জাপান কাহিনীঃ জাপানি মিডিয়া

Japan Stories_2 (1)

বলেনতো দেখি বিশ্বের সর্ববহুল প্রচারিত পত্রিকা কোনটি?
গুগল করে দেখি প্রথম ৫টি পত্রিকার মধ্যে ৪টিই জাপানি 

YOMIURI ছাপে দৈনিক দশ মিলিয়ন কপি আর ASAHI আট মিলিয়ন। জাপানের জনসংখ্যা ১২০ মিলিয়ন। বাকি পত্রিকা গুলোর সার্কুলেশন সংখ্যা যোগ করলে পরিবার প্রতি ৩টা পত্রিকা হবার কথা। এত পত্রিকা পড়ে কে?

সে হিসাব পরে হবে। তবে এই বিরাট পাঠক সংখ্যা ধরে রাখার পেছনে আমি সাংবাদিকদের অবদানের কথা বলব। ওনারা জানেন পাঠক কিভাবে ধরে রাখতে হয়,পাঠকদের সম্মান কীভাবে অর্জন করতে হয়। দুটো নমুনা দিচ্ছি।
জাপান কাহিনী বইটিতে জাপানের বিভিন্ন বিষয় খুব সুন্দর ভাবে তুলে এনেছেন আশির আহমেদ

(ক)  একটি জাহাজ ডুবি, ৯ জন নিখোঁজ, দুইটা দেশ

২০০১ সালের কথা। জাপানের শিকোকু দ্বীপের এহিমে জেলার একটি ফিশারি কলেজের ছাত্ররা “এহিমে মারু” নামক একটা জাহাজ নিয়ে ৭৪ দিনের শিক্ষা সফরে বের হলেন। সর্বমোট সদস্য সংখ্যা ৩৫, তার মধ্যে ২০ জন ক্রু, ১৩ জন ছাত্র আর ২ জন শিক্ষক। জাহাজ ঘুরছিল আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপের কাছে। ওখানে তখন আমেরিকা-নেভির সাবমেরিনের একটা মহড়া চলছিল। সাবমেরিনের পাইলট সাহেব জাপানী জাহাজ এহিমে মারু কে নীচ থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে গুতো দিয়ে বসলেন। জাহাজ ডুবল। মুহূর্তে আমেরিকার কোস্ট গার্ড এর হেলিকপ্টার চলে এল। ২৬ জনকে উদ্ধার করলো। ৯ জন নিখোঁজ হলো। জাহাজ চলে গেল সমুদ্রের গভীরে।

পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুকে মেনে নিচ্ছেন কিন্তু নিখোঁজ হওয়াটাকে মেনে নিচ্ছেন না। এটাকেই সেলিংপয়েন্ট ধরে নেমে পড়লেন জাপানের মিডিয়া।

সাংবাদিকরা জাপানের জাহাজ স্পেশালিস্ট দের কাছ থেকে চাইলেন কারিগরি ব্যাখ্যা, রাজনীতিবীদ দের কাছে চাইলেন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। টেলিভিশনে, নিউজপেপারে দেখাতে লাগলেন পরিবারের সদস্যদের শান্ত ভাষার কঠিন দাবী- কেউ হাউ মাউ করে কাঁদছেনা, ভাষা পরিষ্কার, দাবী পরিষ্কার – “পারিবারিক কবরে কবর দিতে চাই, একটা হাড্ডি হলে ও খুঁজে এনে দাও”। জাহাজ ডুবানোর জন্য দায়ী আমেরিকা- সুতরাং লাশ খুঁজে দেয়ার দায়িত্ব ও তাদের।

সাংবাদিকরা জনগণের মানবিক দিকগুলোকে জাগিয়ে দিলেন-

এক মা তার সন্তানের কলেজের ইউনিফর্ম ধরে বসে আছেন- কোন কথা বলছেন না, একটু পর পর গন্ধ শুকছেন। আরেক মা তার সন্তানের পছন্দের খাবার নিয়ে বসে আছেন- আনিসুল হক এর “মা” উপন্যাসের সেই মা এর মতো।

এসব নিঃশব্দ দৃশ্য মানুষ কে দুর্বল করে দেয়। একটা মানুষ নিখোঁজ থাকবে, প্রতিটা দিন প্রতিটা মুহূর্ত পরিবারের মানুষ অপেক্ষা করবে- এটা সহ্য করা কঠিন।

এর মধ্যে আবিষ্কার হলো ঘটনার সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী গলফ খেলছিলেন। উনি গলফ খেলা ইস্তফা দিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশকে ফোন করতে দেরী করেছেন। মিনিটে সেকেন্ডে হিসাব করে জনগনকে বুঝিয়ে দিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী খুব স্লো। জনগন একসংগে হওয়া মানে প্রধানমন্ত্রীর গদিকে নড়বড়ে করে ফেলা।

পররাস্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাখলেন প্রেশারে। দিন নাই রাত নাই একটু পর পর সাংবাদিকরা ওনাদের কাছে আপডেট জানতে চান। রাত দশটা বেজে যাচ্ছে তারপর ও মন্ত্রলায়ের কেউ বাড়ি ফিরতে পারছেন না। বের হতে গেলেই ইন্টার্ভিউ নেবেন। আপডেট জানতে চাবেন।

কোন থ্রেট না, ভাঙ্গাভাঙ্গি-রক্তারক্তি কিছুই না। সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে বাধ্য হলেন।

ডিটেইলে যাচ্ছি না। এ দেখে নিন। উপসংহার টানি। সরকার প্রেশার দিলেন আমেরিকাকে। শেষতক প্রেসিডেন্ট বুশ টেলিভিশনে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলেন- I’M DEEPLY SORRY ABOUT THE ACCIDENT THAT TOOK PLACE; OUR NATION IS SORRY. ক্ষমা চাইলেন কলিন পাওয়েল আর রামসফিল্ড। এবার দাবি আদায়ের পালা।

ইউএস নেভি US$11.47M জরিমানা দিলেন এহিমে জিলা কে, US$13.9M দিলেন পরিবারকে। দুই পরিবার টাকা নিতে শর্ত জুড়িয়ে দিলেন। শর্তানুযায়ী আমেরিকার রাষ্ট্রদূত আর সাবমেরিনের চালক সশরীরে এহিমে তে এসে প্রতিটি পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়ে আশ্বস্ত করলেন।

বোঝেন, ৯ জন নিখোঁজ ব্যক্তির জন্য সাংবাদিক রা দুটো রাষ্ট্র কে কোন লেভেলে ইনভলভ করলেন।

(খ)  একটি হত্যা, একজন পলাতক আসামি

১৯৮২ সালে কাযুকো ফুকুদা নামক এক মহিলা তার কলিগ কে হত্যা করে পালালেন। দুজনেই একটা হোস্টেস বার এ কাজ করতেন। সারা দেশে “ধরিয়ে দিন” পোস্টার লাগানো হলো। ফুকুদা চাল্লু মহিলা। প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারা পরিবর্তন করে ফেললেন। পুলিশ খবর পেয়ে যখনি ধরতে যান তখনি তিনি চেহারা ও জায়গা পালটান। সাতবার চেহারা পাল্টিয়েছেন বলে ওনার নাম হয়ে গেল সাত-মুখী ফুকুদা।

জাপানের নিয়মে ১৫ বছর মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে না পারলে আসামি আর আসামি থাকবেননা।

১৯৯৭ সাল। ১৫ বছর পার হতে আর ২ সপ্তাহ বাকি।

মিডিয়া মাঠে নামলেন। ফুকুদা কে ধরতে হবে। বিচার তার করতেই হবে। একটা আসামি কে বিনা বিচারে থাকতে দেয়া মানে সহস্র অপরাধ কে প্রশ্রয় দেয়া।

রবিবার সকালের একটি প্রোগ্রামে হৃদয়স্পর্শি একটা প্রোগ্রাম দেখাল। নিহত পরিবারের নিঃশব্দ দাবি, করুন আকুতি – ফুকুদা এসে ক্ষমা চাক। ফুকুদার ৭ চেহারা, হাঁটার স্টাইল, কথা বলার স্টাইল, ১৫ বছর পর তার চেহারা কেমন হতে পারে তা ও এঁকে দেখাল। আমি সেই প্রোগ্রাম টা দেখেছি। আমি ও এতটা কনভিন্সড হয়েছিলাম যে, আমি দেখলেই ফুকুদাকে চিনবো আর সাথে সাথে পুলিশে সোপর্দ করবো।

পাঁচ দিনের মাথায় ফুকুদা ধরা খেল। বেশ নাটকীয় ভাবে।

একটি স্ন্যাক্স-বার এ নিয়মিত যেতেন ফুকুদা। কথা বলার স্টাইল, হাঁটার স্টাইল দেখে মালিকের সন্দেহ হলো। সন্দেহের আলোকে কাউকে আটকানো যাবেনা। পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে ফন্দি আঁটলেন।

ফুকুদা দোকানে আসলেন। অন্যান্য দিনের মতোই। মালিক ড্রিঙ্ক করতে বোতল, গ্লাস এগিয়ে দিলেন। ফুকুদা গ্লাসে হাত দিতেই তার হাতের ছাপ লেগে গেল। দোকানের মালিক হাতের ছাপ ওয়ালা গ্লাস টা রেখে অন্য একটা গ্লাস দিলেন। হাতের ছাপ ভেরিফাই করে পুলিশ নিশ্চিত হলেন – এটাই ফুকুদা

পরদিন সারা দোকানে সাদা পোশাক পরিহিত অবস্থায় একদল পুলিশ কাস্টমারের ভান করে বসে দোকানে রইলেন। ফুকুদা এলেন। গতানুগতিক ভাবে গ্লাসে চুমুক দিলেন। একজন পুলিশ এসে নাম ধরে বললেন- ফুকুদা সান, আর পালানোর সুযোগ নেই। ইউ আর আন্ডার এরেস্ট। ফুকুদা একটু টু শব্দ করলেন না, হাত পেতে দিলেন। শুধু বললেন, “আমি ক্লান্ত, আর পারছিনা, আমার বিচার করুন” ।

মিডিয়া কী করতে না পারে!!

বিচারকাজ শুরু হল। ১৫ বছর পুর্ণ হবার মাত্র ১১ ঘণ্টা আগে তার বিচারের রায় হল। আমৃত্যু জেল। জেলে বসে ফুকুদা সমাজের জন্য কাজে লেগে গেলেন। ১৫ বছর পালিয়ে থাকার কাহিনি নিয়ে বই লিখলেন। সেই বই থেকে আয় হল ৮ মিলিয়ন ইয়েন। পুরোটাই সমাজে দান করে দিলেন। তারপর একদিন জেলেই ঠুস করে মরে গেলেন।

(গ)  আমাদের লঞ্চ ডুবি, আমাদের নিখোঁজ মানুষ

আমার শৈশব কেটেছে চাঁদপুরের মতলব থানার এখলাছপুর গ্রামে। পাশে মেঘনা নদী। ওপার দেখা যায়না। কারন মেঘনার পরেই আছে পদ্মা। ঢাকা চাঁদপুর বরিশাল নারায়ণগঞ্জ রুটের লঞ্চ যায়। শহরের সাথে আমাদের অন্যতম যোগাযোগব্যবস্থা হল নৌপথ। বর্ষাকালে নদী ফুলে ফেঁপে উঠে। আমরা ভয় পাই। বড় লঞ্চ গুলো পর্যন্ত ভয় পায়। নদীর মাঝখানে না গিয়ে তীর ঘেঁষে চলে। বড় বড় ঢেউ হয়। নদীর পাড় ভাঙে। গ্রামের আয়তন (ক্ষেত্রফল) কমতে থাকে।

বর্ষাকালে প্রতি বছর লঞ্চডুবি হয়। গ্রামের অধিকাংশ লোক স্বল্প আয়ের চাকুরীজীবী। ঈদের ছুটিতে গ্রামে আসেন। ঈদ শেষে ঢাকা ফিরেন। লঞ্চ ভর্তি মানুষ থাকে। তারপরও দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে উঠেন। জীবন হারানোর সম্ভাবনা ২% কিন্তু একদিন দেরিতে গেলে চাকুরী হারানোর সম্ভাবনা ৯০%।

পিনাক-৬ এর ভিডিও দৃশ্য (৪ঠা অগাস্ট,২০১৪) টা দেখেছেন ? 

চেয়ে চেয়ে দেখলাম …
তুমি ডুবে গেলে …এ এ এ এ …….চেয়ে চেয়ে দে..খ..লা..ম ……
আমার করার কিছু করার ছিলনা ………
নৌ-মন্ত্রী সাহেবের কি করার ছিল? ঘটনা ঘটার টাইম, T=0 তে হয়ত ওনার কিছু করার ছিলনা। T=(-1HR, -1 MIN), T=(+1MIN, +1HR, WEEKS, YEARS) এ যা করার ছিল তা জাপানি সাংবাদিক হলে সাংবাদিকরা খুঁচিয়ে বের করে ছাড়তেন। মেরিন প্রফেশনালদের ব্যস্ত রাখতেন জাহাজের ত্রুটি গুলোকে লিস্ট করতে। ছাত্রদের, গবেষকদের রিসার্চ টপিক হতো কীভাবে মানুষের ভুল গুলো স্বয়ংক্রিয় মেশিন দিয়ে রোধ করা যায়।

পরিবারের লোকজন তীর পর্যন্ত এসে পানির দিকে তাকিয়ে থাকেন। রানা প্লাজা যেখানে ছিল সেই শূন্যস্থানে এখনও কিছু পরিবারের লোকজন এসে শুধু তাকিয়ে থাকেন। শূন্যের মাঝে নিখোঁজ ব্যক্তিটিকে খোঁজেন।

১৫ বছর আগে আমার এক খালার একমাত্র ছেলে চাঁদপুরে এক লঞ্চডুবিতে নিখোঁজ হলেন। একজন নিখোঁজ মানুষের জন্য অপেক্ষা করা কি বেদনাদায়ক তা খালার চেহারায় দেখেছি। একটা ক্ষীণ আশা নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। গভীর রাতে একটু বিড়াল নড়া আওয়াজে ও খালা জেগে উঠেন, এই বুঝি ছেলে এলো। দীর্ঘ ১৪ বছর অপেক্ষা করে গত বছর খালা মরে গিয়ে আমাদের বাঁচালেন।

পিনাক-৬ এ দুই শতাধিক লোক ছিলেন। কতজন মরলো, কতজন নিখোঁজ হলো তার পরিসংখ্যান আমার কাছে নেই। কার কাছে আছে?

লঞ্চ ডুবি ছাড়া ও বিভিন্ন কারণে গ্রাম থেকে লোকজন নিখোঁজ হন। অপেক্ষা করতে থাকেন খালারা। বাংলাদেশে এই ধরনের খালাদের সংখ্যা কত কেউ জানেন?

নীচের ও একটু ক্লিক করে দেখুন। দুঃখ পেলেও খুশি (?) হবেন জেনে। গ্রামের মা-খালাদের কাছে এরা কিন্তুকম বেশি সবাই নিখোঁজ।
[১] বহুল প্রচারিত পত্রিকা HTTP://EN.WIKIPEDIA.ORG/…/LIST_OF_NEWSPAPERS_IN_THE_WORLD_B…
[২] এহিমে মারু এক্সিডেন্ট HTTP://EN.WIKIPEDIA.ORG/…/EHIME_MARU_AND_USS_GREENEVILLE_CO…
[৩] পিনাক-৬ এর ভিডিও HTTPS://WWW.YOUTUBE.COM/WATCH?V=UPB886LAPLE
[৪] দেখলে দুঃখ পাবেন-১ HTTP://WWW.BBC.COM/NEWS/WORLD-SOUTH-ASIA-18579318
[৫] দেখলে কষ্ট পাবেন-২ HTTP://WWW.URI.EDU/ARTSCI/WMS/HUGHES/PAKISTAN.HTM
এক নজরে আশির আহমেদঃ জাপান কাহিনী ধারাবাহিক ভাবে লিখেছেন আশির আহমেদ, তিনি জাপানের কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক । দীর্ঘ ২৮ বছরের জাপানের অভিজ্ঞতা বাংলাভাষীদের জন্য লিখে যাচ্ছেন আশির-ঢঙের জাপানকাহিনি। তিনি দেশটিকে ও টুরিস্টদের মতো বাইরে থেকে দেথেনি- দেখেছে একজন বিদেশি হিসেবে যে বহুদিন সে দেশে থাকতে থাকতে নানা বাস্তব ও মানবিক অভিজ্ঞতায় ভরে উঠেছে। এ বই তারই উষ্ণ সজীব বিবরণ। জাপান এর বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪( জাপান কাহিনী-১ থেকে ৫ খন্ড)। তাঁর সবগুলো বই দেখুন রকমারি ডট কম -এ

আরও পড়ুনঃ

‘পাচিনকো’ একটি বৈধ জাপানি জুয়াখেলা !

বইয়ের সঙ্গে পাঠকের যত রসায়ন !

রকমারি ব্লগ

রকমারি ব্লগ

Published 07 Nov 2018
  0      3
 

comments (3) view All

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png