নিজেকে নিজে সম্মান করাই কি প্রকৃত সম্মান?

2021-10-10 নিজেকে নিজে সম্মান করাই কি প্রকৃত সম্মান

মানুষ আসলে কিসে সম্মানবোধ করে অর্থে, শিক্ষায় নাকি নানা রকম সামজিক ক্ষমতা লাভে? এটা ব্যক্তিবিশেষ নির্ভর করে। কিন্তু প্রকৃত সম্মান নিজেকে নিজে সম্মান করা। নিজেকে যে নিজে সম্মান করতে পারে না সে অন্যদেরও সম্মান করতে পারে না। আমাদের চারপাশে প্রচুর মানুষ রয়েছে যারা নানা ধরণের মানসিক সমস্যায় আছেন। এ সমস্যাগুলো কাউকে হয়তো খুলেও বলতে পারে না। কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে, স্কুল কলেজে তৈরি হয় নানা সমস্যা। সেই সমস্যাগুলোই মানসিকভাবে পীড়ন তৈরি করে। এতে করে যেমন মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয় তেমনি বাড়তে থাকে শারীরিক সমস্যাও। এ বিষয় বাংলায় তেমন কোন বইও নেই। ইংরেজি ভাষায় এ বিষয়ের বই পাওয়া যায়।

নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই অসচেতন। ফলে হীনম্মন্যতা, বিষণ্ণতা ও আত্মগ্লানিসহ নানা মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। মানসিক স্বাস্থ্য বলে যে একটি বিষয় আছে তা সম্পর্কে কতজনই বা অবগত! মানসিক সমস্যা বলতে আমরা সাধারণত পাগলই বুঝি। কিন্তু এ ধারণা সবক্ষেত্রে সঠিক নয়। মানুষের নানা বয়সে নানা রকম মানসিক জটিলতার মধ্যে পড়ে। এ বিষয়গুলো লুকিয়ে না রেখে সুচিকিৎসা নিলে জীবন হয়ে ওঠে আনন্দময়।

somman, amakei ami
BUY NOW

সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে নানা ধরনের মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারি। হয়েও থাকি। আবার স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা আমাদের ইমোশনাল হেলথ নিয়ন্ত্রণ করতে অনেক সময়ে ব্যর্থ হই। নিজেরাই জানি না, আমি নিজে কখনো নিয়ন্ত্রনহীন অথবা নিয়ন্ত্রণাধীন! খুব সাধারণভাবে বলে থাকি আমার আত্মসম্মানবোধ আছে। কিন্তু কখনো কি নিজেকে নিজে সম্মান দিয়েছি? অথবা চিন্তা করেছি যে, আমি যেমন অন্যদরকে সম্মান দিই বা অন্যদের কাছ থেকে সম্মান পাবার আশা রাখি, ঠিক তেমনি, আমার ভিতরে যে ‘আমি’ আছে সেই ‘আমি’কে সম্মান করতে হবে? অথবা সেই আমি যে সম্মান পাবার আশা রাখে আমার নিজের কাছে থেকে?

হয়তো সেভাবে চিন্তা করিনি। আত্মসম্মানবোধ বা আত্মমর্যাদাবোধ থাকা আর নিজেকে নিজে সম্মান করা এক বিষয় নয়। আমি যদি আমাকেই সম্মান না করি, তাহলে অন্য কেউ সম্মান করবে কীভাবে? মেডিক্যাল সাইন্সের অন্যতম একটি বিষয় মানসিক স্বাস্থ্য। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদেরও সমাজে রয়েছে নানা ধরণের কুসংস্কার। ফলে সঠিক জ্ঞানও পাওয়া যায় না। মাসুদ আহমেদ পাটোয়ারী এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় নিয়ে লিখেছেন এ বইটি। লেখক মাসুদ আহমেদ পাটোয়ারী লিখেছেন-‘‘আত্মপ্রত্যয়, আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদা, আত্মমর্যাদাবোধ, আত্মবিশ্বাস, আত্মমূল্যায়ন, আত্মগ্রহণযোগ্যতা, আত্মোপলব্ধি, আত্মানুভূতি, আত্মতৃপ্তি, আত্মতুষ্টি, আত্মাদর এই সবগুলো শব্দ ঘিরেই আবর্তিত সেলফ-এস্টিম।

প্রত্যেকটি শব্দের পৃথক অর্থ বিদ্যমান। যদিও খুব কাছাকাছি, কিন্তু খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়ে গেছে। সেলফ-এস্টিম (Self-Esteem) অনুশীলন করার পাশাপাশি সেলফ-এস্টিমকে একই সাথে কাজে লাগানো প্রয়োজন। সতর্কভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন সেলফ-কনফিডেন্স (Self-Confidence) আর সেলফ-এস্টিম এক বিষয় না। আর এই পার্থক্য যদি বুঝতে পারা যায়, তবে সহজ হয়ে যাবে সেলফ-এস্টিম বুঝে যাওয়া। আর ঠিক তখন থেকেই নিজের মাঝে তা ধারণ করে বলে অনুভব করবে।’’

এমনই বিশ্লেষণধর্মী এই বইটি একটি মজার বিষয় হচ্ছে যে, এটি পড়তে পড়তে মনে হবে আপনি একটি উপন্যাস পড়ছেন। লেখার মুন্সীয়ানা অনেক জটিল জটিল বিষয়কে সহজ করে দিয়েছে। আমাদের দেশে এখনো সেই অর্থে কাউন্সেলিং সিষ্টেম গড়ে ওঠেনি। ফলে এ কথা বলা যায় যে, বইটি একজন কাউন্সিলরের ভূমিকা রাখতে পারে।

এক. নিজেকে জানুন―সম্মান আসবেই, দুই. অনুভূতি জাগ্রত থাকলে সবকিছু সম্ভব, তিন. ইতিবাচক যোগ্যতাই সবকিছুর মূল নিয়ামক। এ অধ্যায় আরো আলোচিত হয়েছে ব্যর্থতার থেকে সফলতার হার, ব্যক্তি মূল্য, স্বতন্ত্র আত্মতৃপ্তি, আত্মসম্মানবোধ বনাম আত্মমগ্নতা/আত্মমুগ্ধতা, সেলফ-এস্টিম এবং বুলিং চার. মানসিক দৃঢ়তাই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ অধ্যায় আরো আলোচিত হয়েছে- সংবেদনশীল (আবেগীয়) স্বাস্থ্য এবং সেলফ-এস্টিম, প্রথমেই আমাদের জানা প্রয়োজন ইমোশনাল হেলথ কী?, সুস্থতা উন্নতির পন্থা, আবেগ এবং আবেগের প্রতিক্রিয়ার সতর্ক সচেতনতা, ইতিবাচকভাবে অনুভূতি প্রকাশ করা, প্রতিক্রিয়া দেখানোর পূর্বে চিন্তা করা, যেকোনো ধরনের মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা, শারীরিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া, অন্যদের সাথে যোগাযোগ রাখা, বিষয়ের উদ্দেশ্য এবং অর্থ অনুধাবন, ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা, ধর্মীয় স্বাস্থ্য এবং আত্মসম্মান।

পাঁচ. রুচি ও শালীনতাবোধ ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। এ অধ্যায় আরো আলোচিত হয়েছে-সেলফ-এস্টিম অনুশীলন, সেলফ-এস্টিম গড়ার সহায়ক আলোচনা, আমার আমিকে উপস্থাপন, নিজেকে প্রকাশ এবং উপস্থাপন, কথা বলার বাচনভঙ্গি, শারীরিক ভাষা, খেয়াল রাখুন, চেষ্টা করুন, পোশাক, অন্যের সামনে মুখোমুখি আচরণ, কথা বলার সময়, কখন কোথা থেকে শুরু হয় সেলফ-এস্টিমের অনুসরণ?, মুখোশের আড়াল পরিহার করুন। ছয়. ইসলামী জীবনে রয়েছে অনাবিল শান্তি, সাত. নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে এবং আট. অসম্ভবের পেছনে না ছোটাই শ্রেয়। আট পর্বে বিভক্ত এ বইটির একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব চার। আত্মানুসন্ধান ও মানসিক শক্তির উদ্ভোধনে এ বইটি তুলনাহীন।

পিতা-মাতা সন্তানের মাঝে আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। যেমন―Competent―এই কাজটি তুমি চমৎকারভাবে করেছ, Smart―তোমার পরিকল্পনাটি সত্যিই দুর্দান্ত, Effective―যেকোনো কাজের ব্যাপারে তুমি আসলেই দক্ষ, Valuable―আমি আসলেই খুব গর্বিত যে তুমি আমার সন্তান এবং আমি তোমার মতো সন্তানের বাবা/মা।

অন্যদিকে সন্তানের মনোবল ভেঙে যেতে পারে এমন কিছুও অনেক সময় হয়তো বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বলতে পারেন। কিন্তু এই জাতীয় নেতিবাচক কথা থেকে সাবধান থাকা উচিত। যেমন― Incompetent―কোনো কাজই তুমি সঠিকভাবে করতে পারো না, Incompetent―তুমি আসলেই কিছু পারো না, Helpless―আমি জানতাম তুমি এ কাজ পারবে না/তোমার দ্বারা এ কাজ সম্ভব নয়, Worthless―এই কাজে তুমি আসলেই দক্ষ না।

এই অল্প কিছু কথার মাঝেই লুকিয়ে আছে আপনার নিজের আত্মসম্মান এবং একই সাথে আপনার সন্তানের মাঝে আত্মসম্মান তথা সেলফ-এস্টিম গড়ে তোলার কিছু উপায়। পিতা-মাতার অনুমোদনের প্রয়োজন এবং গ্রহণযোগ্যতা শিশু-কিশোরের মনোবল তৈরিতে এত শক্তিশালী যে তারা খুব চেষ্টা করে পিতা-মাতা তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু পেতে। প্রত্যাশা করে পিতা-মাতা তাদেরকে সব সময় উৎসাহ দেবে। শিশু-কিশোরের মাঝে সেলফ-এস্টিম গড়ার কিছু উপায় (Ways To Help Children Develop High Self-Esteem)। সন্তানের মাঝে উচ্চ আত্মসম্মানবোধ তৈরি করে দেওয়াই হলো পিতা-মাতার পক্ষ থেকে সন্তানের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহারগুলোর মাঝে একটি। সাধারণভাবে কিছু বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখা যেতে পারে―
প্রথম থেকেই সন্তানের সাথে একটি দৃঢ় এবং বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এই সম্পর্ক তৈরি করতে হবে একেবারে সন্তানের শৈশব থেকেই, যখন পৃথিবী বলতে বোঝে তার বাবা আর মাকে।
মানুষের বিভিন্ন বয়সের মনমানসিকতার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য কিছুটা শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে, যদি সাধারণ বিষয়গুলো সম্পর্কে না জেনে থাকেন। এতে করে সন্তানের বিভিন্ন বয়সে তার সাথে তাল মিলিয়ে তাকে সাড়া দিতে পারবেন। বুঝতে পারবেন সন্তান আসলে কী চায়।
সন্তানের দৈহিক বৃদ্ধি গঠনে যেমন সতর্ক, খেয়াল করে দেখুন তার মানসিক স্বাস্থ্য, আবেগীয় স্বাস্থ্য, ধর্মীয় স্বাস্থ্য বা আর্থিক স্বাস্থ্য সঠিকভাবে একইভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না।
সন্তানের সাথে বেশ কিছু সময় কাটানোর চেষ্টা করেন। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে। অনেক বিষয় থাকে যে আপনি সন্তানের সাথে একটা চমৎকার সম্পর্কে পূর্বে থেকে আবদ্ধ না হলে সন্তান আপনাকে বলবে না। হয়তো বা লজ্জায়, সংকোচে, ভয়ে অথবা অন্য কোনো কারণে। এতে করে সমস্যা শুধু বৃদ্ধিই পাবে। তাই পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নিন।
সন্তানের কথা শোনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিন।
পরিবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিন। তার পরামর্শ যদি ভালো হয় তাহলে মেনে নিন। এতে সন্তান জানতে পারবে তাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফলে তার নিজের প্রতি সম্মানবোধ গড়ে উঠবে।

এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ড. মাসুম আহমেদ পাটওয়ারী রচনা করেছেন ‘সম্মান আমাকেই আমি’ শিরোনামের গ্রন্থটি। নিজেকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই যে মানসিক উৎকর্ষতা ঘটানো যায় সেটাই তিনি যৌক্তিক, তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিকভাবে তুলে ধরেছেন। আত্মমর্যাদা, আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মসম্মানবোধ নিয়ে তিনি চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন। আত্ম-উন্নয়ন ও আত্ম-উপলব্ধির জন্য এ বইটি পাঠকের প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে জাগিয়ে তুলবে- এ আমার বিশ্বাস।

এই লেখকের অন্যান্য বই দেখতে ক্লিক করুন 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading