যেভাবে আদর্শ এবং অনুকরণীয় শিক্ষক হবেন?

15

শিক্ষকতা অত্যন্ত মহান একটি পেশা। আমরা যা শিখি তা অন্যকে শেখানোর মধ্যে একটি আনন্দ রয়েছে। ইসলামিক দৃষ্টিকোণে, আমি যদি কাউকে কিছু শেখাই এবং সে যদি তা অন্য কাউকে শেখায় তাহলে আমিও পূণ্যের ভাগ পাবো। এটাকে ইসলামে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বলা হয়। যারা মন-প্রাণ দিয়ে কাজ করতে চান এবং শিক্ষার্থীদের পেছনে অধিক সময় ব্যয় করে কাজ করতে চান তাদের শিক্ষকতা পেশায় আসা উচিত। রকমারি ক্যারিয়ার কার্নিভালের ক্যারিয়ার ক্যাফে লাইভের আড্ডায় কথাগুলো বলছিলেন জামালখান কুসুম কুমারী সিটি কর্পোরেশন গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকা লুৎফুন্নিছা খানম। লুৎফুন্নিছা খানম একজন প্যাশনেট শিক্ষক। ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে তিনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদানের চেষ্টা করেন। শিক্ষকতার স্বীকৃতি ও গবেষণার কাজে তিনি একাধিক দেশে আমন্ত্রিত হয়েছেন। লুৎফুন্নিছা খানম ক্যারিয়ার ক্যাফে লাইভে কথা বলেন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষকতা পেশায় নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে। শিক্ষকতা পেশায় লুৎফুন্নিছা খানমের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির কথা নিয়ে এবারের আয়োজন।

১. জানতে হবে- শিক্ষকের কাজ কী?

লুৎফুন্নিছা খানমের মতে বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো- শিক্ষার্থীদের মোটিভেট করা। তার মতে, এখন ট্রেডিশনাল শিক্ষার যুগ নেই। ক্লাসে শিক্ষক যা বলবেন তাই খাতায় তুলে শিখতে হবে- সেই ট্রেন্ড এখন নেই। এখন শিক্ষার্থীরা স্কুলের বাইরে বাসায় বসেও ইন্টারনেটে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারছে। কাজেই শিক্ষার্থীদের মোটিভেট করাই এখন শিক্ষকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ।

২. শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করা

এখনকার শিশু-কিশোররা আগের চেয়ে অনেক বেশি দুষ্টুমি করে। কিন্তু তাই বলে শিক্ষকদের খুব বেশি কঠোর হওয়া যায় না। শিক্ষাকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে শিশুদের মনোযোগী করে তোলা যায়। অর্থাৎ, এক ঘেমেয়ি শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করতে হবে। লুৎফুন্নিছা খানম ইংরেজি ক্লাস তার শিক্ষার্থীদের নানা রকম গেমের সাহায্যে শিক্ষা প্রদান করেন।

৩. আদর্শ শিক্ষক হতে হবে

লুৎফুন্নিছা খানমের মতে, একজন আদর্শ শিক্ষকের কয়েকটি গুণ থাকা চাই।

১. শিক্ষকতা পেশাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতে হবে।

২. ভালো কমিউনিকেশন স্কিল থাকতে হবে।

৩. শিক্ষার্থীদের পেছনে সময় ব্যয় করতে হবে।

যদি এমন হয়ে থাকে, আপনি অনেক জানেন কিন্তু শিক্ষার্থীদের সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারছেন না, তাহলে আপনি ভালো শিক্ষক হতে পারবেন না। একজন ভালো শিক্ষকের ভালো কমিউনিকেশন স্কিল থাকা চাই। একজন আদর্শ শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক ভালো জ্ঞান থাকা চাই। তিনি যে বিষয়ে পাঠদান করবেন সে বিষয়ে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে হবে। সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কৌতুহলী করে তুলতে হবে। একজন আদর্শ শিক্ষকদের আরেকটি বড় গুণ হলো- শিক্ষার্থীদের পেছনে সময় ব্যয় করা। একজন আদর্শ শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের পেছনে সময় ব্যয় করেন, তার ধরন বোঝার বোঝার চেষ্টা করেন, কে কীসে ভালো বা কোন বিষয়ে ভালো করতে পারবে এইসব নিয়ে ভাবেন।

সৃজনশীল পদ্ধতি মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়েছে

লুৎফুন্নিছা খানম বলেন, সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মুখস্থ নির্ভরতা কমেছে। শিক্ষার্থীরা এখন আগের মত বইয়ের লাইন মুখস্থ করে পরীক্ষা দিচ্ছে না। নিজের সৃজনশীলতাকেও কাজে লাগানোর সুযোগ দিচ্ছে। তবে এটা শিক্ষকদের আন্তরিকতার উপরেও নির্ভর করছে। যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য সময় ব্যয় করে নিজে নিজে সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন করছেন তার শিক্ষার্থীরা এর সুফল পাচ্ছে। আর যে শিক্ষক বই বা গাইড বই থেকে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন তার শিক্ষার্থীরা এই সুফল পাচ্ছে না। এজন্য শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের জন্য সময় ব্যয় করার মনোভাব থাকা উচিত।

জিপিএ বনাম মূল্যবোধ

লুৎফুন্নিছা খানম মনে করেন, শুধু জিপিএ-৫ নয়, শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশের ক্ষেত্রেও শিক্ষক ও অভিভাবকদের আন্তরিক হওয়া উচিত। তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেল, কিন্তু তার প্রতিবেশি অসুস্থ হলো কিন্তু সে দেখতে গেল না তাহলে বুঝতে হবে তার নৈতিকতার বিকাশ ঘটেনি। শিক্ষার সাথে মূল্যবোধের সমন্বয় না ঘটলে এই শিক্ষা সমাজের উপকারে আসবে না।

শিক্ষায় চাকরিগত বৈষম্য

টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রজেক্টে কাজ করেছিলেন লুৎফুন্নিছা খানম। এ প্রজেক্টের সম্মেলনে তিনি ম্যানচেস্টারে আমন্ত্রিত হোন। সেখানে যোগ দেওয়ার পূর্বে তিনি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকগুলো কী এই নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন।

লুৎফুন্নিছা খানমের গবেষণায় চারটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা উঠে আসে।

১. চাকরিগত বৈষম্য

২. যানবাহন সমস্যা

৩. পাহাড়ে অপ্রতুল শিক্ষা

৪. শিক্ষার্থীদের মনোভাব না বুঝতে পারা

লুৎফুন্নিছা খানম বাংলাদেশে প্রাইমারি স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা চাকরির মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। অন্য তিনটি প্রতিবন্ধকতার একটি হলো, যানবাহন সমস্যা। বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে প্রচুর জ্যামের সৃষ্টি হয়। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্থ হোন। আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হলো-পাহাড়ি শিক্ষা। পাহাড়ে শতভাগ শিক্ষার প্রচলন করা যায়নি। সবশেষ প্রতিবন্ধকতাটি হলো, শিক্ষকদের আন্তরিকতার অভাব। তারা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হোন।

ভালো ছাত্ররা শিক্ষকতায় কেন আসছে না?

লুৎফুন্নিছা খানম বলেন, ভালো শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতায় আসতে চাচ্ছে না এটি সত্য কথা। ভালো শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। ‘ব্রেন ড্রেন’ সিস্টেম কোনোভাবে থামানো যাচ্ছে না। এতে দেশের ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতায় এখন ভালো বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। তবুও শিক্ষকতায় ভালো ছাত্ররা আগ্রহী হচ্ছে না, তার একটি কারণ, স্কুল শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা এখনো ভালোভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এছাড়াও আরও কিছু কারণ রয়েছে, যেমন- একজন শিক্ষক যখন সহকারি শিক্ষক পদে চাকরিতে জয়েন করছেন, তাকে দেখা যাচ্ছে আজীবন সহকারি শিক্ষক পদেই থাকতে হচ্ছে। প্রমোশনের সুযোগ কম। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে যেমন সহকারি অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক এভাবে প্রমোশনের সুযোগ থাকে, স্কুল শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এমনটা নেই। স্কুল শিক্ষকেরা গবেষণার সুযোগ পান না। গবেষণা করলেও এটা তার চাকরির ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসছে না। এসব কারণেই সম্ভবত ভালো শিক্ষার্থীরা স্কুল শিক্ষকতায় আসতে চাচ্ছে না।

সুমসময়ের আশায় বসে না থাকা

লুৎফুন্নিছা খানম একজন দৃঢ় আত্ম-প্রত্যয়ী নারী। তার জীবনে আছে অসম্ভবকে সম্ভব করা একটি গল্প। মাধ্যমিক পাশের পর বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়াশোনা থেকে দূরে যান তিনি। বিয়ের পর তার কোল জুড়ে আসে দুই সন্তান। সে সন্তান দু’টিকে কিছুটা বড় করে পড়াশোনায় ফিরবেন এই আশায় কেটে যায় সাত বছর।  সাত বছর পর তিনি যখন কলেজে ভর্তি হোন, তার বন্ধু সহপাঠীরা তখন মাস্টার্সে পড়ছে। না দমে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। তারপর আসেন শিক্ষকতা পেশায়। নিজের গল্প থেকে তিনি বলেন, আমরা ভাবি, আমাদের সব সমস্যা শেষ হয়ে গেলে আমরা নতুন করে কোনো কাজ শুরু করবো। কিন্তু আমাদের জাগতিক সমস্যার শেষ কখনো হবে না। পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমাদেরকে নিজের কাজটিকে এগিয়ে নেওয়া শিখতে হবে।

পছন্দের বই

ব্যক্তিগত জীবনে লুৎফুন্নিছা খানম বই পড়তে অনেক পছন্দ করেন। তার পছন্দের বই-

শিক্ষকতা পেশা বিষয়ক বইগুলো

 

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png