শেফ ইন্ডাস্ট্রিতে বাড়ছে সম্ভাবনা! কিন্তু কেন?

11

বর্তমান বিশ্বে কালিনারি আর্টস একটি অনেক বড় ও সম্মানজনক ফুড ইন্ডাস্ট্রি। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ বিষয়টি প্রথমে বুঝতে চান না। তরুণরা যখন এই সেক্টরে আসতে চান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবার বাধ সাধে। কিন্তু এই তরুণরাই যখন মাইগ্রেশনের জন্য যখন কানাডার মত বিভিন্ন দেশে আবেদন করছেন, তখন আইনজীবী  তাদেরকে শেফ কোর্স করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তখন তারা বুঝতে পারেন এই কোর্সটি কতটুকু জরুরি ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে কালিনারি আর্টসের মূল্যায়ন ও সম্ভাবনা কতটুকু। তাই আমি বলব, কালিনারি আর্টসকে আমাদের দেশের আঙ্গিকে না দেখে ফুড প্রোডাক্শনের আঙ্গিকে ও প্যাশনের জায়গা থেকে দেখতে হবে। বিশ্বের বড় বড় শেফদের ফলৌ করতে হবে। দেখতে হবে তারা কতটুকু সম্মান পাচ্ছেন, তাদের স্যালারি স্ট্যান্ডার্ড কেমন। তাহলে বুঝা যাবে এটি আমাদের দেশের তরুণদের জন্য কতটুকু সম্ভাবনাময়ী ইন্ডাস্ট্রি হতে পারে। কথাগুলো বলছিলেন ওয়ার্ল্ড মাস্টার শেফ’স সোসাইটির স্বীকৃতি অর্জনকারী বাংলাদেশের প্রথম মাস্টার শেফ ড্যানিয়েল সি গোমেজ। যিনি প্রায় দুই যুগ ধরে দেশ ও দেশের বাইরে ইন্টারন্যাশনাল চেইন হোটেলে কাজ করেছেন। বর্তমানে কালিনারি ইন্ডাস্ট্রিতে বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন।

রবি আজিয়াটা লিমিটেডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জাবেদ পারভেজের সঞ্চালনায় রকমারি ক্যারিয়ার কার্নিভালের ক্যারিয়ার ক্যাফে লাইভে অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন মাস্টার শেফ ড্যানিয়েল সি গোমেজ। প্রায় ঘন্টাখানেকের আলোচনায় ড্যানিয়েল সি গোমেজ কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশী তরুণদের করণীয় ও উপায় নিয়ে কথা বলেন। সঞ্চালকের প্রশ্ন ও ড্যানিয়েল সি গোমেজের নিখুঁত জবাবে আলোচনায় কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রির নানা খুঁটিনাটি বিষয় উঠে আসে। ক্যারিয়ার ক্যাফে লাইভের আলোচনায় বেরিয়ে আসা এইসব খুঁটিনাটি ও জানা-অজানা দিক নিয়েই এই লেখাটি।

কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রি

ড্যানিয়েল সি গোমেজ বলেন, কালিনারি আর্টস মূলত ফুড প্রোডাক্শন বা খাদ্য তৈরি করা। আমাদের পরিবারের সদস্যরা আমাদের জন্য যেসব খাদ্য তৈরি করেন সেগুলোও আর্টসের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু এই খাবার তৈরির বিষয়টিকে আমরা যখন বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে আসি তখন এটাকে আমরা কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রি বলে সংজ্ঞায়িত করছি। একটু উদাহরণ দেওয়া যাক। মনে করুন আপনি একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে স্যুপ অর্ডার করলেন। আপনি দেখতে পেলেন স্যুপের নিচে ফায়ার জ্বলছে। এই অবস্থা থেকে স্যুপকে পুরোপুরি খাবার যোগ্য করে আপনার সামনে পরিবেশন যোগ্য করে তোলার পুরো ব্যপারটি একটি আর্টস বা শিল্প। যেহেতু এই স্যুপের বিনিময়ে আপনাকে নির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করতে হবে, তার মানে এই শিল্পটির আর্থিক বা বাণিজ্যিক সঙ্গতি রয়েছে। তখন আমরা বলতে পারি এই আর্টসটি একটি ইন্ডাস্ট্রিতে রূপ নিয়েছে। যাকে আমরা এখানে বলছি কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রি

কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রির পরিধি

কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রির পরিধি ব্যাপক। খাদ্য তৈরির উপকরণ বা কাঁচামাল সংগ্রহ, খাদ্য তৈরি ও তৈরিকৃত খাবারকে অতিথির টেবিলে পরিবেশন করা কিংবা প্যাক করে কাস্টমারের দরজায় পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটি বিষয় কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রির অন্তর্গত।

শেফ কে?? 

কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় আর্টিস্ট একজন শেফ। শেফ শব্দটি ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে। যার অর্থ প্রধান বা নেতা। ফরাসি শব্দ ‘Chef de cuisine’ (শেফ দো ক্যুজিন) এর অর্থ ‘চিফ অব কিচেন’। অর্থাৎ কিচেনের প্রধানকে বলা হয় শেফ। অন্যভাবে বলা যায় শেফ হচ্ছেন একজন কমার্শিয়াল কুক। শেফের দক্ষতার উপর প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুনাম নির্ভর করে। শেফের কাজ শুধু সুস্বাদু রান্না করা নয়, খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, গুণাগুণ রক্ষা, সঠিক কায়দায় পরিবেশন ও পরিপার্শ্বিক নিরাপত্তা সম্পর্কে সতর্ক থাকাও শেফের দায়িত্ব। এছাড়াও একজন শেফের হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও ট্যুরিজম ব্যবসা সংক্রান্ত ধারনাও থাকতে হয়। একসময় প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছাড়াও শুধুমাত্র অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শেফ হিসেবে কাজ করা যেত। কিন্তু বর্তমানে কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রির উত্তরোত্তর অগ্রগতির এই জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যে কারণে কালিনারি আর্টস ইন্ডাস্ট্রিতে প্রফেশনাল শেফের চাহিদা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্যাশন থাকা চাই

মাস্টার শেফ ড্যানিয়েল সি গোমেজ বলেন, একজন ভালো শেফ হতে হলে অবশ্যই প্যাশনেট হতে হবে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সংমিশ্রণ ঘটাতে পারলেই কেবল একজন ভালো শেফ হয়ে উঠা সম্ভব। খাবার তৈরি থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সবগুলো কাজের সাথে একজন শেফের হৃদয়ের ঘনিষ্ঠতা থাকে। খাবার গ্রহণের পর অতিথি যখন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন তখনই একজন শেফ নিজের শ্রমকে সার্থক ভাবার সুযোগ পান এবং নিজেও পরম তৃপ্তি লাভ করেন। তাই শেফ হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার পূর্বশর্ত হলো প্যাশন থাকা।

শেফ পেশায় সম্ভাবনা

শেফ ইন্ডাস্ট্রিকে খুবই সম্ভাবনাময়ী ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে উল্লেখ করে মাস্টার শেফ ড্যানিয়েল সি গোমেজ বলেন, গত দশ বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মানুষ আগে শুধুমাত্র বিভিন্ন উৎসব ও দিবসে রেস্টুরেন্টে যেত। কিন্তু এখন মানুষ রেস্টুরেন্টমুখী হচ্ছে খুব বেশি। বর্তমান অর্থনীতিতে শুধুমাত্র পুরুষের একা আয়-রোজগারে টিকে থাকা কঠিন। তাই নারীরাও এখন সমানতালে বাইরে কাজ করছেন। যে কারণে মানুষের রেস্টুরেন্ট নির্ভরতা বাড়ছে আর শেফ ইন্ডাস্ট্রিও বড় হচ্ছে। একজন শেফের কাজ করার জায়গাগুলো হলো রেস্টুরেন্ট, ফাস্ট ফুড শপ, বেকারি, হোটেল, মোটেল ও ট্যুরিজম এজেন্সি এমনকি শিপেও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

শেফ পেশায় চ্যালেঞ্জ

চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে ড্যানিয়েল সি গোমেজ বলেন, শেফ ইন্ডাস্ট্রিতে ধৈর্য থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। প্যাশন নিয়ে যারা কাজ করতে পারেন, তাদের সবার সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিজের উদারহণ টেনে তিনি বলেন, আমি ২০০২ সালে বাংলাদেশের শেরাটন হোটেলে কাজ করেছি। সে সময় যিনি চিফ শেফ ছিলেন, তার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। তখন আমি মনে মনে চ্যালেঞ্জ করেছি যে, এক সময় আমি চিফ শেফের অবস্থানে কাজ করবো। আজ দীর্ঘ ১৮ বছর পর এই অবস্থানে কাজ করছি। ধৈর্য ও প্যাশনের কারণেই আমার পক্ষে এটি সম্ভব হয়েছে। তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শেফ কোর্স করার বেশির ভাগ লোককে দেখছি চাকরি খুঁজছেন। আমি তাদের বলব, সবাই চাকরি না খুঁজে কেউ কেউ উদ্যোক্তাও হতে পারেন। প্রথম অবস্থায় আমাদের কিচেন অবশ্যই প্যারিসের সমতুল্য কোনো কিচেন হবে না, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কাছাকাছি তো পৌঁছাতে পারব। নারীদের ক্ষেত্রে যারা সংসারের কারণে বাইরে সময় দিতে পারছেন না, তাদেরও হতাশ হবার কারণ নেই। আপনি চাইলে ঘরে বসেও উদ্যোক্তা হতে পারেন। এখন হোমমেড ফুডের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। ধৈর্য ও প্যাশন নিয়ে এগোলে সফলতা আসবে।

শেফ হতে পারেন সবাই

নারী-পুরুষ যে কেউ চাইলে শেফ ইন্ডাস্ট্রিতে আসতে পারেন। প্যাশন থাকাটাই সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। মাস্টার শেফ ড্যানিয়েল সি গোমেজ বলেন, শেফ ইন্ডাস্ট্রিতে শুধুমাত্র একটি শব্দের ব্যবহার রয়েছে তা হলো ‘শেফ’। এখানে কোনো ‘মেল শেফ’ বা ‘ফিমেল শেফ’ এমন কোনো শব্দের ব্যবহার নেই। তাতেই বুঝা যায়, এই পেশাতে সবার জন্য সবার সমান সুযোগ এবং কাউকে ছোট-বড় করে দেখার সুযোগ নেই।

বয়সের ধরা-বাঁধা নেই

শেফ কোর্স করার জন্য বয়সের কোনো ধরাবাঁধা নেই। একইভাবে যেকোনো বয়সেই যে কেউ শেফ পেশায় ক্যারিয়ার শুরু করতে পারেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনার অভিজ্ঞতাও বাড়বে, সেই সাথে বাড়বে সুযোগ-সুবিধা ও স্যালারি।

শিক্ষিত হওয়া চাই

প্রফেশনাল শেফ কোর্স লেভেল-০১ এর জন্য ‘এসএসসি’ বা ‘ও লেভেল’ শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা চাই। আর ডিপ্লোমা ইন কালিনারি আর্টিস অথবা গ্র্যাজুয়েশন ইন কালিনারি আর্টসের জন্য ‘এইচএসসি’ বা ‘এ লেভেল’ শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে। ড্যানিয়েল সি গোমেজ বলেন, একসময় পড়াশোনাকে পাশ কাটিয়ে টেকনিক্যাল দিকগুলো শিখে অনেকে শেফ হতে পেরেছেন। কিন্তু বর্তমানে কালিনারি ইন্ডাস্ট্রি সম্পূর্ণ আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর হওয়ায় এখন শিক্ষাগত দিকগুলোকে বিবেচনা করা হয়। এই ইন্ডাস্ট্রি এখন শিক্ষিত ও আধুনিক ব্যক্তিরাই পরিচালনা করছেন।

খরচ খুব বেশি নয়

ড্যানিয়েল সি গোমেজের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল কালিনারি আর্টস ইনস্টিটিউটে (আইসিআই) প্রফেশনাল শেফ কোর্স-০১ ও ডিপ্লোমা ইন কালিনারি আর্টস কোর্স দুইটি পড়ানো হয়। প্রফেশনাল শেফ কোর্স-০১ তিন মাসব্যাপী একটি কোর্স। যাবতীয় খরচসহ চল্লিশ হাজার টাকায় এই কোর্সটি সম্পন্ন করা যাবে। ডিপ্লোমা ইন কালিনারি আর্টস এক বছর মেয়াদী কোর্স। আইসিআই থেকে এই কোর্স করতে খরচ হবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।

আনন্দ ধরা দেয়

একজন শেফের জীবনে কখনো কখনো কিছু আনন্দের মুহূর্ত এসে ধরা দেয়। ড্যানিয়েল সি গোমেজ তেমনই এক মুহূর্তের কথা বলছিলেন। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে এসেছিল আর্জেন্টিনা ফুটবল টিম। সে সময় বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির পুরো আর্জেন্টিনা টিমের শেফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ড্যানিয়েল সি গোমেজ। নিজের তৈরি করা খাবার হোটেল রুমে পরিবেশন করেছেন প্রিয় খেলোয়াড় লিওনেল মেসির সামনে। ড্যানিয়েল সি গোমেজ বলেন, এই সুখস্মৃতি কখনো ভোলার নয়।

চ্যালেঞ্জ নিতে ইচ্ছুক তরুণদের জন্য শেফ হতে পারে দারুণ পেশা। এই পেশার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো বয়সের সাথে সাথে মর্যাদা বৃদ্ধি। ড্যানিয়েল সি গোমেজ বলেন, আমি আঠারো বছর বয়সে যে বেতন পেয়েছি, পঁয়তাল্লিশ বছরে এসে আশি গুণ বেশি বেতন পাচ্ছি। বিমানবালার সাথে তুলনা দেখিয়ে তিনি বলেন, বিমানবালারা আজীবন বিমানে থাকেন না। একটা বয়সের পর তারা ম্যানেজমেন্টের কাজের সাথে যুক্ত হন। কারণ- অধিক বয়সকে বিমানবালা হিসেবে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত হিসেবে মনে করা হয় না। কিন্তু শেফ পেশা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। শেফ আজীবন উপভোগযোগ্য একটি পেশা।

ক্যারিয়ার বিষয়ক বইগুলো পেতে 

 

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading