শিক্ষা উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বে ছায়াশিক্ষার প্রেক্ষাপট

2021-02-07 জনসংখ্যা কোনো সমস্যা নয়

স্বপ্নের পথচলা শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে। মাত্র ৫/৬ জন মানুষ আর অল্প কিছু বই নিয়ে গুটি গুটি পায়ে শুরু হয় ছোট রকমারির বড় যাত্রা! সারা দেশে বই ছড়িয়ে দিয়ে বইপ্রেমী মানুষদের প্রিয় হয়ে ওঠে আজকের এই রকমারি ডট কম। যার স্বপ্নের পথ ধরে এত দূর এলো রকমারি ডট কম, সেই স্বপ্নবাজ মানুষটি হলেন মাহমুদুল হাসান সোহাগ; বাংলাদেশের একজন সফল উদ্যোক্তা হিশেবে, বিশেষ করে একজন শিক্ষা উদ্যোক্তা হিশেবে যার নাম সবার প্রথমে মনে হয়।

বর্তমানে তিনি অন্যরকম গ্রুপ এর চেয়ারম্যান এবং সি ই ও । পাইল্যাবস বাংলাদেশ লি. এর চেয়ারম্যান। উদ্ভাস এ্যাকাডেমিক ও এ্যাডমিশন কেয়ার এবং উন্মেষ মেডিকেল ও ডেন্টাল কেয়ার এর পরিচালক। রকমারি ক্যারিয়ার কার্নিভালের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে ও বাংলাদেশের বাইরে ছায়াশিক্ষার প্রেক্ষাপট, উদ্যোগ এবং উদ্যোক্তা বিষয়ে কথা হয়েছিল মাহমুদুল হাসান সোহাগের সঙ্গেও।

সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বাধা ব্যর্থতাগুলো কী কী?

 

যখন কোনো মানুষের চেষ্টায় কোনো কিছু দাঁড়িয়ে যায়, তখন মানুষ কেবলমাত্র সামনের বিষয়টাই দেখে, পেছনের পরিশ্রমটা দেখে না। ধরেই নেয় তিনি একজন সুপারম্যান, কাজটা ধরেছেন এবং সফল হয়েছেন। ব্যাপারটা মোটেও এরকম নয়। সবারই ভিন্ন ভিন্ন গল্প রয়েছে। যে কোনো একটি সাকসেস অনেকগুলো ব্যর্থতার ঘাড়ে চেপেই আসে। যারা ব্যর্থতাকে ব্যর্থতা মনে করে, তারা মোটেই আশাবাদী মানুষ নন। আর যারা ব্যর্থতাগুলোকে অভিজ্ঞতা হিশেবে নেন, ব্যর্থতাকে উপরে ওঠার ধাপ হিশেবে ধরেন তারাই সফল হন। একলাফে তো কেউ ছাদে উঠতে পারে না, স্টেপ বাই স্টেপ উঠতে হয়। ব্যর্থতা হলো সফল হওয়ার পথের স্টেপ।

মাহমুদুল হাসান সোহাগ বলেন, তার জীবনে ২৮-২৯ টি ফেইলওর প্রজেক্টের তালিকা তিনি করেছিলেন, যার মধ্যে ১০-১২ টি পরিপূর্ণ লিমিটেড কোম্পানি ছিল। তবে সেই লিস্টও পূর্ণাঙ্গ ছিল না। যতটুকু তার স্মৃতিতে এসেছে ততগুলোই তিনি লিস্ট করেছেন। তবে তিনি মনে করেন, আনুমানিক ৫০ টি উদ্যোগে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। যেমন- তার হেলিকপ্টারের একটি প্রজেক্ট ছিলো, অনেক দিন চেষ্টা করেছিলেন হেলিকপ্টার বানানোর, যা ৩০-৪০ কেজি ওজন বহন করতে পারবে। সেখানে তিনি ব্যর্থ হন। বায়ো ফুয়েল’র একটি প্রজেক্ট ছিল, যেখানে প্ল্যান্টস থেকে ফুয়েল তৈরি করার কাজ তিনি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। আবার ইসলামিক মোটিভেশনের আগে তিনি একটি প্রোডাকশন হাউজ করেছিলেন, যেখানে ইউনিলিভারসহ আরও বড় বড় ব্র্যান্ডের কাজ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়। এছাড়া স্কুল, গেম স্টুডিও থেকে শুরু করে লিমিটেড কোম্পানি ফর্মে থাকা অনেক প্রজেক্ট ছিল, যেগুলো সফলতার মুখ দেখেনি।

তবে তিনি অন্যদের সতর্ক করে বলেন যে, বর্তমানে তার সফলভাবে দাঁড় করানো ৮ টি কোম্পানি এবং পূর্বের অনেকগুলো প্রজেক্ট ফেইলর দেখে অনেকেই মনে করতে পারে যে একসাথে হয়তো অনেক কিছু করতে হবে। কিন্তু এটা মোটেও ঠিক নয়। একসাথে কখনোই অনেক কিছু করে সফল হওয়া সম্ভব নয়। ফোকাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উদ্ভাসের সাথে তিনি লেগে ছিলেন টানা ৮ বছর। তারপরেই উদ্ভাস সফলতার মুখ দেখেছে। উদ্ভাস সফল হওয়ার পরেই তিনি অন্য প্রজেক্টগুলোতে মনযোগ দেন। উদ্ভাসের সাথে তিনি মাত্র একটি সফটওয়্যার কোম্পানি চালাতেন পাশাপাশি। এছাড়া অন্যান্য যেসকল সফল ও ব্যর্থ প্রজেক্ট, সেগুলো সবই উদ্ভাস সফল হওয়ার পরে করা।

তিনি আরও বলেন, যদি নিজের জীবনকে পুনরায় পেছনের দিকে নিয়ে গিয়ে আবার শুরু থেকে শুরু করার সুযোগ তাঁকে দেয়া হত, তাহলে তিনি কখনোই একসাথে এতগুলো কাজ করতেন না। খুব সীমিত কিছু কাজ করতেন। বরং তাঁর যেটা প্যাশনের জায়গা, ‘শিক্ষা’, সেখানেই তিনি আরও বেশি সময় দিতেন। ২০০০ সালের শেষের দিকে উদ্ভাসের যাত্রা শুরু। সেসময় তিনি সবে বুয়েটে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর এ্যাকাডেমিক ফলাফল বেশ ভালো ছিল। যে কারণে পরিবারের মানুষদের প্রত্যাশার জায়গাটা অনেক বেশি ছিল। উদ্ভাস খুলে বসলে সেসময় তাঁর মায়েরও ধারণা হয়, ছেলেকে হয়তো টাকার নেশায় পেয়ে বসেছে। সে কারণে মা তাঁকে বেশ কড়াভাবেই বাধা দেন এ ব্যাপারে। কিন্তু মা-কে বুঝিয়ে বলার পর মা এই শর্তে রাজি হন, যদি রেজাল্ট ভালো থাকে, তাহলে তিনি যা করছেন, তা করতে পারবেন। পরবর্তীতে তিনি বুয়েটে ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল করতে থাকেন এবং পাশাপাশি উদ্ভাস চালিয়ে যেতে থাকেন।

তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলে থাকে যে পরিবারকে ম্যানেজ করতে পারছে না, পরিবার যা বলে সেটা করতে চাই না। তিনি নিজের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তাঁর মা চেয়েছিলেন তিনি ডাক্তার হন কিংবা পিএইচডি করেন, কিন্তু তিনি প্রত্যেকবার তার নিজের পরিকল্পনা, নিজের আইডিয়াকে তাঁর পরিবারের কাছে সেল করেছেন বা সঠিকভাবে বোঝাতে পেরেছেন যে তিনি তার জীবন নিয়ে, প্যাশন নিয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস। ফলে পরিবার খুব বেশি আপত্তি করেনি। এভাবেই রেজাল্ট ভালো রেখে তিনি নিজের প্যাশন নিয়ে কাজ করে একটি বড় প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পেরেছেন। কখনোই ভাবা যাবে না যে পরিবার বুঝতে চায় না, সবসময়েই ভাবতে হবে যে, আমিই বোঝাতে পারিনি।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে শ্যাডো এডুকেশন এর অবস্থা বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে কেমন?

 

শ্যাডো এডুকেশন বলতে আসলে আমরা যেটাকে বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার বা ট্রেনিং সেন্টার বলি, সেটাকেই বোঝায়। এই টার্মটার সঙ্গে বর্তমানে অনেকেই পরিচিত, তবে এখনও অনেকে এটার ব্যাপারে জানেন না। এটি ইউনেস্কোর একটি টার্ম। স্কুল-কলেজ প্রকৃতপক্ষে মূল শিক্ষার প্রতিষ্ঠান এবং এটার বাইরে সার্পোটিভ এডুকেশনকে শ্যাডো এডুকেশন বলা হয়। মূল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে সহায়ক শিক্ষাদানের বিষয়টি সারা বিশ্বেই পরিচিত। এটা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে কেবল আছে- সেটাই নয় বরং বর্তমানে এটি বিস্তৃত হতে হতে অনেক বড় একটি জায়গায় এসে পৌঁছেছে।

ইউনেস্কোর শ্যাডো এডুকেশন নিয়ে গুগলে সার্চ করলে আরও বিস্তারিত জানতে পারা যাবে।  যেমন- জাপানের কথা বলা যায়। আমাদের কাছে জাপান একটি আদর্শ দেশ। সারা পৃথিবীতে জাপানের পণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন কিছু সমাদৃত। জাপান নিয়ে আমাদের দেশে সবার একটি ধারণা যে জাপানে কোনো কোচিং হয়তো নেই। তবে পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় ১২ ক্লাস পর্যন্ত এমন একটিও শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না যে কোচিং এ যায় না। জাপানে কোচিংকে বলা হয়- জুকু। বিভিন্ন ধরনের জুকু রয়েছে জাপানে। মাহমুদুল হাসান সোহাগ বলেন, বাংলাদেশে এই শ্যাডো এডুকেশন ব্যাপারটিকে আমরা নেতিবাচক হিশেবে দেখার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে।

প্রথমত, ইনফরমেশন গ্যাপ। আমরা ধরেই নিয়েছি যে উন্নত দেশগুলো ইউটোপিয়ান ওয়ার্ল্ড বা কল্পনার রাজ্য। সবাই স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে, এরপর আর কিছু দরকার হয় না। ছেলে-মেয়েদের সমস্ত পড়াশোনা স্কুলেই হয়। তাদের বাসায় এসে পড়াশোনা করতে হয় না। তারা আনন্দে দিন পার করে এবং বড় বড় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়। শিক্ষাখাতে কোন দেশ কেমন এটির একটি গ্লোবাল র‍্যাংকিং হয়, যেটাকে বলা হয় ‘পিসা’ র‍্যাংকিং। শেষ ১০-১৫ বছরের ট্রেন্ড দেখলে দেখা যাবে, কোন দেশগুলো র‍্যাংকিং টপ পজিশনে রয়েছে। এখানে দেখা যায় সর্বদা সেরা ৫ এর মধ্যে ৪টি দেশই থাকে এশিয়ার। এছাড়া এর বাইরে ফিনল্যান্ড থাকে। তবে ফিনল্যান্ড বাদ দিলে থাকে সাউথ কোরিয়া, জাপান, হংকং, সিঙ্গাপুর। এর ভেতরে যদি সাউথ কোরিয়ার কথা বলা যায়, তাহলে দেখা যাবে সাউথ কোরিয়াতে সারবিশ্বের সবচেয়ে বেশি কোচিং সেন্টার রয়েছে। সাউথ কোরিয়ান সরকার কোচিংকে বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল এবং কোচিং সেন্টার ব্যান করেছিল। ব্যান করার পর দেখা যায় কোচিংগুলো আরও বেড়ে যায় এবং আরও ব্যয়বহুল হয়ে যায়। যে কারণে সাউথ কোরিয়ান সরকার কোচিং এর ওপর থেকে ব্যান সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

কেবল শিক্ষা খাতেই নয়, কোরিয়ান কোম্পানি স্যামসাং- বিশ্বজুড়ে টেক জায়ান্ট হিশেবে পরিচিত, যেখানে বেশিরভাগ টেক জায়ান্ট কোম্পানিগুলো আমেরিকান, সেখানে স্যামসাং এশিয়া থেকে তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় অনেক উপরে আছে।  কোরিয়ায় এমনভাবে কোচিং চলে যে তাদের স্টুডেন্টদের গড়ে বাসায় ফেরার সময় হচ্ছে রাত ১-২টা। তিনি বলেন যে, তিনি সাউথ কোরিয়ান সিস্টেমকে আদর্শ হিশেবে ধরছেন না বরং তিনি ট্রেন্ডটা বোঝানোর চেষ্টা করছেন। সেই কোরিয়া যাদের শিক্ষার্থীদের গড় ঘুমানোর সময় ৪-৫ ঘন্টা, তারা কীভাবে স্যামসাং এর মতো একটি কোম্পানি তৈরি করতে পেরেছে!

এর মূল কারণ হচ্ছে, আমরা বৈশ্বিক একটি প্রতিযোগিতার ভেতরে ঢুকে পড়েছি। ক্যাপিটাললিজম এর সিস্টেমটাই এমন যে অন্যদের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয়। সারা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যাবে এই প্রতিযোগিতার চিত্র। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও রয়েছে কোচিং সেন্টার। এমনকি অস্ট্রেলিয়াতে কোচিং করলে সরকার থেকে বিশেষ ট্যাক্স সুবিধা দেয়া হয়। আমেরিকায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের কোচিং এর ফি সরকার বহন করে। এর মূল কারণ হচ্ছে এই যে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এটা ভাল-মন্দ যাই লাগুক, এই প্রতিযোগিতায় যেহেতু অংশ নিতেই হবে, সেহেতু সব দেশই চায় অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে এগিয়ে যেতে। সেখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যদি স্কুল-কলেজে যথেষ্ট হয়েও থাকে , তবুও একটু অতিরিক্ত প্রচেষ্টা থেকে, প্রশিক্ষণ থেকে তাদের যদি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে তা সবাই কাজে লাগাতে চায়। এ কারণেই কোরিয়ার মতো দেশ এতো পরিশ্রম করে এতদূর আসতে পেরেছে।

আমাদের দেশের একটি ধারণা এরকম যে, আমরা উন্নত দেশ হবো, সারাবিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো, আমাদের দেশের মানুষ ভাল জায়গায়  নেতৃত্ব দেবে, অথচ আমরা কোনো প্রতিযোগিতা করতে পারবো না, কিছুই পারবো না। এই চিন্তাধারার বদল না করলে এই দেশের এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কেননা- আমাদের দেশের একটি শিক্ষার্থীকে বিশ্বে এগিয়ে যেতে হলে তাকে জাপানিজ, চাইনিজ, কোরিয়ান, ইউরোপিয়ান শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে যেতে হবে। তারা প্রচন্ড পরিশ্রম করছে সারাদিন আর আমরা মাত্র ২-৩ ঘন্টা পরিশ্রম করে সবকিছুই জয় করে ফেলব এই ভাবনা কখনই বাস্তব সম্মত নয়। এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অবশ্যই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে পরিশ্রম করতে হবে। আর তা না হলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী বা উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখা যাবে না। সেক্ষেত্রে অন্যভাবে এগোতে হবে, ভুটান হওয়ার চেষ্টা করতে হবে, সুখী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তবে যদি অর্থনৈতিকভাবে সফল হতে হয় এই পুঁজিবাদী বিশ্বে, তাহলে প্রতিযোগিতা করেই এগিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশে শ্যাডো এডুকেশনের উদ্যোগ নেয়া এবং সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি কেমন?

 

কোচিং সেন্টারকে বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত নিচু চোখে দেখে।আবার যাদের ছেলে মেয়ে কোচিংয়ে পড়ে তারাই বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কোচিং এর বিরুদ্ধে কথা বলে। প্রথমত, এটার পেছনে মূলত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই দায়ী। আবার আমাদের বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা নেই, এই ব্যাপারটিও দায়ী। যেমন- উদাহরণ হিশেবে চায়নার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। চায়না পূর্বে ছিল সমাজতান্ত্রিক দেশ, কিন্তু বর্তমানে তাদের অর্থনীতি পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের সংমিশ্রণে চলছে। মার্কেট ইকোনমিতে প্রবেশের শুরুর দিকে তারা কোচিং শিক্ষা বা শ্যাডো এডুকেশনকে কেবল অনুমোদনই দান করেনি বরং মানুষকে কোচিং এর ব্যাপারে উৎসাহী করেছে। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে একই ব্যাপারটি সত্য। কেননা- তারা এটা উপলদ্ধি করেতে পেরেছিল যে, যেহেতু তারা মার্কেট ইকোনমিতে আসছে সেহেতু তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, আর প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে গেলে তাদের কোচিংয়ে উৎসাহ দান করার কোন বিকল্প নেই। আমাদের দেশের মানুষের কোন ধারণাই নেই যে, আমরা কোন মডেলে দেশকে নিয়ে যেতে চাইছি, কোনভাবে দেশটাকে গড়ে তুলতে চাইছ। ইকোনমি সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই, অথবা আমরা মুখস্থ করে পাশ করে এসেছি। বই এর লাইন এবং বাস্তবতার সাথে আমরা সংযোগ করতে পারি না।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক রোমান্টিসিজম এর একটি চল রয়েছে। যারা মার্ক্সবাদে বিশ্বাস করেন, তারা বাংলাদেশের বেশিরভাগ দেয়ালগুলো ভরে রেখেছে- শিক্ষা কোন পণ্য নয় জাতীয় শ্লোগানে। এই ধরনের শ্লোগানগুলো আমাদের মধ্যে একধরনের দ্বিধা তৈরি করছে। তাদের যেসব আদর্শ রাষ্ট্র, তারা বেশিরভাগই প্রচলিত পূর্বের ব্যবস্থা বাদ দিয়ে নতুন সিস্টেমে প্রবেশ করেছে, কিন্তু তারা এখনো সেই নস্টালজিক বিষয়টি ছাড়তে পারেননি। তার মানে এই নয় যে, সমতার কথা মিথ্যা। তবে সমতার দর্শনের পাশাপাশি ব্যবহারিকভাবেও আমাদের ভাবতে হবে। শিক্ষাগত দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তবে আমাদের মিডিয়ার একটি বড় অংশ নেতৃত্ব দিচ্ছে, যারা পূর্বে বাম রাজনীতি করত। তারা শিক্ষা -কে এমন একটি পবিত্র অবস্থানে বসিয়েছেন, যেখানে শিক্ষার সাথে বাণিজ্যের যদি সংযোগ ঘটে তাহলেই তারা সেটাকে তীব্র নেতিবাচক হিশেবে দেখেন। কিন্তু আমরা এইভাবে চিন্তা করি না যে, একজন যদি একটি কোচিং চালায়, সেবা দেয় তাহলে সে তার সার্ভিস বা সেবার একটি মূল্য নেবে। কিন্তু সেই মূল্য নেয়াটা কি এতটাই খারাপ? কেউ সার্ভিস দেবে তার বিনিময়ে কোন অর্থ দাবী করতে পারবে না? আবার তাহলে এই যুক্তিতে যদি দেখা যায়, তাহলে স্কুল-কলেজে শিক্ষক যে বেতন নেন, তিনিও খারাপ মানুষ। তাঁরও এই টাকা নেয়া উচিত নয়। শিক্ষা যদি বিনামূল্যে দেয়া হয়, তাহলে তাঁরও বেতন নেয়ার কোনো অধিকার নেই। আবার অনেকে বলতে পারে, স্কুল-কলেজের শিক্ষক তো কোন ব্যবসা করছেন না, তিনি বেতন নিচ্ছেন। সেই বেতনটা দিচ্ছে সরকার। সরকারকে টাকা দিচ্ছে দেশের মানুষ ট্যাক্স হিসাবে। ফলে আমাদের ইনকামের টাকা সরকার নিয়ে সেই টাকা শিক্ষককে বেতন হিশেবে দেয়। এখানে শিক্ষককে তেমন কিছু করতে হচ্ছে না, তাকে বেতন দেয়া হচ্ছে। তিনি শুধু পড়ানোর দ্বায়িত্বটা নিচ্ছেন। আর একজন কোচিং এর মালিক পড়ানোর দ্বায়িত্বের পাশাপাশি রেভেনিউ কালেকশনের দ্বায়িত্ব বহন করেন। এক্ষেত্রে কেউ তাকে টাকা তুলে দেয় না। কোচিং নিয়ে মানুষের একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কোচিং নেয়া থেকে। সেখানে বাধ্য করা হয় কোচিংয়ে যেতে। না হলে শিক্ষার্থী নম্বর পাবে না। মাহমুদুল হাসান সোহাগ বলেন, তাঁদের মতো যারা শ্যাডো এডুকেশন চালান তারা কাউকে বাধ্য করেন না, কেননা তাঁরা স্কুল কলেজের সঙ্গে যুক্ত নন। ফলে এখানের অর্থ আরও বেশি হালাল। হালাল এই জন্যেই যে, তাঁরা যদি ভাল সার্ভিস না দেন, তাহলে পরবর্তীতে সেই স্টুডেন্ট তাঁর কাছে আর পড়বে না। করোনাকালে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা না পড়ালেও বেতন পেয়েছেন, কিন্তু তাঁরা প্রতিষ্ঠান না চালালে কোনো টাকা পাননি। সার্ভিস দিলে তবেই তাঁরা টাকা পান। তাহলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পদ্ধতিতে কাজ করে। স্কুলে শিক্ষককে বেতন দেয়া হচ্ছে সরকার থেকে, সরকারকে জনগনই টাকা দিচ্ছে; আর এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি জনগণের কাছ থেকে সার্ভিসের বিনিময়ে টাকা নিচ্ছে। কেবলমাত্র দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে মানুষের নিচু ধারণা রয়ে গেছে।

আবার শিক্ষা উদ্যোগের সুযোগের কথা যদি বলা যায়, তাহলে বাংলাদেশে মার্কেট কত বড় এবং সেই মার্কেটে কিভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে সেটা বেশ জরুরি। যেমন- উদাহরণ হিশেবে বলা যায়, আমরা ১৬ কোটি মানুষের দেশ, কিন্তু আমরা রচনায় পড়েছি জনসংখ্যা একটি সমস্যা। সমস্ত ব্যাপারে আমরা নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা নিয়ে বসে আছি। সমস্ত পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে বড় অগ্রগতি করতে থাকা ক্ষমতাধর দুটি রাষ্ট্র হলো – ভারত এবং চীন। তারা কিসের জন্য ক্ষমতাধর হয়েছে বা হচ্ছে? অবশ্যই জনসংখ্যা বা মানব সম্পদ বা জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পেরেছে বলে। জনসংখ্যা কোনো সমস্যা নয়, জনশক্তিকে কাজে লাগাতে না পারাটাই সমস্যা। অথচ আমাদের আচরণ নেতিবাচক হয়ে আছে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু আমাদের ফোকাস যদি হতো এই জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলা, এই জনশক্তিকে সমৃদ্ধ করা; তবেই অর্থনৈতিক দিক থেকে আমরা অন্য দেশ থেকে অনেক এগিয়ে যেত পারতাম।

বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ এখন দেশের বাইরে কাজ করে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই স্কিলবিহীন অবস্থায় গিয়ে শ্রম নির্ভর কাজ করে। যদি ফিলিপাইন-এর সাথে বাংলাদেশের তুলনা করা যায়, তাহলে পরিসংখ্যানটা এরকম- ফিলিপাইনের প্রবাসীরা কাজ করে  ১ জন যে পরিমাণ রেমিটেন্স পাঠায় বাংলাদেশের প্রায় ৩.৫ জনের রেমিটেন্স একত্রে সেই রেমিটেন্স-এর সমপর্যায়ের হয়। এর মূল কারণ হচ্ছে, ফিলিপিনোরা তাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠায়, আর বাংলাদেশীরা সম্পূর্ণ আনস্কিলড বা দক্ষতাবিহীনভাবে পাঠায়। ফলে বিদেশে গিয়ে সবচেয়ে সস্তা কাজগুলো বাংলাদেশীদের করতে হয়। তাহলে এই জনশক্তিকে শিক্ষিত করা, শিক্ষিত করা বলতে কেবল স্কুল-কলেজ পাশই বোঝায় না, বরং প্রত্যেকটি স্তরে স্কিল বা দক্ষতা তৈরির জন্য প্রশিক্ষিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাহমুদুল হাসান সোহাগ এ ব্যাপারে নিজের একটি বাস্তব উদাহরণ উল্লেখ করেন-

তাঁর এক বন্ধু দুবাইতে সরকারি চাকুরী করে- ওয়াটার এন্ড ইলেকট্রিক সেক্টরে। সেখানকার অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে সেই বন্ধু জানিয়েছেন- তাদের কর্মক্ষেত্রে ৩০০ জন ওয়েল্ডিং এর মানুষের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। তিনি চেষ্টা করেছিলেন বাংলাদেশ থেকে কিছু কর্মী নিয়োগ করতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, তিনি তেমন কাউকে খুঁজে পাননি এই কাজে দক্ষ হিশেবে। সেখানে পরবর্তীতে ৩০০ জনের মধ্যে ৯৯% ভারতীয় মানুষ নিয়োগ পায়। এর মূল কারণ- দুবাইয়ে ম্যানেজারিয়াল লেভেলে ভারতীয়দের প্রাধান্য বেশি। ফলে তারা জানে এই কাজের চাহিদা কেমন। তাই তারা ভারতীয়দের এই কাজে প্রশিক্ষণসহ সার্টিফিকেট দিয়ে তৈরি করে রেখেছে। যে কারণে বেশিরভাগ ভারতীয় সেখানে নিয়োগ পেয়েছে। মাহমুদুল হাসান সোহাগ আরেকটি উদাহরণ জাপান থেকে দেন। জাপানেও এরকম ৩০০ নার্স নেয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশ দিতে পারেনি। সেখানে থাইল্যান্ড থেকে নার্সরা নিয়োগ পায়। বাইরের দেশে এত বিপুল পরিমাণ কাজের চাহিদা রয়েছে যে, আমাদের দেশ থেকে সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে, সামান্য ভাষা শিক্ষা দিয়ে পাঠালেই তারা সেই কাজগুলো অনায়াসে করতে পারবে। কিন্তু আমরা পাঠাচ্ছি শিক্ষা বিহীন, দক্ষতাবিহীন জনবল, যারা বাইরে গিয়ে সবচেয়ে সস্তা দরের কাজগুলো করছে।

কেবলমাত্র ফিলিপিনোদের স্তরে উঠলেই আমাদের দেশের রেমিটেন্স ৩.৫ গুণ বেড়ে যেত। এই ব্যাপারগুলোতে ঘাটতি থাকার একমাত্র কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা; যেখানে উদ্যোক্তা হওয়াকে, ট্রেনিং করানোকে খুব নিম্ন মানের হিশেবে বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই দেশের বাইরে থেকে কর্মী এসে, বিশেষ করে ভারতীয় এবং শ্রীলঙ্কান মানুষ এসে আমাদের দেশের উচ্চপদগুলোতে আসীন হচ্ছে; ৪০-৬০ হাজার কোটি টাকার বেতন প্রতিবছর নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের মানুষ দক্ষতার অভাবে তা পারছে না। এই দক্ষতার অভাব ঘটছে শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি থেকে, দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এই দক্ষতাগুলো কখনোই স্কুল-কলেজ বানাবে না। বানাবে ট্রেনিং সেন্টার, কোচিং সেন্টার। স্কুল-কলেজের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু তারা শিখিয়ে দেবে, অর্থাৎ মৌলিক জ্ঞানগুলো, কিন্তু এই বেসিক জ্ঞানকে প্র্যাকটিকাল স্কিলে পরিণত করতে সাহায্য করবে শ্যাডো এডুকেশন বা ট্রেনিং সেন্টারগুলো। এই ব্যাপারে আমাদের দেশের মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গি অতিদ্রুত পরিবর্তন করা প্রয়োজন। তা না হলে কোনো মেধাবী এই সেক্টরে আসবে না। ফলে দেশের মানুষ প্রশিক্ষিত হতে পারবে না।

পাশাপাশি মেধাবীদের এই সেক্টরে উদ্যোগে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। কেবল কোচিং সেন্টারই নয়। কেউ চাইলে ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম বানাতে পারে, কেউ চাইলে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সফটওয়ার বানাতে পারে, টিচার ট্রেনিং এর মডিউল বানানো যায়, টেকনোলজি সম্পর্কিত ইনোভেশন করা যায় এবং আরও নানান ভিন্ন ভিন্ন ভাবে শিক্ষা উদ্যোগ নেয়া সম্ভব। পুরো জায়গাটিতে অনেকগুলো স্তর আছে, যেটার সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক নতুন কিছু করা সম্ভব। মূল টার্গেটটি হলো বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করা।

শিক্ষা উদ্যোগের ক্ষেত্রে করণীয় এবং বর্জনীয়গুলো কী কী?

 

মাহমুদুল হাসান সোহাগ এ ব্যাপারে প্রথমেই বলেন, যে জিনিসটা আপনি ভালোভাবে বুঝবেন না, সেটা করতে যাওয়া বা সেটা নিয়ে উদ্যোগ নেয়া কখনোই উচিত নয়। শিক্ষা উদ্যোগের ক্ষেত্রে তিনি নিজের উদাহরণ টেনে বলেন- তিনি এবং আবুল হাসান লিটন যখন উদ্ভাস শুরু করেন, তখন তাদের শেখাতে বেশ ভালো লাগত। এই ব্যাপারে তারা দুজনেই প্যাশনেট ছিলেন। যদিও এটি কোনো ইউনিক আইডিয়া ছিল না কিন্তু পরবর্তীতে এটি ইউনিক হয়েছে কোয়ালিটির মাধ্যমে। কোয়ালিটি আবার নির্ভর করে অনেক সুক্ষ্ম বিভিন্ন জিনিসের উপর। যার ফলে কেউ একজন যে জিনিস ঠিকমতো বোঝে না বা জানে না বা প্যাশন নেই তার পক্ষে সেই সেক্টরে সেই মানের কোয়ালিটি তৈরি করা সম্ভব হবে না। তিনি আরও বলেন যে, আপনি কীসের উপর প্যাশনেট সেটার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আপনি কীসে ভালো বা কোন কাজটি আপনি ভাল পারেন। তবে এটা বেশিরভাগ সময়েই একে অপরের পরিপূরক যে, আপনি যে বিষয়ে প্যাশনেট হবেন সেখানেই আপনার পারফরম্যান্স ভালো থাকবে। আর তাই, কোন একটি মার্কেট অনেক ভালো কিংবা কোথাও একটি ভালো সুযোগ আছে, শুধুমাত্র এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে সেখানেই কাজ করতে থাকা ঠিক নয়। যেখানে ইচ্ছা আছে, প্যাশন আছে, যেটা আপনি ভালো পারেন, সেটাই করা উচিত। তবেই কাজটিকে ভবিষ্যতে আরও বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, তিনি মজা করেই বলেন- গায়ের চামড়া মোটা থাকতে হবে। অর্থাৎ অন্যের উপহাসে, অন্যের ঠাট্টায় কান দেয়া যাবে না। বাংলাদেশে বাণিজ্য ব্যাপারটাকেই বেশ খারাপ চোখে, নেতিবাচক চোখে দেখা হয়। উদ্যোক্তা হতে গেলেই নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে মানুষের অপমান হজম করার ক্ষমতা রাখতে হবে। এ প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে- First they ignore you, then they laugh at you, then they fight you, then you win.  কাজেই কেউ যদি আপনার কাজ নিয়ে ঠাট্টা বা খোঁচা দেয় তাহলেই বুঝবেন আপনি ইতিবাচক কিছু করছেন, আর যদি কেউ আপনার কাজ নিয়ে কথা না বলে তাহলে বুঝবেন আপনি তেমন কোনো পরিবর্তনযোগ্য কিছু করছেন না।

এছাড়া উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য যে বিষয়গুলো সর্বোপরি প্রয়োজন, সেগুলো অবশ্যই থাকতে হবে; যেমন- সঠিক মাইন্ডসেট, লেগে থাকা, পারসিভিয়ারেন্স, আত্মবিশ্বাস, মাথা খাটানোর প্রবণতা ইত্যাদি।

কোভিড-১৯ এর কারণে উদ্ভাস-উন্মেষসহ শিক্ষা খাতে কী পরিবর্তন এসেছে?

 

মাহমুদুল হাসান সোহাগ জানান, প্যান্ডেমিকেও তাদের পজিটিভ থেকেছে সবকিছু। উদ্ভাস-উন্মেষ-রকমারি সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০০ ফুল টাইম টিম মেম্বার রয়েছে। বেতন কাটতি করা হলেও এখনও কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি। তিনি বলেন, সবাই এরকম নিয়ত করে রেখেছেন যে যদি কম খাই, তাহলে সবাই মিলে কম খাব। সেইসাথে পুরো ব্যাপারটিকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখছেন এইভাবে যে উদ্ভাস-উন্মেষের অনেকদিন ধরে অনলাইন এডুকেশনে যাওয়ার কথা থাকলেও এই লকডাউনের মধ্যে তা কার্যকর হয়েছে। উদ্ভাস-উন্মেষ এর সমস্ত প্রোগ্রাম অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে। শিক্ষকরা অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীরা এই ব্যাপারটিকে বেশ ভালোভাবে স্বাগত জানিয়েছে। অনেক কম খরচে, প্রয়োজনে অনেক বেশি স্টুডেন্ট নিয়ে অনেক কার্যকরভাবে ক্লাসগুলো নেয়া যাচ্ছে এবং অনেক বেশি স্কেলেবল করা যাচ্ছে। অনেকেই এর আগে বলতেন, এ্যাকাডেমিক পড়ানো হয় না কেন! কিন্তু বেশি শিক্ষকদের ঢাকার বাইরে পাঠানোর মতো অবস্থা ছিল না। কিন্তু এই প্যানডেমিকের মধ্যে সারা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের অনলাইনে এ্যাকাডেমিক পড়াশোনা করানো সম্ভব হচ্ছে। এছাড়াও অনলাইনের কারণে বেশ কার্যকরভাবে প্রোগ্রেস দেখতে পারা, কাস্টমাইজভাবে লেসন দেয়া এবং আরও অনেক ধরনের সুযোগ আছে টেকনোলজি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে টিচিংকে আরও ভালো পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার। তবে ফিজিক্যালি যেভাবে এতদিন চলতো সেটার অবশ্যই অনেক বেশি স্ট্রেংথ আছে। কেননা সামনাসামনি যে আদান-প্রদান ঘটে, সেটা অনলাইনে তেমনভাবে সম্ভব নয়, কিন্তু অনলাইনের মাধ্যমে টিচিং এর একটি বড় সুযোগ রয়েছে। এই দুইটির সুযোগ-সুবিধাগুলোকে একত্রিত করে একটি অসাধারণ এক্সপেরিয়েন্স তৈরি করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন যে, সামনে তিনি আরও বড় অপরচুনিটি দেখছেন। অনলাইন এবং ফিজিক্যাল ক্লাসের বিষয়াবলীকে একত্রিত করে শিক্ষা খাতে বেশ ভালো ধরনের ইনোভেশন আনা সম্ভব।

মাহমুদুল হাসান সোহাগের মতে গুরুত্বপূর্ণ বইসমূহ

১। সেভেন হ্যাবিটস অফ হাইলি ইফেক্টিভ পিপল

২। দ্য কম্পাউন্ড ইফেক্ট

৩। মাউন্ডসেট

৪। দ্য লিন স্টার্টাপ

৫। হ্যাকিং গ্রোথ

৬। এনট্রেপ্রেনিয়রস এন্ড বুক

যেভাবে বই নির্বাচন করেন

কোনো বিষয়ে বই খুঁজে বের করার জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করেন মাহমুদুল হাসান সোহাগ। ‍তিনি যখন যে টপিক নিয়ে রিসার্চ করতে চান, সেই টপিকের নাম লিখে তার সাথে টপস বুকস লিখে সার্চ করেন। যেমন: টপস বুকস অন লিডারশিপ। সার্চ করলে অনেকগুলো আর্টিক্যাল আসে, তিনি সেই আর্টিকেলগুলোর ভেতরে লক্ষ্য করেন কোন বইগুলোর নাম বার বার এসেছে। তিনি সেই বইগুলো অ্যামাজনে সার্চ করেন এবং সেখান থেকে সেই বইগুলোর রিভিউ-রেটিংগুলো দেখেন। রিভিউ-রেটিং দেখে তিনি মোটামুটি আইডিয়া পান কোন বইগুলো পড়া প্রয়োজন আর কোনগুলো তেমন ভালো নয়। এরপর তিনি চূড়ান্ত একটি তালিকা তৈরি করে বইগুলো কিনে ফেলেন। যেহেতু একেকজনের বইপড়ার টেস্ট একেকরকম, তাই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে কেউ তার পছন্দের বই খুঁজে নিয়ে পড়তে পারেন।

পরিশেষে মাহমুদুল হাসান সোহাগ আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এর একটি উক্তির কথা বলেন- ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।’ আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় কিছু করি না, কারণ- আমরা নিজেকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকি এবং আমাদের চিন্তাধারাটাই ছোট। আমরা অনেক সময়েই ভাবি একটি জেট প্লেন কিনবো, কিংবা একটি হেলিকপ্টার কিনবো। এগুলোও ক্ষুদ্র মানসিকতার চিন্তাধারা, কেননা এখানে কেবল নিজেকে নিয়েই ভাবা হচ্ছে। বড় কিছু করতে গেলে ভাবনাকে বড় করতে হবে, মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। সবসময় মনে রাখতে হবে যে, সৃষ্টিকর্তা আমাদের যে মেধা দিয়েছেন সেটা আমাদের সম্পদ। এটা ব্যবহার করা আমাদের দ্বায়িত্ব। এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হতে হবে। কেননা আমাদের দেশে অনেক মিডিওকর মানুষ আছে, তাই আমাদের মিডিওকর বা মোটামুটি ভালো’র প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রয়োজন শ্রেষ্ঠত্ব, যার মাধ্যমে আমরা অন্য মানুষের, দেশের, পৃথিবীর উন্নতি করতে পারব।

ছবি- অন্তর্জাল

সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সাহায্য করতে পারে যে বইগুলো 

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কিত বই 

সহজে ভাষা শেখার বইগুলো দেখুন 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading