বিল বাঘিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য

কৃষি, সংস্কৃতি ও জীব বৈচিত্র্যের সেকাল-একাল
bil baghiya feature image

আপনি যদি কখনো বর্ষায় বিল বাঘিয়া যান এবং পড়ন্ত বিকেলে সেখানে নৌকায় ঘুরতে বের হন, আপনার মনে হবে, হাওয়া বদলের জন্য এ এক তীর্থস্থানই বটে। প্রকৃতি যেন উদার হস্তে এখানে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। মাথার উপরে খোলা আকাশ, দূরগ্রাম থেকে আসা নির্মল বাতাস শরীর-মন দুটোকেই ফুরফুরে করে দেয়।

বিল বাঘিয়া জলজ উদ্ভিদ, ক্ষুদে প্রাণী, শীতের পাখি ও মাছের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। অভয়াশ্রমও বলা যেতে পারে। নৌকা এখানে ভরষা, চলে আষাঢ় থেকে অগ্রহায়ন পর্যন্ত। ফাঁকা ফাঁকা বাড়িগুলি ছোট্ট দ্বীপের মত। চারিদিকে তাকালে চোখের দৃষ্টি অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে, দূরের সবুজ সারিবাঁধা গ্রামে। চোখে প্রশান্তি এনে দেয় অনায়াসেই। নিসর্গ প্রকৃতি এখানকার মানুষের স্বাস্থ্যের বড্ড অনুকূল। নির্ভেজাল সুস্বাদু খাবার আর সার-বিহীন তাজা শাকসব্জি-মাছ। হাট-বাজার, স্কুল-কলেজসহ নানা কাজে হাটাহাটি এদের শরীরের পক্ষেই যায়।

শুধু পড়ন্তু বিকেলের হাওয়া খাওয়া কেন? আষাঢ়-শ্রাবণে একটু ভোর বেলা ওঠা যাক না। ভোরের হালকা আঁধারীতেই চোখে পড়বে শাপলা ফুলে ফুলে ভওে ওঠা সারা পাথার। যেন সাদা চাদর বিছানো এক মায়াবী প্রান্তর। আষাঢ়-শ্রাবন বিলের উঠতি যৌবন। এরপর আশ্বিন পর্যন্ত এক বুক জলরাশি নিয়ে বিল হয়ে ওঠে ভরাযৌবনা, অপরূপা। এই তো আর ক’টা দিন মাত্র। আষাঢ় আসছে, সাথে বর্ষা। এর জন্য বিল বাঘিয়া অপেক্ষা করে বছর জুড়ে। পুরো বর্ষায় এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব হয়ে ওঠে। বাঘিয়ার মানুষ সে খবর রাখে।

এই বিল বাঘিয়া বিস্তৃীর্ণ একটি এলাকা। এর অবস্থান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালী পাড়ার সর্বোত্তরে। আশেপাশে আরো বিল আছে। তবে বিল বাঘিয়ার ঐতিহ্য আলাদা। তারমধ্যে বাঘিয়ার নৌকা বাইচ ছিল অন্যতম।

অর্ডার করুন

যে জলজ উদ্ভিদের কথা বলছি, তা জ্যৈষ্ঠের জমিতে জল আসতে না আসতে আপনা আপনি গজাতে শুরু করে। কত যে বুনোঘাস, লতাপাতা, গুল্ম বেড়ে ওঠে, কে তার হিসেব রাখে! বর্ষার সাথে সাথে কলমীর ডগা ধেই ধেই করে বাড়তে থাকে। কার্তিক-অঘ্রানে এর ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে ওঠে মাঠ-প্রান্তর। দূর থেকে চোখে পড়ে। কচরীপানা, শেওলা, শাপলা, শাপলা পাতায় ছেয়ে যায় পুরো বিল। গুন্দি শাপলা আছে, নীল ফুলের। আশ্বিনে শাপলা ফুলে ঢ্যাপ আসে, গোলাকার দেখতে। ঢ্যাপের ভিতর সরিষা-দানার মত বীজ থেকে ঢ্যাপের খৈ তৈরী হয়। এসব শখের কাজ এখন কমে গেছে। নানা রঙের শেওলা বেড়ে ওঠে জলের নীচে। জলের নীচে এসব পরিষ্কার দেখা যায়। ছোট সাদাফুল মাথায় নিয়ে জন্মে মামাকলা। সারা পাথার জুড়ে কচু-ঘেচু, নিদ্রালী, শাখারু, ভূঁই ডালিম, দূরালী, ক্যাচরা, বলুঙ্গা, গোদাফেনা, টোপাফেনা, নগ্নাফেনা, ব্যাঙের হাতা, ব্যাঙের ছাতাসহ নানা জলজ উদ্ভিদ দেখা যায়। এদের অনেক নাম স্থানীয়ভাবে পরিচিত।

সবুজ ঘাস বিলের সৌন্দর্য। সাধারন ঘাস, আজালী, কাইনালী, মালঞ্চ, ঝরা, উড়ি, কাজলা, তেইলগা, শিকা বাদশা, ফুর্সা, দূর্বা, কলসহ নানা জাতের ঘাস বেড়ে উঠে। একবার বীজ থেকে অনেক বছর পরও এরা জন্মে। কথায় আছে, ‘উড়ির কুড়ি শোলার বত্রিশ, ডেকে কয় কল, কলির আছে কতকাল?’ বর্ষার বাতাসে ঘাসবনে ঢেউ তোলে। ঢেউয়ের সাথে ফড়িং উড়ে উড়ে পড়ে ঘাসের ডগা থেকে ডগায়।

নল-নটার এখনো কিছু আছে। হেমন্তে কাশফুলের মত নল-ফুল ধরে। আছে বলজ গাছ, বইন্যা গাছ। বইন্যার বাহারী ফুল আর কত্ বেলের মত ফল। কোনো কাজের নয়। আশ্বিনে হলুদ ফুলে ভরে ওঠে শোলার ক্ষেত। বন-বাঁদারে কত কী বেড়ে ওঠে, কতটুকুন তার চোখে পড়ে! অথচ শহরে যত্নে গড়া বাগানের এক কোনে নলের ছোপাটিও চোখে পড়ে। পৌষে মাটি জেগে ওঠার সাথে সাথে বিষকাটালি, ডুটকুরা গজিয়ে ওঠে। কালো, নরম মাটি। ডুটকুরা জ্বালতি হিসেবে বৈশাখে কেটে নেয়। বাঘিয়ার বিলে অতীতে  ছোপা ছিল। শীতকালে কুয়ার পাশে তিতা হেলঞ্চা শাক বেড়ে ওঠে, কাঁথার মত করে করে। সুগন্ধি সোন্ধ্যা আছে। এর মূল সুগন্ধিযুক্ত, বিয়েতে গায়ে-হলুদের কাজে লাগে। খোলায় নানান পদের শাক প্রাকৃতিক ভাবেই জন্মে। চৈত্রে জমি থেকে শালুক কুড়ায়। পুড়িয়ে খায়। কিশোরকিশোরীদের মুখে এর স্বাদ অপূর্ব। এছাড়া ঝুলিকাথা, মলপটকী, আগ্রা, ছিটকী গাছসহ আরও অনেক নাম না জানা লতাপাতা, গুল্ম, গাছপালা বিলে দেখা যায়। বিলের জল-মাটি উর্বর বলেই উদ্ভিদে এত বৈচিত্র্য। বিলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য তার তার জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীতে।
বাইড়া চাষ: বিলে ভাসমান ধাপ বা বাইড়াতে সব্জী চাষ একটি প্রাচীন প্রথা। কচুরিপানা দিয়ে ২৫-৩০ হাত লম্বা ও ১০-১২ হাত আড়ে বাইড়া তৈরী করে। আগে ফাল্গুনে জমির নাড়া দিয়েও বাইড়া বা আইল তৈরী করা হত। এখন শুধু কচুরিপানা দিয়ে বাইড়া করে। তাতে হলুদ, উচ্ছে, ঢেঁড়শ, শসা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, তরই, বরবটি, ডাটা, শিম, নোবা, পাটশাক, চুপরীশাক সহ নানা তরিতরকারী হয়। এ অঞ্চলে হলুদ চাষের একমাত্র উপায় এই বাইড়া চাষ পদ্ধতি। এটি পরিবেশ বান্ধব ও সারবিহীন সব্জি উৎপাদনের চমৎকার একটি পন্থা। আজকাল প্রায় সব বাড়িতে উঠান বা আঙিনায় পুইশাক, কুসি (চিচিঙ্গা), শসা ও চালকুমড়ার মাচা দেখা যায়।

বিলে জলজ উদ্ভিদের পাশাপাশি সবুজ ধানক্ষেত, সোনালী ধানের মাঠ, বাড়ি সংলগ্ন ক্ষেত-খোলা, কচু, পাট, মেস্তা, শোলা, ধৈঞ্চা, মাছ, পাখী, ক্ষুদে প্রাণী, মেঘ-বাতাস, রোদ-বৃষ্টি, চাঁদের আলো, সব মিলিয়ে বিল সত্যিই এক অপরূপ সৌন্দর্য ধারন করে। চাঁদের আলোয় নৌ-বিহার ভীষণ ভালো লাগার। বিশেষ করে ভরা পূর্ণিমার জোছনা যখন গলে গলে বন্যা বইয়ে দেয় সারা প্রান্তর জুড়ে। এখানে বৃষ্টিতেও যেন যাদু আছে। দূর গ্রাম থেকে বৃষ্টি ঝেপে আসছে দেখে চারিদিকে সারাতাড়া পড়ে যায়। যত বড় ফোঁটা তত বেশী শিহরণ। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, কথা হারিয়ে যায়, সে এক চমৎকার অনুভূতি। মিষ্টি পতনে কেমন সিক্ত হয়ে ওঠে মন। পাথারে শাপলা ফুল বৃষ্টির ঘায়ে ঘায়ে এদিক ওদিক ন্যুয়ে পড়ে, শাপলা পাতাগুলোও কেঁপে কেঁপে ওঠে। জলের উপরিতল এতটুকুন স্থির হতে দেয় না, এলোমেলো করে দেয় আকাশের প্রতিবিম্বটা। জানালা দিয়ে ঝুম বৃষ্টি দেখতে দেখতে একসময় চোখ ভারি হয়ে আসে। বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাসের হিমেল স্পর্শ সারা শরীরে বুলিয়ে দেয়।
ক্ষুদে প্রাণীদের অভয়ারণ্য:

বিল বাঘিয়ার ক্ষুদে প্রাণী বিলেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাকৃতিকভাবেই তা। বিলের গাছপালা, ঘাস, জলজ উদ্ভিদের সাথে জড়িয়ে আছে এখানকার প্রাণী ও পোকামাকড়ের বিচরণ। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ু এদের বসবাস করার পক্ষে উত্তম জায়গা। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে কুনোব্যাঙ, প্যাটকুরা, ঘুঘরা ও আরজিনার আধিক্য বেড়ে যায়। একসময় প্রচুর সোনা ব্যাঙ, ভাউয়া ব্যাঙ ছিল। সবুজ-সোনালী রেখা ও রঙে তা ছিল চমৎকার দেখতে। জলে গুইসাপ ধীরে ধীরে বিচরণ করে বেড়ায়। কারও টের পেলে হঠাৎ কোন ঝোপে বা জলে তলিয়ে যায়। বিপদজনক প্রাণী নয়। নানা জাতের সাপ ছিল একসময়। এখন কমে গেছে। সাপ যদি কখনো ব্যাঙ ধরে তাহলে রয়ে রয়ে ব্যাঙের মরণ ডাক শোনা যায়, বিশেষ করে রাতে। গা ছমছম করে।
প্রাণীর আরও খবর আছে বিলে। খাটাশ, বাগডাশা ও বেড়াল জাতীয় প্রাণী ছিল একসময়। খাটাশের হাস চুরি ছিল নিয়মিত কাজ। বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রাণীটি। খেঁকশিয়াল, পাতিশিয়াল ছিল, এখন দেখি না। বেজী আছে। সাপ-বেজীর লড়াই নাকি দেখার মত। কচরী, ঘাস ও ধানক্ষেতে নানা ধরনের ফড়িং উড়ে বেড়ায় । ধানক্ষেতে একসময় প্রচুর শামুক, ঝিনুক ছিল। এখন কমে গেছে। চিংড়ি ঘেরের জন্য তুলে নিয়ে যায়।

ঘরের পেছনে গাছে মৌমাছি চাক বাঁধে। শুকনার সময় উচ্ছে ও লাউয়ের মাচায় কাঙলাস (গিরগিটি ধরনের) থাকে। গাছ বেয়ে ওঠা এবং দৌড়াতে এরা খুবই পটু। এই আছে এই নেই। কার্তিক-অঘ্রানে নানা রঙের প্রজাপতি, ঘাসফড়িং বাড়িময় উড়ে বেড়ায়। হরেক রকমের পোকা-মাকড়, কীট পতঙ্গ আছে এই বিলে। ভোমরা, কুমুল, বোলতা, ভীমরুল, মাকড়শা, ঘুগরা (ঝিঁঝিঁ পোকা), পঙ্গপাল, চারাপোকাসহ আরও অনেক নাম না জানা।

বিচিত্র ক্ষুদে প্রাণীদের বসবাস এই বিল বাঘিয়ায়। নীরব প্রকৃতির এক বিশাল আয়োজন এদেরকে নিয়ে। রাতে ঝিঁঝিঁ পোকা, ব্যাঙ, পতঙ্গদল একটানা সুর বাজিয়ে চলে। যেন সুরের লহরীতে ঐকতান সৃষ্টি করে। কারও থেকে কারও ডাক আলাদা করা যায়না। একসুরে বাঁধা পরিবার, যেন প্রকৃতির এক দক্ষ অর্কেষ্টা দল।

পাখীর কলকাকলীতে মুখরিত বিল

বিল বাঘিয়ায় পাখীর ডাকে ঘুম ভাঙে। কত পাখী হবে? জরিপ নেই। পাখী আসে যায়, কোনো বাঁধা নেই। কিছু পাখি আছে বাড়িকে ঘিরে সারা দিনমান ওড়াওড়ি করে। এই আসে এই যায়। এরা ঘরোয়া পাখির মত, খানিক দূরে গিয়ে আবার ফিরে আসে।। নানা ডাকে কেবলি আপন হতে চায়। চড়–ই, শালিক, কবুতর, দোয়েল (দইয়ানাচা), শ্যামা, পাতি কাক, দাড় কাক, কোকিল, হাস, মোরগ, এরা সেই পাখি যারা বাড়ি দখল করে রাখে। আবার পাথার জুড়ে থাকে ফিঙে, পানকৌড়ি, চিল, হ্যাচাইন, বাজকুরাল, চাতক, টুনিসহ আরও অনেক পাখি। কিছু পাখি আবার সিজনাল। বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যে আউশের ক্ষেতে কোড়া দেখা যেত। মাথায় লাল ঝুটির কোড়া, দেখতে বেশ সুন্দর। এক সময় ফাল্গুন-চৈত্রে জমিতে বাবুই পড়ত। এখন তালগাছ হওয়ায় বাবুই বিলে আস্তানা গেড়েছে। পেন্ডুলামের মত এদের বাসা বাতাসে দুলতেই থাকে, দুলতেই থাকে।

বিলে আগে কোকিল, ঘুঘু, গাছ খোড়লী (কাঠ ঠোকরা) ছিলনা। খুশীর খবর, গাছপালা বাড়ায় এরা এসে বাঘিয়াতেম ভর করেছে। শুধু বসন্তে নয়, কোকিল এখন সারা বছর থাকে। ডেকে ডেকে বাড়ি নিজের করে রাখে। বাড়ির দক্ষিনপাশে নিম গাছের ঝোপে সকালেই টু-উ, টু-উ করে এদের রিং টোন বেজে ওঠে।

বিলের পাখি মানে শীতের পাখী। শীতের পাখী বিলে সুন্দর নাকি বিল সুন্দর শীতের পাখীতে! দুটোই সত্য। বিলের সৌন্দর্য এই শীতের পাখিতেই। মাছ, পোকামাড়, গুল্মসহ অঢেল খাবার বিলে। কত নাম, এসব ভীড় করা পাখীদের! ধূসর কানি বক, সাদা খড়ি বক ও লম্বা গলার দাড় বক, গো-বক, রাঘা (সারস জাত), কালিম, নলঘোঙরা (ছোট কানি বকের মত), কাঁদাখোচা/চ্যাগা, মাছরাঙা, ডাহুক, কুক্কা, সবুজ সুইচড়া, কাজলা দেখা যায়। বিলে বক ও বালিহাসের ঝাক চমৎকার। এরাই আসল পাখি। পিল পিল ডাকে মুখর করে তোলে বুনো হাসেরা। পথের পাশে কাঁদাখোচা পাখি প্রথম চোখেই পড়েনা। হঠাৎ উড়ে ভয় পাইয়ে দেয়। লাল ঝুটির কালিম এখন নেই, ময়ূরের মত দেখতে। সুস্বাদু এর মাংস। ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’ অবস্থা পাখিটির। বিলের নলখাগড়া পাখিদের আবাসস্থল। আজকাল বড় বড় সারস পাখি দল বেধে পৌষ-মাঘে জমিতে পড়ে। স্থানীয়রা একে শামুকখোলা পাখী বলে, লম্বা ঠোটের। পাখি শিকার আজকাল নেই বললেই চলে।

বিল বাঘিয়ার স্বাদের মাছ

বিল বাঘিয়ার মাছের খ্যাতি বহুকাল থেকে। এখনো মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এখানকার বাজারে মাছ কিনতে আসে। এর স্বাদ আলাদা। অতীতে বাঘিয়া বিলের পুরান কৈ ও মাগুর মাছের সুনাম ছিল গল্পের মত। তখন প্রচুর মাছ ছিল। এখন কমে গেছে, তবু তার ঐতিহ্য মুছে যায়নি। সব মাছই জুটত তখন। বিশেষ করে কৈ, পুঁটি, সরপুঁটি, টেংরা, ভেইলশা, খইলশা, টাকি, চান্দা, পাবদা, বাইলা, বাঁচা, ফলি, বাইন, ষোল, গজাল, রুই, কাতল, চিতল, বোয়াল, চিংড়ি, কচ্ছপ, টাটকিনিসহ আরো অনেক মাছ। আগে সৌখিন মাছ শিকারী ছিল, নামকরা। মাছ শিকারের নানা কাহিনী শোনা যেত। এখন মাছের দাম চড়া।

সর্বশেষ কথা

‘পলাশীর যুদ্ধ’ জনপ্রিয় নাটকের রচয়িতা এবং প্রখ্যাত কবি ও লেখক নবীনচন্দ্র সেন একসময় এ বিল নৌকায় করে পাড়ি দিয়েছিলেন, মাদারীপুর থেকে কোটালীপাড়া যেতে। সে ১৮৭৮ সালের কথা। তখন তিনি মাদারীপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে বিলের বেশ কিছু বর্ননা দিয়েছেন। এ ছাড়াও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতায় আছে ঃ
‘মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলি বলেছিল, বড় হও দাদাঠুকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে!’

উল্লেখ্য যে, সেই ‘তিন প্রহরের বিল’-ই এই বিল বাঘিয়া। কবির মাতুলালয় ছিল পাশেই রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম-এ, প্রসিদ্ধ গ্রাম। বস্তুত বিল বাঘিয়ার মাটি জৈব ও দো-আঁশ মাটি। অতীতের আউশ-আমনের পরিবর্তে এখন উচ্চফলনশীল ব্রী-ধানের চাষ হয়। মাটি যথেষ্ট উর্বর হওয়ায় চাষাবাদে এখানে তেমন সার প্রয়োগ নেই। ফলে পরিবেশ যেমন ভালো থাকে তেমনি এখানকার মাছ-তরিতরকারী ন্যাচারাল এবং সুস্বাদু হয়ে থাকে। এখানকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়েই বিল বাঘিয়া অস্তিত্ব, মাহাত্ম। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা সহজ-সরল এবং সাধারণ। তাদের একান্ত চাওয়া, বাঘিয়ার এ পরিবেশ যেন অটুট থাকে। কোনো অজুহাতেই যেন এর পরিবেশ নষ্ট না হয় কিংবা দূষণকারী কোনো আধুনিকতা যেন বিল বাঘিয়াকে গ্রাস না করে। প্রাণের বিল বাঘিয়া তাদের কাছে তীর্থই বটে।

আরও পড়ুন- সুন্দরবনের বাঘ ও বাঙালি পর্যটকরা

এই লেখকের অন্যান্য বই দেখুন

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading