অভূতপূর্ব হবেন, না থাকবেন লোকচক্ষুর আড়ালেই? সিদ্ধান্ত আপনার

পার্পল কাউ

ভাষার সৃষ্টি আগে, তারপর তার ব্যাকরণ। ব্যাকরণ বড়জোর তাকে বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু শৃঙ্খল পরাতে পারে না। আর ঠিক সেরকমই ব্যবসা কিংবা তার সাফল্য-ব্যর্থতাও কখনো গৎবাঁধা বিধি-নিয়ম মেনে হয় না। মানুষ তার প্রয়োজনেই ব্যবসায় নানান কৌশল অবলম্বন করে এসেছে প্রতিনিয়ত। তাই বলে এই কৌশলগুলোকে কোন নির্দিষ্ট নিয়মের ছকে বাঁধা যাবে না। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে গেছে ব্যবসার ধরণ-ধারণাও। মানুষের চাহিদা বেড়েছে, সে হয়েছে আরও সচেতন আর তার সাথে তৈরি হয়েছে বিশাল প্রতিযোগিতা। তবে এত এত নেতির মাঝেও নিজেকে টিকিয়ে রাখার কিছুটা উপায় বাতলে দিয়েছেন Seth Godin

লেখকের মতে আজকের দিনের বেশির ভাগ মানুষই একরাশ একঘেঁয়ে পণ্যের ভীড়ে দিশেহারা, আর তাই দ্রুতই ভুলে যেতে পারলেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। সেকারণে যেটা দরকার তা হলো, এমন এক পণ্য যেটা ক্রেতারা মনে রাখবেন এবং তা নিয়ে আলোচনা করবেন। বইয়ের শিরোনামের মতোই-যখন আপনি একটা পার্পল গরু(অনন্যসাধারণ পণ্যের আইডিয়া) দেখতে পাবেন, আপনি চাইলেও এটাকে ভুলতে পারবেন না কখনো। আর তাই পণ্য আসলে গরুর মতোই-সেগুলো হয় অভূতপূর্ব অথবা অতি সাধারণ (বা অদৃশ্য) আর কেইবা একটা অতি সাধারণ, এক কথায় অদৃশ্য পণ্য কিনতে যাবে?

আজকালকার দিনে একটা পণ্য অথবা একটা আইডিয়া সফল হয় যদি ক্রেতারা এটা নিয়ে কথাবার্তা বলেন বা তাদের বন্ধু বান্ধব আর পরিবারের লোকজনের সাথে এটা নিয়ে আলোচনা করেন, আর আদতে সেটাই পণ্যটাকে পরিচিতি দেয়। অনেকটা তারকাদের মতোই। আলোচনায় আসতে অস্বাভাবিক কিছু ঘটনার জন্ম দেন তারা। এই গসিপটাই তাদের ব্র্যান্ডিং এর কাজটা ঠিকই করে দিচ্ছে, হোক সেটা মন্দ কিছু, কিন্তু এমনকিছু, যা আপনাকে অবাক করবেই। সত্যি বলতে এই কনসেপ্টটা হরহামেশাই আমাদের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। এক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতার কথাও মনে পড়ে।

আমার মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায়, তখন ন্যুডুলস বলতে কোকোলা জানত সবাই। তো, সে সময় একদিন কারো বাসায় খেয়ে কিংবা প্রতিবেশীদের মুখে শুনে ম্যাগি কেনা হয় আমাদের। আনকোরা স্বাদটাও ভাল লাগল বেশ। আর এরপর থেকে ধীরে ধীরে কোকোলার হারিয়ে যাওয়া এবং ম্যাগি নুডলস এর রাজত্ব সবটাই দেখলাম। কিংবা ধরুন, কয়েক বছর আগে আমার ভাই জাফর ইকবাল স্যারের একটা বই কিনেছিল-নাম আমার বন্ধু রাশেদ। এই বইয়ের কথা তখনো কেউ শুনিনি, এমনকি ওই বইমেলায় এটা কিনতেও চাই নি। তারপরেও কেন কেনা হল ? এর কারণ তার খুব শ্রদ্ধেয় এক বড় ভাই এটার ব্যাপারে রেকমেন্ড করেছিলেন। আর তার কথামতো বইটা কিনে পড়লাম আমরা আর অদ্ভুত ভালোও লেগেছিলো। আমি অন্যদেরও এটা কেনার ব্যাপারে বলেছিলাম, অবশ্যই আরও ভূয়সী প্রশংসা করে, ফলে তারাও কিনে পড়েছিলো। মজার ব্যাপার, কয়েক বছরের মাথায় এর উপর একটা চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়, বেশ জনপ্রিয়তাও পায়।

আবার ফিরে আসি পার্পল কাউ বইটা প্রসঙ্গে। লেখক বিশ্বাস করেন, পণ্য প্রস্তুতকারকগণ এখন আর সাফল্যের সাথে ক্রেতাদের তাদের পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারছেন না সনাতন মিডিয়া মার্কেটিং কৌশল অবলম্বন করে। তিনি বলতে চেয়েছেন, বেশির ভাগ ক্রেতাই তাদের যা আছে তাই নিয়েই সন্তুষ্ট, বিজ্ঞাপণ পছন্দ করেন না বললেই চলে। ফলে তারা প্রায় সবক্ষেত্রেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিজ্ঞাপণগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন সেটা যে মিডিয়াতেই হোক না কেন-টিভি, রেডিও কিংবা ম্যাগাজিন। বছর দশক আগেও পণ্যের বিজ্ঞাপণের কার্যকরী একটা পদ্ধতি ছিলো- টেলিভিশন বিজ্ঞাপণ, এমনকি ভালো মানের লাভজনক পণ্যের গায়ে লেখা থাকতো ‘টেলিভিশনে যেমনটা দেখেছেন’। কারণ সে সময়টাতে টেলিভিশন ক্রেতাদের কাছে পণ্য বাজারজাতকরণের এবং উৎপাদনের পদ্ধতিটাই বদলে দিয়েছিলো বলতে গেলে। কিন্তু ধীরে ধীরে টেলিভিশনের প্রভাবও রেডিও, সংবাদপত্র কিংবা ম্যাগাজিনের সাথে সাথে রংচটা হতে থাকে।

Purple Cow: Transform Your Business by Being Remarkable (Paperback) by Seth Godin

অরিজিনাল পেপারব্যাকঃ BUY NOW

বাংলা অনুবাদঃ  BUY NOW

লেখকের বিশ্বাস আপনি আজকের দিনে শুধু ঐসব লোকের কাছেই আপনার পণ্য বিকোতে পারবেন, যারা আসলেই কিছু খুঁজছে তার সমস্যা সমাধানের জন্য। তার মানে পণ্যের বিজ্ঞাপণটা পৌঁছতে হবে নির্ধারিত কিছু সঠিক মানুষের কাছে (অর্থাৎ বিশাল বাজার হওয়া যাবে না),সঠিক উপায়ে এবং প্রাসঙ্গিক কিছু পণ্য নিয়ে। আর অ্যাড গুলোও যেতে হবে ঐসব মানুষের কাছেই যাদের আসলেই পণ্যটার প্রয়োজন। সবার জন্য বিজ্ঞাপন দিলে তো সমস্যা, কারণ- সবাই তো ঐ একই জিনিসটার প্রয়োজন অনুভব করছে না। তার মানে, এক কথায় প্রচারণার বিশাল একটা অংশ জলে যাচ্ছে, কারণ- আপনি এমন মানুষকে টার্গেট করেছেন, যে ওই জিনিসটার প্রতি কোনরকম আগ্রহই বোধ করছে না, সেক্ষেত্রে কেনার প্রশ্নটাও আসছে না ।

সবমিলিয়ে এ বইয়ের সারমর্ম অনেকটা আমাদের এরই মধ্যে জানা, অর্থাৎ মার্কেটিং কৌশলগুলো এখন আর দশ বছর আগের মতো কাজ করে না। মার্কেটিং আর নিশ্চয়তা দিতে পারে না যে আপনার পণ্যটা দৃষ্টিগ্রাহ্য হবেই। আর মার্কেটিং এর সাধারণ ধারণাগুলোও এখন আর পাওয়ার হাউজ হিসেবে কাজ করে না। এটা শুধু প্রিন্ট আর ডিজিটালের পার্থক্য না; এটা অসাধারণ কিছু হয়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য হওয়া আর অদৃশ্য থেকে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য।

আবার সেই প্রথম কথায় ফিরে আসি। মার্কেটিংয়ের কৌশলগুলোকে নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা যায় না। বইটিতে তাই নির্দেশনার কিছুটা অভাব আছে। লেখক নিজেও সেই একই কথা বলেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন-কোন ‘সঠিক’ পদ্ধতি বা ‘সহজ তরিকা’ নেই আসলে। যদি থাকতোই, আমরা সবাই সফল হতাম। তবে হ্যাঁ, এটা আবার লটারির মতো অনিশ্চিতও না, সফল হবার জন্য অবশ্যই কাজ করে যেতে পারি। তার প্রধান যুক্তি- মানুষ এত পণ্যের ভীড়ে, এত অপশনের ভীড়ে, এত এত বিজ্ঞাপণের যন্ত্রণায় হারিয়ে গেছে। যদি তোমার কোম্পানি অন্যরকম কিছু না হয়, আসলেই তুমি হারিয়ে যাবে। সবার ক্ষেত্রেই ঘটে এটা। আমি দারুণ একটা পণ্য বাজারে ছাড়লাম, কিন্তু এটা সর্বপ্রথম না, সবচেয়ে বড় না, সবচেয়ে সস্তাও না, না আবার সবচেয়ে দামি, সবচেয়ে ব্যবহারবান্ধব না, সবচেয়ে কঠিন কিছুও না, ক্রেজিও কিছু না, প্যাকেজিংটাও সবচেয়ে ড্যাশিং না, সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দনও কিছু না, সবচেয়ে দ্রুতগতির কিছু না কিংবা সবচেয়ে ধীরইবা কী! আর সেকারণেই যত ভালো পণ্যই হোক, এটা লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাবেই। আমার পণ্যটা ভালো-কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না। আমি আর সব ফটোগ্রাফারের মতোই একজন। আর তাই আমি গুগলের ডাস্টবিনেই পড়ে থাকবো। এতে মানুষকে দোষ দেয়ারও কিছু নেই। তারা তাদের সারাটি দিন একটি সাধারন মিডল ক্লাস পণ্য খোঁজার পেছনে ব্যয় করবে না। তারা চায় কেউ তাদের বলুক, এই পণ্যটাই বেস্ট, এটার দাম সবচেয়ে কম…। আমরা নিজেরাও কি তাদের দলে নেই? তবে এটাও ঠিক, সবচেয়ে দ্রুত জানাটাই সেরা সমাধান না, কিন্তু এটা বাঁচিয়ে দেয় অনেকটা সময় ও শ্রম। আর এটাই তো চায় মানুষ!

সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে অংশটি তা হলো, বিভিন্ন সফল কোম্পানির উদাহরণগুলো, তারা কেন সফল হল, কীভাবে সাফল্য ধরে রেখেছিলো, আর কেনইবা কেউ কেউ ঝরে গেল। তিনি পণ্যকে মার্কেটিং ধারণা থেকে আলাদা করে ফেলেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, মার্কেটিং প্রয়োজন, কিন্তু পণ্য দরকার তারও চেয়ে বেশি। আর এটা তো ঠিকই! কেইবা ভালো বিজ্ঞাপণের ধোঁকায় খারাপ পণ্য কিনতে চাইবে?

মোট কথা, তুমি যদি নিজে উদ্যোক্তা হও কিংবা কোম্পানির প্রভাবশালী কেউ হয়ে থাকো, বইটা তোমার পড়া উচিত। যদিও কিছুটা হতাশ লাগবে। কারণ- এখানে ‘পার্পল কাউ’ হবার কোন সহজ ‘এসো নিজে করি’ টাইপ উপায় বাতলে দেওয়া নেই, কিন্তু এটাই সম্ভবত হবে জীবনে পাওয়া সেরা উপদেশসমগ্র।

প্রিয় উক্তিসমূহ- “Are you obsessed or just making a living?”

“Let them see that every single industry is feeling the same pain you are.”

“Well, if you don’t have time to do it right, what makes you think you’ll have time to do it over?”

“Cheap is an easy way out of the battle for the Purple Cow.”

“The sad truth, though, is that it may be quite a while before the {cell phone} market generates the attention it did five years ago.”

“So the question you need to ask yourself is this: If only 6 percent of the most valuable brands used the now-obsolete strategy of constantly reminding us about their sort-of-ordinary product, why do you believe this strategy will work for you?”

“Will any business that targets a dying business succeed? Of course not. But…targeting a thriving niche in a slow-moving industry can work-if you’re prepared to invest what it takes to be remarkable.”

“No one will argue with you if you claim that Wal-Mart is the biggest, most profitable, scariest retailer on earth. So, when Wal-Mart was frantically trying to catch up with Amazon.com, what did they have plastered on a banner in their offices? “You can’t out-Amazon Amazon.”

“You have to go where the competition is not. The farther the better.”

যদিও বইটা সুখপাঠ্য কিন্তু একটা জিনিসের অভাব কিন্তু রয়েই যায়। এটায় কোন সিক্রেট ফর্মুলা বলা নেই আজকের দিনের মার্কেটিং-এর জন্য, কিংবা কীভাবে একটা সফল ‘পার্পল কাউ’ তৈরি করা যেতে পারে। তিনি অনেকগুলো বাস্তব উদাহরণ টেনেছেন কিভাবে অনেক বড় বড় কোম্পানি পার্পল কাউ নীতি অনুসরণ করে সাফল্যের চূড়ায় উঠেছে, আর কেনইবা অন্যরা নতুন পার্পল কাউ খুঁজে না পেয়ে অদৃশ্য হয়ে হারিয়ে গিয়েছে। মোদ্দা কথা, যেসব কোম্পানি লাভজনক ব্যবসা চালিয়ে যেতে চান, তাদের অবশ্যই উদ্ভাবনক্ষম হতে হবে, হতে হবে দৃশ্যমাণ, সবার চায়ের কাপের আলোচনার বস্তু-আর শুধু সেটা আজকের জন্য না, ভবিষ্যত দিনগুলোতেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তা সত্ত্বেও যে জিনিসগুলো তিনি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বেশ ভালো ভাবে-

১। অসাধারণ হবার জন্য সাহস প্রয়োজন। কারণ- লোকচক্ষুর আড়ালের কাউকে কেউ চায় না। কিন্তু লক্ষ্য যদি হয় শুধু অনুসরণ করা, নিরাপদ দূরত্বে থাকা, না দাঁড়ানোর মানসিকতা, তাহলে ব্যর্থতা সুনিশ্চিত। বইয়ের শ্লোগানও অনেকটাই তাই-‘safe is risky’ and ‘very good is bad’. নতুন দিনের চ্যালেঞ্জটা আসলে কিভাবে ভিন্নধর্মী হওয়া যায়, কিভাবেইবা অসাধারণ হওয়া যায়, তার। কিছু ঝুঁকিপূর্ণ কাজও করতে হবে , সীমার প্রান্তে গিয়ে দেখতে হবে, সবসময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখলে চলবে না, নিজের লিমিটে পোঁছে যেতে হবে, যদি সে সুযোগ থাকে

২। মার্কেটিং শুধু মার্কেট ব্যবস্থাপনাকেই বোঝায় না। “Marketing is the act of incenting the product, the effort of developing it. The craft of producing it. The art of pricing it. The technique of selling it.”

৩। ক্রেতাদের কাছ থেকেই শিখতে হবে, তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান দিতে হবে, তাদের মাথাব্যথার উপশম তোমাকেই করতে হবে। তদের কী প্রয়োজন, শুধু সেটা বের করলেই হবে না, তারা আসলে কী চায় জানতে হবে, তাদের কল্পনার জিনিসটা কী এবং কীসে তারা খুশি হবে-এমন কিছুই কর, যাতে বিশ্ববাসী সেটাকে নিয়ে পত্রিকায় ছাপে, সাধারণকে করে বিস্মিত আর সবচেয়ে বড় কথা চায়ের কাপে ঝড় তোলে।

সবশেষে বলা চলে, নিজের সুদূরপ্রসারী ভাবনা আর কল্পনার মিশেলে তৈরি করতে হবে এমন কিছু, যার জন্য বসে আছে তোমার ক্রেতারা। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু উপস্থাপন করতে হবে, যা সবাই মনে রাখবে। হাজার হাজার পণ্যের ভিড়ে যেন তোমারটায় এসেই চোখ আটকে যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে; আর তার কৌশলগুলো কিন্তু খুঁজে নিতে হবে নিজেকেই।

ব্র্যান্ডিং, মার্কেটিং ও সেলিং বিষয়ক বইসমগ্র পেতে ক্লিক করুন !

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading