এক ঝলকে মাসুদ রানা সিরিজ সৃষ্টির ইতিহাস

মাসুদ রানা

মাসুদ রানা,  বাংলাদেশের জনপ্রিয় কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র। কাজী আনোয়ার হোসেন এর স্রষ্টা। লেখকের ১০ মাসের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল এই চরিত্রটি। কাজী আনোয়ার হোসেন ঐ সময়ে মোটরসাইকেলে তাঁর রাঙ্গামাটি ভ্রমণের কথা স্মরণ করে লেখেন সিরিজের প্রথম উপন্যাসটি। আর ঐ কাহিনীই বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কারণ এটাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম চরিত্র যা বাংলাদেশের চরিত্র হলেও একটি বৈশ্বিক চরিত্র হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। চলুন এক ঝলকে দেখে আসি মাসুদ রানাকে। 

নামকরণ-
মাসুদ রানা’র নামকরণ করা হয় দুজন বাস্তব মানুষের নামের অংশ মিলিয়ে। কাজী আনোয়ার হোসেন তাঁর স্ত্রী, আধুনিক সংগীতশিল্পী ফরিদা ইয়াসমীনের সাথে পরামর্শ করে নামটি নির্বাচন করেন। এপ্রসঙ্গে স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের দুজনেরই বন্ধু স্বনামধন্য গীতিকার মাসুদ করিমের ‘মাসুদ’ আর আমার ছেলেবেলার হিরো (নায়ক) ইতিহাসে পড়া মেবারের রাজপুত রাজা রানা প্রতাপ সিংহ থেকে ‘রানা’ নিয়ে নাম হলো মাসুদ রানা।

 

সাংকেতিক নাম– এম আর নাইন।

 

প্রথম আগমন

এই সিরিজের প্রথম বই বের হয় ধ্বংস পাহাড় নামে ১৯৬৬ সালে। 

পেশা– 

গুপ্তচর বৃত্তি। তরুণ মাসুদ রানা বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স-এর এজেন্ট। 

সংস্থার নাম– ‘রানা এজেন্সি’।

 

যে আদলে তৈরি

বিশ্বখ্যাত ইয়ান ফ্লেমিং-এর গোয়েন্দা সিরিজ জেমস বন্ডের ছায়া অবলম্বনে তৈরি এই সিরিজ।

বাবা– জাস্টিস ইমতিয়াজ চৌধুরী।

 

চরিত্রায়ণ-

মাসুদ রানা সেনাবাহিনীর প্রাক্তন মেজর, এবং কাল্পনিক সংস্থা বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর সদস্য, এবং তাঁর সাংকেতিক নাম MR-9। এছাড়া রানা এজেন্সি নামক একটি গোয়েন্দা সংস্থাও রানা পরিচালনা করে থাকে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে তথা ১৯৭১-এর আগের বইগুলোতে সংস্থাটির উল্লেখ থাকতো পি.সি.আই বা ‘পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স’হিসেবে। সে পৃথিবী ও বন্ধু-বান্ধবদের বিভিন্ন বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মিশনে নামে। এই চরিত্রের স্রষ্টা আনোয়ার হোসেন  রানা সম্পর্কে বলেন, ‘সে টানে সবাইকে কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।’ 

পার্শ্বচরিত্রগুলো-

সহায়ক চরিত্রে প্রথমেই মেজর জেনারেল রাহাত খানের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের প্রধান। তাঁরই তত্বাবধানে রানা নিজের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া তার কাজে সহায়তা করে থাকে সোহেল, সলিল, সোহানা, রূপা, গিলটি মিয়া প্রমুখ চরিত্রও। সাগর-সঙ্গম বইটি লিখতে গিয়ে কোনো এক বই থেকে কাছাকাছি একটা চরিত্র পেয়ে সেটাকেই কাহিনীর উপযোগী করে বসাতে গিয়ে লেখক নিজের অজান্তেই তৈরি করে ফেলেছেন গিলটি মিয়া চরিত্রটিকে। চরিত্রটির বাচনভঙ্গি তিনি তাঁর মায়ের থেকে পেয়েছেন, যিনি হুগলির মানুষ হলেও কলকাতা শহরে বড় হয়েছিলেন। তাঁরই মুখের ভাষা একটু অদলবদল করে নিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন গিলটি মিয়ার মুখে। সিরিজের ‘সোহেল’ চরিত্রটি খানিকটা জেমস বন্ডের বন্ধু ফিলিক্স লেইটারের আদলে গড়া। ‘সোহানা’ হলো লেখকের কল্পনার বাঙালি মেয়ে। এছাড়া মাসুদ রানার চিরশত্রুদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য হলো বিজ্ঞানী কবীর চৌধুরী, উ সেন প্রমুখ। ‘কবীর চৌধুরী’ এসেছে সেবা প্রকাশনীর কুয়াশা সিরিজের চরিত্র থেকে।

চলচ্চিত্রে মাসুদ রানা-

চরিত্রটি নিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় মাসুদ রানা সিরিজের ‘বিস্মরণ’ অবলম্বনে, ১৯৭৩ সালে। আর ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। পরিচালনায় ছিলেন মাসুদ পারভেজ তথা পরবর্তীকালের জনপ্রিয় অভিনেতা সোহেল রানা। তার পরিচালিত প্রথম ছবি এটি। বিশ বছরের বেশি সময় পর পরবর্তীকালে লেজার ভিশনের ব্যানারে এই চলচ্চিত্রটি ডিভিডি আকারে বাজারে আসে।

নাটকে মাসুদ রানা- 

বাংলাদেশের টিভি নাটকের ইতিহাসে প্রথম প্যাকেজ নাটক ‘প্রাচীর পেরিয়ে’ এর কাহিনী রচনা করা হয় কাজী আনোয়ার হোসেন রচিত মাসুদ রানা সিরিজের ‘পিশাচ দ্বীপ‘ নামক বই থেকে। কাহিনীর নাট্যরূপ প্রদান করেন আতিকুল হক চৌধুরী। ১৯৯৪ সালে প্রচারিত এই নাটকটিতে মাসুদ রানার ভূমিকায় অভিনয় করেন জনপ্রিয় মডেল তারকা নোবেল আর তার বিপরীতে সোহানার ভূমিকায় অভিনয় করেন বিপাশা হায়াত। খলনায়কের ভূমিকায় ছিলেন কে. এস. ফিরোজ।

পরিসংখ্যান-

সেবা প্রকাশনী কর্তৃক এই সিরিজে এই পর্যন্ত মোট ৪৫০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে বইগুলিতে মোট ৩০৩টি গল্প আছে (অনেক বইয়ের দুটি, এমনকি তিনটি ভলিউম থাকায় এমনটি হয়েছে)।

মাসুদ রানা সিরিজের সকল বই 

 

আরও পড়ুন একঝলকে হুমায়ূন আহমেদের  ‘হিমু’ 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png