খনার বচন ও কৌটিল্যের নীতিশাস্ত্র

2021-10-30 খনার বচন ও কৌটিল্যের নীতিশাস্ত্রn

‘খনার বচন ও কৌটিল্যের নীতিশাস্ত্র’ শিরোনামের এই বইটি সম্পাদনা করেছেন মোবারক সালমান। খনার বচন মূলত কৃষিতত্ত্বভিত্তিক ছড়া। অধিকাংশ গবেষকদের মতে খনার বচন ৭ম শতাব্দীরও পূর্বে রচিত হয়েছিল। এই রচনাগুলো চার ভাগে বিভক্ত। ভারতের আসাম থেকে নিয়ে সমগ্র বাংলাদেশসহ ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের কেরালা পর্যন্ত খনার বচনের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সিংহলি ভাষায় রচিত মহাবংশ নামক গ্রন্থের মাধ্যমে জানা যায় যে, খনা রাজবংশেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শুভক্ষণে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে তার নাম রাখা হয় ক্ষণা বা খনা। আরো জনশ্রুতি আছে যে, খনার নিবাস ছিল অধুনা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসত সদর মহকুমার দেউলিয়া গ্রামে। এমনকি, তিনি রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার নবরত্নের দশম সদস্য ছিলেন বলে কথিত। বরাহমিহির এর পুত্র মিহির তার স্বামী ছিল বলেও কিংবদন্তি কথিত আছে।

পতিবরাহের খনার পান্ডিত্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি তার পুত্রকে ডেকে বলেন, ‘খনার জিভ কেটে এনে আমার পদতলে বিসর্জন দাও।’ পিতৃ-আদেশ পালনে মিহির খনার জিহ্বা কর্তন করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বিদুষী খনার মৃত্যু হয়। খনা অংশের সূচিতে লেখক যুক্ত করেছেন- প্রাসঙ্গিক আলোচনা, খনার বচনের ঐতিহাসিকতা ও পরিব্যাপ্তি, খনার পরিচয়, কিংবদন্তির আলোকে খনা, গবেষণার দৃষ্টিতে খনার পরিচয়, খনার বচনের ভাষা, পাঠান্তর ও বচনসংখ্যা, খনার বচনের সংখ্যা, ধর্ম ও শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খনার বচনের মূল্যায়ন, খনার বচনের সারসংক্ষেপ। এছাড়া রয়েছে তিনটি অধ্যায়।

গবেষক ও পতিদের মতে খনার বচন রচিত হয়েছিল অপভ্রংশ ভাষায়। অবশ্য স্মরণাতীত কালের সুনির্দিষ্ট কোন্ সময়ে খনার বচনের উদ্ভব ঘটেছিল তা আজও বিতর্কিত বিষয়। খনার বচনের কোনো প্রাচীন পান্ডুলিপিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। প্রথমে বেদের বাণীগুলো রচিত হয়ে মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছিল এবং শ্রোতাগণ তা স্মৃতিতে ধারণপূর্বক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শোনাত। অক্ষর-জ্ঞানহীন মানুষজন বহু শতাব্দী যাবৎ বেদের অসংখ্য শ্লোক কেবল শুনে শুনে স্মৃতিতে সংরক্ষণ করেছিলেন। প্রাচীন কালে এমন অনেক ব্যক্তি ছিলেন, যারা কেবল শুনে শুনে পূর্ণ বেদ মুখস্থ করেছিলেন। কালক্রমে যখন নানান জনের মুখে বেদের শ্লোকগুলো বিকৃত হয়ে একপর্যায়ে তা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন তা লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। লিপিবদ্ধ হওয়ার পর বেদ-বাণী বিকৃতি ও অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পায়।

খনার বচন ও কৌটিল্যের নীতিশাস্ত্র
BUY NOW

খনার বচন নিঃসন্দেহে বিকৃতির শিকার হয়েছে। বেদবাণীর মতো ধর্মীয় গুরুত্ব না থাকায় তা বিলুপ্তি কিংবা বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পায়নি। তাই আমরা অঞ্চলভেদে খনার বচনের নানা রূপ-বৈচিত্র্য দেখতে পাই। পতিগণের মতে খনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বচনগুলোর খুব দ্রুতই বিকৃতি ঘটেছে এবং অঞ্চলভেদে এগুলোর ভাবানুবাদও হয়েছে। পরে বিকৃত ও অনূদিত বচনগুলোকেই মানুষ খনার আদি বচন বলে ধরে নেয়। প্রাচীন কালে লেখার প্রচলন না থাকায় অন্যান্য বিষয়ের মতো খনার বচনও গেয়ে গেয়ে লোকজনদের শুনানো হতো। শতাব্দীর পর শতাব্দী এভাবেই চলছিল। কালের পরিক্রমায় খনার বচনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। হয়েছে অঞ্চলভেদে এগুলোর অনূদিত রূপায়ণ। তাই একথা মোটেই জোর দিয়ে বলা যাবে না যে, বর্তমানের বচনগুলোই খনার আদি ও মৌলিক বচন। বরং এগুলোর প্রায় সবই ভাবানুবাদ।

বাংলাদেশের একটি বড়সংখ্যক জনগোষ্ঠী খনার বচনকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে দেখতে আগ্রহী। তাদের মতে প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে যেহেতু খনার বচন অনেকাংশে জড়িত, তাই তাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে নেয়া উচিত। তাদের যুক্তি অবাস্তব নয়। তাই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা খনার বচনের পর্যালোচনা করার হয়ে থাকে।

আমাদের দেশের হিন্দু-সমাজের অধিকাংশেরও বেশি অংশজুড়ে খনার বচন অতি সমাদৃত হয়ে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। হিন্দু-সমাজে খনার বচন বিশ্বস্ত দিঙ্নির্দেশক হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে যুুগ যুগ ধরে। হিন্দু-সমাজের মতো বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীও খনার বচনের প্রতি একান্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রকাশ করে থাকে। মুসলিম-সমাজেও খনার বচনের গুরুত্ব চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর মুসলিম-সমাজে খনার বচন বেশ জনপ্রিয়। অবশ্য শুভাশুভ লক্ষণ, কৃষি ও আবহাওয়াসংক্রান্ত দু-চারটি বিষয়ে মুসলিম-সমাজে খনার বচন তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি।

মুসলিম ধর্ম-দর্শন প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের প্রতি শতভাগ বিশ্বাস ও যুক্তিনির্ভর চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ একটি জীবনদর্শন। তাই ধর্ম ও যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাইবাছাই এবং বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ ব্যতীত শিক্ষিত মুসলিম-সমাজে খনার বচন গৃহীত হয় না। অবশ্য খনার বচনের সারবত্তা ও যৌক্তিকতাকে বিদগ্ধ মুসলিম-সমাজ নির্বিচারে নাকচ করেনি।

২.
খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০ অব্দে তৎকালীন ভারতবর্ষের তক্ষশীলায় জন্মগ্রহণ করেন মহামতি কৌটিল্য। খ্রিস্টপূর্ব ২৮৩ অব্দে বিহারে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তার মূল নাম বিষ্ণুগুপ্ত। ছদ্মনাম কৌটিল্য। চানক গ্রামে জন্ম নেয়ায় তাকে চানক্য বা চাণক্যও বলা হয়ে থাকে। অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। এছাড়া মৌর্য বংশের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী পদেও তিনি নিযুক্ত ছিলেন।

ঐতিহাসিকগণ বলেন, চন্দ্রগুপ্তের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে বিলাসবহুল জীবন যাপনের অবারিত সুযোগ থাকার পরও তিনি খুব সাধারণ একটি কুঁড়েঘরে নির্মোহ সন্ন্যাসজীবন-যাপন করতেন। শিষ্যদেরকে রাজ্যশাসনের কৌশলসহ নৈতিক ও আর্থ-সামাজিক বিষয়ে জ্ঞান দান করতেন। তাঁর নীতিবোধ-শিক্ষা খুবই উচ্চাঙ্গের ও মানবিকতার গুণে প্রশংসিত ছিল। তাঁর একটি সংকলন হলো ‘চাণক্য নীতি দর্পণ’। দু হাজারেরও অধিক বছরের কাল-পরিক্রমায় এসেও চাণক্য-নীতির শ্লোকগুলো বিন্দুমাত্র গুরুত্বহীন হয়নি। ধর্ম, দর্শন, নীতিশাস্ত্র, সামাজিক আচরণ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে চাণক্যের অভূতপূর্ব দার্শনিক প্রজ্ঞা অতুলনীয়। তবে অসাধারণ দক্ষ পরিকল্পনাবিদ হিসেবে চাণক্যের খ্যাতি সবচেয়ে বেশি। তিনি আপন সিদ্ধান্তে অটল-স্বভাবী ছিলেন। তাঁর কাছে অর্থহীন আবেগের কোনো মূল্য ছিল না। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন এবং তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।

তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারে অনেক ঐতিহাসিক বলে থাকেন যে, সুবন্ধু নামক বিন্দুসারের এক মন্ত্রী চাণক্যকে অপছন্দ করতেন। তাঁর জনপ্রিয়তায় তিনি খুব ঈর্ষান্বিত ছিলেন। বিন্দুসারকে তিনি জানান যে, তাঁর মায়ের মৃত্যুর জন্য চাণক্যই দায়ী। এতে বিন্দুসার প্রচ- ক্ষুব্ধ হন এবং চাণক্যকে বহিষ্কার করেন। তখন চাণক্য বৃদ্ধবয়সে উপনীত হয়েছিলেন। বিন্দুসারের এ ধরনের আচরণে চাণক্য খুবই মর্মাহত হন এবং স্বেচ্ছা-উপবাস করে দেহত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য কয়েক দিন পরই রাজা বিন্দুসার জানতে পারেন যে, চাণক্য নির্দোষ। তখন তিনি সুবন্ধুকে চাণক্যের নিকট পাঠিয়ে তাকে রাজপ্রাসাদের ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করেন। চাণক্য রাজপ্রাসাদে ফিরে আসার সংকল্প করেন বটে কিন্তু ধূর্ত সুবন্ধু তাকে ফেরার পথে পুড়িয়ে হত্যা করেন।

পতি কৌটিল্য বলেন― স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালের অধিশ্বর, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রভু বিষ্ণুর প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে বিভিন্ন শাস্ত্রের নির্বাচিত নীতির বর্ণনা আরম্ভ করছি। যে এলাকায় রাজা, বৈদিকশাস্ত্রের পতি, চিকিৎসক, ধনী ব্যক্তি ও নদী―এই পাঁচটি বিষয় অনুপস্থিত, সেখানে ক্ষণিকের জন্যও অবস্থান করবে না। যে দেশে জীবিকা নির্বাহের জন্য আয়-উপার্জনের সুবন্দোবস্ত নেই, জনসাধারণের মধ্যে সৌজন্যতাবোধ বা আদব-কায়দা নেই, লোকজনের মধ্যে লাজ-লজ্জার তোয়াক্কা নেই, মেধা ও বিদ্যাবুদ্ধির উৎকর্ষের চর্চা নেই, দান-দক্ষিণার রীতি নেই, এমন দেশে এক মুহূর্তের জন্যও প্রবেশ করা কোনো জ্ঞানী লোকের জন্য উচিত নয়। তুমি অঢেল ধনবান হলেও সবসময় যথাসাধ্য ধন-সম্পদ সঞ্চয় করতে থাক। কারণ, যেকোনো সময় জীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ভুলেও কখনো মনে করবে না যে, ধনবানের আবার বিপর্যয় আসে কীভাবে? জেনে রেখো, ধন-সম্পদ যখন ক্ষয় হতে থাকে, তখন রাশি রাশি সম্পদও নিমিষেই হাওয়া হয়ে যায়।

তাঁর নীতিবোধ-শিক্ষা খুবই উচ্চাঙ্গের ও মানবিকতার গুণে প্রশংসিত ছিল। তাঁর একটি সংকলন হলো ‘চাণক্য নীতি দর্পণ’। অর্থশাস্ত্র ও চাণক্য নীতি নামক দুটি গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। লেখক এ অংশে সূচিবদ্ধ করেছেন- কৌটিল্যের জীবনী ও কৌটিল্যের নীতিশাস্ত্র। এছাড়া বইটিতে রয়েছে খনার বচনের শব্দার্থ, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও শাস্ত্রীয় আলোচনা। সুসম্পাদিত এ বইটি পাঠক সমাজে সমাদৃত হবে বলে আশা করা যায়।

আরও পড়ুন- কেমন ছিল মাওলানা ভাসানী ও ন্যাপের মতাদর্শ? 

কিংবদন্তী কৃষিবিদ খনাকে নিয়ে রচিত অন্যান্য বইগুলো দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading