রিয়াজ মাহমুদ’র অনুবাদে মুন্সী প্রেমচাঁদের অনবদ্য উপন্যাস ‘নির্মলা’

সামাজিক ক্ষরণ ও একাকীত্বের গল্প
nirmala feature image

শহরের নামকরা উকিল বাবু উদয়ভানুলালের কন্যা নির্মলা। উকিল বাবুর আরও একটি কন্যা এবং দুটো পুত্র সন্তান রয়েছে। আরও আছে বাড়ি ভর্তি অসংখ্য আশ্রিত আত্মীয়-স্বজন। কিন্তু এখানে এদের সবাইকে আমাদের প্রয়োজন নেই। তদানীন্তন সমাজের নারী-জীবনের তাবৎ দুঃখের বোঝা নির্মলা একা বহন করে নিয়ে গেছে কাহিনীর শেষ পর্যন্ত।

ঘটনার শুরুতে নির্মলার বয়স ছিল পনেরো। সেকালের সমাজের নিয়ম অনুসারে বিয়ের ভরপুর বয়স। বাবু উদয়ভানুলাল নির্মলার জন্য অনেক দিন থেকেই ভালো ঘর, ভালো বর খুঁজছেন। কন্যাদায়গ্রস্ত অন্যান্য পিতার মতো তাঁরও মাথায় একটাই চিন্তা—কে জানে, বরপক্ষ কত না কত যৌতুক দাবী করে। উকিল সাহেবের উপার্জন যদিও প্রচুর, কিন্তু তিনি সঞ্চয় করতে জানেন না। ফলে, যৌতুক তাঁর জন্য এক বিরাট সমস্যা।

এখন, বরের পিতা যেহেতু নিজ মুখে বলে দিয়েছেন যে, তিনি যৌতুকের পরোয়া করেন না, তো এবার তাকে আর পায় কে? এত দিন ভয়ে ছিলেন—না জানি কতজনের কাছে হাত পাততে হয়; দুই-তিনজন মহাজনের সাথে কথাও বলে রেখেছেন। তাঁর ধারণা ছিল, টেনেটুনে খরচ করলেও বিশের নিচে নামানো সম্ভব হবে না। বরের পিতার আশ্বাস পেয়ে তাই তিনি আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেছেন।

কিন্তু আহ্লাদে আটখানা হয়ে বেচারা আর বেশি দিন টিকলেন না। বিয়ের আর মাত্র মাসখানেক বাকি আছে, এমন সময় তিনি শহরের কুখ্যাত ‍গুণ্ডা মাতোইর হাতে খুন হলেন। তাঁর নিহত হওয়ার সংবাদ শুনে বরের বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর ছেলেকে এখানে বিয়ে দেবেন না। কারণ, বিয়েতে বরের বাবা যৌতুক চাননি বটে, কিন্তু আশা করেছিলেন। উকিল সাহেবের উদারতা সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই ধরনের দিলখোলা মানুষের কাছে না চাইলেই বরং বেশি পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন সে আশার গুড়ে বালি। যিনি দেবেন, তিনিই যেহেতু চলে গেলেন তো আর এখানে সমন্ধ করে কী লাভ? সুতরাং নির্মলার বাবার মৃত্যুর সাথে সাথে ভালো ঘরের ভালো বরের সাথে নির্মলার বিয়ের সম্ভাবনারও মৃত্যু ঘটল। কিন্তু তাই বলে সোমত্ত মেয়ে তো আর ঘরে বসিয়ে রাখা যায় না! যে কোনো অবস্থায় মাথার বোঝা নামাতে হবে। যে কোনো প্রকারে মেয়ে পার করতে হবে। প্রয়োজনে কূয়ায় ঝাঁপ দিতে হবে। সে রূপবতী, গুণবতী, বুদ্ধিমতী, কুলীন তো কী হয়েছে? যৌতুক না দিতে পারলে তার কোনো গুণই গুণ নয়; দোষ। যৌতুক দিলে সব দোষ গুণ বলে গণ্য হবে। মানুষের মূল্য নাই, মূল্য আছে কেবল যৌতুকের। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!

কারো দিন কারো জন্য থেমে থাকে না। নির্মলার বিয়েও থেমে থাকেনি। বর সে ভালোই পেয়েছে। ধনে-মানে, সামাজিক অবস্থানে পাত্র কোনো দিক থেকেই কম নন। কেবল বয়সটাই একটু বেশি। নাম তাঁর মুনশি তোতারাম। শ্যাম বর্ণের মোটাসোটা মানুষ। বয়স এখনো চল্লিশ পার হয়নি, কিন্তু ওকালতির কঠোর পরিশ্রমের কারণে চুলে পাক ধরেছে। ব্যায়াম করার অবসর তাঁর নেই। এমনকি কখনো ঘুরতে পর্যন্ত বের হন না, ফলে ভুঁড়ি বের হয়ে গেছে। মোটাতাজা হওয়া সত্ত্বেও প্রায়ই শরীরে কোনো না কোনো সমস্যা থাকেই। অর্শ ও অজীর্ণের সাথে তাঁর স্থায়ী সম্পর্ক।

বাবার বয়সী মুনশি তোতারামের ঘনিষ্ঠতা নির্মলার ভালো লাগে না। মাত্র কয়েকদিন আগে তাঁর বয়সী এক ব্যক্তিকে সে বাবা বলে জানত। স্বামীর অধিকার নিয়ে যখন বুড়োভাম তোতারাম এগিয়ে আসেন তো নির্মলার মন ভয় আর বিতৃষ্ণায় সিটিয়ে থাকে। মুনশি তোতারাম বুঝতে পারেন না, তাঁর প্রতি স্ত্রীর এই অনাগ্রহের কারণ কী? স্ত্রীর মন পাওয়ার জন্য তিনি দাম্পত্য-বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হলেন। নির্মলাকে প্রসন্ন করার জন্য তিনি নিজের স্বাভাবিক ঘাটতিসমূহ উপহারের দ্বারা পূরণ করার চেষ্টা করেন। যদিও তিনি খুবই মিতব্যয়ী মানুষ, তবু নির্মলার জন্য প্রতিদিনই কোনো না কোনো উপহার নিয়ে আসেন। প্রয়োজনের সময় টাকার পরোয়া করতে নেই। ছেলেদের জন্য সামান্য দুধ ছাড়া আর কিছুই আসে না; কিন্তু নির্মলার জন্য মেওয়া, মোরব্বা, মিষ্টি—কোনো কিছুর কমতি নেই। জীবনে কখনো রং-তামাশা দেখতে যাননি, কিন্তু ইদানীং ছুটির দিনে নির্মলাকে নিয়ে সিনেমা-সার্কাস-থিয়েটার দেখতে যাচ্ছেন। নিজের বহুমূল্য সময়ের কিছুটা অংশ কাটাচ্ছেন নির্মলার পাশে বসে গ্রামোফোন শুনে।

 প্রি-অর্ডার করুন

দাম্পত্য-বিজ্ঞান পড়ে উকিল সাহেব জেনেছেন—বালিকাবধূর কাছে বেশি করে প্রেমের কথা বলতে হয়। হৃদয় চিরে রেখে দেওয়া চাই—এটাই ওদের বশীকরণের মূলমন্ত্র। এ কারণে উকিল সাহেব তাঁর প্রেম প্রদর্শনে কোনো কসুর করেন না। কিন্তু এসব কথায় নির্মলার মনে ঘৃণার উদ্রেক হয়। যে কথা কোনো যুবকের মুখ থেকে শুনলে মন প্রেমে উতলা হয়ে উঠত, সে কথাই উকিল সাহেবের মুখ থেকে শুনে ওর কাছে শরাঘাত বলে মনে হয়। এর মধ্যে রস নেই, উল্লাস নেই, প্রেম নেই, হৃদয় নেই—আছে কেবল ছলনা, ধোঁকা আর শুষ্ক, নীরস বাগাড়ম্বরতা। সুগন্ধি তেল বা অন্য কোনো উপহার তার মন্দ লাগে না, প্রমোদভ্রমণ খারাপ লাগে না, কথার ফুলঝুরিও খারাপ লাগে না, খারাপ লাগে কেবল তোতারামের পাশে বসা। সে তার রূপ যৌবন বুড়োকে দেখাতে চায় না, কারণ সেখানে দেখার মতো চোখ নেই। সে তাঁকে প্রেমরসে সিক্ত করার যোগ্য মনে করে না। কলি প্রভাত-সমীরের স্পর্শেই ফুটে। রসে দুজনকেই সমান হতে হয়। নির্মলার জন্য সেই প্রভাত সমীর কোথায়?

যা নেই তার জন্য হাপিত্যেশ করে লাভ নেই। নির্মলা তাই অন্যত্র মনের খোরাক খুঁজে নেয়। স্বামীর আগের তরফের তিন সন্তানের সাহচর্যে সে উজ্জীবিত হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এতেও বাধ সাধেন স্বামীর বড় বোন রুক্মিণী দেবী। বয়স পঞ্চাশের ওপরে। এতদিন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন গৃহকর্তী। শ্বশুরকুলে কেউ না থাকায় তিনি স্থায়ীভাবে এখানেই বাস করেন।

বাচ্চাদেরকে তিনি নির্মলার কাছে ঘেঁষতেই দেন না। যেন সে একটা সাক্ষাৎ পিশাচ, বাচ্চাদের গিলে ফেলবে। এই সংসারে  রুক্মিণী দেবীর স্বভাব একেবারে দুর্বোধ্য। বুঝে ওঠা কঠিন যে, তিনি কোন কথায় খুশি হন আর কোন কথায় বেজার। আবার যে কথায় একবার খুশি হন, ঠিক সেই একই কথায় অন্য সময় তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। নির্মলা তার নিজের ঘরে বসে থাকলে তিনি বলেন, গোমড়ামুখী কারো সাথে কথা বলে না। নির্মলা ছাদে উঠলে বা বামুন পাচকদের সাথে কথা বললে রুক্মিণী বুক চাপড়ে চিৎকার করে বলেন, লাজ-শরম কি পোড়ারমুখী সব ধুয়ে খেয়েছে? মনে তো হয়, কয়েক দিন পরে বাজারে গিয়ে নাচবে।

যেদিন থেকে উকিল সাহেব নির্মলার হাতে টাকা-পয়সা দেওয়া শুরু করেছেন, সেদিন থেকে রুক্মিণীর কটুকাটব্য আরও বেড়েছে। ছেলেদের কিছুক্ষণ পরপর পয়সা চাই। যত দিন নিজে গৃহকর্তী ছিলেন, তখন ছেলেদের তিনি ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখতেন। এখন সোজা নির্মলার কাছে পাঠিয়ে দেন। বাচ্চাদের সারাদিন খাই-খাই স্বভাব নির্মলার ভালো লাগে না। তাই কখনো কখনো পয়সা দিতে সে অস্বীকার করে। মনে হয়, রুক্মিণী এমনই সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকেন। একমাত্র সতীনের ছেলে বলেই যে নির্মলা বাচ্চাদের টাকা দেয়নি, এ কথা তিনি দশমুখে বলতে থাকেন।

চাওয়ামাত্র টাকা দিলেও সমস্যা। দেবীজি তখন ভিন্ন জিগির তোলেন—”এর কী? সতিনের ছেলে মরলেই বা কী? বাঁচলেই বা কী? এর কী আসে-যায়? আপন মা নয় তো যে বাচ্চাদের বুঝিয়ে বলবে যে, মিষ্টি খাওয়া ভালো না; বাইরের জিনিস খেতে হয় না। একটা কিছু হয়ে গেলে আমাকেই তো ভুগতে হবে, ওর কী?”

এত দূর পর্যন্ত নির্মলা সম্ভবত সয়ে নিত; কিন্তু দেবীজি গোয়েন্দা পুলিশের মতো নির্মলার সকল কাজে নজর রাখতে শুরু করেছেন। নির্মলা ছাদের ওপর দাঁড়ালে দেবীজি ভাবেন, সে হয়তো পরপুরুষের দিকে তাকিয়ে আছে। বামুন ঠাকুরের সাথে কথা বললে ভাবেন, নিশ্চয় আমার নামে বদনাম করছে। বাজার থেকে কিছু আনতে বললে ভাবেন, সেটা নিশ্চয় খুব দামি কিছু হবে। নির্মলার চিঠিপত্র দেবীজি গোপনে পড়ার চেষ্টা করেন। লুকিয়ে লুকিয়ে ওর কথা শোনার চেষ্টা করেন। রুক্মিণীর দুধারি তলোয়ারের ভয়ে নির্মলা সব সময় আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকে।

আগের তরফের বড় ছেলে মান্সারাম নির্মলার সমবয়স্ক। আগে মান্সারাম ওর কাছে আসতে সংকোচ করত, এখন সে-ও মাঝেমধ্যে এসে বসে। সে নির্মলার সমবয়স্ক, তবে মানসিক বিকাশের দিক থেকে পাঁচ বছরের ছোট। হকি আর ফুটবলই তার সংসার, তার কল্পনার মুক্ত ক্ষেত্র তথা তার কামনার সবুজ শ্যামল বাগিচা। একহারা গড়নের ছিপছিপে, সুন্দর, হাস্যমুখ, লজ্জাশীল বালক, বাড়ির সাথে তার কেবল খাবারের সম্পর্ক, বাদবাকি সারাদিন কে জানে, কোথায় কোথায় সে ঘুরে বেড়ায়। নির্মলা ওর কাছে খেলাধুলার কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য নিজের চিন্তা ভুলে যায়। ভাবে, আবার যদি সেই দিন ফিরে পেত—যখন পুতুল নিয়ে খেলা করত, পুতুলের বিয়ে দিত। কদিন আর হয়েছে, আহা এই তো সেদিনের কথা!

মান্সারামের প্রতি নির্মলার নিষ্কলুষ আকর্ষণ মুনশি তোতারাম সন্দেহের চোখে দেখেন। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা হয় যে, নির্মলা নিশ্চয় মান্সারামের প্রেমে পড়েছে। সন্দেহের বশে তিনি মান্সারামকে কৌশলে বাড়ি থেকে বের করে পাঠিয়ে দেন স্কুলের হোস্টেলে। মান্সারাম ভাবে, তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পেছনে নির্মলার হাত রয়েছে। সন্দেহের ঝড়ে পড়ে বিমাতার আর কখনোই সত্যিকারের মাতা হয়ে ওঠা হয় না। কিন্তু এর পর কী হলো? সেটুকু আরও করুণ। মুন্সী প্রেমচাঁদের ‘নির্মলা’-তে ডুবে যেতে হলে পড়তে হবে এই অনবদ্য উপন্যাসটি।

আরও পড়ুন- প্রশংসিত : নবীজী (সা)-এর জীবনীভিত্তিক আধুনিক উপন্যাস

নির্মলা সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন 

রিয়াজ মাহমুদ এর বই সমূহ

মুন্সী প্রেমচন্দের অন্যান্য বই দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading