশিত হতো না, তখনও একুশের বইমেলার জন্য ১১ মাস অপেক্ষা করতাম। যে বছর ফেব্রুয়ারি ২৯ দিনের, সে বছর একদিন বোনাস পাওয়ার আনন্দে প্রায় সারা দিনই মেলায় কাটাতাম।

আর যখন বই প্রকাশ পাওয়া শুরু হলো, তখন সে অপেক্ষা যেন আরো বিশেষ হয়ে উঠলো। এক এক করে অনেকগুলো বই লিখে ফেললেও নিজের বই প্রকাশ পেলে আজও আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন আন্দালিব রাশদী, দিনের পর দিন অপেক্ষা করেন ছাপার হরফে নিজের সৃষ্টি দেখবার, পাঠকের তৃপ্ত মুখে নিজের লেখনীর তৃপ্তি খুঁজে পাবার। 

সমকালীন উপন্যাস ‘মিমির দুই নম্বর নোটবই’ ২০২০ সালে প্রকাশ পায় আরেকটি অনুবাদের সাথে। এটিকে তাই আন্দালিব রাশদীর সাম্প্রতিকতম রচনা বললে ভুল হবে না। কথাপ্রকাশ থেকে বইটি প্রকাশ পেয়েছে। ১২৮ পৃষ্ঠার এ উপন্যাসে হয়তো পৃষ্ঠাসংখ্যায় বিস্তৃত কলেবর নেই, তবে কাহিনীর গতিময়তা আর পরতে পরতে মূল চরিত্র মিমিকে, তার আশেপাশের লোকজনকে জানার আনন্দটা ফেলে দেওয়া যায় না। নাগরিক জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা যেকোনো গল্প-কাহিনীই পাঠককে স্বস্তি দেয়, একটা চেনা আবহের অনুভূতি দেয়। আন্দালিব রাশদীর অন্য সব উপন্যাসের মতোই এ বইটি পড়ার সময়ও পাঠক এমনই অনুভব করবেন। 

একটা সময় পাঠকের মনে হবে, চরিত্রগুলোকে তারা বহু দিন ধরে চেনেন, হয়তো তাদেরই কোনো প্রতিবেশী মিমি লিখেছে তার দুই নম্বর নোটবই। বইয়ের নামটিতেই যেন লুকিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। বইটি পড়ার আগেই এসব প্রশ্ন ঘিরে ধরে উৎসুক পাঠক মনকে। কেন ‘দুই নম্বর’? তবে প্রথম নোটবইটির কী হলো? সেটি কি আদৌ আছে, নাকি কোনো আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এরই মাঝে? মিমি কী লেখে তার দুই নম্বর নোটবইয়ে? তার মনের গোপন অলিগলির সাথে কি যোগ ঘটবে পাঠকের? মিমি কি কোনো কিশোরী, সদ্যপ্রাপ্ত যুবতী? মিমি কি কোনো বাস্তব ব্যক্তি, নাকি শুধুই স্মৃতি? এসব প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য ছোট্ট এই উপন্যাসটি পড়ে নেয়ার চেয়ে ভালো কোনো উপায় নেই।

এই ব্লগটি লিখেছেন অনিন্দিতা চৌধুরী

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading