যে বিন্দুতে মিলে গেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ দুই বাঙালি

ze bindute mile geche

তাঁরা দুজন দুই গ্রহের বাসিন্দা। কিন্তু তবু তারা কোথায় যেন একই যোগসূত্রে গাঁথা। শত হোক, গ্রহগুলো তো একই সৌরজগতের সদস্য! একজনের বিচরণ সাহিত্যের জগতে। সাহিত্যের কোমলতা, আবেগ, অনুভব আর কল্পনায় তিনি অতুলনীয়; তাঁর কলম থেকে কবিতার ছন্দ, গল্পের নাটকীয়তা, উপন্যাসের গাঁথুনি, প্রবন্ধের সুনিপুণ ব্যাখ্যা- সবকিছু বেরিয়ে এসেছে অত্যাশ্চর্য সাহিত্যিক ভঙ্গিমায়। তাঁর লেখায় মাতোয়ারা হয়েছিল তাঁর সমকালীন বিশ্ব, বুঁদ হয়ে আছে পরবর্তী প্রতিটি প্রজন্ম। অনাগত প্রজন্মও যে তাঁকে আপন করে নেবে, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। 

দ্বিতীয়জনের বিচরণ প্রথমজনের একদম বিপরীত মেরুতে। তাঁর জীবনে সাহিত্যের কোমলতা ছিল না, ছিল রাজনীতির কঠোরতা, গল্প-উপন্যাসের কল্পনার স্থলে ছিল কঠিন বাস্তবতার সাথে পেরে ওঠার সংগ্রাম। তাঁর জন্মই হয়েছিল এক অস্থির সময়ে। তাঁর বেড়ে ওঠার সাথে সেই অস্থিরতা বেড়েছিল পাল্লা দিয়ে। তিনি লড়াই-সংগ্রাম দেখেছেন, করেছেন, করতে করতে বড় হয়েছেন; ভারতভাগ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, গণ অভ্যুত্থান, অসহযোগ আর একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া ন’মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম- সর্বত্র তিনি হয়ে উঠেছিলেন কোটি মানুষের ত্রাতা। তাঁর ভয়-ডরহীন ব্যক্তিত্ব, সমুদ্রে ঢেউয়ের চেয়েও শক্তিশালী গর্জন আর ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তায় এক প্রজন্ম দেখেছে লাখো অত্যাচারীকে লেজ গুটিয়ে পালাতে। আজকের প্রজন্ম আর অনাগত সকল প্রজন্মই তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করে থাকবে।

Rabindranath Tagore কবিগুরু বঙ্গবন্ধু
Image Source: Quartz

এরকম বিপরীত কর্মক্ষেত্র আর বিপরীত ব্যক্তিত্বের দুজন মানুষ কোথায় গিয়ে এক বিন্দুতে মিলিত হতে পারে ভাবছেন? উত্তরটা হলো একটি ভূখণ্ড, যার নাম পূর্ববঙ্গ, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ, তাদের দুজনেরই স্বপ্নের সোনার বাংলা! হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, যে দুজন প্রবাদপুরুষের কথা এতক্ষণ বলা হলো, তাঁদের হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ দুই বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দুই পৃথিবীর এই দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাণ্ডার, সুজলা-সুফলা সোনার বাংলার প্রেমে মিলিত হয়েছিলেন এক বিন্দুতে। আর তাদের এই মিলন বিন্দুকে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে, দুই প্রজন্মের দুই শ্রেষ্ঠ মনিষীর জীবন নিয়ে পাঠকের কৌতূহল মেটাতে লেখিকা সেলিনা হোসেন রচনা করেছেন চমৎকার একটি বই- ‘পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শেখ মুজিবুর রহমান’। 

সেলিনা হোসেন বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। ২১টি জনপ্রিয় উপন্যাস রচনার পাশাপাশি তিনি ৭টি গল্প গ্রন্থ আর ৪টি প্রবন্ধও লিখেছেন। তার লেখাসমূহ একাধিক ভাষায় অনূদিতও হয়েছে। সমকালীন রাজনীতি, দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম আর সেসব প্রেক্ষাপটই তার অধিকাংশ লেখার মূল উপজীব্য। ২০২০ সালে প্রকাশিত তার বই ‘পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ’-ও তেমনই একটি লেখা। দুজন মহাপুরুষের জীবন ও কর্মের অনেক অজানা দিক তুলে ধরার পাশাপাশি তাদেরকে এক বিন্দুতে নিয়ে এসেছেন তিনি পূর্বঙ্গের বাংলাদেশ হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। 

কবিগুরু নিজের দেশমাতৃকার সৌন্দর্যে প্রথম অভিভূত হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গেই। ১৪ বছরের বালক কবি শিলাইদহে যেবার প্রথম গিয়েছিলেন, সেখানেই থেকে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন পল্লী প্রকৃতির সৌন্দর্যে মজে গিয়ে। কবি জীবনে একাধিকবার ঘুরে গিয়েছেন ময়মনসিংহ, যশোর, পাবনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নানা অঞ্চলে। এসময় সকল কর্মচাঞ্চল্য আর মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে গিয়ে নিবিড়ভাবে পরিবেশ প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়েছিলেন তিনি, ঘুরে বেড়িয়েছেন খালে-বিলে, হাওড়ে-বাওড়ে, বনে-বাদাড়ে। এই প্রকৃতির মাঝে মিশে গিয়েই তো লিখতে বসেছিলেন “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।” 

bangabandhu sheikh mujibur rahman
Image Source: Pinterest

পূর্ববঙ্গের প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি বিশ্বকবির ভালোবাসার কথা সর্বজনবিদিত। আর বিশ্বকবির প্রতি পূর্ববঙ্গেরই আরেক মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভালোবাসার কথাও সর্বজনবিদিত। কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার কথা তিনি কখনোই লুকিয়ে রাখতেন না। বরং সাহিত্যে তার বিচরণ পুরোটাই রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বলতেই ভালোবাসতেন তিনি। সাহিত্যের এই ভালোবাসা তিনি সাহিত্যের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেননি। নিজের অসাধারণ রাজনৈতিক জীবনে কবিগুরুকে অনুসরণ করেছেন, তাঁর প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়েছেন। 

কবিগুরু পূর্ববঙ্গকে সোনার বাংলা হিসেবে দেখে গেছেন। বঙ্গবন্ধু দেখেছেন সেই সোনার বাংলায় অত্যাচারী হানাদারদের রাজত্ব। বাংলার মানুষ, বাংলার প্রকৃতি, সবকিছুই হানাদারদের অত্যাচারের স্টিম রোলারের নীচে পড়ে পিষ্ট হতে দেখেছেন তিনি। কিন্তু বাংলার মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা যে হিমালয়ের চেয়ে বিশাল ছিল। ‘৪৩ এর দুর্ভিক্ষের সময় পিতার অগোচরে গুদাম থেকে চাল নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে বিতরণ করা বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করে। আর জীবনের একটা বড় অংশ তো তিনি জেলের ভেতরেই কাটিয়েছেন বাংলার মানুষের অধিকার সংগ্রাম আদায়ের জন্য। তাই তো তাঁর ডাকে সারা দিয়ে সমগ্র বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ করতে নেমেছিল মানুষ, বাংলার মাটিতে এনেছিল প্রাণের জোয়ার, আর পূর্ব বাংলা রূপান্তরিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে। যুদ্ধবিদ্ধস্ত সেই বাংলাদেশকে স্বপ্নের সোনার বাংলায় রূপান্তর করার কাজ শুরু করেছিলেন তিনি, যদিও ঘাতকেরা তাকে সফল হতে দেয়নি। তবু আজকের বাংলাদেশ তাঁর সোনার বাংলার স্বপ্নই দেখে।

কবিগুরুর সোনার বাংলা আর বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তো একই বিন্দুতে মিলে গেছে। সেই মিলন বিন্দুর কথাগুলোই তুলে ধরেছেন সেলিনা হোসেন তার ‘পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ’ বইটিতে। কবিগুরুর পূর্ববঙ্গের প্রতি ভালোবাসা আর বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ঘুরে আসার জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি দারুণ পাঠ।

এই ব্লগটি লিখেছেন মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png