হাসান আজিজুল হকের বই থেকে যেগুলো পড়তে পারেন আপনিও

একজন হাসান আজিজুল হক এবং তাঁর সাহিত্য
হাসান আজিজুল হকের বই

তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যক হিসেবে পরিগণিত। হাসান আজিজুল হকের বই থেকে আপনি যেমনভাবে খুঁজে পাবেন এই অঞ্চলের স্বতন্ত্র গল্পের স্বাদ, তেমনি পাবেন সহজসিদ্ধ গদ্যের নতুন এক দিগন্তের আবির্ভাব। ষাটের দশকে আবির্ভূত এই কথাসাহিত্যিক তার সুঠাম গদ্য এবং মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির জন্য প্রসিদ্ধ। জীবনসংগ্রামে লিপ্ত মানুষের কথকতা তার গল্প-উপন্যাসের প্রধানতম অনুষঙ্গ। রাঢ়বঙ্গ তার অনেক গল্পের পটভূমি। তিনি ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৯৯ সালে একুশে পদকে ও ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। এই অসামান্য গদ্যশিল্পী তার সার্বজৈবনিক সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি লাভ করেন।

প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’ এর প্রথম গল্প ‘শকুন’ এ সুদখোর মহাজন তথা গ্রামের সমাজের তলদেশ উন্মোচিত করেছিলেন তিনি। প্রায় অর্ধশতাব্দীর গল্পচর্চায় বিষয়, চরিত্র ও নির্মাণকুশলতায় হাসান আজিজুল হক অনেক উল্লেখযোগ্য গল্পের রচয়িতা। এসবের মধ্যে রয়েছে ‘শকুন’, ‘তৃষ্ণা’, ‘উত্তরবসন্তে’, ‘বিমর্ষ রাত্রি, প্রথম প্রহর’, ‘পরবাসী’, ‘আমৃত্যু’ ‘আজীবন’, ‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘খাঁচা’, ‘ভূষণের একদিন’, ‘ফেরা’, ‘মন তার শঙ্খিনী’, ‘মাটির তলার মাটি’, ‘শোণিত সেতু’, ‘ঘরগেরস্থি’, ‘সরল হিংসা’, ‘খনন’, ‘সমুখে শান্তির পারাবার’, ‘অচিন পাখি’, ‘মা-মেয়ের সংসার’, ‘বিধবাদের কথা’ ‘সারা দুপুর’ ও ‘কেউ আসেনি’। আজ আমরা এমন কিছু বইয়ের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো, যেগুলো হাসান আজিজুল হকের বই এবং গল্পগুলোর মধ্য থেকে খানিকটা আলাদা করেই রাখা যায়।

১. আগুনপাখি

 

হাসান আজিজুল হকের বই - আগুনপাখি
BUY NOW

এটি হাসান আজিজুল হকের বই থেকে আলাদা করে রাখতে হয় সবসময়ই। কারণ এটি তাঁর প্রথম উপন্যাস। প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কারও পেয়েছে বইটি। ইতিমধ্যেই যে বই বিক্রির শীর্ষ স্থান নিয়েছে। আর হাসান আজিজুল হক মানেই তো অন্য এক নতুন আবিস্কার। যে আবিস্কার ঢেউ তুলতে সক্ষম যে কোনো লেখায়। আগুনপাখি বাংলাসাহিত্যেই এক অভাবনীয় যোগ। কারণ এই উপন্যাসটি দিয়ে হাসান আজিজুল হক জানিয়ে দিয়েছেন তিনি শূধু অসম্ভব শক্তিমান ছোটগল্পকারই নন; তিনি একজন আধুনিক উপন্যাসিকও।

গাঁয়ের একটি মেয়ে, বাপের বাড়ি শ্বশুর বাড়ির বাইরে যে জানে চারপাশের মানুষজনকে, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই হিন্দু। হিন্দু বলে তারা যে আলাদা, তেমন তো কিছু বোঝে না সে। গভীর মমতায় সে গড়ে তোলে তাদের বড় একান্নবর্তী সংসার, আর রাতের নিরালায় স্বামীর কাছে শিখে নেয় অল্পসল্প লেখাপড়া। সুখ দুঃখের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সে দেখে কেমন তার স্বামী জড়িয়ে পড়ে সামাজিক কাজে, হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের কাছেই প্রিয় নেতা হয়ে ওঠে সে। কিন্তু হঠাৎ যেন পাল্টে যায় সব। তাদের একান্নবর্তী সংসারেও ধরে ভাঙ্গন, আর বাইরেও কোথা থেকে রব ওঠে যে দেশটাও নাকি ভাগ হয়ে যাবে। তা কি করে হয়? দেশ আবার ভাগ হয় কেমন করে? অবিশ্বাস্য সেই ঘটনাও সত্য হলো একদিন। মুসলমান পাড়া প্রতিবেশীরা চলে যেতে লাগলো ভিটে ছেড়ে। পরিজনেরাও। কিন্তু সে? না, সে কিছুতেই যাবে না। কেননা সে বলে, ‘আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলেনা ক্যানে আলেদা একটো দ্যাশ হয়েছে,…. এই দ্যাশটি আমার লয়’।

সেই মেয়েটির মুখের আটপৌরে ভাষায় বলা এ এক বুকভাঙ্গা দেশভাগের গল্প।

২. সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য

 

সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য
BUY NOW

হাসান আজিজুল হকের বই থেকে আলাদা করে পড়তে হলে এটি অবশ্যপাঠ্য একটি বই। কারণ এটি তাঁর লেখা প্রথম গল্পগ্রন্থ। সাধারণ পাঠকদের মধ্যে এই বইটির গল্পগুলো এখনও সমান আবেদন রেখে আসছে। গুডরিডসে আবিদা সুলতানা উমামা নামের একজন পাঠক বইটি সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘হাসান আজিজুল হকের কোনো লেখা আমি আগে পড়িনি। তবে এ ধরণের গম্ভীর গদ্যের সাথে অভ্যস্ততা ছিলো। তবু প্রথম দুটো গল্প—শকুন আর তৃষ্ণা পড়তে শুরু করে শেষ করতে অনেকক্ষণ লাগলো কেন জানি। ছবির মতো চোখে ভাসছিলো সব। প্রতিটা গল্পের সমাপ্তিতে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা—এই একটা ব্যাপারের জন্যই ছোটগল্প আমাকে বেশি টানে’।

প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’ এর প্রথম গল্প ‘শকুন’ এ সুদখোর মহাজন তথা গ্রামের সমাজের তলদেশ উন্মোচিত করেছিলেন তিনি। প্রায় অর্ধশতাব্দীর গল্পচর্চায় বিষয়, চরিত্র ও নির্মাণকুশলতায় হাসান আজিজুল হক অনেক উল্লেখযোগ্য গল্পের রচয়িতা।

৩. একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা

 

একাত্তর- করতলে ছিন্নমাথা
BUY NOW

হাসান আজিজুল হকের বই নিয়ে কথা উঠলে অবশ্যই উঠে আসে একাত্তর করতলে ছিন্নমাথার নাম। আমাদের কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক যখন আমাদের ইতিহাসের মহত্তম ঘটনার শরিক থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনার অগ্রসর হন, তখন নিঃসন্দেহে গভীরতর ব্যঞ্জনা নিয়ে ফুটে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা। কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের বই নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আলাপ উঠলে, এখানে তিনি একাত্তরের ভাষ্য শুরু করেছেন নিস্পৃহ ও নিরাবেগ ভঙ্গিতে।

বইয়ের সূচনাবাক্যে তিনি লিখেছেনঃ ‘আমার জানা ছিল না যে পানিতে ভাসিয়ে দিলে পুরুষের লাশ চিৎ হয়ে ভাসে আর নারীর লাশ ভাসে উপুড় হয়ে’। এই জ্ঞান আমি পাই ‘৭১’ সালের মার্চ মাসের একেবারে শেষে। জীবনের নিষ্ঠুরতার বর্ণনায় এমনি অসাধারণ সংযমী শিল্পদৃষ্টির। প্রকাশ আমাদের এক লহমায় দাড় করিয়ে দেয় কঠিন সত্যরূপের মুখোমুখি। শক্তিমান লেখকের সংহত জীবনদৃষ্টি এমনিভাবেই পরতে পরতে উদ্ভাসিত হয়েছে এই গ্রন্থে। একান্ত ব্যক্তিগত ছোট-বড় সাধারণ অভিজ্ঞতাসমূহ শিল্পের পুণ্যস্পর্শে তিনি করে তুলেছেন সর্বকালীন ও সর্বজনীন। শিল্পী আশোক কর্মকারের তুলিস্পর্শে নতুন ভাবে বিন্যস্ত এই সংস্করণ পাঠকরা ফিরে যাবেন একাত্তরের অন্যরকম দৃশ্যপটে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অজস্র বইয়ের ভিড়ে তাই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হিসেবে অনায়াসে চিহ্নিত হবে এই গ্রন্থ।

৪. রবীন্দ্রনাথ ও ভাষাভাবনা

 

রবীন্দ্রনাথ ও বিশ্বভাবনা
BUY NOW

হাসান আজিজুল হকের বই নিয়ে কথা উঠলে বেশিরভাগ মানুষই উপন্যাস ও গল্পের বইয়ের কথা বলেন। তবে তার ফিকশনের বাইরে নন-ফিকশনগুলোও একদমই আলাদা। হাসান আজিজুল হকের বই থেকে আলাদা করে বলতে হয় রবীন্দ্রনাথ ও ভাষাভাবনা।

এই বইটি সম্পর্কে বইটির ফ্ল্যাপে লিখেছেন কবি সৈকত হাবিব। ‘বর্তমান বই রবীন্দ্রনাথ ও ভাষাভাবনা-তেও আমরা তাঁর এই অনুসন্ধানে দেখি। বাঙালির জীবনে যেমন, লেখক হাসানের জীবনেও রবীন্দ্র-গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আমরা দেখি জীবনের বিভিন্ন পর্বে তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভেবেছেন; তাঁকে কেন্দ্রে রেখে সময়-স্বদেশ-বিশ্ব আর ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিচারে উদ্যোগী হয়েছেন। কিন্তু ইতিপূর্বে রবীন্দ্র-নামাঙ্কিত কোনো বই তাঁর থেকে আমরা পাইনি। সার্ধশতবার্ষিকীই হয়তো সেই উপলক্ষটি তৈরি করে দিয়েছে। আর কেবল রাষ্ট্রে-বিশ্বে-সমাজে নয়, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কাদামাখা জীবনেও রবীন্দ্রনাথ কেমন অনিবার্য হয়ে ওঠেন, এর হৃদয়নিবিড় বর্ণনাও তাঁর মতো করে কেউ দিতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। অন্যদিকে ভাষাভাবনা হাসান আজিজুল হকের চিন্তাচর্চার অন্যতম কেন্দ্রীয় অঞ্চল। তাঁর জীবনের প্রধান গবেষণাটির বিষয়ও ভাষা। এই বইয়ে যেমন আছে সেই গবেষণার খসড়ারূপ, তেমনি আছে ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে কয়েকটি মৌলিক ও চিন্তাশীল রচনা।

রবীন্দ্রনাথ ও ভাষাচিন্তার এই যুগলবন্দি হাসান আজিজুল হকের সৃজনশক্তির নতুন চেহারা আমাদের সামনে উন্মোচিত করে।

৫. আত্নজা ও করবী গাছ

 

আত্মজা ও একটি করবী গাছ
BUY NOW

হাসান আজিজুল হকের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ আত্মজা ও একটি করবী গাছ-এর কয়েকটি গল্পে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রভাব সুস্পষ্ট। ত্রিশের উপান্তে মানিক বন্দোপাধ্যায় মার্কসীয় মতবাদের দ্বারা আকৃষ্ট হন। চল্লিশের দশক থেকে মানিক বন্দোপাধ্যায় তাঁর সাহিত্যে সমাজ জীবনকে বিশ্লেষণ করেছেন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সাহায্যে। আত্মজা ও একটি করবী গাছ গ্রন্থে মোট আটটি গল্প সংকলিত হয়েছে। গল্পগুলো গলো- গ্রন্থের নামগল্প আত্মজা ও একটি করবী গাছ, পরবাসী, সারাদুপুর, অন্তর্গত নিষাদ, মারী, উট পাখি, সুখের সন্ধানে, ও আমৃত্যু আজীবন। গল্পগুলো নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের বাস্তবচিত্র নিয়ে লেখা। গ্রাম বাংলার কৃষকের শোষিত জীবন সংগ্রাম ও হতাশা গল্পগুলোতে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

কিছুদিন আগেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে আগুনপাখির মত উড়াল দিয়েছেন আমাদের হাসান আজিজুল হক। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, হাসান আজিজুল হকের বই নিয়ে আলোচনা চলবে বহুকাল, যেমনি বহুকাল ধরে আকাশে ওড়ার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে অনেক রঙের পাখিরা।

আরও পড়ুন- ঘুপচি গলির গল্পে থেমে না থাকা শহীদুল জহির

হাসান আজিজুল হকের সকল বই দেখতে ক্লিক করুন 

 

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading