ক্যারিয়ার হিসেবে সেলস?

8

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন বুকস্টোর রকমারি ডট কম এর আয়োজনে চলেছে সপ্তাহব্যাপী ক্যারিয়ার কার্নিভাল। ক্যারিয়ার কার্নিভালের অন্যতম আয়োজন ক্যারিয়ার ক্যাফে লাইভের পঞ্চদশ পর্বে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বনামধন্য আইসক্রিম প্রতিষ্ঠান ইগলুর সিইও জি এম কামরুল হাসান। পর্বটির সঞ্চালনায় ছিলেন রবির ভাইস প্রেসিডেন্ট জাভেদ পারভেজ। বর্তমানে কোন একটি কোম্পানিতে সেলস ডিপার্টমেন্টের গুরুত্বের কথা আমরা সকলেই জানি। তাই কেউ যদি সেলসে তার ক্যারিয়ার গড়তে চান তাহলে তার কী কী করতে হবে, এখানে ক্যারিয়ার কেমন হবে এবং যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে উক্ত পর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

সহজ ভাষায় কোন পণ্য বা সেবা কেনাবেচা হল সেলস। নিজের আইডিয়া, পণ্য বা সেবা দিয়ে অন্যকে সন্তুষ্ট করা বা বুঝানো হল সেলস। আমরা সেলসের মধ্যেই বাস করছি। কোন না কোনভাবে আমরা সেলসের সাথে জড়িয়ে আছি। সেলস একে অপরের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মধুর কাজটি করছে বলেই একে ক্রিয়েটিভ আর্ট বলা হচ্ছে।

সেলস নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ

জি এম কামরুল হাসানের মতে, ব্যবসা হল বিজ্ঞান, যেখানে পর্যাপ্ত জ্ঞান তো থাকতেই হবে। এই জ্ঞানের সাথে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা না থাকলে খুব একটা সফলতার আশা করা যায় না। প্রথমত আপনাকে আপনার ব্যবসার একটা স্ট্র্যাটেজি সাজাতে হবে। এই স্ট্র্যাটেজি সাজানোর সময় কাস্টমারের চাহিদা, কোন প্রোডাক্টের উপর তার আগ্রহ বেশি, মার্কেটে উক্ত প্রোডাক্টের ভ্যালু এবং প্রতিযোগিতা কেমন, প্যাকেজিং – এসব মাথায় রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আপনার প্রোডাক্টের মার্কেটিং সঠিকভাবে হচ্ছে নাকি তা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য ব্যতিক্রমী উপায়ে আপনার প্রোডাক্টটিকে তুলে ধরতে হবে, যাতে তা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কাস্টমারকে আকৃষ্ট করতে পারে। কিন্তু যদি আপনি আপনার প্রোডাক্টের মার্কেটিং আকর্ষণীয়ভাবে না করতে পারেন তাহলে তা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কাস্টমারের সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করবে না। তাই মার্কেটিং এর উপর বিশেষ নজর দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ক্যারিয়ার গড়ার প্রাথমিক ধাপ। এই সময়টা কিছু বেসিক স্কিলস যেমনঃ প্রেজেন্টেশন স্কিল, কমিউনিকেশন স্কিল, অ্যানালাইটিকাল অ্যাবিলিটি, টাইম ম্যানেজমেন্ট, নেগোসিয়েশন স্কিল, লিডারশিপ মেন্টালিটি সম্পূর্ণরূপে ঝালাই করে নেওয়ার উৎকৃষ্ট সময়। যে যত ভালোভাবে এসব স্কিলসে দক্ষ হবে, ভবিষ্যৎ তার জন্য ততো বেশি প্রসারিত হবে। পাশাপাশি এই সময় থেকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কারণ- কর্পোরেট জীবনে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তাই আগের থেকেই ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হয়ে থাকা ভালো। তাই জি এম কামরুল হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপদেশ দিয়েছেন যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন উপভোগ করার পাশাপাশি একটু একটু করে নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে হবে। নাহলে প্রতিযোগিতার এই বাজারে পিছিয়ে পড়তে হবে।

এখন আসা যাক, ছাত্রাবস্থায় এসব স্কিলস কিভাবে অর্জন করা যাবে সে বিষয়ে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরণের ক্লাব থাকে। পড়ালেখার পাশাপাশি যদি এসব ক্লাবের সাথে যুক্ত থাকা যায়, তবে লিডারশিপ মেন্টালিটি, নেগোসিয়েশন স্কিল, টাইম ম্যানেজমেন্ট – এসবের চর্চা থাকার সাথে সাথে কানেকটিভিটিও বাড়বে। এছাড়াও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী তাদের ছাত্রাবস্থায় টিউশনি করিয়ে থাকে, যেখান থেকে কমিউনিকেশন স্কিল তৈরি হয়। কথা দিয়ে কিভাবে মানুষকে প্রভাবিত করা যায় তারও একটা আইডিয়া পাওয়া যায়।

কিভাবে ধাপে ধাপে নিজেকে উন্নতির পথে ধাবিত করা যায়

জি এম কামরুল হাসান নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, জীবনে উন্নতি করতে হলে আগে নিজের ফাংশনাল স্কিল ঠিক করতে হবে। অর্থাৎ, যে নির্দিষ্ট কাজের জন্য আপনাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তা আপনাকে সঠিকভাবে করতে হবে। কিন্তু জীবনে সফলতার মুখ দেখার জন্য এইটুকুই যে যথেষ্ট নয় তা আমাদের মনে রাখতে হবে। সর্বপ্রথম যে কাজটা করতে হবে তা হলো, একটি দলে বা টিমে কাজ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা, কারণ- কর্পোরেট জীবন মানেই কে কতটা ভালোভাবে একটি টিমে থেকে নিজের কাজ করতে পারছে, নিজের প্রতিভা দেখাতে পারছে। আর এজন্য কমিউনিকেশন স্কিল থাকা দরকার। কারণ- আপনি যদি নিজের কথা দ্বারা আপনার উদ্দেশ্য দলের অন্যদের সামনে তুলে ধরতে না পারেন, নেগোসিয়েট করতে না পারেন, যেকোনো পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে না নিতে পারেন, তাহলে আপনি কোনো টিমে থেকেও কাজ করতে পারবেন না। আর এই কমিউনিকেশন স্কিল, নেগোসিয়েট করার ক্ষমতাই পরবর্তীতে আপনাকে লিডার করে তুলতে সহায়ক হবে।

 ইন্টারভিউয়ের সময় যে যে বিষয় খেয়াল রাখা দরকার

জি এম কামরুল হাসান চাকুরি প্রার্থীদের জন্য কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন। এমন কিছু আচরণ এবং স্কিলস যা ইন্টারভিউ বোর্ডে খেয়াল করা হয়ঃ

  • চাকুরি প্রার্থীকে অবশ্যই নম্র-ভদ্র হতে হবে। কারণ অবশ্যই উদ্ধত আচরণকারীকে কেউ চাকরিতে রাখতে চাইবে না।
  •  ওভার কনফিডেন্স দেখানো যাবে না। কেউ যদি ইন্টারভিউ বোর্ডে নিজেকে সব বিষয়ে জ্ঞানী প্রমাণ করতে চান, সেটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ- ওভার কনফিডেন্ট মানুষরা কখনো কিছু শিখতে আগ্রহী হবে না।
  • নিজের বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দিতে হবে। তাই প্রশ্নের উত্তরগুলো এমনভাবে দেওয়া উচিত যাতে ঐ স্বল্প সময়েই চাকরিদাতা আপনার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পান।
  • ফাংশনাল স্কিলগুলোর (প্রেজেন্টেশন স্কিল, কমিউনিকেশন স্কিল, নেগোসিয়েশন স্কিল, লিসেনিং স্কিল) পরিচয় দিতে হবে।
  • নিজের বডি ল্যাংগুয়েজ ঠিক রাখতে হবে।
  • ড্রেস কোড এবং ফার্স্ট ইম্প্রেশন ঠিক রাখতে হবে।

সেলস নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব দূরীকরণ

আমাদের সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে, “সেলসে কাজের চাপ অনেক বেশি। সেই তুলনায় সুযোগ কম। আবার ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, “Without pain, there is no gain.” হ্যাঁ, এইটা সত্য যে এই পেশায় চাপ বেশি। কিন্তু চাপের সাথে সাথে সুযোগও বেশি।

সেলসে ফিল্ড ওয়ার্ক বেশি থাকলেও এখান থেকে উন্নতি করার অনেক সুযোগ রয়েছে। কারণ- একটা কোম্পানির মূল চালিকা শক্তিই হল সেলস ডিপার্টমেন্ট। কোম্পানির তৈরিকৃত প্রোডাক্ট যদি বাজারে ঠিকভাবে না পৌঁছায়, তাহলে তো কোম্পানি আয় করতে পারবে না। তাই যদি নিষ্ঠার সাথে এখানে কাজ করা যায়, তাহলে দ্রুতই উপরে উঠার সম্ভাবনা থেকে যায়।

অনেকেই সেলসের চাকরিকে সম্মান দিতে চায় না। তাই এই ডিপার্টমেন্টে যুক্ত হতে অনেকেই ভয় পায়, হীনম্মন্ন্যতায় ভুগে। কিন্তু লোকে কী বলবে ভেবে যদি কেউ এখানে চাকরি না করে থাকে, তাহলে সে জীবনে অনেক বড় সুযোগ হাতছাড়া করবে। কিন্তু এটাও মাথায় রাখতে হবে, আপনি খারাপ থাকলে অন্য কেউ আপনাকে দেখতে আসবে না, আপনাকে নিজেই নিজেকে দেখতে হবে। তাই অন্যের কথা শুনে এই ডিপার্টমেন্টে যুক্ত না হওয়া বা চাকরি ছেড়ে দেওয়া স্রেফ বোকামি ছাড়া আর কিছুই না।

সেলসে নতুনদের সৎ পথে থাকা

যে কোনো পেশাতেই সততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সততার মধ্যে কাজে নির্ধারিত পরিমাণ সময় দেওয়া থেকে শুরু করে সকল প্রোডাক্ট জায়গা মতো পৌঁছে দেওয়া সব আসবে। ধরুন, আপনি সেলসে কাজের সাথে যুক্ত হয়েছেন। আপনার উপর দায়িত্ব রয়েছে কোম্পানির প্রোডাক্ট ফিল্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর। এখানে আপনাকে বুঝতে হবে, আপনার কোম্পানি আপনার উপর ততোখানি বিশ্বাস করে বলেই আপনাকে এই কাজটি দিয়েছে। তাই আপনারও উচিত হবে কোম্পানির আস্থা ধরে রাখা। আর এই আস্থা ধরে রাখতে পারলে আপনার উন্নতি কেউ আটকে রাখতে পারবে না। কিন্তু আপনি যদি অসৎ পথে চলেন, তাহলে কোম্পানি আপনার উপর আস্থা হারাবে, আপনিও আপনার চাকরি হারাবেন। ফলে আপনার সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রশস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে।

তরুণদের জন্য কিছু উপদেশ

জি এম কামরুল হাসানের মতে, আমাদের দেশের তরুণ সমাজ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মেধাবী। এসব মেধাবী তরুণদের সফলতার পথে হাঁটতে হলে স্বপ্নের সাথে আঠার মতো লেগে থাকতে হবে, ভেঙ্গে যাওয়া চলবে না। তাদের তিনি বিনয়ের সাথে চেষ্টা চালিয়ে যেতে বলেছেন এবং এই চেষ্টা যাতে দৃশ্যমান হয় সেদিকে নজর রাখতে বলেছেন। প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে আগের চেয়ে আরো বেশি স্কিলড করতে হবে। তাহলে সাফল্য যে হাতছানি দিবেই, উনি এই ব্যাপারে বিশ্বাসী।

সহায়ক কিছু বই

জি এম কামরুল হাসান দুটি বইয়ের কথা বলেছেন যা তার জীবনে উন্নতির পথে চলতে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। “Good to great: why some companies make the leap and others don’t এবং You can win” – এই দুটি বই তাঁর চলার পথের উৎসাহ জুগিয়েছে। পাঠকরা এই দুইটি বই থেকে লিডারশিপ সম্পর্কিত কিছু আইডিয়া পাবেন এবং বেশ কিছু মোটিভেশনাল কথা জানতে পারবেন।

সেলস সম্পর্কিত আরও বই পেতে  

 

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading