নদীর ওপারে কি সত্যিই সর্বসুখ?

nodir opare sorbo sukh

নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস,

ওপারেতেই সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।”

কবিগুরু যেন আমাদের জন্যই চরণ দুটি লিখে গিয়েছিলেন। লাইন দুটোকে আজকাল ভীষণ সত্যি হয়। 

ইশ! অমুক কত ভালো আছে!’, ‘ও কতো জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে! আমার জীবন যদি ওর মতো হতো!’

প্রতিদিনই আমাদের মস্তিষ্কে এমন বিভিন্ন চিন্তা চিন্তা ঘুরপাক খায়। সোশ্যাল মিডিয়ার যূগে এ যেন আরও বহুগুণে বেড়ে গিয়েছে। সবাই তার সুন্দর মুহূর্তটুকুই তার ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করে থাকেন। আর এসব নানা ছবি দেখে আমাদের মনে একটু একটু করে হতাশা জন্ম নেয়। এক সমুদ্র অতৃপ্তি আর অসন্তুষ্টি নিয়ে আমরা নদীর ওপারে ছুটতে চাই প্রতিনিয়ত।

সুখ পাখির সন্ধানে

চলুন, পুরনো উদাহরণটিকেই একটু অন্যভাবে দেখা যাক। ধরুন, আমাকে আর আমার বন্ধুকে দুটো পানির গ্লাস দেয়া হলো। পানি আছে অর্ধেক। এখন আমি আমার বন্ধুর গ্লাসের দিকে তাকালে দেখছি তার গ্লাসে অর্ধেক পানি আর  আমার গ্লাসটা অর্ধেকটা খালি। খুব মন খারাপ করে বসে আছি এটা নিয়ে।

আপনি হয়তো তেড়েফুঁড়ে এসে আমাকে বলতে পারেন, কেন কেন? আপনারও তো গ্লাসে অর্ধেকটা পানি আছে, তা দেখছেন না কেন?

ঠিক এই জিনিসটিই আমাদের জীবনে ঘটে। আমাদের কী আছে আমরা সেটার দিকে না তাকিয়ে অন্যের কী আছে সেটা দেখি আর অতৃপ্তিতে ভুগি। এখান থেকে শুরু হয় বিষাদ, তারপর হীনমন্যতা আর তা তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গেলে—ডিপ্রেশন! আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে নিজের কী কী আছে তা কেউ দেখিয়ে না দেয়া পর্যন্ত উপলব্ধি করতে পারি না।

আকাশ ছুঁয়ে দেখতে চাওয়া

আমরা জীবনে সবচেয়ে বেশি করে যা চাই তা ‘উন্নতি’। আমরা কেবল উপরে উঠতে চাই। কখনও কখনও এও মনে হয়, ইশ! আকাশটা ‍যদি ছুঁয়ে দেখা যেতো। এই যে থেমে না থাকা, ক্রমাগত জীবনের শেষ পর্যন্ত ছুটতেই থাকা—এটাই কি জীবন?

আমরা প্রথমে একটি লক্ষ্য স্থির করি। লক্ষ্যে পৌঁছে গেলে আবার নতুন গন্তব্যে ছোটা শুরু। নিজের অবস্থান নিয়ে যেন কখনওই সন্তুষ্ট থাকতে পারি না।

The miracle morning বইয়ে পাঠকের জন্য নোটে ঠিক এই কথাটিই বলা আছে-“মানুষের মধ্যে সাধারণ মিল এটিই—নিজস্ব জীবনের উন্নতি চাওয়া।”

মিরাকল মর্নিং
BUY NOW

নিজের উন্নতি চাওয়াটা অবশ্যই জরুরি কিন্তু তাই বলে অসীম চাওয়া?

সব পেলে নষ্ট জীবন

‘সব পেলে নষ্ট জীবন’ লাইনটা মনে আছে? বা ছোটবেলায় পড়া সেই ‘যা হয় ভালোর জন্য হয়’ গল্পটা? যেখানে রাজার আঙুল কেটে যাওয়ায় তার জীবন বেঁচে গিয়েছিলো। সেই রাজা কিন্তু আঙুল কাটার পর উজিরের কথায় প্রথমে ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়েছিলো। কারণ উজির বলেছিলো, যা হয় ভালোর জন্য হয়। আঙুল কাটাত মধ্যে আবার কী ভালো থাকতে পারে ভেবে রেগে গিয়ে তাকে নির্বাসিত করেছিলেন। রাজা অবশ্য পরে টের পেয়েছিলেন যা হয় আসলে ভালোর জন্যই হয়।

গল্পটা আমাদের প্রতিটি মানুষের জীবনে ছোট-বড় সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনো কিছু না পেলে, পেয়ে হারিয়ে ফেললে আমরা মেনে নিতে পারি না। জীবনকে অনর্থক মনে হয়। যা ভাগ্যদোষে হারিয়েছে তার জন্য আক্ষেপ করতে করতে বর্তমানে কী আছে তা ভুলে যাই। সন্তুষ্টি আর তৃপ্তি তো তখন এমমি’ই পালায়।

ছোটবেলার আরেকটা গল্প মনে আছে? ওই যে, মুচির গল্প। যে নিজেকে নিয়ে তুষ্ট ছিলো, পরম আনন্দে দিন কাটাতো। তারপর একদিন এক ধনী লোকের দেয়া টাকায় তার শান্তির ঘুমই উড়ে গেলো। শেষ অব্দি সেই টাকা ফেরত দিয়ে সে নিজের শান্তি নিয়ে ঘরে ফিরেছিল। সুখ আর সন্তুষ্টি মূলত নিজের কাছে।

নিশ্চিত প্রাপ্তির আশা ত্যাগ করা

আমাদের জীবনে সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হয় না। অনেক উত্থান পতন আসে। আমরা সবসময় নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে মরিয়া থাকি। ঠিকঠাক লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারলে হতাশ হয়ে যাই।

আমেরিকার বিখ্যাত অভিনেতা জেরিমি পিভেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,

একজন অভিনেতার মূল কাজ হচ্ছে অনুশীলন করা। আর অধিকাংশ অভিনেতারা যে সমস্যায় পড়েন তা হল তারা সরাসরি তাদের প্রত্যাশিত অভিনয় কৌশল অর্জন করতে চায়। কিন্তু তারা কখনই নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন নয় এবং নিজের সম্ভাবনাও যাচাই করে না।”

ঠিক আমরাও অন্যের দেখাদেখি সফল হতে চাই। নিজের সক্ষমতা কতটুকু আছে তা যাচাই করি না।

কাজে চাই শতভাগ আস্থা

গান্ধীজী বলেছিলেন,তখনই সুখী হওয়া যায় যখন চিন্তা, কথা কাজের সমন্বয় হয়।আমরা নিজের কাজের প্রতি আস্থাশীল থাকলেও অধিকাংশ সময় সম্পূর্ণ আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হই না। ফলে আমদের কাজের স্পৃহাও অনেক কমে যায়। তাই গবেষকেরা মনে করেন ৯৮ ভাগ আস্থা অপেক্ষা ১০০ ভাগ আস্থা রাখা সহজ। কারণ যদি কাজের ফলাফল ভাগ্যের উপর বিন্দুমাত্র ছেড়ে দেওয়া হয় তবে শুরু থেকেই কাজের প্রতি দুর্বলতা দেখা দেয়। তাই আশানরুপ ফল পাওয়াও সম্ভব হয় না। তাই নিজের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার জন্য নির্বাচিত কাজের প্রতি শতভাগ আস্থাশীল থাকতে হবে। নিজের কাজে সন্তুষ্ট হতে চাইলে নিজের উপর আস্থাও রাখা প্রয়োজন।

আত্মতৃপ্তিও প্রয়োজন

আমাদের জীবনে প্রাপ্তি যেমন আছে অপ্রাপ্তির সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু যদি আমরা অপ্রাপ্তি নিয়ে বেশি চিন্তা করি তাহলে প্রাপ্তির ফলভোগ হতে বঞ্চিত হব। গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মতৃপ্তি থাকার কারণে শরীর সুস্থ থাকে, মনে ও মাথায় চাপ কম থাকে, রক্তচাপ কম (স্বাভাবিক) থাকে, অধিক ব্যায়াম করে স্বাস্থ্যের ভাল যত্ন নেওয়া যায়, ভাল ঘুম হয় ফলে ঘুম থেকে উঠার পর প্রাণবন্ত থাকা যায়। আর মানসিকভাবেও ইতিবাচক চিন্তার পথ সুগম হয়, অধিক সতর্ক ও প্রাণবন্ত থেকে অধিক সুখ-শান্তি উপভোগ করা যায়। এছাড়াও সামাজিকভাবে অধিক দয়ালু, সহযোগী মনোভাব বাড়ানো, ক্ষমাশীলতা অর্জন ও একাকীত্ব দূর করা সম্ভব হয়।

কৃতজ্ঞ থাকার এত সুবিধার পরও আমরা অধিকাংশ সময় আমাদের অপ্রাপ্তি নিয়েই বেশি চিন্তা করি। কারণ নদীর অপর পাড়ের ঘাস বেশি সবুজ দেখায়। কিন্তু আমরা প্রকৃত সুখী তখনই হতে পারব যখন নিজের অর্জন নিয়ে সন্তুষ্ট বা কৃতজ্ঞ থাকব।

ভালোবাসার চর্চা

বন্ধুদের প্রতি ভালবাসার প্রকাশ  আমাদের মানসিক প্রশান্তিতে প্রভাব ফেলে। পলিনেশিয়ান বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সব সময় বলেন যে তারা অন্যদের ভালবাসে। কারণ তারা বিশ্বাস করেন যে, যখন তারা অন্যের প্রতি ভালবাসা ব্যক্ত করে তখন সেটি শুধু অন্যদেরই পরিবর্তন করে না বরং নিজেকে পরিবর্তন করতেও সহায়তা করে। শুধুমাত্র মুখে আরেকজনকে ভালবাসার কথা বলার মাধ্যমেই অন্যের প্রতি ভালবাসা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং এই ভালবাসা তার কাছে সম্পদে পরিণত হয়। আর যদি কখনও বলতে ভুলে যায় তখন তার অভাব অনুভব করে।

এ সম্পর্কে লেখক হ্যারিয়েট বিচার স্টো বলেন, কবরের উপর মর্মান্তিক চোখের পানি পড়ে শুধুমাত্র না বলা কথা আর ফেলে যাওয়া কাজের কথা মনে করে।তাই যত বেশি অন্যের প্রতি ভালবাসার প্রকাশ ঘটানো যায়, নিজের মনে ততো পরিমাণ আনন্দের দেখা মিলে।

গুরুত্বপূর্ণ কাজের উপর জোর দেওয়া

অধিকাংশ মানুষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ অপেক্ষা জরুরি কাজের উপর জোর দেয়। যেমন ধরুন, আমরা আমাদের চ্যাট-বক্স খুলেই উত্তর করতে শুরু করি। কিন্তু প্রকৃত সুখী ও সফল লোক আগে গুরুত্বের ভিত্তিতে বার্তাগুলো আগে জড়ো করে, আলাদা করে, তারপর উত্তর দেয়। জরুরি থেকে গুরুত্বের মূল্য অনেক বেশি। সুখী আর সন্তুষ্ট হতে এমন দু-একটা টোটকা মেনে চলেই দেখুন না…

যেকোনো কাজ যেমন- বই পড়া, শরীরচর্চা, লেখালেখি বা বন্ধুবান্ধবের সাথে সময় কাটানো জরুরি কাজ না হলেও প্রকৃত সুখী হওয়ার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বোত্তমটি অর্জন করুন

আমাদের জীবনে অনেক সুযোগ আসে কিন্তু সবগুলো আমাদের জন্য দরকারি না। আমরা যদি সব সুযোগই গ্রহণ করতে যাই তাহলে কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো না। তাছাড়া আমরা সবকিছু একসাথে অর্জনও করতে পারবো না কারণ আমরা প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট গন্ডিতে সীমাবদ্ধ। তাই যা আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে সঙ্গতিপূর্ণ নয় তা বাদ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

যারা প্রকৃত সাফল্য ও সুখ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে দেখা যায় তারা অনেক লোভনীয় বস্তুও সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় ত্যাগ করেছেন। কারণ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সর্বোত্তম হল সঙ্গতিপূর্ণ বিষয় যা তার লক্ষ্যের সাথে যুক্ত। তাছাড়া জীবনের গতি কখনও একদিকে চলে না তাই যখন যেটি দরকার তখন সেখান থেকে সর্বোত্তমটি গ্রহণ করাই শ্রেয়।

ব্যর্থতাই সফলতার চাবিকাঠি

ব্যর্থতাই সফলতার চাবিকাঠি। আর যত বেশি ঝুঁকি ততো বেশি লাভ। তাই যদি আমরা ঝুঁকি গ্রহণ করতে ভয় পাই তবে কখনওই সাফল্যের মুখ দেখতে পারব না। যদি স্বাভাবিক ছকে বাঁধা জীবন যাপন করতে চাই তবে কখনোই আমরা অধিক সুখ অর্জন করতে পারব না। তাই যখনই আমরা কোন দুঃসাধ্য সাধন করতে যাব তখন আমাদের সচেতনতার পরিমাণও বাড়বে। সাথে সাথে সৃজনশীলতাও বৃদ্ধি পাবে যা আমাদের সাফল্যের দোরগোড়ায় নিয়ে যাবে। কাজ করতে গেলে অবশ্যই বিফলতা আসবে কিন্তু তাকে ভয় পেলে চলবে না বরং দিগুণ উৎসাহে পুনরায় কাজ শুরু করতে হবে তবেই সাফল্যের দেখা মিলবে।

তাই নদীর ওপারে না তাকিয়ে এপারেই সুখ খোঁজা যাক, কী বলেন?

লেখক হ্যারিয়েট বিচার স্টো’র সকল বই সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading