শর্টফিল্ম নির্মাণের কলাকৌশল

শর্টফিল্ম-নির্মাণের-কলাকৌশল

চলচ্চিত্র এমনই একটি শিল্পমাধ্যম যা অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের বহুকিছু ধারণ করতে পারে। চলচ্চিত্র এক প্রকারের দৃশ্যমান বিনোদন মাধ্যম। চলমান চিত্র বা ‘মোশন পিকচার’ থেকে চলচ্চিত্র শব্দটি এসেছে। চলচ্চিত্রের ধারণা এসেছে ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে। বাংলায় চলচ্চিত্রের প্রতিশব্দ হিসেবে ছায়াছবি, সিনেমা, মুভি বা ফিল্ম শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়। চলচ্চিত্রের মতো অন্য কোনো শিল্পমাধ্যম সাধারণের সাথে এতোটা যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম নয়।

শর্টফিল্মের ধারণাটিকে অনেকে নতুন ধারণা বলে মনে করেন। মূলত তা নয়। চলচ্চিত্রের ধারাই ছিল শর্টফিল্মের ধারা। শর্ট চলমান চিত্র এবং সবাক ও নির্বাক শর্টফিল্ম দিয়েই বিশ^ চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু। ইতিহাস থেকে জানা যায়, অ্যাডোয়ার্ড মাইব্রিজ প্রথম নির্বাক শর্ট চলমান চিত্র (প্রায় ৪ মিনিট) Female Subjects (1884) ধারণ করেন। তিনি বিভিন্ন অ্যাংগেল থেকে নারীর অনেকগুলো চিত্র তুলে সেগুলো এডিটিং করে জোড়া দেন। উইলিয়াম ডিকশন প্রথম সবাক মিউজিক্যাল শর্ট চলমান চিত্র (প্রায় ৩ মিনিট) The Dickson Experimental Sound Film (পিয়ানোবাদক ও ডান্সার, ১৮৯৫/৯৬) ধারণ করেন। শর্টফিল্ম বলতে যা বোঝায় তা আমরা প্রথম পাই জর্জ মেলিয়ের নিকট থেকে।

shortfilm nirmaner kola-koushol
BUY NOW

তিনি প্রথম নির্মাণ করেন The Haunted Castle (1896) নামের নির্বাক হরর শর্টফিল্মটি (৩ মিনিট ২৫ সেকেন্ড)। প্রথম কাহিনি শর্টফিল্ম Cinderella (1899) নির্মাণ করেন জর্জ মেলিয়ে। এটি বিশ্বের প্রথম ফ্যান্টাসি, সায়েন্স ফিকশন, জাদু এবং সাহিত্যপ্রধান স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ওয়ার্নার ব্রাদার্স নির্মাণ করেন প্রথম সবাক শর্টফিল্ম The Jazz Singer (1927)। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের হাত ধরে বাংলাদেশে শর্টফিল্ম নির্মাণ শুরু হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে (১৯৭১) কেন্দ্র করে নির্মাণ করেন চারটি শর্ট তথ্যচলচ্চিত্র। এগুলোর মধ্যে Stop Genocide (1971), A State You Born (1971) এবং Liberation Fighters The Juj Singer (1971) অন্যতম।

সাধারণত এক মিনিট থেকে সর্বোচ্চ চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে শর্টফিল্ম। চিত্রনাট্য মাথায় রেখে পরিচালকই যাবতীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। পরিচালকের সাথে দু-চারজন সহযোগী ও অভিনয় শিল্পী নিয়ে খুব সহজে ফিল্ম নির্মাণ করা যায়। শর্টফিল্ম নির্মাণের কলাকৌশল জানা আবশ্যকীয়। যেমন- দল গঠন, চিত্রনাট্য রচনা, শিল্পনির্দেশনা, অভিনয় শিল্পী নির্বাচন, কাহিনি অনুযায়ী ক্যামেরাম্যান, লাইটম্যান প্রভৃতি বিষয়ে পরিস্কার ধারণা থাকতে হয়। এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘ ও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে হাসান রাউফুনের ‘শর্টফিল্ম নির্মাণের কলাকৌশল’ বইটিতে। চিত্রনাট্যের গুণ ও কাহিনি বা দৃশ্য কীভাবে সাজাতে হয় তা নিয়ে তিনি লিখেছেন যত্নসহকারে।

চিত্রনাট্য তৈরির ক্ষেত্রে দেখা যায় বানান ভুলের ছড়াছড়ি। এজন্য বাংলা বানানে ভুল এড়াতে লেখক মোটামুটি ফিল্ম নির্মাণের জন্য প্রমিত বানানের কিছু নিয়ম তুলে ধরেন। শুদ্ধ উচ্চারণ শেখার অধ্যায়টিও আলোচিত হয়েছে যা একজন অভিনয় শিল্পীর জন্য খুবই জরুরি। সংক্ষিপ্ত এবং সহজ ভাষায় চিত্রনাট্যের কাঠামো অনুযায়ী নাটকের পঞ্চাঙ্ক কীভাবে লিখতে হয় চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। শর্টফিল্মের নমুনা কীভাবে ঢেলে সাজাতে হয় তাও অত্যন্ত গুছিয়ে আলাদা দৃশ্য বা সংলাপের বর্ণনা দিয়েছেন সময়ের জনপ্রিয় লেখক হাসান রাউফুন। সংক্ষিপ্ত ডায়লগের মাধ্যমে ও মূল বিষয়ে গল্পের শুরু, চূড়ান্ত ও কত সহজে সমাপ্তি টানা যায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বইটির সূচিপত্রে রয়েছে-

প্রথম অধ্যায় : শর্টফিল্মতত্ত্ব

শর্টফিল্মের ইতিহাস, শর্টফিল্ম উৎসব ও আন্দোলন, শর্টফিল্মের সংজ্ঞার্থ ও বৈশিষ্ট্য, শর্টফিল্মের পরিবার, শর্টফিল্মের উপাদান, চিত্রনাট্য, শিল্পনির্দেশনা, অভিনয়, কম্পোজিশন (ইমেজ, রং, ধারাবাহিকতা, সাজসজ্জা, ড্রেস), আলোকসম্পাত, ডিজিটাল পদ্ধতি, সম্পাদনা, শব্দ ও সংগীত, শর্টফিল্মের অভিযোজন, কবিতা ও শর্টফিল্ম, নাটক ও শর্টফিল্ম, উপন্যাস ও শর্টফিল্ম, গল্প ও শর্টফিল্ম, অণুগল্প ও শর্টফিল্ম, খুদেগল্প ও শর্টফিল্ম, প্রবন্ধ ও শর্টফিল্ম।

দ্বিতীয় অধ্যায় : শর্টফিল্ম নির্মাণের কলাকৌশল
ফিকশন/কাহিনি শর্টফিল্ম, ডকু/প্রামাণ্য শর্টফিল্ম

তৃতীয় অধ্যায় : শর্টফিল্মের নমুনা

ফিকশন/কাহিনি শর্টফিল্ম, ডকু/প্রামাণ্য শর্টফিল্ম

একজন চিত্রপরিচালক কেবল অ্যাক্টর নয়, চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত সকলকেই হ্যান্ডলিং করার ক্ষমতা রাখেন। কাহিনির প্রয়োজনে যেসব চরিত্র উপস্থাপন করা হয় সেসব চরিত্রকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নেয়াকেই চরিত্র পরিচালনা বা Actor Handling বলে। কীভাবে চরিত্র পরিচালনা করা হয় তা জানার আগে চিত্রপরিচালক কে বা তার কী কী গুণ থাকা দরকার তা জানা দরকার। চরিত্র হলো সম্পূর্ণ দোষেগুণে জীবন বা মানুষ। কিন্তু চলচ্চিত্রে চরিত্র শুধু মানুষ না হয়ে যেকোনো বিষয়কেই চরিত্র করা যেতে পারে। কাহিনির প্রয়োজনে একটি পশু যেমন চরিত্র হতে পারে তেমনি একজন মানুষও চরিত্র হিসেবে পরিগণিত হতে পারে।

একজন পরিচালক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য একজন প্রযোজক ঠিক করেন। অথবা নিজে বা চিত্রনাট্যকারকে দিয়ে একটি চিত্রনাট্য তৈরি করে প্রযোজককে তা দেখিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রযোজককে চলচ্চিত্রটি নির্মাণে রাজি করান। এরপর চিত্রনাট্যকারের সঙ্গে কয়েকবার সিটিং দেন পরিচালক, প্রযোজক, শিল্পনিদের্শককে নিয়ে। প্রয়োজনীয় কাহিনি পরিবর্তন, সংলাপ তৈরি বা পুনঃতৈরি করেন। একটি চলচ্চিত্রের কাহিনি চিত্র ও সংলাপের উপর নির্ভরশীল তাই যথাসম্ভব চলচ্চিত্রের সংলাপ অত্যন্ত আকর্ষণীয় করার তাগিদ অনুভব করা হয়। সাধারণত সংলাপ সমগ্র কাহিনিকে শেষ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। দৃশ্যের দিকে খেয়াল করে যথাযথভাবে সংলাপ (সংলাপ হবে সহজ, সরল, সুন্দর ও সংক্ষিপ্ত) তৈরি করতে হয়।

একটি চলচ্চিত্রের সৃষ্টির গোড়াতে যিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন তিনি হলেন প্রযোজক। প্রাথমিক স্তরে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তাতে প্রযোজকও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। প্রযোজক হলেন যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যবাহিনীর সেনাপতির মতো। তিনি বিশাল সৈন্যবাহিনীকে অর্থাৎ চিত্রকর্মীকে পরিচালনা করেন। কাহিনি নির্বাচন, শিল্পী নির্বাচন, পরিচালক নির্বাচন ইত্যাদি কাজগুলো তিনি করেন। অভিজ্ঞতা, দূরদৃষ্টি, চলচ্চিত্র সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা তার প্রয়োজন।

অথচ দুঃখের বিষয় আমাদের দেশের প্রযোজকদের উপরিউক্ত একটি গুণও থাকে না। তারা পরিচালকদের হাতের পুতুল মাত্র। তিনি কেবল অর্থ বিনিয়োগ করেই নিজের দায়িত্ব পালন করেন। এক্ষেত্রে পরিচালকই সর্বেসর্বা হয়ে পড়েন। চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের ক্যামেরাম্যান পরে হলেন লাইটিং ক্যামেরাম্যান। বর্তমানে সিনেমাটোগ্রাফার। এটাই তাদের শৈল্পিক গুরুত্বের স্বীকৃতি। চিত্রগ্রাহক অর্থাৎ ক্যামেরাম্যান হলেন চলচ্চিত্রের প্রাণশক্তি। যেহেতু চলচ্চিত্রের জন্ম সেলুলয়েডের বুকে, সুতরাং আলোকচিত্র শিল্পীর দায়িত্ব হলো বিভিন্ন দৃশ্যগুলো সেলুলয়েডের বুকে ধরে রাখা। বিভিন্ন শটের মাধ্যমে তিনি সমগ্র কাহিনিকে রূপান্তরিত করেন।

পরিচালকের ডানহাত রূপে তিনি কাজ করেন। একজন অভিজ্ঞ পরিচালক কোনোদিনই আলোকচিত্র শিল্পীর কথা ভুলে যান না। আলোকচিত্র শিল্পীকেও পরিচালকের কথা ভুলে গেলে চলবে না। আলোকচিত্র শিল্পীকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে পরিচালক কী চান আর কী চান না। সেটে তিনি প্রথম আসেন আর সেট পরিত্যাগ করেন সকলের শেষে।
পুরো মানুষটি চলচ্চিত্র হলে তার কঙ্কালটা হলো চিত্রনাট্য। চিত্রের লিখিত রূপ অর্থাৎ পা-ুলিপি হলো চিত্রনাট্য। চিত্রনাট্যকে চলচ্চিত্রের মেরুদ- বলা যায়। চিত্রনাট্য একটি লিখিত শিল্পমাধ্যম। তবে এটি উপন্যাস বা গল্পের মতো নয়। ব্যাকরণগত দিক অর্থাৎ বিষয়, কারিগরি দিক, সময়, স্থান ও কাঠামো মাথায় রেখে চিত্রনাট্য রচনা করতে হয়। চিত্রনাট্য কোনো একক শিল্পমাধ্যম নয়। তবে এটি অন্য শিল্পের একটি পূর্ব-প্রস্তুতিমূলক শিল্পমাত্র। চিত্রনাট্য দৃশ্যের মাধ্যমে দেখানো হয়। কখনও সরলভাবে আবার কখনও শুটিং উপযোগী করে।
নিজস্ব প্রকাশক্ষমতা হলো একটি শিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই শিল্পটি যেভাবেই হোক তার নিজস্ব প্রকাশক্ষমতা তৈরি করে নেয়। একটি শিল্প থেকে অন্য একটি শিল্পে যেতে হলে পরিবর্জন ও পরিবর্ধন তথা অ্যাডাপটেশনের বা অভিযোজন প্রয়োজন। শিল্পের এই ক্ষমতা রয়েছে বলেই সেটি শিল্প হিসেবে পরিগণিত হয়। চলচ্চিত্র একটি চলৎ শিল্পমাধ্যম। যে চিত্র চলমান এবং চিত্রগুলো কোনো তথ্য বা কাহিনি প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে সেসব চিত্রই চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্র একটি উপযোগী বৃহৎ শিল্পমাধ্যম, যেখানে ‘আলোকচিত্র, চিত্রকলা, কাহিনি (কবিতা/নাটক/উপন্যাস/গল্প), নাচ, গান, অভিনয়, স্থাপত্য, চিত্রকল্প/ Image, দৃশ্য/Shot, সংলাপ/Dialouge, সংগীত/Music, আবহসংগীত/ Background Music/ Background Sound, প্রযুক্তি ইত্যাদি উপস্থিত রয়েছে। এগুলোর সমন্বয়েই চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র একটি শিল্পমাধ্যম।
‘শর্টফিল্ম নির্মাণের কলাকৌশল’ বইটি পড়ে শর্টফিল্ম নির্মাণ ইচ্ছুকরা উপকৃত হবেন এবং জানা, অজানা বিষয়কে নতুন করে নবায়ন করে নিতে পারবেন। বাংলা ভাষায় শর্টফিল্ম নিয়ে খুব একটা তাত্ত্বিক বই নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে হাসান রাউফুন রচিত বইটি একটি মাস্টার কপি হিসেব বিবেচ্য হতে পারে।

এই লেখকের অন্যান্য বই দেখতে ক্লিক করুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading