মায়াময় গাঁথুনির গল্পগ্রন্থ ‘নীল তসবি’

শাহানারা স্বপ্নার নতুন গল্পগ্রন্থ
Untitled-1

মাটি. ধাতু, তালপত্র থেকে আজকের অত্যাধুনিক কাগজের পাতায় অবিরাম লিখছে মানুষ। মনের সাথে প্রজ্ঞার মিশেলে তৈরী হচ্ছে কত না উপাখ্যান। সে আখ্যান-সাগরে নতুন অতিথি হল –’নীল তসবি’। চমৎকার বাকরীতির কাব্যময়  বাক্যমালার মায়াময় গাঁথুনির গল্পগ্রন্থ। পড়াশেষেও পাঠকের সঙ্গ নেয়, ঘোরে পিছু পিছু!  নামগল্প থেকে একটু উদাহরণ দেয়া যাক-

-বাড়ানো হাতের মুঠোর ভেতর মসৃন ভারী  এবং  ঠান্ডা একটা স্পর্শ পেলাম!

-এবার চোখ খোল!

বলতেই চোখ মেলে শিহরিত হলাম- নীল রঙের ছোট ছোট পাথরের অসাধারন এক তসবী! শরতের নিদাঘ নীলাআকাশ  সমস্ত চন্দ্রালোকসহ যেন পিছলে পড়ছে তার ওপর! সমুদ্র মথিত উজ্জ্বল নীল। খুবই সুন্দর দেখতে! তসবীটায় কি ছিল জানিনা। একটা স্ফটিকস্বচ্ছ আলো যেন আমার ভেতর বাহির উদ্ভাসিত করে দিল।

নীলু আপা মিটিমিটি হেসে বলল-

-’স্বপ্না, তোমার জন্যেই এটা আলাদা করে এনেছি। অনেক খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করলাম”!

মানুষের মনের হদিশ পাওয়া ভার, এমনকি নিজের মনেরও। মনোজগতের জটিল গতি-প্রকৃতির নিয়ন্ত্রনেই তো জীবন-নদীর মোড় ঘুরছে। সেই অদৃশ্য নিয়তির কারসাজিতেই হয়তোবা এই তসবী আমার একান্ত প্রিয় হয়ে উঠল। এমনকি একে খুব পয়মন্ত বলে মনে হতে লাগল। সবসময় সঙ্গে রাখা ছাড়াও ‘চোখে হারাই’ ভাব! যে কোন যাত্রাপথেও থাকে নিয়মিত সঙ্গী!”

আর এটিকে বারে বারে হারানো যেন অনিত্য জীবনের রূঢ় সত্যটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে-’যারে বেশী বাঁধতে চাই সেই বাঁধন ছুটে পালায়’!

নীলের প্রতি অসম্ভব দুর্বৃল নীলু আপার সাথে সমার্থৃক হয়ে ওঠা  নীল তসবি’ চৌদ্দটি গল্পের  বইয়ের নামগল্প। গল্পটি এক কথায় অনবদ্য ও  সুখপাঠ্য।  নীলু আপার স্মৃতি-স্বাক্ষর নীল তসবিকে ঘিরে  ধীরে ধীরে বাস্তবানুগভাবে ডালপালা বিস্তার করেছে। কোথাও এতটুকু অতিশোয়িাক্তি, কষ্টকল্পতা নেই।  ঝরঝরে ঝর্নাস্রোতের মত  গল্প এগিয়েছে মসৃনভাবে।

গল্প তো শুণ্য অশরীরি কিছু নয়, থাকে তার শরীরী অবয়ব।  গল্পের চরিত্ররা স্থান-কাল পাত্রের রূপ-রস-মাধুর্য্ ধারন করে শব্দ-গৌরবে নিজেদের প্রকাশ করে। তাদের বোধ-বাস্তবতা, আচার আচরনে  সে সময়টা জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাই তো গল্প অনেকটা কালের দর্পন। যে দর্পনে জীবন-রাজনীতি-সমাজনীতি নানা রঙে রঞ্জিত হয়ে ইতিহসের অনুসঙ্গে পরিনত হয়।

অনাদীকাল ধরেই মানুষ গল্প বলে, গল্প শুনে, গল্প তৈরী করে নিজের ভেতরটাকে প্রকাশ করে আসছে। স্রষ্টার সাথে সংযোগ স্থাপনে তিনিই নির্দেশ দিয়েছেন ‘পড়ো’!  অতীত-বর্তমান, ঐতিহ্য-ইতিহাস জানার মাঝে বই হলো সাঁকো। নানা মাত্রিক বই পড়েই  মানুষ আত্মস্থ করে জীবন পথের সুখদুখ, বিনির্মান করে সুন্দর ভবিষ্যতের চলার পথ। এ চলার পথে  ছড়িয়ে পড়ে গল্প পাঠের আলো, অভিজ্ঞতার দ্যুতি। যে আলোয় উদ্ভাসিত হয় মানবিক জীবন।  তাইতো জ্যার্তিবিদ, দার্শনিক ওমর খৈয়াম বইকে অতটা গুরুত্ব দিয়েছেন-’রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার চোখ ঘোলাটে হবে, কিন্তু বই সে অনন্ত যৌবনা-তার কদর কখনো ফুরোবে না”! ড, শহীদুল্লাহ কলেছেন-’আমাকে মারার জন্য ধারালো অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, শুধুমাত্র বই থেকে দুরে রাখলেই চলবে”!

নীল তসবি
নীল তসবি

BUY NOW

নীল তসবির গল্পকার ‘আমার কথায়’ লিখেছেন গল্পলেখার পটভূমিকার কথা- ‘প্রতিটি মানুষের জীবনই  একেকটা বই বা বড়গল্প ছাড়া আর কিছু নয়।  ঘটে যাওয়া ঘটনা, চাওয়া-পাওয়া, আলাপ-পরিচয়, জীবন-জীবিকা, উত্থান-পতন, আনন্দ-বেদনার অসংখ্য বাঁক উপবাঁকে কাটানো সময়ই গল্পের নির্যাস। এসবই মিলেমিশে তৈরী করে প্রতিটি গল্প।  ’অচেনা গন্তব্যের শানুর নাম স্মৃতি হয়ে মনের কোন গভীরে লুকিয়েছিল জানা ছিল না। হৃদয় সমুদ্রে সপ্তডিঙ্গা চড়ে ঘোরার পথে তাকে খুঁজে পেলাম। সে কত কথা! সব কথা তো বলতেই পারিনি। বলা মুশকিল, ফুটিয়ে তোলা আরো দুরূহ।

’ আজমতির দিন গুজরান, সুবহ ভোর থেকে অবিরাম ছুটে চলার ছবিগুলো ঝরা পাতার মত ঝুরঝুরিয়ে ঝরে পড়ে।  তার কিছুটা মুঠো ভরে  তুলে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি শব্দের তুলিতে কালের পাতায়। দুর থেকে একটা মিনতিভরা চোখ যেন মায়াময় চোখে তাকিয়ে থাকে। এমন অদৃশ্য হাতছানির গল্প থাকে সব গল্প হয়ে ওঠার পেছনে। ‘জীবনের মোড়’ গল্পের শামসুর বাঁকানো গ্রীবা এখনো চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাই। এভাবে সবকটা গল্পই ছবির অথবা ছবিরগল্প।  আমার মনে হয় যে কোন লেখা, বিশেষ করে গল্পলেখা মনের ভেতরে জমানো ছবি আর কল্পনার মিশেল।  জীবন, প্রকৃতি ও সময়ের রঙে রাঙানো মন-ছবিরা একই সাথে ছবি ও কবি। নিজেরাই বাখানিয়া সুরে নিজেদের কথা বলতে থাকে’ ………!

সত্যি, সব গল্পের বসবাস তো মনের ভেতরেই, এটাই গল্প  তৈরীর মূল জায়গা।

’নীল তসবী’র গল্পমালার প্রথম গল্প ‘অচেনা গন্তব্য’ মধ্যবিত্ত পরিবারের এক সাধারন মেয়ে শানুর জীবনের বাঁক বদলের গল্প। ইডেনে নতুন ভর্তি হওয়া শানুর সেকেন্ড ইয়ার ফাইনালের আগেই আচমকা পরিবর্তৃনের ঝড় । আজন্ম লালিত পরিচিত পরিবেশের গন্ডীর বাইরে স্বল্পকালের জীবনটাকে ঘুড়ির মত উড়িয়ে  অন্য এক অজানা আকাশ পানে  ধাবিত করে, যা তার কল্পনাকেও  হার মানায়।  শানুর বাবা সিলেট থেকে বদলী হয়ে সবে ঢাকা এসেছেন। বছর প্রায় শেষের দিকে। ভাইবোনরা সব তাড়াহুড়ো করে নতুন স্কুলে ভর্তি, শানুর নতুন কলেজ, নতুন বাসা নুতুন পরিবেশ, সর্বোপরি অচেনা মানুষের মাঝে খাপ খাইয়ে নেয়ার কসরত। এরই মাঝে হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত! এক ফুফাতো বোনের চাপে  শুরু হল শানুর বিয়ের তোড়জোড়! তিন দিনের মধ্যেই বিয়ে এবং কুড়ি দিনের মাথায় স্বামীর সঙ্গে বিদশে যাত্রা। আশির দশকে মেয়েদের পরিবারে সমাজে অবস্থান এবং মানসিকতার একটি হৃদয়ম্পর্শী মনোমুগ্ধকর আলেখ্য এ গল্পে  বর্নিত হয়েছে।

বিবৃত হয়েছে স্বপ্নের চেয়ে দ্রুততর গতিতে বদলে যাওয়া হত-বিহব্বল শানুর  দ্বন্ধমুখর  অনভিূতি । যেমন বিশাল বিমান বন্দরে বিন্দুবৎ স্থানুর মত বসে থাকা-

’শানুর মনের ভেতর কেমন এক অজানা ভয় গুড়গুড়িয়ে ওঠে। আস্তে আস্তে সেটা জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে। পনেরো বিশ দিন আগেও যাদেরকে কোনদিন দেখেনি, এখন এরাই নাকি তার সব! কিন্তু মনে ভয় যতই থাক এখন এ মুহুর্তে সত্যিই এরাই তার একমাত্র কান্ডারী! বারবার শানুর দু’চোখ তাদেরকেই অনুসরন করছে, দৃষ্টি আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছে। যদি হারিয়ে ফেলে, ওরা যদি আর কোথাও চলে যায়! ভাবতেও শানুর গা কাঁটা দিচ্ছে!

এই মহা জনসমুদ্রে আর তো কাউকে শানু চেনে না। বাবা এ কী করলেন! মুহুর্তে বাবার ওপর তীব্র অভিমানে শানুর চোখ ফেটে কান্না এলো। তার পরীক্ষা পর্যন্তও কি অপেক্ষা করা যেত না? বাঁধ না মানা  অশ্রু দু’কূল উপচে ভেসে যেতে থাকে। শানু কিছুতেই সে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারকে থামাতে পারে না। কী এক কষ্টে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে ভেতরটা। নিরবে লুকিয়ে কাঁদছে, অঝোর ধারায় ভাসছে। অনেকক্ষন কেঁদে কেঁদে একটু হালকা হয়।তবু আপনিই গড়িয়ে পড়ে পানি। শানু মুখ ঢেকে রাখে। খুব সন্তর্পনে হাতের রুমালটা গালে চেপে চেপে পানি মোছে। মুখটা নামিয়ে রাখে, যদি ওরা কেউ দেখে ফেলে’!

শানুর উনিশ বছরের জীবনে একেতো  প্রথমবার মা-বাবাকে ছেড়ে আসা তারোপর অচেনাজনের সাথে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়া। থেকে থেকে একটা ভয় বিষ্ময় উদ্বেগ আর আশঙ্কা তাকে আকুল করে তুলছে। শানুর সাথে সাথে গল্পের পাঠকেরও বুক ভারী হয়ে আসে। তবে সবশেষে যাবতীয় সংকট পেছনে  ফেলে সুন্দর ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও রয়েছে, যা থেকে মনে হয় শানু হয়তো সুখী হতে পারে।  ছোট গল্পের  পরিসরে  বৃহতের ব্যাঞ্জনা বিমূর্তৃ হয়ে উঠেছে।

আজমতি গল্পের- ’গ্রাম এলাকার নিশুতি রাতের তৃতীয় প্রহর। চারদিক নিরব নিস্তব্ধ। জমজমাট অন্ধকার। গোপন অপরাধের কায়-কারবার রাতের অন্ধকারের আড়ালেই জমে ওঠে। যাবতীয় অশুভ অন্ধকারকে হুঁশিয়ার করতেই যেন ভোরের রেলগাড়ির হুইসেলটা হঠাৎ বিকট জোরে চিৎকার করে উঠল কু-উ-উ-উ-!!” গল্পের শুরুটাই যেন আজমতির  নিয়তি নির্ধারিত বেদনাক্লিষ্ট জীবনের ওপর প্রতিবাদের  আর্তনাদ হয়ে শেষ পর্যৃন্ত বেজে চলেছে।

স্বামী –সন্তান, ঘর-গেরস্থালীসহ আজমতির সুখের সংসারই ছিল। হঠাৎ অসুস্থতায় পড়ে এবং রোগে ভুগে স্বামী মারা গেল। দুটি মেয়ে নিয়ে বিধবা হল আজমতি। ঘর ভিটাটুকু ছিল বলে রক্ষা। ’সংসারে দুর্দিনের ছায়া পড়তেই আত্মীয়-স্বজনের আসল চেহারা ফুটতে শুরু করল। খরচের ভয়ে কেউ আর পারতপক্ষে এ বাড়ির পথ মাড়ায় না’। নিজের সঙ্গে আজমতির যুদ্ধ চলে। সে কি ভিক্ষে করবে? পরের বাড়ি কাজ নেবে? পরক্ষনেই মনটা পিছিয়ে যায়। বাড়ির বউ ঘরের বার হবে? ছি ছি!

অবশেষে আজমতি বুঝে গেছে, না খেয়ে মরে পড়ে থাকলেও কেউ  খোঁজ নেবে না। উল্টো শকুনের থাবা মেলে সব বসে আছে কবে আজমতির সামান্য পুকুর-ভিটের জমিটুকু গিলে খাবে! সবরকম লাজ-লজ্জা ঝেড়ে সে উঠে দাঁড়ালো। বাঁচতে হলে শক্ত হতে হবে। নিজের দুই হাতকেই হাতিয়ার বানিয়ে ঝাঁপ দিল জীবন-যুদ্ধে। লাজ-নম্র ভীতু গৃহবধুর  খোলস ভেঙ্গে বেরিয়ে এল এক খাপখোলা তলোয়ার’ ! তার জীবন সংগ্রাম, অসহায়ত্ব, হার না মানা জেদ বলিষ্ঠতার অভিব্যাক্তিতে জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার শক্তি যোগায়।

’আরব সুগন্ধি বখুর’ গল্পে সুগন্ধির আদ্যপান্ত তুলে ধরা হয়েছে গল্পচ্ছলে। একদিকে  লোবানের সুগন্ধ আরেকদিকে আরব সমাজের টুকরো চিত্র বেশ  উপভোগ্য। দুটি গল্পে আরব পটভূমিকা বিধৃত।  সেখানকার অভিজ্ঞতা, ভাষা, জীবনের রসায়ন  এ দেশীয় জানালায় দেখা পরিযায়ী পাখির সৌন্দর্য্যের মত মনোরম।

”দোকান যদি হয় আগর-লোবান-বখুরের, তবে সে সুরভির চুম্বক টান উপেক্ষা করা ফেরেশতারও  সাধ্য নেই !….’’ সুসজ্জ্বিত দোকানের সামনে কারুকার্যখচিত জলকরি ডিজাইনের বিশাল আগরদানী। হাঁটু  সমান উঁচু সোনালী পাত্রে জ্বলছে আগরের বখুর। সুরভিত হালকা ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে ডানা মেলা পাখির মত চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। সে সুগন্ধিতে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। ভেতরে ঢুকে চক্ষু স্থির ! এত এত বখুর!- লোবান, ওউদ, আগর, আতর !

সারি সারি বাক্স ভর্তি  হালকা সবুজ-কমলা ও নানা রঙের পাথরের টুকরোর মত দানাদার লোবান আর আগর, চন্দন এবং সুগন্ধি কাঠের ছোট ছোট টুকরোয় ভর্তি। ছোট বড় হরেক সা্ইজের রয়েছে। আবহাওয়ার তারতম্য ভেদে বিভিন্ন দেশেরটা বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। বাক্সগুলোয় দশ বারোটা দেশের নাম  লেখা থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই ! অথচ বাংলাদেশের আগর কাঠ থেকেই হয় পৃথিবীর উৎকৃষ্ট মানের ওউদ ও আতর। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয় বিশ্ব জুড়ে নামী দামী ব্র্যান্ডের ”হারামাইন”আতর কোম্পানীর  মালিকও বাংলাদেশী।

হায় সুজানগর! হাজার বছর ধরে সুগন্ধ সওদাগরি করেও কপালে স্বীকৃতি জোটেনি! চার পাঁচশ’ বছর আগেও আরব, ইউরোপ, ভারতের ব্যবসায়ীরা সিলেটের আতরনগর সুজানগরে দলে দলে ভীড় করতো।  বর্তমানেও সেখানে তিন চারশ’ আতর কারখানা  আছে তবে পদ্ধতি এখনো  সেই মান্ধাতা আমলের –”বিশ্ব যখন  এগিয়ে চলে আমরা তখনো বসে! নিজ দেশের উদাসীনতার  এ আফসোস পাঠকের মনেও সঞ্চার হবে। এখানে গল্প শুধু বিনোদনেরই নয় অনেক কিছু জানারও।

‘বিবি মতি বানু’, ’আরেক ছবি’রহিমারা কোথায় যাবে’ নামের  গল্পগুলো  সামাজিক  অবক্ষয়ের গল্প। সাধারন মানুষের জন্য দুয়ারগুলি  যেন এক এক করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক সুবিচার  নেই কোথাও।  একশ্রেনীর লুব্ধক  দুর্নৃীতি, অনৈতিক সুযোগ কব্জা করে সমাজ গভীরে সৃষ্টি করছে  হতাশা, বিশৃঙ্খলা। ’প্রতিকার’হীন প্রশ্নরা মুখ ব্যাধন করে  আছে জবাবের প্রতীক্ষায়।

’নিজের  সংসার’,  ’ফখরিয়া’,  ’জীবনের মোড়’, ’আনমনার সাথে’, রোজগার  প্রভৃতি গল্পের কাঠামোয় সহজাত প্রবনতাময় একটা যাদুকরী ভাষার টান আছে।  গ্রাম ও নাগরের  পটভূমিকায়  যাপিত জীবনের আশা-নিরাশার দোলাচল, সমাজ বাস্তবতা অষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। ঋজু দৃষ্টিভঙ্গি  ভাষার  জাদুময়তায়    পাঠক গল্পের মূলভাব  সহজেই  বুঝতে পারে ।  সময়ের পরতে জমে থাকা মুহুর্তৃরাই গল্প হয়ে উঠেছে।

হলি আর্টিসানের ঘটনা নিয়ে লেখা  ‘একটি দুর্ঘটনার রাত’ গল্প না বলে আলেখ্যই বলা যায় । নতুন করে আমাদের মনে পড়ে সে ভয়াবহ রাতের স্মৃতি। অহেতুক সে রক্তক্ষয় হৃদয়কে বেদনার্তু করে তোলে।  শারীরিক প্রতিবন্ধী  মেয়ে রুমীর জন্য ভালোবাসা অনবদ্য স্মৃতিকথার গল্প ‘শান্তি কুটির’। রানী ফুফুর ভারাক্রান্ত হৃদয় পাঠককেও ভারাক্রান্ত করে তোলে। জাদুভরা শব্দের তুলি গল্পের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে অবোধ এক বালিকার বাকরুদ্ধ মনের ইতিবুত্ত। রানী ফুফুর মনো জগতের  টানাপোড়ন-

’রানী ফুফুর সমস্ত সুখের মূলে  একপোঁচ কালির মতই যেন বিধাতা পাঠিয়েছিলেন  বড় মেয়ে রুমীকে। আজন্ম পঙ্গু রুমী নিজের সঙ্গে  সঙ্গে তাদের জন্যও দুর্ভাগ্য বসে নিয়ে এসেছিল। রুমীকে নিয়ে ফুফুর কষ্ট আর বিড়ম্বনার শেষ ছিল না। স্বজনের করুনা পরিচিতজনের  সমবেদনা তাঁকে অধীর করে তোলে। আড়ালে  থেকে পরিত্রানের উপায় খুঁজতেন। স্বস্তি পেতে ছুটে আসেন শহর ছেড়ে দুর গাঁয়ে। সবার দৃষ্টিসীমার বাইরে এসে বাড়ি তৈরী করেন গাঁয়ের এই নিভৃত কোনে। এখানকার শীতল অরন্যে ছড়িয়ে দেন জীবনের উত্তাপ, মনের সুদীর্ঘু হাহাকার। উত্তরের বাতাস মুছে নেয় তাঁর দীর্ঘশ্বাস।  প্রকৃতির দেয়া দুঃখ  প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিয়ে কিছুটা শান্তি আসে মনে’। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রুমীর নারী শরীরে ফুটে ওঠে অপরূপ রূপ লাবন্য। মাখনের মত নরম ত্বকে চাঁপা ফুলের ঔজ্জ্বল্যতা নিয়নের আলোকে ম্লান করে। একরাশ কালো চুল সমুদ্রের ঢেউ তুলে পিঠে নেমেছে। টিকালো নাক।পাখির ডানার মত ভ্রু, বিধাতা সবই যেন নিজ হাতে এঁকে দিয়েছেন। কিন্তু শিল্পীর অপুর্বৃ সৃষ্টির ওপর টানা দাগের মতই সামান্য শারীরিক বিকৃতি বিনষ্ট করেছে ওর সমস্ত সৌন্দর্য্যৃকে”।

রুমীর  জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে  আরো   করুন ট্র্যাজেডী  জানার জন্য পড়তে হবে –’নীল তসবি’ গল্পের বইটি।

সব গল্প সব সময় সরল পথে এগোয় না। কারন জীবন তো একটি সরল রেখার ওপর চলেনা।  মাঝে মাঝে বাঁক পরিবর্তন করে। আবার কখনও কখনও গল্প গন্তব্যে পৌঁছায় অনেক ঘুরপথে এমনকি সময়ে কোথাও নোঙরই করে না।  পাঠক থমকে দাঁড়ায়, ভাবনারা দুলে ওঠে। কিছু  ইঙ্গিত, একটা অব্যক্ত অনুরন, কোথাও একটু  দ্যুতি ফেলে রেখে চলে যায়।

শাহানার স্বপ্নার  এ যাবত প্রকাশ পাওয়া প্রায় সবগুলো গ্রন্থই পড়েছি। যাপিত জীবনের ভেতর থেকেই নির্বৃাচন করেন প্লট। গল্প বর্নৃনার একটা অপরূপ ভঙ্গি রয়েছে যা  আলাদা করে চেনা যায়।  রেখেছেন  সমৃদ্ধ  মন ও মননের  স্বাক্ষর। নিজস্ব ঐতিহ্যানুগ সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চৃায় বেশী আগ্রহী।    ইতিহাস ও সাহিত্যের  নিগুঢ় পাঠে নিমগ্ন  এ লেখক  প্রচুর প্রবন্ধ নিবন্ধও  লিখেছেন,  লিখছেন।

‘নীল তসবি’ লেখকের ৫ম গ্রন্থ।  স্কুল জীবন থেকেই তিনি লিখছেন। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে বেশ ঋদ্ধ। পরিণত লেখনির স্বাক্ষর রয়েছে উপমা উৎপ্রেক্ষায়।  চৌদ্দটি  গল্পই সমাজ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি বলা যায়। মানব হৃদয়ের গহীনে ঢেউ খেলে যাওয়া আবেগ, অন্তরদ্বন্ধ, বোধ-বিশ্বাস, টানাপোড়ন  প্রতিবিম্বিত  হয়েছে গল্পের মুকুরে।  এ গল্পকথাকারের   লেখায় পাঠক নিজেকে খুঁজে পাবেন।  আবাল্য স্নেহ জড়ানো স্মৃতি, পরিবশের স্নিগ্ধ বর্নৃনা মনে হবে আমার শৈশবেরেই ছবি তো!  রয়েছে সহজ উপস্থাপনায় চরিত্রের  গভীরে পৌঁছানোর সক্ষমতা।  তীক্ষ্ণ  পর্যৃবেক্ষনে  মনের অতল অভ্যন্তরের হদিশ তুলে আনেন ডুবুরির দক্ষতায়।  নির্মৃান করেন  বোধ ও বিশ্বাসে কথকতার নিজস্ব এক ভাষ্যরীতি। অনবদ্য মুন্সিয়ানায় তৈরী করেন গল্পের অবকাঠামো ।

’নীল তসবি’র  গল্পসমুহ  অবসরে, কাজের  ফাঁকে পড়তে ভালো লাগবে।  পাঠকের ভালোবাসার আকাঙ্খায়ই জন্ম নেয় গল্প-গল্পের বই।

আরও পড়ুন- হাওয়া দেখি, বাতাস খাই

বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন 

শাহানারা স্বপ্নার লেখা অন্যান্য বই দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading