ছড়া কবিতার অলংকার -এ যা যা পাবেন

ছন্দ শৃঙ্খলা, অলংকার চেনার উপায়, সর্বপ্রকার অর্থালংকারের সংজ্ঞা ও নমুনা
chora kobitar olongkar

ছড়াকবিতার ওপর ভিত্তি করেই বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটেছে এ কথা বলা যায়। যুগ যুগ ধরে কবিদের নিরলস চর্চা ও অধ্যাবসায়ের মধ্য দিয়ে কবিতার নানা বাঁক বদল ঘটেছে। যুক্ত হয়েছে নানা কৌশল। একজন প্রাজ্ঞ কবি মাত্রই ভাষার ওপর তার দখল থাকতে হয় ও সৃজনশীল হতে হয়। চিন্তা, আবেগ, দর্শনকে নানাভাবে, নানা আকারে উপস্থাপন করা হয় কবিতার মাধ্যমে। কবিতার পাঠক কিংবা কবিতার গবেষক এক একজন কবির কবিতার মধ্যে এক এক ধরণের নতুনত্ব আবিস্কার করতে পারেন। আসলে এই আবিস্কারই কবিতা পাঠের একটি মূল আনন্দ বা আকর্ষণ।

যারা কবিতা লিখতে চান, পড়তে চান বা সাহিত্যের ছাত্র তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ছড়াকবিতার অলংকার’। বইটি লিখেছেন হাসান রাউফুন। বইটির সূচিপত্রে রয়েছে বিভিন্নপ্রকার কবিতা/কাব্য, ছড়াকবিতার উপাদান বা প্রাণ, অলংকার চেনার উপায়, সর্বপ্রকার অর্থালংকারের সংজ্ঞা ও নমুনা, শব্দালংকার ও অর্থালংকারের মধ্যে পার্থক্য, বিমূর্ত ও মূর্ত অলংকার ও গুরুত্বপূর্ণ সাবজেকটিভ ও অবজেকটিভ প্রশ্ন।

অনেকের ধারণা সাহিত্য কেউ শেখাতে পারে না। কাগজে কলমে সাহিত্যিক তৈরি করা যায় না। কিন্তু ছড়াকবিতা আবেগ বা ভাব থেকে উৎসারিত হলেও সে চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু টেকনিকেল উপাদান- ব্যাকরণ, ছন্দ, অলংকার ইত্যাদি নিয়ে। লুই আরাগ বলেছেন, ‘কবিতার ইতিহাস তার টেকনিকের ইতিহাস।’ এই টেকনিকেলে পারদর্শিতা অর্জন করতে হলে একজন গুরু লাগে, শিক্ষক লাগে।

ব্যাকরণ যুক্তিগাহ্য বলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে- বচন, ক্রিয়া, বিভক্তি, বানান, সন্ধি, সমাস, যতি ইত্যাদির মাধমে। ছন্দ শৃঙ্খলা, সুর বা গতিগ্রাহ্য বলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে- পদ, অক্ষর, মাত্রা, পংক্তি, চরণ ইত্যাদির মাধ্যমে। অলংকার সৌন্দর্যগ্রাহ্য (বাহ্যিক ও আত্মিক) বলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে- মিল, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, চিত্রকল্প ইত্যাদির মাধ্যমে।

ছড়াকবিতার অলংকার

BUY NOW

ভাষার ব্যাকরণ ও কবিতার ব্যাকরণ এক নয়। কবিতায় অনেক কিছু ব্যাকরণ বহিরর্ভূত বাক্য, শব্দ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। গতানুগতিকভাবে কবিতার অলংকার বলতে আমরা ছন্দকেই বুঝি। কিন্তু কবিতা অলংকার একটি বৃহৎ অধ্যায়। একজন নারী তাকে সাজানোর জন্য কতো প্রকার যে অলংকার ব্যবহার করে তার যেমন সঠিক হিসেব নেই তেমনি একটি কবিতায় নানা প্রকার অলংকার ব্যবহার করে কবিতাকে পাঠকপ্রিয় করে তোলেন একজন প্রতিভাবান কবি।

বহুবছর ধরে অলংকারের জটিল ব্যবহার যেমন লক্ষ করা যায় তেমনি আবার সহজ ব্যবহারও লক্ষ করা যায়। জটিল ব্যবহার ও উপস্থাপনের পক্ষে না। পোষাকি সংজ্ঞা বাদ দিয়ে ব্যবহারিক সংজ্ঞা দেয়ার চেষ্টা করেছেন লেখক। তবে অলংকারের বহুব্যতিক্রম ও জটিল ব্যবহার থেকে লেখক শুধু সহজ ও সুন্দর পর্বগুলো তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। আর নমুনা নিয়েছেন, প্রবীণ-নবীন ছড়াকার ও কবিদের ছড়াকবিতা থেকে।

ভাষাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও অলংকারমন্ডিত করার জন্য ব্যাকরণ দরকার অর্থাৎ ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব বা রূপ বা পদতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব আর সাহিত্যকে শৃঙ্খলাবদ্ধ, অর্থপূর্ণ ও অলংকারমন্ডিত করার জন্য দরকার ব্যাকরণ অর্থাৎ সার্থক পদক্রম, ছন্দ ও অলংকার। কবিতাকে অর্থবোধক করতে সাহায্য করে সার্থক পদক্রম আর শারীরিক ও আত্মিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সাহায্য করে ছন্দ ও অলংকার। সাহিত্যে ছন্দ ও অলংকার একজন সুস্থ মানুষের পরিধানযোগ্য বস্ত্রের মতো।

স্বাদ যেমন জিভের ওপর নির্ভর করে তেমনি সাহিত্যের স্বাদ ছন্দ ও অলংকারের ওপর নির্ভর করে। এগুলোকে কবিতার ব্যাকরণও বলা চলে। অলংকার সম্পর্কে ধারণা নেয়ার আগে অলংকার কারা পরিধান করে তা জানা জরুরি। সাহিত্যের মধ্যে পদ্য সামান্যই অলংকার পরিধান করে। তবে কবিতা জোরালোভাবে অলংকার পরিধান করে আর কম করে হলেও ছড়াকবিতা অলংকার পরিধান করে। যারা অলংকার পরিধান করে তাদের সম্পর্কে জেনে নেয়া জরুরি।
হাসান রাউফুনের ছড়া কবিতার অলংকার বইটিতে বিভিন্ন প্রকার কবিতা/কাব্যের প্রকারভেদর ওপর উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এগুলো হলো-

ক) ধরনগত কবিতা
পদ্য, ছড়াকবিতা, ছড়া, কবিতা

খ) গঠনগত বা টেকনিক্যাল কবিতা
ছন্দবদ্ধ কবিতা: স্বরবৃত্ত ছন্দ, মাত্রাবৃত্ত ছন্দ, অক্ষরবৃত্ত ছন্দ
মুক্তকছন্দ, গদ্যছন্দ।

গ) বিষয়গত কবিতা

মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ কবিতা
ওড/ স্তোত্রকবিতা, শোকগাথা/ শোকগীতিকবিতা/ এলিজি, ভক্তিমূলক/স্তব গীতিকবিতা, স্বদেশি গীতিকবিতা, সনেট/ চতুর্দশপদিকবিতা, চিন্তামূলক কবিতা, বৈষ্ণবকবিতা, প্রেমমূলক কবিতা, প্রকৃতিবিষয়ক কবিতা/ নিসর্গকবিতা, পরাবাস্তব কবিতা, বিজ্ঞানমূলক কবিতা, অলৌকিককবিতা।

তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ কবিতা
মহাকাব্য, খ-কাব্য, ট্রাজেডিকবিতা, গাথাকবিতা/ গীতিকা/কাহিনিকবিতা, মঙ্গলকবিতা, কোষকবিতা, নীতিকবিতা, কাব্যনাট্য/নাট্যগীতি/ দৃশ্যকাব্য, প্যারডিকাব্য, লিপিকবিতা, ব্যঙ্গকবিতা/শে−ষাত্মককবিতা, রূপককবিতা/প্রতীকিকবিতা/ বিমূর্তকবিতা, পত্রকবিতা।

ম্যাকলিশের অভিমত হলো- কবিতা কিছুই বুঝায় না, কবিতা শুধু হয়ে ওঠে। না- কবিতা বুঝায় এবং কবিতাকে হয়ে উঠাতে হয়। কবি এই নির্জীব কবিতাকে প্রাণবন্ত করেন জীবন্ত করেন- জীবন, অভাব, কষ্ট, আত্মশ্লাঘা, জাতি, সময় ইত্যাদি দিয়ে। ১১৯ বছর বয়সি সোনার তরী, ৮৮ বছর বয়সি বিদ্রোহী, ৭৪ বছর বয়সি বনলতা সেন আর ৬৬ বছর বয়সি সাত সাগরের মাঝি শধু কবি নয়, সবাইকে জয় করেই হয়ে উঠেছে কবিতা।

কবিতাকে অর্থবোধক করতে সাহায্য করে সার্থক পদক্রম আর শারীরিক ও আত্মিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সাহায্য করে ছন্দ ও অলংকার। সাহিত্যে ছন্দ ও অলংকার একজন সুস্থ মানুষের পরিধানযোগ্য বস্ত্রের মতো। স্বাদ যেমন জিভের ওপর নির্ভর করে তেমনি সাহিত্যের স্বাদ ছন্দ ও অলংকারের ওপর নির্ভর করে। এগুলোকে কবিতার ব্যাকরণও বলা চলে।

সমকালীন অনেক কবির ছড়াকবিতার বিশ্লেষণ ও উদাহরণ দিয়ে অলংকার সম্পর্কে আরো সহজ ও সময়পোযোগী করে লেখা হয়েছে বইটি। ৯৬ পৃষ্ঠার এই বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠাই গুরুত্বপূর্ণ কেননা কবিতার অলংকারের যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়গুলো খুব সূক্ষ্ম ও সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। লেখক হাসান রাউফুন বইটি উৎসর্গ করেছেন বাংলা ভাষার দুজন প্রখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশ ও কবি আল মাহমুদকে।

ভূমিকায় লেখক মিত্র খলিল লিখেছেন, ‘বইকে ভালোবাসো কিংবা গরুকে পিটিয়ে মানুষ করা যায় না’-বললে ভুল বাক্য মনে হয় কি? আসলে ভুল বা বাহুল্য হয় কিনা তা খেয়াল করুন, ‘বই ভালোবাসো কিংবা গরু পিটিয়ে মানুষ করা যায় না’। বইটির লেখক হাসান রাইফুন বইটি লেখার স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন- ‘সেই বাংলা সাহিত্য পরিষদ। সেই অলংকারের ক্লাস। সেই শিক্ষক আবদুল মান্নান সৈয়দ, আমার অন্ধকারে আচ্ছাদিত দরজাগুলো আলোর দিকে আনতে সাহায্য করেন। স্যারের নিকট থেকে অলংকারের ছবক নেয়া আর একটু একটু করে লিখে রাখা তথ্য থেকে আজকের এই বই। তবে বইটি দেরিতে তৈরি হলেও আগ্রহ এবং পড়ার ঘাটতি ছিলো না। তবে মান্নান সৈয়দ স্যারের একটি কথা এখনও কানে বাজে, ‘স্মৃতির প্রখরতার সাথে সাথে বিস্মৃতিকেও রাখতে হবে।’ ‘অলংকার বিষয়টা খুব দুরূহ’ (আবদুল মান্নান সৈয়দ)। অলংকার বিষয়টি যতটা সহজ বলে মনে হয় আসলে অলংকার অতটা সহজ না।

কবিত্ব কাব্যগুণের মুখাপেক্ষি। অভিজ্ঞতা, দর্শন, পঠন কবিত্বের প্রজননকেন্দ্র। ভাবনা থেকে ভাবের উৎপত্তি। ভাব বিজ্ঞান সম্মত নয় তবে ভাবনাকে রচনা বা উৎপত্তির মাধ্যমে বিজ্ঞান সম্মত করা যায়, সত্যে পরিণত করা যায়। প্রমত অভাব ও ভাব কবিতা হয়ে উঠতে সহযোগিতা করে। ছড়া কবিতার ব্যাকরণ বলতে রাউফুন শব্দ-সার্থকবাক্য, ছন্দ ও অলংকারকে বুঝে থাকেন। যেহেতু এটি অলংকারের বই সেহেতু তিনি শব্দ-সার্থকবাক্য ও ছন্দকে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। আর বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন অলংকারকে। এমন অনেক নতুন ভাবনারই জনক বইটি। ছড়াকবিতার অলংকার নাম হলেও বইটি পাঠে শুধু ছড়াকবিতা নয়, পুরো কবিতা সম্পর্কেই একটি ধারণা পাওয়া যাবে। কবিতা কী, কত প্রকার, আঙ্গিকগত ও আত্মিকগত একটি সুস্পষ্ট ধারণার পাশাপাশি ছন্দ ও অলংকারের উপর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বইটিতে।

এই লেখকের অন্যান্য বই দেখতে ক্লিক করুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading