ত্রিমাত্রিক ছফার আত্মকথন: ‘অলাতচক্র’

‘দানিয়েল’ নামের যে চরিত্রটি তিনি তৈরি করেছেন, তা অনন্য। মুক্তিযুদ্ধের করুণ ইতিহাস আমরা কম-বেশি সবাই জানি। কিন্তু এত ভিন্নভাবে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধকে সম্ভবত আর কেউ তুলে ধরতে পারেনি। প্রতিনিয়ত লেখক যে টানাপোড়েন, কষ্ট আর মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মাঝে দিয়ে সময় পার করেছেন, ‘অলাতচক্র’ শব্দটির মাঝেই যেন তা ফুটে উঠেছে।
2021-08-29-অলাতচক্র-আহমদ-ছফার-pcbi00jetstps9ayvl07i16o5081bwq8cajw0olweg

আহমদ ছফার ডায়েরি অনুসারে জানা যায় — এপ্রিলের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতা চলে যান। অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করবেন, এমন ইচ্ছে ছিল ছফার। কিন্তু তাঁকে বোঝানো হয় – যুদ্ধ করার লোক আছে অনেক, কিন্তু লেখালেখির যুদ্ধের জন্য কিছু লোক দরকার; আহমদ ছফা নাহয় সেই কাজই করুক। ছফা কলকাতায় ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম শিবির’ নামে একটি সংগঠন শুরু করেছিলেন। সেখানে সভাপতি ছিলেন অজয় রায় আর আহমদ ছফা ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। কলকাতায় থাকাকালীন সময়ে প্রবীণ সিপিএম নেতা কমরেড মুজাফফর আহমেদের সান্নিধ্যে আসেন ছফা।

ছফা মুক্তিযুদ্ধকালীন এসব স্মৃতিমালাকে নিজ জবানিতে লিপিবদ্ধ করে ‘অলাতচক্র’ শিরোনামে প্রথম প্রকাশ করেন ১৯৮৫ সালে, সাপ্তাহিক নিপুণ পত্রিকার ইদ সংখ্যায়। মাত্র ১২ দিনে এটি লেখেন তিনি। কিন্তু সেটি তাঁর মনঃপুত হয়ে ওঠেনি, কিছু বিতর্কও ছিল। এ কারণে উপন্যাসটি পুনরায় লেখার চিন্তা করেন ছফা। নানা জনের আপত্তিতে উপন্যাসের কয়েকটি চরিত্রের নামও পরিবর্তন করতে হয় তাঁকে। এরই ধারাবাহিকতায় উপন্যাসের চরিত্রদের নামসহ অন্যান্য কিছু পরিবর্তন ও পরিমার্জন এনে ১৯৯৩ সালে মুক্তধারা প্রকাশনী থেকে পুনরায় উপন্যাসটি প্রকাশ করা হয়। এরপর খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি আরও দুটি সংস্করণ বের করে এবং ড. সলিমুল্লাহ খানের আলোচনা যুক্ত করা হয় এতে।

“আমি কিন্তু তায়েবাকে কখনো আমার, একথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের ধরনটা কী, অনেক চিন্তা করেও নির্ণয় করতে পারিনি, হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে আছে সে। চোখ দুটো সম্পূর্ণ বোজা। নিঃশ্বাস ফেলার সঙ্গে সঙ্গে নাকের দু’পাশটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। তার ডান হাতটা আমার মুঠোর মধ্যে। এই যে গভীর স্পর্শগুলো লাভ করছি তাতে আমার প্রাণের তন্ত্রীগুলো সোনার বীণার মতো ঝংকার দিয়ে উঠছে। এই স্পর্শ দিয়ে যদি পারতাম তার সমস্ত রোগ-বালাই আপন শরীরে শুষে নিতাম। তার জন্য আমার সবকিছু এমন অকাতরে বিলিয়ে দেয়ার এই যে সহজ সরল ইচ্ছে, ওটাকে কি প্রেম বলা যায়? ”

গল্পকথকের এই নির্মল ভাবনাগুলো আসলে কি গল্পের মাঝে পড়ে? নাকি লেখক কোনো বাস্তবতাকে টেনে পুরে দিয়েছেন তার লেখায়? এই অনুভূতিগুলো যেকোনো পাঠকের মনে দাগ তৈরি করতে বাধ্য। আহমদ ছফা নিজেকেও যেন ঢেলে দিয়েছেন এই উপন্যাসের পাতায়। ‘দানিয়েল’ নামের যে চরিত্রটি তিনি তৈরি করেছেন, তা অনন্য। মুক্তিযুদ্ধের করুণ ইতিহাস আমরা কম-বেশি সবাই জানি। কিন্তু এত ভিন্নভাবে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধকে সম্ভবত আর কেউ তুলে ধরতে পারেনি। প্রতিনিয়ত লেখক যে টানাপোড়েন, কষ্ট আর মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মাঝে দিয়ে সময় পার করেছেন, ‘অলাতচক্র’ শব্দটির মাঝেই যেন তা ফুটে উঠেছে।

BUY NOW

চিরচেনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত নানা সাহিত্যকর্মে ফুটে ওঠে এদেশের সকল প্রকার মানুষের করুণ আত্মত্যাগ, পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্মম হত্যাকাণ্ড আর রাজাকারের অত্যাচার কিংবা সাহসী মানুষের রণক্ষেত্রে লড়াই। কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে কিছু না বলা গল্প; যে গল্প ৩০ লক্ষ শহীদের নয়, ১ কোটি শরণার্থীর। জীবন বাঁচাতে যাদের পাড়ি জমাতে হয়েছিল অন্য দেশের মাটিতে। এমন অসংখ্য মানুষ আছে যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও যুদ্ধ করেছে প্রতিনিয়ত, এমনও অসংখ্য মানুষ আছে যারা সীমান্তের ওপারে গিয়েও পালাতে পারেনি ছাপ্পানো হাজার বর্গ মাইলের শেকড়ের টান থেকে। ভিটে-বাড়ি, পরিবার-পরিজনদের রেখে মনের বিরুদ্ধেও চলে যেতে হয়েছে অনেককেই। এতটা সময় কীভাবে কাটিয়েছে তারা? পরদেশের নতুন বাতাসে তারা কি আদৌ সুখে ছিল?

আহমদ ছফা শেকড় থেকে তুলে এনেছেন এই ইতিহাসকে। চিত্রায়িত করেছেন শরণার্থী শিবিরের করুণ প্রতিচ্ছবি। গল্পের প্রধান চরিত্র ‘দানিয়েল’। মনের বিরুদ্ধে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে শরণার্থী শিবিরে। সে চেয়েছিল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে, কিন্তু তার উৎসাহকে ছোট করে দেখা হয়। ক্ষোভে বলে ফেলে,আমার যুদ্ধ যাওয়া হয়নি। যুদ্ধকে ভয় করি বলে নয়! আমাদের দেশের যেসকল মানুষের যুদ্ধের দায়-দায়িত্ব, তারা আমাকে ট্রেনিং সেন্টারে পাঠাবার উপযুক্ত বিবেচনা করতে পারেনি।”

অতঃপর সে প্রতিটি ঘটনা, আশ্রয় নেয়া মানুষদের জীবন, তাদের চিন্তাধারা পর্যবেক্ষণ করে। তার সাথে নিজের চিন্তারাজ্যকে যুক্ত করে আহমদ ছফা যেন নিজেকেই দানিয়েলে রুপান্তর করেছেন। প্রথমে আত্মজীবনীমূলক লেখা হিসেবে ছাপা হলেও পরবর্তীতে এটি পুনরায় সম্পাদনা করা হয়।

গল্পের আরেকটি মন নাড়িয়ে দেয়া চরিত্র তায়েবা। ক্যান্সারে তার উদ্দীপনা ধরাশায়ী হয়ে গিয়েছে। কলকাতার পিজি হাসপাতালে মুক্তিযুদ্ধের মতোই সে লড়াই করছে নিজের জীবনের সাথে। তায়েবা কোনো সাধারণ মেয়ে নয়। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে আসাদ হত্যার দিনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছিল সে। প্রবল রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করা মেয়ে তায়েবা। দানিয়েলের মতে, সে সাধারণ মেয়েদের উর্ধ্বে। সাধারণের মতো কোনো ঈর্ষা, আকাঙ্ক্ষা তাকে স্পর্শ করেনি।

তায়েবা-দানিয়েলের সমন্বয় উপন্যাসটিকে নিয়ে গিয়েছে অনন্য ধারায়। পাঠক হয়তো বুঝতেও পারবেন না কখন হারিয়ে গেছেন তাদের মাঝে। উপন্যাসটিতে আহমদ ছফা যেন তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ আর নির্মোহ বিশ্লেষণের ক্ষমতা পুরোটাই ঢেলে দিয়েছেন।

উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে তৎকালীন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী সবসময় শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়ে এসেছেন। ভারতীয় জনগণ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার অনুকূলে ছিল, কারণ তাতে তাদের চিরশত্রুকে বড় রকমের সাজা দেয়া যায়। চীন, আমেরিকাসহ অধিকাংশ দেশ তখন পাকিস্তানের পক্ষে, ফলে যুদ্ধে জড়ানোটা ইন্দিরা গান্ধী শ্রেয় মনে করেন নি। কারণ তাতে একটা বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তিনি তখন রাশিয়াসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে সফর করেন। ভারত যে কোনো দেশের স্বার্থ পরিপন্থী কিছু করবে না, তা জানান দেয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

এর মাঝেও ছফা তুলে ধরেছেন একটি নীরব শঙ্কা। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির যুদ্ধ ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধে পরিণত হয়ে যাবে না তো? বাঙালি মুসলমানদের অপরিবর্তনীয় ভাগ্যের কথাও তিনি বলে গেছেন। যে বাঙালি মুসলমানদের অকুণ্ঠ আত্মদানে পাকিস্তান সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল, সেই পাকিস্তানই ৩০ বছর বুকের উপর বসে তাদের ধর্ষণ করে। ইতিহাসের তামাদি শোধ করার জন্যই কি তবে এই জাতিটির জন্ম? বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সাল থেকেই সংগ্রাম করে আসছে। যদি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়, তাতে হয়তো ভারত জয়লাভ করবে আর ভারতের সহায়তায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করব, কিন্তু ২২ বছরের ফলাফল কি আমরা এটাই চেয়েছিলাম????

যুদ্ধ যত অগ্রসর হতে থাকে কলকাতার পরিবেশ যেন ততটাই অস্থিতিশীলতার পথে হাঁটতে থাকে। হিন্দু-মুসলিম রেষারেষিতে মানুষের মনে বিতৃষ্ণার সঞ্চার হয়। শরণার্থীদের মাঝেও তৈরি হয় নানা বিবাদ। জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। সবাই যেন একই পরিস্থিতিতে থাকতে থাকতে এক রকম ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তবু প্রতিদিনের চরমপত্র শুনে সবাই আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এম. আর. আখতার মুকুলের চরমপত্র যে সকল মানুষদের মনে রস আর বিশ্বাসের সঞ্চার করতো উপন্যাসে তা স্পষ্ট।

“সব মিথ্যা জেনেও আমরা পরের দিনের চরমপত্র পাঠ শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। আর কোথাও তো কেউ কিছু করতে পারছে না। আমরা এম. আর. আখতার মুকুলের ওপর ভরসা ছাড়তাম না। আগামীকাল তিনি নতুন আক্রমণ এবং নতুন বিজয়ের কথা শোনাবেন। ডুবন্ত মানুষ তো প্রাণপণ শক্তিতে ভাসমান তৃণখন্ডকে আঁকড়ে ধরে। ”

উপন্যাসের শেষদিকে ‘রওশন আরা’ চরিত্র নিয়ে কিছু কথা রয়েছে। একটি কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে মানুষের মাতামাতি, চরিত্রটিকে ব্যবহার করে অনেকে ঘামঝরানো বক্তৃতা দিয়ে ফেলে, এমনকি খবরের কাগজে এই কাল্পনিক মানুষটির জীবনীও ছাপা হয়। দানিয়েলের আক্ষেপ, যে তায়েবা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলো, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করলো, সে আজ হাসপাতালের বিছানায়। আর অলীক রওশন আরা ভারতীয় জনমনে অক্ষয় আসন দখল করে আছে!

‘অলাতচক্রে’ আহমদ ছফা মুক্তিযুদ্ধকালীন শুভ ও অশুভ শক্তির তৎপরতা এঁকেছেন নিপুণ হাতে। এঁকেছেন রণক্ষেত্রের বাহিরে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া আরেকটা মুক্তিযুদ্ধের মানবিক চিত্র। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, ভাসানী, মোশতাক, ওসমানী সবগুলো চরিত্র হাজির হয় উপন্যাসে, লেখক তুলে আনেন এক রাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধকে। পুরো উপন্যাস জুড়েই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে এক ঠান্ডা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। উপন্যাসে লেখক আহমেদ ছফা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন।

আহমদ ছফার এই উপন্যাস অবলম্বনে পরবর্তীতে নির্মিত হয় বাংলা ভাষায় প্রথম থ্রিডি চলচ্চিত্র ‘অলাতচক্র’। সরকারি অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন নবাগত পরিচালক হাবিবুর রহমান। ১৯ মার্চ, ২০২১ এ মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি ঘিরে দর্শকের ছিল আগ্রহ ব্যাপক। বলা হয় ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসে দানিয়েলের জবানিতে নিজেকেই তুলে ধরেছেন লেখক আহমদ ছফা। নিজের প্রেমিকারূপে সৃষ্টি করেছেন তায়েবা চরিত্রটি।

অলাতচক্র’ আর চার-পাঁচটা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের মতো নয়। এতে ফুটে উঠেছে অপ্রিয় কিছু সত্য আর কিছু কঠিন বাস্তবতা। শুধু দ্বাদশ অধ্যায়টি নিয়ে বলতে গেলেই আরও কয়েকটি লেখনীর প্রয়োজন হবে। তাই আপনি যদি উপন্যাসটি না পড়ে থাকেন, তাহলে আজই শুরু করে দিন। মুক্তিযুদ্ধের মাঝে এমন সুন্দর প্রেমের উপাখ্যান হয়তো অন্য কোথাও পাবেন না। দানিয়েলের প্রতিটি তর্কে যেন আহমদ ছফা তাঁর মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অর্ধ-আত্মজীবনী হোক কিংবা উপন্যাস — লেখনী হিসেবে ‘অলাতচক্র’ এক অনন্য সৃষ্টি। ‘অলাতচক্র’ মানে হচ্ছে ‘আগুনের চক্র বা বৃত্ত’। লেখক আহমদ ছফা নিশ্চিতভাবে তাঁর জীবনকে আগুনের বৃত্তে দাঁড় করিয়েছেন উপন্যাসটির নামকরণের মাধ্যমে।

আহমদ ছফার বইগুলো সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading