আল হামরা : গৌরব, ঐতিহ্য আর বিশ্বাসঘাতকতার স্মারক

মুসলমান শাসিত স্পেনের আল-হামরা নিয়ে যত কথা
Alhambra_palace-01

সৈয়দ আমীর আলী বলেছিলেন, “শক্তিশালী কলম দিয়েই কেবল আল হামরা র সৌন্দর্য বর্ণনা সম্ভব।”

মাদ্রিদের ৪৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে দারু নদীর তীরে সবুজ-শ্যামল এক পাহাড়ে অবস্থিত ‘আল-হামরা’ প্যালেস। আল-হামরার ঐতিহ্যগত গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে ১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে স্পেনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সবার প্রথমেই আসে আল হামরার নাম। প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ পর্যটক আল হামরা দেখতে যান।

আন্দালুসিয়ার আল হামরা মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। মুসলিম শাসনাধীন সময়ে স্পেনের  নাম ছিল আন্দালুসিয়া। ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৭৮২ বছর মুসলিমরা স্পেনকে পরিণত করেছিল সমগ্র ইউরোপের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে। ৭০০ মসজিদ, ৮০০ শিক্ষাকেন্দ্র, ৭০টি সুবিশাল লাইব্রেরি ও কর্ডোভাতে গড়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়। এখানেই জন্ম নিয়েছিল ইবনে রুশদ, ইবনে ফিরনাস, ইবনে তোফায়েলসহ অসংখ্য মুসলিম বিজ্ঞানী। কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে আন্দালুসিয়া, হারিয়ে গেছে মুসলিম শাসকদের প্রতিপত্তি আর গৌরবের ইতিহাস। ক্ষয়ে যাওয়া ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে আন্দালুসিয়ার আল হামরা প্রাসাদ। স্পেনের মুসলিম সভ্যতার এই নিদর্শন নিয়েই আজকে আমাদের আয়োজন।

ইতিহাস

আন্দালুসিয়ার  আল হামরা শুরুতে এমন বিশাল স্থাপনা ছিল না। ৮৮৯ সালে দারু নদীর তীরে একটি ক্ষুদ্র দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। একাদশ শতকের মাঝামাঝিতে গ্রানাডার জিরিদ আমিরাতের  উজির সামুয়েল বিন নাঘরিলা দুর্গটিকে সংস্কার করে নিজের বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে তার পুত্র জোসেফ বিন নাঘরিলা প্রাসাদটিকে আরও সম্প্রসারণ করেন।

১২২১ সালে মুসলিম শাসক ইবনে আল আহমদ তার রাজধানী জেন থেকে গ্রানাডায় সরিয়ে এনে সেখানে তার রাজপ্রাসাদ স্থাপন করেন। ইবনে আল আহমেদ ও তার উত্তরসূরিদের রাজত্বের সময়কে নাসিরীয় খেলাফত বলা হয়। তার নির্দেশেই পাহাড়ের গায়ে আল-হামরা প্রাসাদ ও দুর্গ, শহর, শিক্ষালয়, প্রশাসনিক ভবন তৈরির কাজ শুরু করা হয়। শহর ও শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, দুর্গের কাজ শেষ হয় ১৪০০ শতাব্দীতে। শহরের সুবিধার জন্য খলিফাদের প্রাসাদ আল-হামরার কাছকাছি প্রশাসনিক ভবনগুলোকেও সরিয়ে আনা হয়। ১৪৯২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল নাসিরীয়দের রাজত্বকাল। তারপর ক্যাথলিকদের আক্রমণে নিজেদের সামরিক দুর্বলতাকে স্বীকার করে বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন তখনকার খলিফা নাসিরীয় বংশের শেষ শাসক দ্বাদশ মুহাম্মদ (আবু আবদুল্লাহ)।  ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের পর আল হামরা ব্যবহৃত হতো রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রানী ইসাবেলার রাজসভা হিসেবে। তাদের বিজয়ের পর আলহামরার কিছু নকশা চুনকাম করে ঢেকে ফেলা হয়, কিছু নষ্ট করে ফেলা হয়। রাজা প্রথম চার্লস আলহামরার শীতকালীন প্রাসাদের অনেকটা অংশ ভেঙে সেখানে রেনেসাঁর স্টাইলে নিজের দুর্গ নির্মাণ করেন। এরপর মুরিশ শিল্পের ধ্বংসসাধন চলতে থাকে। ১৮১২ সালে এক যুদ্ধে ফরাসিরা টাওয়ারগুলো ধ্বসিয়ে দেয়। ১৮২১ সালে ভূমিকম্পেও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয় আন্দালুসিয়ার আল হামরা।

স্থাপত্যশৈলী

আন্দালুসিয়ার আল হামরা প্যালেসের স্থাপত্যশৈলী একদিকে যেমন নান্দনিক অপরদিকে খুবই জটিল। প্রাসাদগুলোর বাইরের দিকটা অবশ্য সাদামাটা রাখা হয়েছে। এমনভাবে আলহামরা ডিজাইন করা হয়েছে যেন ভেতরে প্রচুর আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে।  প্রাসাদের ভেতরের দেয়ালগুলো কবি ইবনে জামরাকের কবিতা খোদাই করে সাজানো হয়েছে। এছাড়া রয়েছে নানারকম জটিল জ্যামিতিক কারুকাজ এবং অ্যারাবেস্কের কাজ। অ্যারাবেস্ক হচ্ছে কোনো পৃষ্ঠতলে পরস্পর জড়াজড়ি করে থাকা ফুলপাতার নকশা। ছন্দময় রৈখিক প্যাটার্নে পরস্পর আপতিত সরলরেখার কাজও অ্যারাবেস্কের মধ্যে পড়ে। আরো রয়েছে মুসলিম বিশ্বে ব্যবহৃত আলকাটাডো টাইলসের কাজ, গাণিতিক নকশা ল্যাসেরিয়ার কাজ, স্টাকো এবং ফোলিয়েট অর্নামেন্টসের কাজ। প্রাসাদের সিলিংয়ের সাজেও আছে বৈচিত্র্য। কাঠের তৈরি গম্বুজাকার সিলিং সাজানোর জন্য মাকার্নাসের নকশা।

আল হামরার বর্তমান সংস্করণ নাসিরীয় শাসকদের হাতেই সম্পাদিত হয়। আন্দালুসিয়ার আল হামরা প্রাসাদের বিখ্যাত সিংহ দরবার, হাম্মাম প্রভৃতি স্থাপনা নাসিরীয় আমিরদেরই কীর্তি।

তিনশ বছর ধরে বিভিন্ন পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে প্রাসাদটিকে। একে শুধু একটি প্রাসাদ বললে খুব কম বলা হবে। আলো, আঁধার, বাতাস, জল, নির্জনতার এক সুষম ও শৈল্পিক মিলনমেলার পরিপূর্ণ জগৎ সাজানো হয়েছে প্রাসাদের প্রতিটি ঘরে ঘরে। প্রাসাদের প্রতিটি অংশেই মার্বেল পাথরের অতি সূক্ষ্ম কাজ, আর এর মাঝে আধো আলো, আধো আঁধারের খেলা, বাইরে ফুল, গাছ, ফোয়ারা, রোদ আর ছায়া নিজের শরীরে স্পর্শ আর অনুভূতির মতোই জীবন্ত। আল-হামরা মানব জগতের আত্মিক শৈল্পিক মননের জাগতিক উদাহরণ।

ইনসাইড অফ আল হামরা

 আন্দালুসিয়ার আল হামরা প্রাসাদের অভ্যন্তরের দেয়াল এবং বিভিন্ন অবকাঠামোতে আরবি অক্ষরে কী লেখা আছে, তা জানা সম্ভব হয়নি অনেকদিন। আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে নিবিড় পর্যবেক্ষণে জানা গেছে,  আল হামরার দেয়ালে রয়েছে পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াত।  রয়েছে প্রাচীন আমলের অসংখ্য ক্ষুদ্র কবিতা। স্পেনের ‘স্কুল অব অ্যারাবিক স্টাডিজ’-এর গবেষক জুয়ান কাস্তিলা বলেন, আমরা পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছি। তবে এখন পর্যন্ত ১০ ভাগের অর্থও আমরা উদ্ধার করতে পারিনি। ১২৩৮ সাল থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত গ্রানাডার শাসক গোত্রের একটা আদর্শিক বাণী এতে উৎকীর্ণ আছে। এই বাণীটি শতাব্দীর পর শতাব্দী পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। এতে বলা হয়েছে ‘আল্লাহ ছাড়া কেউ জয়ী নয়’ এই একটি কথাই উৎকীর্ণ আছে হাজারবার। ২০০২ সালে একটি প্রকল্প শুরুর পর এখন পর্যন্ত ১০ হাজার পঙ্ক্তি শনাক্ত করেছি এবং ৩ হাজার ১১৬টি পঙ্ক্তির অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে যে বাক্যটি সবচেয়ে বেশিবার লেখা আছে তা হলো ‘চিরন্তন শান্তি’। এর মাধ্যমে সম্ভবত গ্রানাডা শাসকের প্রতি মানুষের সদিচ্ছার কথাই প্রকাশ করা হয়েছে। সাধারণ কিছু নীতিবাক্যও রয়েছে এসব লিখনের মধ্যে। যেমন আছে, ‘বাক্যে সংযত হও, সুখী হতে পারবে’ এবং ‘আল্লাহ সহায় হলে তোমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে’ ইত্যাদি। ১৪৯২ সালে গ্রানাডা খ্রিস্টানদের হাতে পুনরায় চলে আসার পর শাসক ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার কিছু নির্দেশও এখানে উৎকীর্ণ আছে যার অর্থ এখনো উদ্ধার করা হয়নি। এসব লিখনের অধিকাংশই এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে। কিছু ঢাকা পড়েছে গম্বুজ আর স্তম্ভের আড়ালে। এগুলো পাঠোদ্ধার করা হচ্ছে ত্রিমাত্রিক লেজার স্ক্যানারের সাহায্যে। মুসলিম শাসনামলে মানুষসহ প্রাণীর প্রতিকৃতি অঙ্কন নিষিদ্ধ হওয়ায় দুর্গটির অভ্যন্তরভাগ এসব আরবি লেখনী দিয়েই সজ্জিত করা হয়েছিল ‘

আন্দালুসিয়ার আল হামরা  ১৭৩০ মিটার দেয়ালে ঘেরা একটি শহর। এর ভেতরে রয়েছে ত্রিশটি টাওয়ার আর চারটি সদর দরজা। এর মূলত তিনটি অংশ- প্রাসাদের নিরাপত্তা দানকারী রাজকীয় সেনাবাহিনীর বাসস্থান বা আলকাজাবা, শাসকের পরিবারের আবাস বা সিটাডেল, আর শহর বা মাদিনা। শহরে রাজসভার কর্মকর্তারা বাস করতো। আলহামরার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা তিনটি হলো কোমারিস প্যালেস, কোর্ট অব লায়ন ও পার্টাল প্যালেস। সবগুলোই চতুর্দশ শতাব্দীতে নির্মিত।

আল হামরা পতন

আন্দালুসিয়ার আল হাল হামরা পতনের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছিল স্পেনের মুসলিম অধ্যায়।

আবু আব্দুল্লাহ ছিলেন গ্রানাডায় নাসিরি বংশের দ্বাদশ এবং শেষ শাসক। ১০০২ সালের পরে আন্দালুসিয়া ও অন্যান্য প্রদেশগুলো আভ্যন্তরীন কোন্দলের কারণে প্রায় ৩৪ টি স্বাধীন প্রদেশে বিভক্ত হয় এবং ধীরে ধীরে সেগুলো ইউরোপের খ্রিস্টান শাসকদের হস্তগত হয়। বাকি থাকে শুধু গ্রানাডা। গ্রানাডার শাসক ছিলেন আবু আব্দুল্লাহর পিতা আবুল হাসান আলী। খ্রিস্টানদের সহায়তায় সিংহাসনের লোভে পিতার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে আবু আব্দুল্লাহ। পিতা পুত্রের যুদ্ধে পিছু হটে পিতা আবুল হাসান। উপায় না পেয়ে ভাই আব্দুল্লাহ জাগালের হাতে ক্ষমতা দেয় আবুল হাসান। চাচার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ চালিয়ে যায় আবু আব্দুল্লাহ। চাচাকে অবরোধ করে রাখে আবু আব্দুল্লাহ এবং খ্রিস্টান মিত্ররা। একসময়ে খাদ্য সংকট ও অন্যান্য দূর্দশাগ্রস্থ হয়ে আত্মসমার্পণ করতে বাধ্য হয় আব্দুল্লাহ জাগাল।

রাজা ফার্দিনান্দ আবু আব্দুল্লাহকে আশ্বস্ত করেছিলো গ্রানাডার ক্ষমতা তার হাতেই থাকবে এবং আশে পাশের খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর সাথে বিশ্বস্ত সম্পর্কও থাকবে। আবু আব্দুল্লাহ ফার্দিনান্দের সাথে বন্ধুত্বকে ক্ষমতায় যাওয়ার সিড়িঁ হিসেবে নিয়েছিলেন আর পিতা ও চাচাকে শত্রু বানিয়ে ছিলেন।

আবু আব্দুল্লাহ ক্ষমতা পাননি। মরোক্কোতে গিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হন। মুসলিমদেরকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে দিয়ে যান। বিশ্বাসঘাতকতা, ইতিহাস, গৌরব আর ঐতিহ্যের স্বারক নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে আন্দালুসিয়ার আল হামরা।

ইতিহাস নির্ভর বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading