আকাশের ঠিকানায় কোনো পোস্ট অফিস নেই

images (24)

ফেব্রুয়ারি মাস, শীতটা প্রায় শেষের দিকে। মেলায় সেবার রুদ্রের একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় রুদ্র জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন। এমন এক পড়ন্ত বিকেলে স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন কবি। তাকে ঘিরে এক গুচ্ছ মানুষের ভিড়। বলা বাহুল্য, ভিড়ে পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যাই বেশি। এমন সময়, ভীড় ঠেলে রুদ্রের এক পাঠিকা রুদ্রের দিকে তার কবিতার বইটি অটোগ্রাফের জন্য বাড়িয়ে দিলেন। রুদ্র এক পলক তার পানে তাকালেন। দেখলেন, তার পরনে একটি শাড়ি, চুল খোপা করে বাঁধা, কপালে ছোট্ট একটি টিপ, হাতে চুড়ি, কানে দুল, চোখে  অদ্ভুত এক ধরণের বিষন্নতা। এই বিষন্নতা রুদ্রের যেন খুব চেনা, খুব আপন।

রুদ্র
কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

মজার ব্যাপার হলো রুদ্র তরুণীর নাম জিজ্ঞেস করলেন না, বইটিতে লিখলেন, “যে কোনো কাউকে”।  পাঠিকা মনে মনে ভাবলেন, আজ আমি কবির কাছে যে কোনো কেউ, বিশেষ কেউ না। এমনকি একটি নামও নয় যেই নাম লিখে অন্তত তিনি আমাকে শুভেচ্ছা জানাবেন। জ্বী, ঠিক ধরেছেন, রুদ্রের সেই পাঠিকা আর কেউ নয়, তসলিমা নাসরিন।

দু’জনের সম্পর্ক ততদিনে বিচ্ছেদে রূপ নিয়েছে। হয়তো একারণেই বইয়ে ‘যে কোনো কাউকে’ বলে সম্বোধন করেছিলেন কবি।

তসলিমা’র সঙ্গে রুদ্রের পরিচয় অনেকটা হুট করেই। তসলিমা তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্রী। সে সময় ‘বিচিত্রা’ ছিল বেশ আলোচিত সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন। বড় বড় কবি-সাহিত্যিকদের প্রায় সবাই এই ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতেন। সেই ম্যাগাজিনে ‘ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন’ নামক একটি বিভাগ ছিল। সেখানে চার-পাঁচ লাইনে বিজ্ঞাপন দাতার নামসহ মনের ভাব প্রকাশের সুযোগ ছিল। এটি অবশ্য নিজের খরচেই ছাপাতে হতো।

তসলিমাও সেখানে প্রায়শই লিখতেন, তবে তিনি পুরো নাম ব্যবহার করতেন না। ‘তনা’ নামে লিখতেন। নামটি কবি হেলাল হাফিজের দেয়া। একবার তসলিমা ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনে লিখেছিলেন, “আমার মরফিয়া তুমি নাও, ঘুমাও মানিক সোনা, ঘুমাও।”

এই লেখাটি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র চোখে পড়ে। লেখাটি পড়েই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ছুটে যান রুদ্র। সেই থেকে দু’জনের পরিচয়।

তসলিমাকে ভালোবেসে রুদ্র “সকাল” বলে ডাকতো। কবিতাতেও তিনি বেশ ক’বার এই নামেই সম্বোধন করেছেন।

“সেই যে আমি স্বপ্নে ভীষণ রক্ত দেখি,
টকটকে লাল রক্ত দেখি
সেই যে আমি রাত্রে চোখে ঘুম আসে না
চোখ বুজলেই মিছিল দেখি, বুলেটবিদ্ধ মানুষ
দেখি
সেই যে আমি একটুখানি স্নেহের কাঙ্গাল, মনে
পড়ছে?
সেই যে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, দ্বিধাগ্রস্ত
দাঁড়িয়েছিলাম
মনে পড়ছে? সকাল, তোমার মনে পড়ছে ?”

দু’জনের কথা হতো চিঠিতে। দেখা করার জন্য কখনও রুদ্রকে ময়মনসিংহ যেতে হতো, কখনও বা তসলিমা ঢাকায় আসতেন। সেসময়ের অনেক কবি-সাহিত্যিক এই কপোত-কপোতীর প্রেমের সাক্ষী ছিলেন।

রুদ্র-তসলিমা’র এই প্রেম চলে প্রায় দেড় বছর। এরপর দু’জন বিয়ে করে নেন। কোর্ট ম্যারেজ। কিন্তু দু’জনের সংসার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ছয় বছর দাম্পত্য জীবন শেষে ১৯৮৬ সালে তারা আলাদা হয়ে যান। বিচ্ছেদের পর রুদ্রর বিরুদ্ধে তসলিমা বিভিন্ন অভিযোগও তুলেছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি পুরো পুরুষজাতি নিয়েই নানা রকম প্রশ্ন তোলেন। এ সময় ‘পূর্বাভাস’ পত্রিকায় তসলিমাকে উদ্দেশ্য করে রুদ্র একটি চিঠি লিখেছিলেন।

আশির দশকের তরুণ লিখিয়েদের মধ্যে তসলিমা নাসরিন ইতিমধ্যে তরুণ কবি হিসেবে নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপিত করতে পেরেছেন। অগভীর ছুঁইয়ে যাওয়া হলেও তার ভাষা মেদহীন এবং বেশ জোরালো। মোটেই মেয়েলি গন্ধ নেই।

সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন পত্রিকায় তার কলাম-বন্দী রচনাগুলোর ভেতর পুরুষ-বিকারগ্রস্ততা লক্ষ্য করছি। লেখাগুলো ঝগড়াটে মেজাজের।

অগ্রজ লেখক হিসেবে আমার, তার সম্ভাবনার প্রতি একধরনের দুর্বলতা রয়েছে। আমরা সবাই জানি তার দাম্পত্য জীবন সংঘাতময়। তার জন্য প্রথমত দায়ী রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে আমি মোটামুটি সকল পুরুষদের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রচন্ড ধিক্কার জানাচ্ছি।

আশা করছি, এরপর আপনার ক্ষুরধার লেখনি থেকে পুরুষেরা রেহাই পাবে। আপনি বরং সৃজনশীল লেখার ব্যাপারে সিরিয়াস হন।

– রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

তসলিমা’র জীবনে রুদ্র যেন ‘রুদ্র’ হয়েই এসেছিলেন। তসলিমা নিজেও রুদ্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন।

রুদ্রকে আমি আমার সতেরো বছর বয়স থেকে চিনি। সেই সতেরো বছর বয়স থেকে রুদ্র আমার সমস্ত চেতনা জুড়ে ছিল। আমাকে যে মানুষ অল্প অল্প করে জীবন চিনিয়েছে, জগৎ চিনিয়েছে- সে রুদ্র। আমাকে যে মানুষ একটি একটি অক্ষর জড়ো করে কবিতা শিখিয়েছে- সে রুদ্র।”

রুদ্রের জীবন ছিল ছন্নছাড়া, কবিদের যেমনটা হয়। শরীরের যত্ন করা তো দূর, রীতিমতো অত্যাচার করতেন তিনি। খাবারের অনিয়ম তো ছিলই, সঙ্গে ছিল অনিয়িন্ত্রিত ধুমপান, মদ্যপান…..। একটা সময় রুদ্রের পাকস্থলীতে আলসার ধরা পড়ে। কিন্তু তিনি এই ব্যাপারটিকে কখনওই খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। অসুস্থতা নিয়েও তিনি ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন কবিতা পাঠের আসরে যেতেন।

একটা সময় রুদ্রকে বাধ্য হয়েই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কবিকে দেখতে হাসপাতালে প্রতিদিনই কেউ না কেউ আসেন। সবার মতো তার প্রাক্তন তসলিমাও তাকে দেখতে গিয়েছিলেন।

হাসপাতালে বেশিদিন থাকতে হয়নি রুদ্রকে। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু একদিন যেতে না যেতেই, ওঠে শোকের মাতম। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করতে কবি বেসিনে দাঁড়ান। সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়ে যান রুদ্র। এরপর আর কোনোদিন সকাল দেখেন নি কবি।

রুদ্র আমাদের আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছেন, অনেকে হয়তো লিখেছেনও। হায়! আকাশের ঠিকানায় যে কোনো পোস্ট অফিস নেই।

রুদ্রের সকল কবিতার বই সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading