অটোফেজি কী? কেন প্রয়োজন?

autophagy feature image

‘অটোফেজি’ একটি গ্রিক শব্দ। এর বাংলা অর্থ ‘আত্মভক্ষণ বা নিজেকে খেয়ে ফেলা’। এই আত্মভক্ষণ কোষের কোনো ক্ষতি করে না বরং কোষকে সজীব রাখতে সাহায্য করে। যদি এই আত্মভক্ষণ প্রক্রিয়াতে কোনো সমস্যা হয়, তবে শরীরে নানা রকম রোগের উৎপত্তি হতে পারে কেননা এটা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহকে পরিষ্কার করার একটা প্রক্রিয়া, যা সম্পন্ন হয় কোষীয় পর্যায়ে। মানুষের দেহে বিভিন্ন ধরনের কোষ রয়েছে, যেমন―রক্ত কোষ, মাংস-পেশি কোষ, চর্বি কোষ, চর্ম কোষ, শিরা-উপশিরা কোষ ইত্যাদি। সাধারণত দেহের কোষগুলোর বিন্যাসের ওপর নির্ভর করে দেহের গঠন ও গড়ন।

অটোফেজি প্রক্রিয়া দেহের জন্য ‘ঝাড়–দার’। সে ঝাড়– দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে কোষের ডাস্টবিন লাইসোজোমে নিয়ে ফেলে। ১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন কোষের অভ্যন্তরে সাইটোপ্লাজমের সাইটোসলে (Cytosol) একধরনের অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ রয়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের এনজাইমও আছে। ১৯৫৫ সালে লাইসোজোম আবিষ্কারের জন্য বেলজিয়ান বিজ্ঞানী ডে দুভে (Christian de Duve) ১৯৭৪ সালে নোবেল বিজয়ী হন। ‘ডে দুভে’র ১৯৬৩ সালে ‘অটোফেজি’ শব্দটির সাথে বিশ্ববাসীকে পরিচয় করিয়ে দিলেও লাইসোজোমে কী ঘটে তা বিজ্ঞানীদের কাছে পরিষ্কার ছিল না, ফলে অটোফেজি নিয়ে মানুষ মাথা ঘামায়নি।

‘ডে দুভে’র আবিষ্কারের পর কয়েক দশক পর্যন্ত খুব নগণ্য পরিমাণ কাজ হয় অটোফেজি নিয়ে। এর প্রধান কারণ অটোফেজি তখন কেবল কোষের আবর্জনা নিষ্কাশন পদ্ধতি হিসেবেই পরিচিত ছিল। এর কৌশল, প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রকার মাথা ঘামাতে চেষ্টা করেনি কেউ। জাপানের বিজ্ঞানী ইওশিনোরি ওসুমির আবিষ্কারটা ছিল লাইসোজোম নামক প্রকোষ্ঠটির কাজের ওপর এবং কীভাবে এটা আমাদের দেহের ক্ষতিকারক প্রোটিনকে ধ্বংস করে বা কাজে লাগায় সেই ক্রিয়া-কৌশল নিয়ে। অটোফেজি নিয়ে পরবর্তী গবেষণার কর্ণধার জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি।

BUY NOW

অটোফেজি এমন একটি প্রক্রিয়া, যা ক্ষতিকারক প্রোটিনকে শুধু যে ধ্বংস করে তা নয়, আবার দেহের কাজে লাগায়। দীর্ঘক্ষণ উপবাসে থাকলে, পরিমাণে কম কিংবা কম ক্যালরির খাদ্য খেলে, ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম করলে কিংবা নিয়মিত নিদ্রার মাধ্যমে অটোফেজি প্রক্রিয়া চালু হয়। এ প্রক্রিয়া শরীরে চালু করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো রোজা বা উপবাস। যখন শরীরে খাবারের সংকট তৈরি হয় তখন অটোফেজি প্রক্রিয়াটি চালু হয়। আমি যদি টানা ১২ ঘণ্টা না খেয়ে থাকি, তা হলে আমার দেহের সকল খাবার শেষ হয়ে যায়, অর্থাৎ আমাদের পরিপাকতন্ত্র তখন বিশ্রাম নেয়।

অনেক সময় আমরা যদি রাতে ভালো ঘুম দিই, তা হলে পরিপাকতন্ত্র এই বিশ্রামের সুযোগটা পায়। এই সুযোগটা দেহকে দেওয়া প্রয়োজন, কেননা এই সময় দেহ রোগ প্রতিরোধের কাজটি করে থাকে। অর্থাৎ যখন তাকে খাবার হজম কিংবা খাবার পরিপাক নিয়ে ভাবতে হয় না তখন সে দেহ তৈরিতে মনোযোগী হয়, রোগ প্রতিরোধ কিংবা জীবাণু ধ্বংসের কাজে নেমে পড়ে। গ্লুকোজ নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই, তখন গ্লুকাগন নামক একটি হরমোন গ্লাইকোজেন ভেঙে গ্লুকোজ বানিয়ে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।

১৬ ঘণ্টা উপবাসে থাকার পর দেহ তার সঞ্চিত ফ্যাট ভাঙা শুরু করে। অর্থাৎ কেউ যদি তার ফ্যাটকে কাজে লাগাতে চায় তা হলে অন্তত ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে হবে। আরেকটা জিনিস মনে রক্তে হবে, যতক্ষণ দেহে চিনি আছে ততক্ষণ ফ্যাট বার্ন হবে না। কেউ যদি চায় তার দেহ থেকে মেদ দূরে সরে যাক, সে যেন প্রথমে চিনিজাতীয় খাবার খাওয়া বন্ধ করে, তারপর নিয়মিত দেহকে উপবাসে রাখে! এভাবে ১৮-২৪ ঘণ্টা উপবাসে থাকার পর দেহে অটোফেজি চালু হয়।

কী কী উপায়ে আমরা উপবাস করতে পারি? সেটা হতে পারে উপবাস, রোজা, সবিরাম বা মধ্যবর্তী উপবাস, কিটো ডায়েট, জল উপবাস, অটোফেজি ডায়েট কিংবা ব্যায়াম। এমনকি হতে পারে চিনি ছাড়া সকালে এক কাপ কফি! মনে রাখবেন, যতক্ষণ দেহে চিনি আছে ততক্ষণ ফ্যাট বার্ন হবে না। কেউ যদি চায় তার দেহ থেকে মেদ দূরে সরে যাক, সে যেন প্রথমে চিনিজাতীয় খাবার খাওয়া বন্ধ করে, তারপর নিয়মিত দেহকে উপবাসে রাখে!

আপনি যদি নিয়মিত মধ্যবর্তী উপবাসে থাকেন, তা হলে দেখবেন―আপনার যে সকল ছোটখাটো স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, ছয় সপ্তাহের মধ্যে কম করে তার ৫০ শতাংশ চলে যাবে। মনে রাখবেন, ডায়েট মানে না খেয়ে থাকা নয়, ডায়েট মানে আপনাকে সঠিক খাবার নির্বাচন করা, আপনাকে উপলব্ধি করা কোনটা খাবেন এবং কোনটা বাদ দিবেন। আপনি সবকিছু ঠিক রেখে শুধু কার্বোহাইড্রেট কিছুটা কমিয়ে সেটা ১৫০০ ক্যালরিতে নামিয়ে আনলেন, হয়ে গেল আপনার লো-কার্ব ডায়েট চার্ট। মনে রাখবেন শরীরে যেন ভিটামিন কিংবা মিনারেলের সংকট না হয়, এই ক্যালরির পরিমাণ বাড়াতে হতে পারে যদি আপনি ব্যায়াম বা পরিশ্রমের কাজ করেন।

আপনি যখন শরীরে গ্লুকোজ সরবরাহ বন্ধ করে দেন তখন শরীর তার বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করার জন্য ফ্যাটি টিস্যু ভাঙা শুরু করে দেয়। যখন ফ্যাট বার্ন হবে তখন আপনার ওয়েট লস বা ফ্যাট লস হবে। কারণ কিটোতে আপনার ফ্যাট সেল বার্ন হচ্ছে। ফ্যাট কমানোর জন্য ফ্যাটজাতীয় খাবার বন্ধ না করে শরীরে গ্লুকোজ সরবরাহ বন্ধ করুন। ইসবগুল একধরনের ডায়েটারি ফাইবার, যার কিছু পানিতে দ্রবীভূত হয়, কিছু হয় না। অন্ত্রের ভেতরে থাকাকালীন ইসবগুলের ভুসি প্রচুর পরিমাণ পানি শোষণ করে, কোনো কিছুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিষ তৈরি করে না এবং অন্ত্রের দেয়াল পিচ্ছিল করে দেয়। ফাইবারসমৃদ্ধ হওয়ার কারণে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও হজম ক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করে।

মোটা মানেই অসুস্থ নয়, মোটা হওয়া মানেই রোগ নয়। আপনার ওজন বাড়তে যেমন সময় লেগেছে, কমাতে হলে সময় নিয়ে কমাবেন। এক বছরে আপনার ওজন যদি ১০ কেজি বাড়ে তা হলে এক বছর সময় নিয়ে সেটা কমান―সাত দিন কিংবা এক মাসে কমাতে গিয়ে রোগ ডেকে আনবেন না। প্রতিদিনের সকালটা শুরু হোক লেবুর শরবত দিয়ে। এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে লেবু চিপে শরবত করে সঙ্গে একটু লবণ মিশিয়ে নিন। চিনি মেশাবেন না, চিনি যদি বন্ধ করতে না পারেন তা হলে কখনো দেহের চর্বি গলাতে পারবেন না। সব রকমের চিনিজাতীয় খাবার থেকে দূরেই থাকুন।

স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ১০ কোটি স্নায়ুকোষ থাকে। তাদের মধ্যে চার-পাঁচ লক্ষ কোষ ডোপামিন তৈরি করে। ২৫ বছর বয়সের পর থেকেই মানব মস্তিষ্কে বিভিন্ন স্নায়ুকোষ মরে যেতে শুরু করে। কোষ যখন মারা যায়, ডোপামিন নিঃসরণকারী কোষও কমতে থাকে, একপর্যায়ে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণকারী স্নায়ুকোষগুলোর শতকরা ৬০ ভাগ মারা গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দেহে পার্কিনসন্স রোগের উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।

বর্তমানে অটোফেজি গবেষণার কর্ণধার জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি। অটোফেজি কৌশল ব্যাখ্যা ও নতুন গবেষণা দ্বার উন্মোচনে ওসুমির অসামান্য অবদানকে স্বীকার করে তাকে ২০১৬ সালে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। বর্তমানে অনেক বাংলাদেশীসহ পৃথিবীতে কয়েক হাজার গবেষক এটা নিয়ে কাজ করছেন। ২০২০ সাল পর্যন্ত এই বিষয়ের উপর ৪,০০০ এর অধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমানের পিএইচ.ডি’র গবেষণার বিষয় ছিল ‘অটোফেজি’। সেটা নিয়েই তিনি বাংলায় এই বইটি লিখেছেন। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে দুজনকে গবেষককে। উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছেন ‘জাপানের অটোফেজি গবেষক অধ্যাপক ড. তাকাশি উশিমারু, যিনি আমাকে অটোফেজি বিষয়ে পিএইচ.ডি ডিগ্রি দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় চিকিৎসক ডা. মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর কবীর, যিনি অটোফেজি বিষয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে দেশবাসীকে নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করেন।’

বইটি গল্পে গল্পে লেখা তথ্যগুলো শরীর নামক বাহনকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সহায়তা করবে। এই বই আপনাকে ডায়েট চার্ট দেবে না, অপ্রয়োজনে ডায়েট করতেও বলবে না, তবে সুস্থ থাকার উপায় জানাবে। এটা একটা শিক্ষামূলক বই, এটা কোনো প্রেসক্রিপশন নয়। কোনো চিকিৎসা প্রয়োজন হলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে সরাসরি যাবেন, কোনো লেখক, ফেসবুক সেলিব্রেটি কিংবা ইউটিউবারের কাছে নয়। বইটি সম্পূর্ণ পড়বেন, সময় নিয়ে পড়বেন, বুঝে বুঝে পড়বেন।

আরও পড়ুন- খনার বচন ও কৌটিল্যের নীতিশাস্ত্র  

এই লেখকের অন্যান্য বই দেখতে ক্লিক করুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading