কেমন ছিল মাওলানা ভাসানী ও ন্যাপের রাজনৈতিক মতাদর্শ?

2021-10-24 কেমন ছিল মাওলানা ভাসানী ও ন্যাপের রাজনৈতিক মতাদর্শc

এ কথা সবারই জানা, মূলত ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান নামক দেশটি সৃষ্টি হয়েছিল। এর মধ্যে ধর্ম ও ধর্মের পক্ষে বিপক্ষে সক্রিয় ছিল নানা মতাদর্শের রাজনৈতিক পার্টি। রাজনৈতিক পার্টি সৃষ্টির নেপথ্যে নানা কারণ থাকে। মূলত একটি সক্রিয় পার্টির নেতা কর্মীদের মধ্যে যখন ব্যক্তি বা বৃহত্তর ইস্যু নিয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয় তখন এদের মধ্য থেকেই একটি অংশ নতুন কোনো পার্টি গঠন করে। সারা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ বা গবেষণা করলে দেখা যাবে যে, সেসব দেশের রাজনৈতিক পার্টিগুলোর মধ্যে দুই চারটি পার্টিই সম্মুখ ভূমিকা পালন করে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে। এর বাইরে নামসর্বস্ব নানা রকম পার্টি থাকে। এদের ভূমিকা খুব একটা না থাকলেও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে এসব পার্টি চলমান রাখে।

এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।
চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

শামিমা আকতার লিপি রাষ্ট্র বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সুবাদে তিনি রাষ্ট্রের ইতিহাস ও রাজনৈতিক পার্টির ইতিহাস সম্পর্কে সুগভীর জ্ঞান রাখেন। এছাড়া তিনি বড় হয়েছে রাজনৈতিক পরিবারে। তিনি তার এমফিল গবেষণার বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন ‘বাংলাদেশে ভাসানী ন্যাপের রাজনীতি’। সম্প্রতি তিনি পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। স্বাধীনতার পূর্বে এবং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এ পার্টির ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বিশদ ও বিপুল তথ্য উপাত্ত সমৃদ্ধ গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণাপত্রকেই বই হিসেবে একাডেমির বাইরে বৃহৎ পাঠক সমাজের কাছে উন্মুক্ত করেছেন।

BUY NOW

আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় দল প্রথা একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিকব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের প্রকৃতি, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বিভিন্নতা দেখা যায়। রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপের মধ্যে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুধাবন করা যায়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উদ্ভবের সাথে সাথে মানব মনে প্রয়োজন অনুভূত হয় রাজনৈতিক দল গঠনের। গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্বশীলতা রক্ষার জন্য দলব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কার্যকর কোনো উত্তম প্রাতিষ্ঠানিক উপায় আজও উদ্ভাবিত হয়নি। সরকারকে জনগণের নিকট দায়িত্বশীল রাখার জন্য তাই দলব্যবস্থা গণতন্ত্রে অপরিহার্য। গিলক্রাইস্টের মতে, ‘‘One of the most notable development of modern democratic government is the rise of political parties.” প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।

সকল রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলব্যবস্থা একরূপ নয়। রাষ্ট্র ভেদে রাজনৈতিকব্যবস্থার ভিন্নতার কারণে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ নানাভাবে রাজনৈতিক দলের শ্রেণী বিন্যাস করেছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাজনৈতিক দলকে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করেছেন। প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে বা সংখ্যার ভিত্তিতে দলীয় ব্যবস্থার শ্রেণীবিভাগ করা হয়। যেমন : যে দেশে একটি দলের অস্তিত্ব রয়েছে, সেখানে একদলীয় ব্যবস্থা, দু’টি দল থাকলে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা এবং বহুদল বিদ্যমান থাকলে বহুদলীয় ব্যবস্থা বলে অভিহিত করা হয়। আধুনিক লেখকগণ সংখ্যার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলের শ্রেণী বিভাজনকে যুক্তিযুক্ত মনে করেন না। কারণ এর দ্বারা কোনো দেশের দলীয়ব্যবস্থার স্বরূপ জানা যায় না। এ কারণে দলের স্বরূপ কার্যকলাপ সংগঠন পদ্ধতি কর্মসূচি ও মতাদর্শের প্রতি নজর রেখে দলীয়ব্যবস্থার শ্রেণী বিন্যাসের ওপর গুরুত্বারোপ করেন আধুনিক লেখকগণ।

পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন ঐতিহাসিক ও অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮৫-১৯৭৬)। তিনি ১৯০৭ সালে ‘রেশমি রুমাল’ আন্দোলোন থেকে ১৯৭৬ সালের ফারাক্কা লং মার্চ আন্দোলন পর্যন্ত উপমাদেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের সাথে জড়িত ছিলেন ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার রাজনীতির অন্যতম একটি জায়গা ছিল সাম্রাজ্যবাফ বিরোধীতা। তিনি নানা সময় নানা রকম রাজনীতির দল, মত ও আদর্শের পরিবর্তন করেছেন। তার ভাষ্য মতে ‘আর্দশের থেকে মানুষ বড়’ তাই তিনি আমৃত্যু মানুষের পাশে থেকে মানুষের জন্য লড়াই করেছেন অকুতভয়ে।

ব্রিটিশ সরকার ‘ভাগ কর, শাসন কর’ এই নীতির উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষকে ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়ে যায়। দেশবিভাগের পর পাকিস্তানের শাসনভার ন্যস্ত হয় মুসলিম লীগের ওপর। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাসন ক্ষমতায় এসেছিল তা পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ক্ষমতা পেয়েই স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে ওঠে মুসলিম লীগ। পূর্ব বাংলার জনগণ দেখতে পায় যে, তারা নতুন আর একটি উপনিবেশের শিকারে পরিণত হতে চলেছে।

এরূপ পরিস্থিতিতে মওলানা ভাসানীসহ আরও অনেক নেতা তার প্রতিবাদ করে এবং মুসলিম লীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার একরকম সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেন। মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের পাশাপাশি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র দল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যার ফলশ্রুতিতে আওয়ামী মুসলিম লীগের (Awami Muslim League) সৃষ্টি হয়। মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলন আহ্বান করেন। এ সম্মেলনেই গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। ৪০ সদস্যবিশিষ্ট ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন, যথাক্রমে মওলানা ভাসানী ও শামসুল হক। তাছাড়া আতাউর রহমান খান সহ-সভাপতি; ইয়ার মুহাম্মদ খান কোষাধ্যক্ষ; খন্দকার মুশতাক আহমেদ ও শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন।

গঠিত দলের মধ্যে বামপন্থী ভাব থাকার ফলে অর্থাৎ একটি বামমনা গোষ্ঠী অবস্থান করছিল। ফলে ১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। এতে কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং মওলানা ভাসানীকে সামনে রেখে দলের মধ্যে একটি গ্রুপ সৃষ্টি হতে থাকে। এ গ্রুপ সবসময় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সমাজতান্ত্রিক নীতি ও কর্মসূচির সমর্থন করে এবং পাকিস্তানের পুঁজিবাদী ও পাশ্চাত্যপন্থী বৈদেশিক নীতি বিশেষত সিয়াটো (SEATO সেন্টো (SENTO) চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক জোটবদ্ধ হওয়ার নীতির বিরোধিতা করে। এর সাথে নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার দাবি জানান।

কিন্তু সোহরাওয়ার্দী মার্কিন ঘেঁষা নীতিতে অবিচল থাকেন এবং উপরোক্ত চুক্তিদ্বয়ের সমর্থন করেন। সোহ্রাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করলে মওলানা ভাসানী তাঁকে পাকিস্তানের সকল সাম্রাজ্যবাদী যুক্ত জোটের বাইরে থেকে আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টো অনুসারে স্বাধীন ও বৈদেশিক নীতি অনুসরণ, পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ভেঙে দিয়ে স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে সাবেক প্রদেশসমূহের পুনর্গঠন এবং ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে দেশরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও মুদ্রাব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রেখে পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দেয়ার আহ্বান জানান।

কিন্তু সোহরাওয়ার্দী মার্কিন ঘেঁষানীতিতে অবিচল থাকলে মওলানা ভাসানী তাতে ক্ষুব্ধ হন। ফলে আওয়ামী লীগের মধ্যে মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় এবং নেতৃবৃন্দ উদারনৈতিক গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী দু’টি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে যায় ১৯৫৭ সালে ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে। মূলত মওলানা ভাসানী চেয়েছিলেন যে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি হবে জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি।

পাকিস্তানের মুসলীম লীগ সরকার জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাসন ক্ষমতায় এসেছিল তা পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এরূপ পরিস্থিতিতে মওলানা ভাসানীসহ আরও অনেক নেতা মুসলীম লীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এরপর আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠন করেন। কিন্তু আওয়ামী মুসলীম লীগের অন্যতম নেতা সোহ্রাওয়ার্দী মার্কিনঘেঁষা নীতি অবলম্বন করলে মওলানা ভাসানী আওয়ামী মুসলীম লীগ ত্যাগ করে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পাটির্’ নামে নতুন একটি পার্টি গঠন করেন। এ পার্টির সংক্ষিপ্ত নাম ন্যাপ।

শামিমা আকতার লিপি ন্যাপের যাবতীয় কার্যক্রম ও এদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন বইটিতে। বইটিতে রয়েছে সাতটি অধ্যায়। ৩০৪ পৃষ্ঠার এ বইটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও এর বিকাশ সম্পর্কে জানতে ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে রাজনীতি মনস্ক পাঠকদের জন্য খুবই সহায়ক হবে। এ বইটি প্রকাশিত হয়েছিলো বইমেলা ২০১৩ সালে। বর্তমান সময়ের যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চলছে তার পেছনের ইতিহাসের যে প্রভাব তা বুঝতে বইটি কর্যকারী হবে নিঃসন্দেহে।

বইটিতে আরও পড়া যাবে ‘ন্যাপ (ভাসানী)-এর জন্ম, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কর্মসূচি ও মতাদর্শ’, ‘স্বাধীনতা পূর্ব ন্যাপ (ভাসানী)-এর ভূমিকা’, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী (১৯৭১-৭৫) পর্যন্ত ন্যাপ (ভাসানী)-এর ভূমিকা’, ‘সামরিক শাসনামলে ন্যাপ (ভাসানী)-এর ভূমিকা (১৯৭৬-৯০ পর্যন্ত)’, সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনামলে ন্যাপ (ভাসানী)-এর ভূমিকা (১৯৯১-২০০১)। এছাড়াও রয়েছে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের ফলাফল, ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল, ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের ফলাফল, ১৯৮১ সালের নির্বাচন, ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনের ফলাফল, ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল, ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল, ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল।

শামিমা আকতার লিপির আরও বই পড়তে ক্লিক করুন

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading