সৌন্দর্যের দেবী কেরালা নিয়ে বই ‘কেরালা সৌন্দর্যের দেবী’

কেরালার ইতিহাস, পৌরাণিক উৎস, ভূগোল, ধর্ম, যোগাযোগ, জনসংখ্যাতত্ব, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মিডিয়া, খেলাধূলা, পর্যটন ও পোষাক পরিচ্ছদ
kerala sondorjer debi feature image 1

ড. প্রভাস চন্দ্র রায় মন মননে একজন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। দীর্ঘদিনের চাকরিজীবন থেকে অবসর নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দেশ ভ্রমণে। ‘কেরালা সৌন্দর্যের দেবী’ শিরোনামের এই বইটি লিখেন কেরালা ভ্রমণ শেষে। কেরল বা কেরালা ভারতের একটি রাজ্য। কেরালার রাজধানী তিরুবনন্তপুরম একটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত। মালয়ালম ভাষা কেরলের রাজ্যভাষা। কেরালার নামকরণ কিভাবে হয়েছে তা অষ্পষ্ট। মালায়ালাম ভাষায় কেরালাম (Keralam) থেকে এর উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়- কেরা (Kera) মানে নারিকেল গাছ (Ccoconut Tree) এবং আলাম (Alam) মানে ভূমি বা স্থান (Land or Location)। কেরালাকে ক্লাসিক্যাল তামিল চেরা আলাম (Chera-Alam) অর্থাৎ পাহাড়ের ঢাল অথবা চেরাদের ভূমিও বলা হয়।

কেরালা সৃষ্টির বিষয়ে অনেক ধরণের পৌরাণিক ধ্যান ধারণা রয়েছে। হিন্দু পুরাণ মতে কেরালা ‘পরশুরাম’ কর্তৃক তৈরিকৃত যিনি মহবিষ্ণুর একজন অবতার (দূত) ছিলেন। ভূত্ববিদগণ বিশ্বাস করেন যে, কেরালা ভূমিকম্পনজনিত কারণে সৃষ্টি হয়েছে সেটি ধীরে ধীরে হোক কিংবা অকস্মাৎ হোক। কেরালার ইতিহাস খৃীস্টপূর্ব চার হাজার বছরের পূরোনো। ঐ সময়ে অন্যান্য এলাকার মতো প্রথম শতাব্দী থেকেই কেরালাও একটি রাজ্য ছিল এবং রাজ্যটি শক্তিশালী প্রজাবৎসল রাজ্য ছিল।

কেরালা তার মসলা বিশেষ করে দারুচিনি, গোলমরিচ, এলাচ, জায়ফল, শুষ্ক আদা ইত্যাদির জন্য বিখ্যাত ছিল। এগুলিই বিদেশিদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ ছিল। খৃস্টপূর্ব ৩০০ সন থেকেই কেরালার সাথে অনেক দেশের শক্তিশালী ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন দেশে মসলা রপ্তানী হতো যেগুলির মধ্যে পারস্য, ব্যবিলন, ইসরায়েল, গ্রীস, রোম, চীন প্রভৃতি। খৃস্টপূর্ব ৩০০ সন থেকেই আর্যরা উত্তর দিক থেকে এসে কেরালায় বসবাস করতে শুরু করে।

কেরালা ভারতবর্ষের সবচেয়ে ছোট রাজ্যগুলির একটি। এর আয়তন ৩৮,৮৫৫ বর্গ কিলোমিটার যা ভারতের সর্বমোট আয়তনের শতকরা ১.৩ ভাগ। কেরালার ভূমি মূলত- পূর্বদিক থেকে সরু সমুদ্র মূখী নদী প্রবাহিত হয়ে পশ্চিম দিকে আরব সাগর দ্বারা বেষ্টিত। শ্রীধারা মেননের (Sreedhara Menon) কথায় ‘এটি একটি অনন্য ভৌগলিক অবস্থান যা কেরালাকে একটি আশ্চর্যজনক স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যম-িত করেছে’। আর তাই এটি ভারতের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কেরালাকে বলা হয় ‘প্রকৃতির সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত পুত্র’। উত্তরের কাশ্মীরের মত দক্ষিণে কেরালা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যম-িত একটি এলাকা।

কেরালা সৌন্দর্যের দেবী
BUY NOW

কোচি, কোঝিকোডে, কোল্লাম, ত্রিশূর, কোট্টাম, কান্নুর, আলাপুঝা, মানজেরী ও পালাকাদ এই রাজ্যটির প্রধান ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কেরালা ছোট ছোট অনেক শহর সমন্বয়ে গঠিত যার কারনে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশ বেশি। ইকোনোমিক টাইমস্ এর জরীপ অনুযায়ী ভারতে বসবাসযোগ্য সবচেয়ে ভাল দশটি শহরের মধ্যে পাঁচটিরই অবস্থান কেরালাতে। ব্যাকওয়াটার (নদীর মোহনা ও সাগরের পানি যেখানে সমউচ্চতায় বিরাজ করে এবং কোন স্রোত থাকে না), যোগব্যায়াম, আর্য়ুবেদিক চিকিৎসা এবং গ্রীষ্মম-লীয় সবুজের সমারোহের জন্য কেরালা একটি জনপ্রিয় পর্যটক গন্তব্য। এজন্য কেরালাকে ঢেউ খেলানো পাম গাছ (Waving Palms) এবং বিস্তৃত বালুকাময় বীচ (Beaches) শোভিত ট্রপিক্যাল স্বর্গ বলা হয়।

ইউরোপিয়ানদের আগমন কেরালার ইতিহাসকে আরেকটি অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ১৪৯৮ খৃস্টাব্দে ভাস্কো-ডা-গামা কোঝিকোডের নিকটবর্তী কাপ্পাদে পৌঁছেন। এর ফলে পরবর্তীতে বহু সংখ্যক ইউরোপিয়ানদের আগমন ঘটে। যদিও তাদের আগমনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা এবং মালাবার কোস্টে আসার সংক্ষিপ্ত পথ আবিষ্কার, কিন্তু এখানকার রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদেরকে প্রশাসনে নাক গলাতে যথেষ্ট উৎসাহিত করে। প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের পরষ্পর শত্রুতা দেখে তারা একজন শাসকের বিরূদ্ধে আরেকজনকে সামরিক সহায়তা দিতে শুরু করে। এতে তাদের প্রভাব এতই বৃদ্ধি পায় যে, তারা শাসন সংক্রান্ত কাজে হস্তক্ষেপ করতে থাকে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে স্থানীয় শাসকদের তাদের হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলে। স্থানীয় শাসকগণ পরষ্পর কোন্দল, যুদ্ধবিগ্রহ ও শত্রুতা ইউরোপিয়ানদের এখানকার শাসনকাজে নাক গলানোর কাজে বেশি বেশি করে সুযোগ এনে দেয়। পর্তুগীজরাই ইউরোপিয়ানদের মধ্যে প্রথম যারা কেরালায় তাদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। পরবর্তীতে ডাচ ও তারও পরবর্তীতে ইংরেজরা কেরালায় আসন গাড়ে।

কেরালায় ইংরেজদের আধিপত্য সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী ২০০ বছর স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত টিকে ছিল। যদিও বেশ কতকগুলি যুদ্ধ ও বিদ্রোহ তাদের বিরূদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল, ইংরেজগণ ত্বরিৎ সেগুলি দমন করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রাদেশিক রাজ্যগুলির অনৈক্যের কারণেই তা সম্ভব হয়েছিল। কোচি ও ট্রাভাঙ্কোর বিশিষ্ট রাজ্য ছিল। ইংরেজদের শাসনের ফলে কেরালার অনেক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধিত হয়। দাসত্ব প্রথা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইংরেজ ধর্ম প্রচারকগণ মানুষের জীবিকার মানদন্ড উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সময়কালে বেশ কতকগুলি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল খোলা হয়। ইংরেজগণ কর্তৃক অনেক রেললাইন, সড়ক এবং সেতু তৈরি করা হয়। মোট কথা, আধুনিকীকরণের জন্য কেরালা ইংরেজদের কাছে ঋণী।

বিশ্বযুদ্ধগুলি ঔপনিবেশিক শক্তিকে দূর্বল করে দিয়েছিল যার কারনে ঔপনিবেশগুলিতে জাতীয়তবাদী আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ভারতে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিশেষ গতি পায়। এই আন্দোলনের ধাক্কা কেরালাতেও লাগে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কেরালা বিভাগ খোলা হয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর নেতৃত্বে সংগঠিত খিলাফত আন্দোলন মালাবার অঞ্চলের মুসলিম সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। অবশেষে নভেম্বর ১, ১৯৫৬ তারিখে কেরালা একটি রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এটি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির আংশিক মালাবার প্রদেশ এবং ট্রাভাঙ্কোর-কোচিন রাজ্য নিয়ে গঠিত।

বর্তমানে কেরালা পার্লামেন্টারী পদ্ধতিতে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধি সমন্বয়ে শাসিত হয়, যাঁরা রাজ্যের জনগণ কর্তৃক ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। সরকারের তিনটি শাখা থাকে। এক কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট, নির্বাচিত সদস্য সমন্বয়ে কেরালা আইনসভা, এবং স্পেশাল অফিস বিয়ারার- স্পীকার/ডেপুটি স্পীকার যাঁরা সদস্যদের মধ্য হতে নির্বাচিত হন। আইনসভার সভাপতিত্ব করেন স্পীকার, তাঁর অবর্তমানে ডেপুটি স্পীকার। কেরালা ১৪০টি নির্বাচনী এলাকায় ভাগ করা।

কেরালা রাজ্যের তিনটি প্রধান বিমানবন্দর রয়েছে- থিরুভানন্থপূরম, কোচি, ও কোঝিকোডে যেগুলি ভারতের অন্যান্য এলাকা ছাড়াও বিশ্বের সাথে যোগাযোগ করেছে। কোচিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হচ্ছে প্রথম ভারতীয় বিমানবন্দর যা সর্বপ্রথম পাবলিক লিমিটেড কোম্পানীতে রূপান্তরিত হয়েছে এবং যা ৩০টি দেশের প্রায় ১০,০০০ অনাবাসী ভারতীয় কর্তৃক অর্থায়িত।

কেরালার বীচসমূহ পৃথিবীর মধ্যে সুন্দরতম। সমুদ্র তীর বরাবর ৬০০ কিলোমিটারের পুরোটাই বীচ যা সুন্দরভাবে নারকেল গাছ, খাঁড়া উচ্চ পাহাড় ও রূপালী বালুকারাশি দ্বারা পরিবেষ্টিত যা বীচপ্রেমী, ছুটি উপভোগকারী এবং পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ করে তাঁদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় উৎসাহ যোগায়। কেরালার বীচসমূহ প্রকৃতই ছুটি উপভোগকারীদের কাছে স্বর্গতূল্য যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বীচের তুলনায় অনন্য ও অতুলনীয়।

কেরালা জম্মগতভাবে ভারতের সবচেয়ে সুন্দরতম বীচের অধিকারী। বীচের পার্শ্বের পাম গাছের সারি সারি বাগান, নীল পানি, মহার্ঘ সামুদ্রিক খাবারের সমাহার, রৌদ্র করোজ্জ্বল দিন এবং বিনয়ী মানুষ সবমিলে আপনাকে স্মরনীয় দিনগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।

কেরালার প্রকৃতি এতোই মনোমুগ্ধকর যে যেকোনো মানুষকে বিমোহিত করে ফেলে। ড. প্রভাস চন্দ্র রায় শুধুমাত্র একজন পর্যটকের মতোই ঘুরে ঘুরে দেখেনি। তিনি নানাভাবে বিচার বিশ্লেষণ ও এর ইতিহাস ঐতিহ্যের বিষয়ও অনেক তথ্য উপাত্ত জেনে তা সরাসরি দেখেছেন।

বইটির লেখা খুবই স্বাবলীল ও গতিময়। পড়তে পড়তে মনে হবে যেনো নিজেই কেরালা ভ্রমন করছি। তিনি বইটিতে কেরালা সম্পর্কে যতোটুকু পারা যায় ততোটুকু তথ্য দিতে চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে ভূ-তত্ত্ব, জলবায়ু, উদ্ভিদ ও প্রাণী, রাজনীতি ও প্রশাসন, অর্থনীতি, ধর্ম, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয় বইটিতে তুলে ধরেছেন।

এ বইটি পাঠ করে কিভাবে কেরালা ভ্রমণ করা যায় কম খরচে তার একটি গাইড লাইন পাওয়া যাবে। বইটি যে কোনো পর্যটকের গাইড হিসেবে কাজ করবে। কারণ এতো বিস্তারিত ও চিত্রকল্পময় কাব্যিক লেখা যা পড়লে যে কেউ ভ্রমণের সাথী হিসেবে আছে তা অনুভব হবে।

এছাড়াও বইটিতে পাবেন একনজরে কেরালা, কেরালার জাতীয় প্রতীক, কেরালার ইতিহাস, পৌরাণিক উৎস, কেরালার ভূগোল, কেরালাবাসী ও ধর্ম, যোগাযোগ, জনসংখ্যাতত্ব, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মিডিয়া, খেলাধূলা, পর্যটন, কেরালার পোষাক পরিচ্ছদ, কেরালার বীচ ও দ্বীপ, কেরালার নদী, কেরালার খনিজ সম্পদ, আয়ুর্বেদ, থিরুভানন্থপূরম (ত্রিবান্দ্রম) কেরালার রাজধানী, কন্যাকুমারী : ভারতের সর্ব দক্ষিণ প্রান্তবিন্দু ইত্যাদি।

আরও পড়ুন- ভিন্নধর্মী ভাষা-গবেষণার বই ‘স্থানিক বাকরীতি ও ভাষা-বৈচিত্র্য’

ড. প্রভাসচন্দ্র রায়ের অন্যান্য বই দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading