‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে কী বলতে চেয়েছিলেন নজরুল?

20200417_102621

‘মৃত্যুক্ষুধা’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনবদ্য এক সৃষ্টি। ১৯৩১ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রথম এ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি কবি তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা অবলম্বনে রচনা করেছেন।

 

  • রুবি : শিক্ষিতা মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। পিতা ম‍্যাজিস্ট্রেট, মেয়ের অমতে বিয়ে দিয়ে দেয়। তাই বিধবা হবার পর পিতা ও পরিবারকে কষ্ট দেবার উদ্দেশ্যে রুবি বৈধব‍্যের সাজে থাকে। তার মনের মনিকোঠায় একজনের বসবাস , যার নাম আনসার।
  • আনসার: (মূলত এই চরিত্রটিতে কাজী নজরুল ইসলামের নিজের বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে উঠেছে) আনসার বৈরী স্বভাব ‌। স্বদেশের প্রেমে উজাড় করে, ব্রিটিশদের দেশ ত‍্যাগ করানোর জন্য নিজে ঘরত‍্যাগ করেছে, তাই আর মানবীর প্রেমে জড়াতে চায় না। তবে রুবির কথা চিন্তা করে আনসারের মনে গোলযোগ শুরু হয়ে যায়।
  • মেজবৌ : মেজ বৌ অভাবী মুসলিম ঘরের বিধবা বৌ। একটি ছেলে একটি মেয়ের মা। বৈধব‍্য, মাতৃত্ব আর অভাব কিছুই মেজ বৌয়ের রুপ আর হাসি কম করতে পারেনি। সে কথায় কথায় হাসে কারণে অকারণে হাসে। আনসারের প্রতি মেজো বৌয়ের একতরফা দুর্বলতা আছে আর অনেক খানি সম্মান।
  • পকাল : সম্পর্কে মেজবৌয়ের দেবর। তিন ছেলে হারিয়ে মায়ের একমাত্র অন্ধের জষ্ঠি আর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
  • কুর্শি: শ‍্যামলা বর্ণের বার তেরো বছরের মেয়ে, কিন্তু বয়সের থেকে একটু বেশিই বাড়ন্ত। কুর্শির বাবা ধর্মান্তরিত খ্রীষ্টান। খ্রীষ্টান জেনেও প্যাকলে এই শ‍্যামলা কুর্শির প্রেমে পরে।

‘মৃত্যুক্ষুধা’: 

 

কৃষ্ণনগরের চাদসড়কের এক বস্তিতে রোজ ছোট ছোট উসিলায় লোকে অকথ‍্য গালাগালি করে আবার কিছুক্ষণ পর গলা জড়াজড়ি করে গড়াগড়ি করে। কখনও তারা ধর্মের নামে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, কখনও তারা সদ‍্যজাত শিশুর কান্নায় এক উঠোনে এসে জড়ো হচ্ছে। দারিদ্রতা ও ক্ষুধা তাদের জীবনে এতটা প্রখর যে বাকিসব ধুলো বালি ছাই। প‍্যাকলে তার তিন ভাইয়ের প্রায় এক ডজন বংশধরের অন্নসংস্থান করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে। তার উপর ছোট বোনও দোজবেরে স্বামীর ঘর ত‍্যাগ করে চলে এসেছে।
এদিকে বাড়ির সেজো বউ টাইফয়েডের রোগী, তার একখানা কঙ্কাল সদৃশ ছেলে। প্রদ্বীপে ফু দিতে দেরি হবে কিন্তু এই ছেলের প্রাণ বের হতে দেরি নেই। এদেরই প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে খ্রীষ্টান ডাক্তারবাবু আর মেম। যাবার সময় মেজো বৌকে ২ আনা দিয়েও যায়। মেজো বউ সেই দানে নতমস্তক যায় আর নিজ জাতিকে অভিসম্পাদ।
মেজো বউকে নিয়ে শাশুড়ি সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকে। কখন জানি তার সুন্দরী ছেলের বউ অন‍্য কারো সাথে নিকে (বিয়ে) করে ফেলে। বিধবা বউ, সম্পত্তি নেই।  এমন হলে মেজো বউয়ের সাথে ছেলেমেয়ে দুটোই চলে যাবে। মেজো বৌয়ের ছেলেটা একদম নাকি তার বাপের মত হয়েছে। তাই বাড়ির সবাই মিলে মেজো বউকে প‍্যাকালের সাথে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু প‍্যাকালে তাতে রাজি নয়। ওদিকে কুর্শিকে এক কামারের সাথে আলাপনে দেখে, কুর্শির মাথা ফাটিয়ে প‍্যাকালে শহরে চলে আসে।
কৃষ্ণনগরের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ঘোচাতে আনসার কিছুদিনের জন্য বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। মেজো বউ, সেজো বউকে ছোট বোনের মত ভালবাসতো, সেজো বউয়ের রুগ্ন ছেলেটা মারা যাবার পর সেও গত হয়েছে। প‍্যাকাল নেই, ক্ষুধা আর দারিদ্রতার কারণে পরিবারের টিকে থাকা মুশকিল, তার মধ্যে মেজো বউয়ের দুলাভাইয়ের শালিকাকে বিয়ের ইচ্ছে জেগেছে। সবথেকে মুশকিল হল যখন পাড়ায় গুজব বের হল মেজ বউ খ্রীষ্টান হবে। গুজবকে সত‍্যি করে মেজো একদিন গীর্জায় গিয়ে খ্রীষ্টান হয়েও গেল।
আনসার বেশিদিন গরিবের দুর্দশা লাঘব করতে পারেনি, পুলিশ আসে তাকে ধরে নেবার জন্য। তখন উন্মত্ত জনতার উদ্দেশে আনসারের কিছু কথা,” বন্ধুগণ! আমার বিদায়কালে তোমাদের প্রতি আমার একান্ত অনুরোধ, তোমরা তোমাদের অধিকারের দাবী কিছুতেই ছেড়ো না! তোমাদেরও হয়ত আমার মত করেই শিকল পরে জেল যেতে হবে, গুলি খেয়ে মরতে হবে, তোমারই দেশের লোক তোমার পথ আগলে দাঁড়াবে সকল রকমে কষ্ট দেবে, তবু তোমরা তোমাদের পথ ছেড়ো না, এগিয়ে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত হয়ো না, আগের দল মরবে পেছনের দল তাদের শূন্যস্থানে গিয়ে দাঁড়াবে। তোমাদের মৃতদেহের ওপর দিয়েই আসবে তোমাদের মুক্তি। অস্ত্র তোমাদের নেই, তার জন্য দুঃখ করো না। যে বিপুল প্রাণশক্তি নিয়ে সৈনিকেরা যুদ্ধ করে, সেই প্রাণশক্তির অভাব যদি না হয় তোমাদের, তোমরাও জয়ী হবে। আর অস্ত্র বা নাই বলবো কেন? কোচোয়ান? তোমার হাতে চাবুক আছে। বুনো ঘোড়াকে —– পশুকে তুমি চাবুক মেরে শায়েস্তা কর আর মানুষ কে শায়েস্তা করতে পারবেনা? রাজমিস্ত্রি! তোমার হাতের কন্নিক দিয়ে, গজ ফুট দিয়ে এত বাড়ি ইমারত তৈরী করতে পারলে, বুনো প্রকৃতিকে রাজলক্ষীর সাজে সাজালে—- পীড়িত মানুষের নিশ্চিন্তে বাস করার স্বর্গ তোমারই রচে তুলতে পারবে। আমার ঝাড়ুদার, মেথর ভাইরা! তোমরাই তো নিজেদের অশূচি অস্পৃশ্য করে পৃথিবীর শূচিতা  রক্ষা করেছ, সমস্ত দূষিত বাষ্প গ্রহণ করে আয়ুক্ষয় করে আমাদের পরমায়ু বাড়িয়ে দিয়েছ, আমাদের চারপাশের বাতাসকে নিষ্কলুষ করে রেখেছ! তোমরা এত ময়লা যদি পরিষ্কার করতে পারলে —- তাহলে এই ময়লা-মনের ময়লা মানুষগুলোকে কি শূচি করতে পারবে না তোমাদের মত ত্যাগী করতে পারবে না? তোমাদের মত ত‍্যাগী করতে পারবে না? তোমাদের এই ঝাড়ু দিয়ে ওদের বিষ-ময়লা ঝেড়ে ফেলতে পারবে না? তুমি চাষা? তুমি যে হাল দিয়ে মাটির বুকে ফুলের ফসলের মেলা বসাও, সেই হাল দিয়ে কি এই অনুর্বর-হৃদয় মানুষের মনুষ্যত্বের ফসল ফলাতে পারবে না, ফলাতে পারবে”
কিছুদিন যাবৎ পাদ্রীদের মনে হচ্ছে এই জায়গায় থাকলে মেজো বউ বেশি দিন খ্রীষ্টান থাকতে পারবেনা। তাই তাকে দূরে পাঠাতে হবে‌। আনসার কে জেলে নেওয়ার খবর শুনেই মেজ বউ চলে আসে পাদ্রীদের আরেক গির্জায়। এখানে প‍্যাকালে আর কুর্শিও আছে ওদের বিয়ে হয়েছে। প‍্যাকালেও খ্রীষ্টান হয়েছে এখন একটা গীর্জায় কাজ করে। মেজ বৌয়ের ছেলেমেয়ে দুটো আছে দাদীর কাছে।
বছরখানেক বাদে এক চিঠিতেই ওরা আবার কৃষ্ণনগরে হাজির। চিঠিতে ছিল মেজো বউয়ের ছেলে মৃত‍্যুসজ্জায় মাকে দেখতে চায়। তবে মাকে সে দেখতে পায়নি। মেজো বউ ছেলের মৃত্যুর খবরে নিঃস্তব্ধ হয়ে গেছে, আর প‍্যাকাল তার মৃতপ্রায় মাকে দেখে হাউমাউ করে কাঁদছে। এবার ওরা আবার মুসলমানের খাতায় নাম লেখালো। কুর্শির বাবা মারা গেছে তাই ওরও আর সমস্যা নেই। যে মৌলবীরা মেজ বৌয়ের ধর্মান্তরিত হওয়ার দোষে ওর শাশুড়িকে একখানা ছাগল প্রায়শ্চিত্ত দিতে বলেছিল , আজ তারা ভাবে কাকে দিয়ে মেজ বউকে একেবারে স্বধর্মৈ বেঁধে রাখা যায়।
আনসারের একখানা চিঠি এসেছে জেল থেকে। সেই চিঠি পড়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে মেজো বউ আনসারের বোনের বাড়িতে। সেখানে রুবিও আছে। এই প্রথম রুবি মেজো বউকে দেখল, হিংসে হচ্ছিল আবার সম্মান , মায়াও। চিঠি অনুযায়ী আনসারের শরীরে মরণব‍্যাধি ধরা পড়েছে। ব্রিটিশ বাহিনী এ ব‍্যাধীর দাতা হতে রাজি কিন্তু এর দায় নিতে নয় তাই আনসার কে ছেড়ে দেবে। রুবি যেখানে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনসারের সঙ্গে শেষ সময়ে থাকার কথা জানাচ্ছে। মেজ বৌ বলল, ” তোমার জায়গায় আমি থাকলে এখন আমি তার সাথেই থাকতাম।” রুবি অবশেষে আনসার সেবা করার সুযোগ পায় তবে সে রোগের কোন শুশ্রূষা করতে পারেনি। একসময় রুবিও ঐ একই মরণব‍্যধিতে আক্রান্ত হয়। আনসার মারা যায়। আর রুবি মৃত্যুর অপেক্ষায়।

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading