আমি কীভাবে ‘রক্তে আঁকা ভোর’ লিখলাম: আনিসুল হক

xxx

‘রক্তে আঁকা ভাের’ আসলে একটা উপন্যাসধারার ৬ষ্ঠ এবং শেষ বই। প্রথম উপন্যাসটির নাম ‘যারা ভোর এনেছিল।’ এটা বেরিয়েছিল ২০১১ সালে। কিন্তু কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। এই সময় ঈদসংখ্যা প্রথম আলো এবং ঈদসংখ্যা অন্য আলোয় এর নির্বাচিত অংশ প্রকাশিত হয়। তার মানে প্রায় ১৩ বছর ধরে আমি একটা কাহিনির সঙ্গে বসবাস করছি। যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে, আলো-আঁধারের যাত্রী, এই পথে আলো জ্বেলে, এখানে থেমো না। ৫টি উপন্যাসের পর এই ‘রক্তে আঁকা ভোর‘।

১৩ বছর আগে কেন আমি যারা ভোর এনেছিল লিখতে শুরু করেছিলাম, সেটা আগে বলি। তখনও বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী বের হয়নি। আমি দেখি, আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলি এইভাবে– ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি মিলিটারি ঘুমন্ত বাঙালির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় বাহিনি– মিত্রবাহিনির কাছে পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করল।

তার মানে আমাদের মুক্তির দীর্ঘ সংগ্রামকে যুদ্ধে সীমিত করা হচ্ছে। আসলে কি ব্যাপার এত সোজা? আমি তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সেই ১৯৩০-এর দশক থেকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম। আহা, কী ত্যাগই না স্বীকার করেছেন শেখ লুৎফর রহমান, সায়রা খাতুন। কী কষ্ট-ত্যাগ-তিতিক্ষার ভেতর দিয়ে গেছেন বেগম মুজিব ওরফে রেনু। পাকিস্তান হলো কীভাবে? ১৯৪৮ সালেই ভাষা আন্দোলন শুরু করলেন বঙ্গবন্ধুসহ ছাত্রযুবনেতারা। তাজউদ্দীন তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুর শিষ্য। রফিক জব্বার সালাম বরকত–এরা কারা? ধীরেন্দ্রনাথ দ্ত্তর কাহিনিটা কি নতুন প্রজন্ম জানে? আমার উপন্যাসের চরিত্র হয়ে এলেন মওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা প্রমুখ।

রক্তে আঁকা ভোর 2
আনিসুল হক

তো ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই কাহিনির ১৯৭১ পর্ব বেরুবে। কিন্তু যতই পড়ি, ততই ব্যাপারটার বিশালতা আমার কাছে অধরা হয়ে যেতে থাকে। বইমেলা পিছিয়ে গেলা মার্চ-এপ্রিল মাসে। আমি লিখেই চলেছি। ফেসবুক বন্ধ করে দিলাম। করোনার লকডাউনের কারণে বাড়ির বাইরে যেতে হয় না। সারাদিন পড়ি। সারাদিনরাত লিখি। আমার একটা ছবি দিচ্ছি। রক্তে আঁকা ভোর লেখার সময় আমি বিছানায় বই নিয়ে ঘুমুতাম। শেষে ১ লাখ ৬০ হাজার শব্দ দাঁড়াল উপন্যাসটা। অবশেষে ফেব্রুয়ারির বই বেরুচ্ছে সেপ্টম্বরে। মুক্তিসংগ্রাম বিশাল মহাকাব্য। এর কাহিনি উপকাহিনি অনেক। চরিত্র অসংখ্য। নিক্সন কিসিঞ্জার ভিলেনের ভূমিকায়। মোশতাক তাদের হয়ে কাজ করছেন। মুক্তিবাহিনি ছাড়াও আছে মুজিববাহিনি। তাদের সঙ্গে মুজিবনগর সরকারের সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক। ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা অসাধারণ। ইয়াহিয়া কিংবা নিয়াজি তো একেবারে মদে-নারীতে চুর। গ্রামের সাধারণ মানুষ জীবন দিচ্ছে। প্রতিরোধ করছে। রাজাকার আলবদর আলশামস হত্যা-ধর্ষণ চালাচ্ছে। সেক্টর কমান্ডাররা কে কী করছেন? গেরিলারা? নৌকমান্ডো। মুক্তিসংগ্রামী বিমানবাহিনি। খালেদ মোশাররফেরা লড়ছেন বীরের মতো। জিয়াউর রহমানকে ধরে নিয়ে গেলেন বেলাল মোহাম্মদ, কালুরঘাট বেতার সম্প্রচার কেন্দ্রে। জিয়া কী করলেন? যোদ্ধা হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন? ১৬ ডিসেম্বরের আগে পরে কী হলো? কী করছিলেন মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল? শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ রাসেল অবরুদ্ধ ঢাকায় বেগম মুজিবের সঙ্গে একটা গৃহবন্দিত্বের বাড়িতে কেমন করে দিনরাত কাটালেন? তাজউদ্দীন কত ঝড় সামলালেন? বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ হলো। তারপর?

মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস গল্পের মধ্য দিয়ে জানার জন্য যারা ভোর এনেছিলো সিরিজ

 

এইসবের ইতিহাসনিষ্ঠ কিন্তু উপন্যাসশোভন বর্ণনা আমাকে দিতে হয়েছে। আরো অনেক প্রসঙ্গ আছে। আমি মনে করি, আমাদের কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে বহুবিস্তারী উপন্যাস এই রক্তে আঁকা ভোর। অনেক কিছু কভার করা গেছে। অনেক কিছু কভার করাও যায়নি। তবে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বইটা পড়লে গল্পের ছলে জানতে পারবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিশালতার খানিকটা। বই লিখতে লিখতে একটা তথ্যের জন্য পাঁচটা বই ঘাঁটতে হয়েছে। ফোন করেছি মহিউদ্দীন আহমদ কিংবা নাসির উদ্দীন ইউসুফকে। কখনো জিগ্যাসা করেছি প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানকে। কখনো সোহরাব হাসানকে। কখনো রাশেদুর রহমান তারা ভাই, কিংবা লুৎফুল ভাইকে। কখনো জিগ্যাসা করেছি বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা আপাকে। কখনো ফোন করেছি তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি আপাকে। তাঁরা সবাই আমাকে তথ্য দিয়ে, রেফারেন্স দিয়ে সহায়তা করেছেন। আরো কতজনকে যে জ্বালিয়েছি। কত বই থেকে তথ্য নিয়েছি, বিবরণ নিয়েছি।


রক্তে আঁকা ভোর বইটি অটোগ্রাফসহ পেতে ক্লিক করুন

আমার ইচ্ছা হলো, ৬টা বই একখানে করে অখণ্ড ‘যারা ভোর এনেছিল’ বের করব। তখন গ্রন্থপঞ্জী দিতে হবে। এর বাইরে দেশি-বিদেশি পত্রিকা, ওয়েবসাইট, ভিডিও, ডকুমেন্টারি দেখেছি। প্রথমা চেষ্টা করেছে বইটাকে নির্ভুল করতে। তিনবার প্রুফ দেখা হয়েছে। তিনজন সম্পাদক আলাদা আলাদাভাবে তথ্য নির্ভুল করার জন্য সম্পাদনা করেছেন। তারপরেও ভুল থাকবে। আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আমরা পরবর্তী সংস্করণে ভুল সংশোধন করে দেব।

কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক নিয়ে অন্যান্য লেখা পড়তে

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading