জাতির পিতা হত্যাকান্ডের পূর্বাপর ইতিহাস

জাতির পিতা হত্যাকান্ড

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। দেশি-বিদেশি অনেকেই লিখেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত সেনা অফিসারদের অনেকে লিখেছেন। সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, রাজনীতিবিদ এবং মুক্তিযোদ্ধারা লিখেছেন। তথ্যভিত্তিক অনেক গবেষণামূলক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলি তখন নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে বেশ কিছু বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সমাজে রাজনীতিতে এবং ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাচ্ছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার তাড়না থেকেই লেখক কাজী জয়নুল আবেদীন বীরপ্রতীক এই বইটি লিখেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড কেন ঘটেছে, কার কী ভূমিকা ছিল, ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি এবং প্রকাশিত তথ্যাবলি বিশ্লেষণ করে ঘটনার পেছনের ঘটনা নিয়ে গবেষণামূলক, বিশ্লেষণধর্মী এই বইটি।

সেনাবাহিনীর দুটি ইউনিট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল। মেজর ফারুকের নেতৃত্বে প্রথম ল্যান্সারের অফিসার ও সৈনিকরা ২৮টি ট্যাংক নিয়ে এবং মেজর রশিদের নেতৃত্বে ৪৬ ব্রিগেডের অধীন ২ ফিল্ড আর্টিলারির অফিসার ও সৈনিকরা ১২টি কামান নিয়ে এবং চাকরিচ্যুত কিছু অফিসার অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। মেজর মহিউদ্দিন বজলুল হুদা ও নূর চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি গ্রুপ বঙ্গবন্ধুর ৩২ নাম্বার সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে আক্রমন করে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাদের তিন ছেলে- শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের এবং একজন পুলিশ অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

BUY NOW

মেজর ডালিম স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রসজ্জিত হয়ে একদল সৈন্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে আক্রমন করে সেরনিয়াবাত, তার স্ত্রীসহ নারী ও শিশুদের হত্যা করেছিল। রিসালদার মুসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল সৈন্য শেখ মনির বাড়ি আক্রমন করে তাকে ও তার অন্তঃস্বত্তা স্ত্রীকে হত্যা করেছিল। খুনিরা সেদিন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের ২০ জনকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল। যেটাকে গণগত্যা বলা চলে। খুনি মেজর ফারুক ও রশিদ দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে স্বীকার করেছে তারা শেখ মুজিবকে হত্যা করেছে। তারা আত্মস্বীকৃত খুনি। দেশের বাইরে থাকায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যান জাতির পিতার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

সে বছরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রিসিপসনিস্ট কাম রেসিডেন্ট পিএ আ ফ ম মহিতুল ইসলাম ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক আহমেদ অঘোষিতভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদে ছিলেন। খন্দকার মোশতাক আহমেদ খুনিদের রক্ষায় ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। এরপর ১৯৭৯ সালে যাকে আইনে পরিণত করেন জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ‘ইনডেমনিটি অ্যাক্ট’ বাতিল করে হত্যাকান্ডটির বিচারের পথ সুগম করে। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো সামরিক ক্ষমতার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ঘটে। হত্যাকান্ডটি বাংলাদেশের আদর্শিক পটপরিবর্তন বলে বিবেচিত। বর্তমানে ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।

আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক শেখ মুজিবকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের দায় তারা রাজনীতিবিদদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। মাওবাদী, মৌলবাদী ও জাসদের দায় অবশ্যই ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ক্ষেত্র তৈরি করার দায় অবশ্যই তাদের রয়েছে। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে, খন্দকার মোশতাক একজন বিশ্বাসঘাতক। তবে তারা এটাও বিশ্বাস করে, মোশতাক এবং জিয়া উভয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, সেরনিয়াবাত হত্যা, শেখ মণি হত্যা, জেলখানায় জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ড, উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধে দ্বিজাতিতত্ত্বের সাম্প্রদায়িক আদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালিরা স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হতে পারেনি।

দ্বিজাতিতত্ত্বের সাম্প্রদায়িক আদর্শে বিশ্বাসী পাকিস্তানের এ দেশীয় দালালরা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান হানাদার বহিনীর পক্ষ নিয়েছিল। আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী গঠন করে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে গণহত্যা গণধর্ষণ চালানো, হিন্দু আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের হত্যা করা, বাড়ি-ঘর লুটপাট করা এবং আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া প্রভৃতি মানবতাবিরোধী ধ্বংসাত্মক কাজে অংশ নিয়েছিল। বামপন্থীদের কৌশল ছিল ভিন্ন। মুক্তিসংগ্রামের সময় তারা সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেনি।

তবে আইয়ুব খানের নিকট হতে সুবিধা নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামকে দুই কুকুরের লড়াই বলে সমালোচনা করেছে। মওলানা ভাসানী অনেক সময় বঙ্গবন্ধুর শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে উসকানি দিয়ে বিশৃঙ্খলা ও ব্যাঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মাওলানা ভাসানীকে প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি প্রবাসী সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করে চীনপন্থীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। মাওবাদীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের মুজিববাদী ছাত্রনেতারা আপত্তি করেছিলেন। তারা আশঙ্কা করেছিলেন, স্বাধীনতার পর মাওবাদীরা তাদের প্রশিক্ষণ স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করবে। তাদের আশঙ্কা সঠিক ছিল।

হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যা দিয়ে বলেছেন, বিদেশি সাহায্যের দ্বারা এ দেশকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। হেনরি কিসিঞ্জারের মন্তব্যে বাংলাদেশের আমলা ও বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই উৎফুল্ল হয়েছিল। কিসিঞ্জারের মন্তব্য বারবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভালোভাবেই টিকে আছে। অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে।

স্বাধীনতাই বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ। যদিও দ্বিজাতিতত্ত্বের অনুসারী বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীরা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ভারতের তাঁবেদার হিসেবে চিহ্নিত করার অব্যাহতভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, বাংলাদেশ ভারতের অংশ হয়নি, তাঁবেদার রাষ্ট্রও হয়নি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন জাতীয়তাবাদী নেতা। জাতীয়তাবাদীরা অন্যায়ের নিকট নত হন না। অন্যের আধিপত্য মেনে নেন না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও তার পিতার রাজনৈতিক উত্তরসূরি একজন জাতীয়তাবাদী নেত্রী। তিনিও অন্যের আধিপত্য মেনে নেবেন না এবং অন্যায়ের নিকট নতিও স্বীকার করবেন না। তিনি এক যুগেরও বেশি সময় দেশের শাসনক্ষমতায় রয়েছেন। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বেড়েছে। তবে হিন্দুদের আধিপত্যও বেড়ে যায়নি। অন্য যেকোনো স্বাধীন দেশের মতোই স্বাধীন বাংলাদেশ সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যদি বেঁচে না থাকতেন এবং দেশে ফিরে এসে যদি আওয়ামী লীগের হাল না ধরতেন তবে হয়তো স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র এত দিনে বাস্তবায়িত হতো। বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে পাকিস্তানের মতো সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলত। সম্ভব হলে পাকিস্তানের সাথে পুনরেকত্রীকরণ করা হতো।

এ ঐতিহাসিক ও হৃদয়বিদায়ক ঘটনাকে নানাভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে লেখা হচ্ছে বই। কেউ কেউ খুনিদের আড়াল করতেও তাদের স্বপক্ষে লিখছেন ও নানা যুক্তি তর্কের অবতারণা ঘটাচ্ছেন। বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক ডিআইজি কাজী জয়নুল আবেদীন বীরপ্রতীক এমন প্রেক্ষাপটে তার অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন-‘জাতির পিতা হত্যাকান্ড, কার কী ভূমিকা ছিল : পূর্বাপর ইতিহাস’ শিরোনামের বইটি। ৪৩২ পৃষ্ঠার বইটির শুরুতে রয়েছে একটি তথ্যসমৃদ্ধ উপক্রমণিকা এবং শেষে রয়েছে নির্দেশনামূলক একটি উপসংহার। এছাড়াও অন্যান্য তথ্যবহুল প্রবন্ধগুলোর শিরোনামগুলো হল:

শেখ মুজিব যেভাবে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা হলেন, ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক, মুক্ত স্বদেশ, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, পাকিস্তানি দালালদের বিচার, বামপন্থীদের ভূমিকা, স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের ভূমিকা, সেনা অফিসারদের ভূমিকা, পাকিস্তানপ্রীতি, বেসামরিক প্রশাসনের ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণযুদ্ধ, রক্ষীবাহিনী গঠন, বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড, ক্ষমতার পালাবদল, জিয়া যেভাবে মেজর থেকে প্রেসিডেন্ট হলেন, ‘তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’, জেনারেল এইচ এম এরশাদের ক্ষমতা দখল, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি, বাংলাদেশের সমুদ্র জয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিডিআর বিদ্রোহের বিচার।

বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মানে বঙ্গবন্ধু এ কথা আজ সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত। নানা ষড়যন্ত্র ও মিথ্যাচারের মধ্য দিয়ে যে ইতিহাস রচিত হচ্ছে তার বিরুদ্ধে সমুচিত জবাব এই বইটি। লেখক কাজী জয়নুল আবেদীন জাতির উদ্দেশ্যে যে সত্য ও সাহসী ভূমিকা রাখলেন এ বইটির মাধ্যমে তার জন্য তার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ও অভিবাদন।

আরও পড়ুন- যেভাবে উদ্ধার হয়েছে বঙ্গবন্ধুর তিন পান্ডুলিপি

এই লেখকের অন্যান্য বই দেখতে ক্লিক করুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading