বাংলাদেশের প্রথম বীজ ব্যাংক গড়ে উঠার গল্প

14

রাজশাহীর প্রবীণ কৃষি উদ্যোক্তা ইউসুফ মোল্লা। তিনি বাংলাদেশে প্রথম কৃষি বীজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৮ সাল থেকে বীজ সংগ্রহের শুরু। ২০১৫ সালে এসে গড়ে তোলেন ‘বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক’। তার বীজ ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিনশ প্রজাতির পুরাতন ও দেড়শ প্রজাতির জীবিত ধানের বীজ রয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের কাছে ইউসুফ মোল্লা এক অনুকরণীয় নাম। রকমারি ক্যারিয়ার কার্নিভালের ক্যারিয়ার ক্যাফে লাইভে আমন্ত্রিত হয়ে ইউসুফ মোল্লা তার কৃষি উদ্যোগ ও কৃষি সংক্রান্ত সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। এসময় তিনি সঞ্চালক প্রকৌশলী রাতুল খান ও দর্শকদের কৃষি সংক্রান্ত নানা প্রশ্নেরও জবাব দেন। ইউসুফ মোল্লার কৃষি উদ্যোগ ও তার কৃষি সংক্রান্ত পরামর্শের আলোকে এই লেখাটি সাজানো হয়েছে।

বীজ সংগ্রহের শুরু যেভাবে

ইউসুফ মোল্লা ১৯৬৮ সাল থেকে কৃষি বীজ সংগ্রহ শুরু করেন। তিনি বলেন, সে সময়ে অনেক রকমের গহনা বা অলংকারের প্রচলন ছিল। আমি দেখতে পেলাম সময়ের সাথে সাথে সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। তখন আমার মনে হলো, এভাবে করে যদি কৃষিও হারিয়ে যায় তাহলে মানুষ হিসেবে আমরা বাঁচতে পারবো না। কৃষিকে বাঁচাতে হলে বীজের সংরক্ষণ জরুরি। তখন আমি কৃষি বীজ সংগ্রহ করতে শুরু করি। অনেকে আমাকে নিয়ে অনেক রকম নেতিবাচক কথা বলেছেন। কিন্তু আমি সেগুলোকে কানে না নিয়ে আমার মত করে বীজ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যেতে থাকি।

বীজ ব্যাংকের শুরু যেভাবে

ইউসুফ মোল্লা বলেন, ব্যাংক শব্দটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাকার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আমার মনে হলো, বীজেরও একটি ব্যাংক দরকার। যেখান থেকে মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জীবিত ও বিলুপ্তপ্রায় নানা জাতের বীজ সংগ্রহ করবে এবং জমা রাখবে। এই চিন্তা থেকে আমি ২০১৫ সালে ‘বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করি। বর্তমানে কৃষকেরা বিভিন্ন জাতের বীজের প্রয়োজনে আমার বীজ ব্যাংকে আসেন এবং তারাও বীজ এনে ব্যাংকে জমা রাখেন। এতে করে পুরো কৃষি সম্প্রদায় উপকৃত হতে পারছে।

সব রকমের বীজের সংগ্রহ

ইউসুফ মোল্লা বলেন তার বীজ ব্যাংকে ধানের বীজ ছাড়াও অন্যান্য সব রকমের কৃষি বীজের সংগ্রহ রয়েছে। যেমন- ডাল, মটর, খেসারি, কালোজি সহ নানা রকমের মশলার বীজ রয়েছে।

নবান্ন উৎসবে বীজ বিনিময়

ইউসুফ মোল্লা বলেন, বরেন্দ্র বীজ ব্যাংকের সাথে সারাদেশের কৃষকেরা সম্পৃক্ত রয়েছেন। বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক প্রতি বছর একটি নবান্ন উৎসব উদযাপন করে থাকে। সে উৎসবে সারাদেশ থেকে কৃষকেরা যোগ দেন। নবান্নে উৎসবে বীজ বিনিময় ঘটে। কৃষকেরা তাদের উদ্ভাবিত বা সংগ্রহকৃত বীজ বরেন্দ্র বীজ ব্যাংকে জমা রাখেন এবং বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক থেকে তাদের প্রয়োজনীয় বীজ সংগ্রহ করেন। তবে নবান্ন উৎসব ছাড়াও অন্য যেকোনো সময় বীজ সংগ্রহ ও জমা করা যায়।

দুই সের দিলে এক সের মিলে

ইউসুফ মোল্লা বলেন, আমাদের বীজ ব্যাংকে টাকার মাধ্যমে কোনো বিনিময় ঘটে না। বীজের মাধ্যমেই আমরা বিনিময় করে থাকি। বীজ ব্যাংক থেকে এক সের বীজ নিলে বীজ ব্যাংককে অন্য যেকোনো দুই সের বীজ প্রদান করতে হয়। এক সেরের বিনিময়ে দুই সের বীজ সংগ্রহের কারণ হলো- বীজ পরিস্কার ও ঝাড়াবাছা করার সময় বীজের পরিমাণ কমে আসে। এই কৃষক থেকে সংগ্রহকৃত বীজগুলো আমরা বীজ ব্যাংকে সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ করে থাকি।

ইউসুফ মোল্লার উদ্ভাবিত ধান

ইউসুফ মোল্লা শুধু বীজ সংগ্রহ নয়, উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবনেও কাজ করছেন। তিনি ও তার এক বন্ধু মিলে ইতিমধ্যে তিন জাতের ধানের বীজ উদ্ভাবন করেছেন। ইউসুফ মোল্লার উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলো হলো- রানারশাল, অহনা ও রূপকথা। এদের মধ্যে রানারশাল জাতটিকে এই বছর উন্মুক্ত করা হয়েছে। ইউসুফ মোল্লা বলেন রানারশাল জাতটি প্রাকৃতিক ভাবে শতভাগ পোকা প্রতিরোধী।

দেশি জাত পরিবেশ সহায়ক

ইউসুফ মোল্লা বলেন, বেশি ফলনের আশায় বেশিরভাগ কৃষক হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করছেন। হাইব্রিড ধান চাষে ব্যয় বেশি হয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। হাইব্রিড ধানের জন্য ক্ষেতে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার সহ নানা উপাদান ব্যবহার করা হয়। এতে মাটিতে বাসকারী ছোটখাটো অনেক প্রাণীর জীবন হুমকির মুখে পড়ে। পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য সব ধরনের প্রাণীর প্রয়োজন রয়েছে। পক্ষান্তরে দেশি জাতের ধান চাষ করলে কীটনাশক ও রাসায়নিক উপাদানের প্রয়োজন হয় না। এতে করে ব্যয় কম হয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় না। হাইব্রিডে ফলন বেশি কিন্তু ব্যয়ও বেশি। দেশি জাতে ফলন কম হলেও, ব্যয় কম ও এটি পরিবেশের জন্য সহায়ক।

কৃষকের পাশে কৃষক স্কুল

ইউসুফ মোল্লা ২০১২ সালে কৃষক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষক স্কুলের মাধ্যমে তিনি কৃষকদের সমবেত করে তাদেরকে কৃষি সংক্রান্ত নানা পরামর্শ সেবা দিয়ে থাকেন। কৃষক স্কুল কৃষকদেরকে কৃষি বিষয়ক বইও প্রদান করে থাকে।

তরুণদের পাশে বীজ ব্যাংক

ইউসুফ মোল্লা বলেন, বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে সুন্দর কৃষি তুলে দেওয়ার জন্যেই তো আমরা বীজ ব্যাংক গড়ে তুলেছি। তরুণরা কৃষি কাজে আগ্রহী হলে তাদের জন্য বীজ ব্যাংকের দরজা সব সময় খোলা। তারা এখান থেকে বীজ সংগ্রহ করতে পারবে। পরামর্শ নিতে পারবে। আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি।

নতুনদের সুযোগ বেশি

ইউসুফ মোল্লা বলেন, আমি পুরাতন যুগের মানুষ। কম্পিউটার ইন্টারনেটের ব্যবহার জানি না। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির ফলে তরুণদের যেকোনো বিষয় আগের চেয়ে বেশি জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা কৃষি কাজে আগ্রহী হলে কৃষি কাজে নিত্য নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। এতে করে আমাদের কৃষি এগিয়ে যাবে।

কৃষিতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ইউসুফ মোল্লাকে জাতীয় পরিবেশ পদক প্রদান করে। ইউসুফ মোল্লারা নিজ প্রচেষ্টায় আমাদের কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এক অন্যন্য উচ্চতায়। ইউসুফ মোল্লাদের মত আরও যারা এভাবে আমাদের কৃষিকে আগলে রাখছেন তাদের সবার জন্য আমাদের ভালোবাসা।

কৃষি বিষয়ক বইগুলো পেতে 

 

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png