ভিন্নধর্মী ভাষা-গবেষণার বই ‘স্থানিক বাকরীতি ও ভাষা-বৈচিত্র্য’

ভিন্নধর্মী-ভাষা-গবেষণার-বই

এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যা কিছু আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে বলা যায় ভাষাই শ্রেষ্ঠ। কেননা ভাষাই মানুষের সৃজনশীলতা ও আবিষ্কারের পথকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। পৃথিবীতে হাজার হাজার ভাষা আছে। একই সাথে হাজার হাজার ভাষা বিলুপ্ত হয়েও গেছে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এ ভাষার রয়েছে একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব। কেননা বাংলাই একমাত্র ভাষা যে ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে, উৎসর্গ করতে হয়েছে মানুষের প্রাণ। পৃথিবীর নানা প্রান্তে রয়েছে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ।

চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা ভাষার আদি ও প্রাচীন রূপ বলা হয়। যদিও হিন্দিভাষী, মৈথিলীভাষী, উড়িয়াভাষী ও অসমীয়াভাষীরা চর্যার ভাষাকে তাদের আদি ভাষার নিদর্শন বলে দাবি করেন; কিন্তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ড. সুকুমার সেন প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, চর্যার ভাষা মূলত বাংলা ভাষারই প্রাচীনতম নিদর্শন। কেননা ভাষা বিচারের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করলে চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র মতে, বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে ৬ষ্ঠ শতকে। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবার থেকে চর্যাগীতিকা উদ্ধার করেছিলেন বলেই আমরা আদি বাংলা ভাষার স্বরূপ জানতে পেরেছি।

বাংলা ভাষা পৃথিবীতে এখন আর অপাঙ্ক্তেয় কোনো ভাষা নয়। বাঙালির ভাষা বহু বিভক্ত প্রাচীন বঙাল ভাষা। ইংরেজি, চীনা, জাপানি, স্প্যানিশ, রুশ এবং জার্মান ভাষার পর বাংলা ভাষার স্থান। জনসংখ্যার বিচারে বাংলা ভাষা আজ পৃথিবীর ৩০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা। রবীন্দ্রনাথের আমলে এ সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৭ কোটি। দুই বাংলার বাইরে মেঘালয়, ত্রিপুরা, মালভূম, সিংহভূম জেলা, আন্দামানের অংশ বিশেষ, পূর্ব পুর্নিয়াসহ মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে বাংলা ভাষা প্রচলিত আছে।

স্থানিক বাকরীতি ও ভাষাবৈচিত্র্য
BUY NOW

ড. দীনেশ চন্দ্র সেন সঙ্কলিত ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’র মাধ্যমে এ অঞ্চলের লোকভাষা দুই বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী অদৃত ও পরিচিত হয়। কারণ বহুল প্রশংসিত ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’য় যে-সকল উপাখ্যান সঙ্কলিত হয়েছে তার বেশিরভাগই কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা অঞ্চল থেকে সংগৃহীত। এ দুই জনপদের স্বল্পশিক্ষিত কিংবা স্বশিক্ষিত লোককবিদের রচিত পালা, গীতিকা ও উপাখ্যানে মাটি-সংলগ্ন প্রান্তিক মানুষের নিত্য ব্যবহার্য শব্দাবলী অসাধারণ প্রাসঙ্গিকতায় উঠে এসেছে। ফলে তাদের রচনায় এ অঞ্চলের লোকভাষা হয়ে উঠেছে প্রাঞ্জল ও বাক্সময়। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ এবং ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’র ছত্রে-ছত্রে ছড়িয়ে আছে কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার অসাধারণ মৌলিক শব্দসম্ভার।
এই মৌলিক শব্দ-নির্ভর আঞ্চলিক লোকভাষা পাঠক-মনে যেমন কৌতুহলের জন্ম দেয়, তেমনি সৃষ্টি করে নবতর শিহরণ ও অভূতপূর্ব ব্যঞ্জনা। আশ্বিপশ্বি, আউজা, আৎকা, উষ্টা, পশর, ফুরুঙ্গি, ভোগা, মান্দাইল, হাটকালা এ-রকম শত শত লৌকিক শব্দ পাওয়া যাবে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র বিভিন্ন রচনায়। এগুলো লোকজীবনের নিত্য ব্যবহার্য মৌলিক শব্দ। এ-রকম অগণিত শব্দ ছড়িয়ে আছে এ জনপদের লোকভাষায়। সময়ের বিবর্তনে প্রচলিত লোকভাষা থেকে অনেক মৌলিক শব্দ আজ হারাতে বসেছে। এগুলো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়োজনেই লোকভাষাকে সংরক্ষণ করতে হবে। করতে হবে লোকভাষার সুলুকসন্ধান।
বাংলাদেশের ৮টি বিভাগেরই বলা চলে আছে আঞ্চলিক ভাষা। ভাষার প্রাণই হলো আঞ্চলিক ভাষা। প্রমিত ভাষা বা লিখিত ভাষার থেকে আঞ্চলিক ভাষার আবেদন ও আকর্ষণ কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। এ ভাষা নিয়ে নানা রকম গবেষণা ও এর বিকাশে নানা জন নানাভাবে কাজ করছেন। ‘স্থানিক বাকরীতি ও ভাষা-বৈচিত্র্য’ শিরোনামে লেখা জাহাঙ্গীর আলম জাহানের বইটি এই কর্মতৎপরতার একটি অংশ। লেখক ময়মনসিংহ বিভাগের কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা বিধায় এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার ওপর কাজ করার পরিসর পেয়েছেন।

প্রমিত ভাষারীতির বাইরে অঞ্চলভেদে প্রত্যেক দেশেই একটি নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা বা কথ্যভাষা প্রচলিত আছে। এই কথ্য ভাষাই ব্যাপক অর্থে লোকভাষা হিসেবে পরিচিত। কথায় বলে―‘এক দেশের বুলি, অন্য দেশের গালি’। অঞ্চলভিত্তিক এ ধরনের কথ্যভাষায় কিছু কিছু শব্দ আছে যা এক এলাকায় শোভন অর্থে এবং অন্য এলাকায় অশ্লীল অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার এমন অনেক উপজেলা আছে যেগুলোতে আঞ্চলিক ভাষার ক্ষেত্রে অনেক বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়।

কিশোরগঞ্জ জেলাধীন অষ্টগ্রাম উপজেলার ভাষার সাথে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ভাষার যেমন মিল নেই, তেমনি ভৈরব ও কুলিয়ারচর উপজেলার ভাষার সাথে অন্য উপজেলার ভাষাতেও বিস্তর ফারাক লক্ষ করা যায়। একইভাবে নেত্রকোনার হাওর জনপদ খালিয়াজুরী উপজেলার গ্রামাঞ্চলে ব্যবহৃত অনেক লোকশব্দের সাথে ধোবাউড়া, পূর্বধলা বা আটপাড়া উপজেলার লোকশব্দের অমিল অথবা বৈপরীত্য রয়েছে। এটিই স্বাভাবিক এবং স্বতঃসিদ্ধ। তদুপরি সব মিলিয়ে কিশোরগঞ্জের নিজস্ব ভাষারীতি এ অঞ্চলের মানুষকে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে। এ পর্যায়ে কিশোরগঞ্জ জেলার লোকভাষার ধরন, প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে হালকা আলোকপাত করা যেতে পারে।

কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক কথ্যভাষা যথেষ্ট কৌতুহলোদ্দীপক। গত শতকের সত্তর ও আশির দশকেও এখানে নতুন কিছু আঞ্চলিক শব্দ তৈরি হয়েছে। যেগুলো ব্যাপক ব্যবহারে সাধারণ মানুষের নিত্য উচ্চারিত শব্দে পরিণত হয়। এ জনপদে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দগুলো যে কোনো মানুষের মধ্যেই আনন্দদায়ক ব্যঞ্জনা ও দ্যোতনা তৈরি করে। প্রান্তিক জনমানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকা সেরকম কিছু আঞ্চলিক শব্দ, শব্দের ব্যবহার এবং প্রমিত রূপ তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।

বইটির সূচিপত্রে রয়েছে- পূর্ব ময়মনসিংহের লোকভাষা, ধরন প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য, লোকভাষার সুলুকসন্ধান, আঞ্চলিক লোকভাষা, শব্দের শেষে ‘গা’ ব্যবহার, শব্দের শেষে ‘ইন’ ব্যবহার, শব্দের শেষে ‘বাম’ ব্যবহার, ক, খ, শ, ষ, স বর্ণের উচ্চারণে ‘হ’ নির্ভরতা, ট এবং ঠ বর্ণের উচ্চারণে ‘ড’ নির্ভরতা, ‘হ’ বর্ণকে ‘অ’ এবং ‘আ’ ধ্বনিতে উচ্চারণ, মহাপ্রাণ ধ্বনির উচ্চারণ-বিভ্রাট, ‘ও’ হয়ে যায় ‘উ’, কথ্য ভাষার আরও কিছু বৈচিত্র্য, অষ্টগ্রাম উপজেলার ভাষাগত স্বকীয়তা ও ছুহুম ভাষা, কাপড় ব্যবসায়ীদের সাঙ্কেতিক ভাষা, জুতো ব্যবসায়ীদের সাঙ্কেতিক ভাষা, স্বর্ণকারদের সাঙ্কেতিক ভাষা এবং স্থানিক বাকরীতি ও ভাষা-বৈচিত্র্য।

এ বইটিতে যে সকল আঞ্চলিক শব্দ দেখানো হয়েছে তা কিশোরগঞ্জ জেলার অধিবাসীরা নিত্যদিনের কথোপকথনে নিয়মিতই ব্যবহার করে থাকেন। এ সকল শব্দ ছাড়াও এ অঞ্চলের বাকভঙ্গিতে আরও অজ¯্র শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। এমনও শব্দ আছে যা প্রমিত শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু শব্দগুলো উচ্চারিত হলে ভাবার্থ বুঝতে শ্রোতাদের কোনোই সমস্যা হয় না।

বইটির লেখক জাহাঙ্গীর আলম জাহান এ বইটি শেষ কথা বলতে গিয়ে বলেন- ‘এ গ্রন্থে সঙ্কলিত বাগ্ভঙ্গি, বাকরীতি ও আঞ্চলিক শব্দসমূহের বাইরেও কিশোরগঞ্জের গ্রামে-গঞ্জে আরও অনেক শব্দ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, অনেক শব্দ হারিয়েও গেছে। শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশেই সমাজকাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জীবনধারাতেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। ফলে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতাও দিনে দিনে কমে আসছে। এই পরিবর্তন অবশ্যই একটি চলমান প্রক্রিয়া।

প্রতিনিয়ত মানুষের রুচির যেমন পরিবর্তন ঘটছে, তেমনি তার সামাজিক রীতি ও কথা বলার ধরনেও পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে প্রতিদিনের জীবনধারায় ও পারিবারিক পরিবেশে ব্যবহৃত প্রাত্যহিক কথ্যভাষায়। এই প্রভাবের কারণেই সমাজ থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে কথ্যভাষার আনন্দদায়ক বাকরীতি এবং আঞ্চলিক শব্দভা-ার। এই শব্দভা-ারকে সংরক্ষণ করা না গেলে আমাদের আগামী প্রজন্ম কোনোদিনই হয়তো জানতে পারবে না তার পূর্বপুরুষের পারিবারিক ভাষা কেমন ছিল, কী রকম ছিল। তাই লৌকিক ভাষা সংরক্ষণে আমাদের সবাইকেই দায়িত্ববান ও যত্নশীল হতে হবে। হতে হবে ভাষাপ্রেমিক ও ভাষা-সন্ধানী।’

ভাষা গবেষণার বিশ্বস্বীকৃত নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি না থাকলেও একাডেমিক গবেষণার কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। লেখক জাহাঙ্গীর আলম জাহান একাডেমিক কোনো পদ্ধতিতে না গিয়ে নিজের আগ্রহে ও চেষ্টায় পাঠকদের জন্য হাজির করেছেন কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের পথে প্রান্তে হাটে বাজারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য শব্দ ও ভাষা। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত ভাষাগুলোকে তিনি সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করেছেন। এ রকম শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ একটি কাজের জন্য লেখক অবশ্যই প্রশংসা পাবার যোগ্য। সব শ্রেণীর সব অঞ্চলের মানুষের জন্যই বইটি পাঠ্য।

এই লেখকের অন্যান্য বই দেখতে ক্লিক করুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading